বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ জুন ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭০টি

সান্ধ্য আলিঙ্গন

কামনা আগস্ট ২০১৭

অব্যক্ত প্রতিদান

ঋণ জুলাই ২০১৭

ব্যর্থ প্রত্যাবর্তন

ঋণ জুলাই ২০১৭

গল্প - কামনা (আগস্ট ২০১৭)

পাথর

ড. জায়েদ বিন জাকির শাওন
comment ৪  favorite ০  import_contacts ১৩৩
এক//

অসময়ে স্বামীকে ঘরে আসতে দেখে সামিয়া খুব অবাক হল। মারুফ মুখ থমথমে। সামিয়া দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো। কিছু না বলে মারুফ ঘরে চলে গেল। সামিয়া গেল পিছুপিছু। মারুফ খাটে গিয়ে বসল। সামিয়া বলল, তোমার কি শরীর খারাপ নাকি? এসময়ে এলে যে? অফিস কি ছুটি নিয়েছ?

-হুম। গম্ভীর ভাবে উত্তর দেয় মারুফ। হাতে একটা খাম ধরা। ডায়াগনস্টিক ল্যাবের রিপোর্ট হবে হয়ত। নাম দেখে তো তাই মনে হল সামিয়ার। নিশ্চই এটা তার শাশুড়ীর রিপোর্ট হবে। আজই দেবার কথা ছিল। কিন্তু এমন কি আছে রিপোর্টে যে মুখ এমন গম্ভীর হয়ে গেল? অজানা আশঙ্কায় সামিয়ার মনে হল নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মারুফ ঘেমে যাচ্ছে দেখে এসি ছেড়ে দিল।

-মা কি করে? আবার কি পেট ব্যাথা করেছিল? ওষুধ খেয়েছে ঠিকমত? মারুফ কথাগুলা বলে সামিয়ার দিকে তাকায়। সামিয়া মনোযোগ দিয়ে শাশুড়ীর আল্ট্রাসনোগ্রাফীর রিপোর্ট দেখছিল। বুঝতে পারছে না কিছুই। গতকালই করানো হল। কয়েকদিন ধরে ওর শাশুড়ীর পেটে বেশ ব্যথা।

-মা এখন ঘুমাচ্ছে। রিপোর্ট এ কি বলেছে? আমি তো কিছুই বুঝলাম না। খারাপ কিছু নাতো? সামিয়া চিন্তিত মুখে জানতে চায়।
-মায়ের তলপেটে পাথর হয়েছে। পাথরটি বেশ বড় হয়ে গেছে। আর খুব দ্রুত মা’কে ওপারেশন করাতে হবে। আজকে আমি গাইনোকলজিস্ট ডাঃ সামিনা হকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে এসেছি। ৭টার সময় যেতে হবে। মায়ের ওপারেশন করাতে হবে জলদি মনে হয়। টেনশন লাগছে।
-টেনশনের কি আছে? আগে ডাক্তার কি বলে দেখই না। সামিয়া সান্ত্বনা দেয় স্বামীকে।
-রিমা কোথায়? আসে নাই স্কুল থেকে?
-কি যে বল! রিমা’র স্কুল থেকে আসতে আরো প্রায় ঘন্টা দুয়েক বাকী। তুমিই না আজকে আগে ভাগে চলে এলে বাসায়।
-ও তাই তো। বলেই মারুফ আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
-হাত মুখ ধুয়ে আস। খাবার রান্না হয়ে গেছে। খেয়ে একটু রেস্ট নাও। এতো টেনশন কর না। সন্ধ্যায় যেতে হবে না? দেখো, মা ঠিকি সুস্থ হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ। পেটে পাথরের অপারেশন তো অনেকেরই হচ্ছে।
-হুম তা হচ্ছে। দেখা যাক ডাক্তার কবে করতে বলেন। মা কিছু খেয়েছে?
-একটু আগে জোর করে খাইয়ে দিয়ে ওষুধ দিলাম। সামিয়া খাবার গোছানোর জন্য রান্না ঘরের দিকে যায়।

সন্ধ্যা ৭টায় ডাঃ সামিনার চেম্বারের সামনে বসা অনেক রোগী। মারুফ এসেছে তহুরা বেগমকে নিয়ে। প্রায় আধাঘন্টা পরে ডাক পড়লো ডাক্তারের রুমে। রিমি বায়না ধরেছিল দাদীর সাথে যাবে। কিন্তু মারুফ আনতে চায় নি। অনেক বলে কয়ে, আইসক্রিম খাওয়ানোর প্রমিস করে রিমিকে রেখে আসতে হয়েছে। মারুফ ডাক্তারের ঘরে ঢুকতে চেয়েছিল কিন্তু তাকে বের হয়ে আসতে হয়েছে। তহুরা বেগমের তলপেটে আবার ব্যথা শুরু হয়েছে। মারুফ তাকে এখনও কিছুই জানায় নাই। মারুফ চিন্তিত মুখে বের হয়ে এসে আবার বসে পড়লো। দুশ্চিন্তায় তার কিছুই ভালো লাগছে না। সময় যেন পার হয়ই না। একসময় দেয়ালে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লো।

ডাঃ সামিনার সহকারী তহুরা বেগমের প্রেসার মেপে একটা খাটে শুইয়ে দিল। অধ্যাপক ডাঃ সামিনা অনেক্ষণ ধরে তহুরা বেগমের মেডিক্যাল হিস্ট্রি আর সব রিপোর্ট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে তহুরা বেগমের তলপেটে টিপে টিপে দেখতে লাগলেন। কোথায় ব্যথা হচ্ছে তা বুঝে নিলেন ভালো করে। এরপর তহুরা বেগমকে নানা রকম প্রশ্ন করতে লাগলেন। আর কাগজে নানা রকম তথ্য লিখতে লাগলেন।

-আপনার বয়স কতো?
-পঁচাত্তর হবে মনে হয়।
-আপনার পেটে ব্যথা কবে থেকে?
-গত চার পাঁচদিন ধরে বেশী ব্যথা হচ্ছে।
-আগে কি এমন হত?
-অল্প অল্প হত।
-আপনার ছেলে মেয়ে কয়জন?
-আমার একটাই ছেলে।
-যাকে দেখলাম একটু আগে, উনি কি আপনার ছেলে?
-জ্বী।
-আপনার বিয়ে হয়েছিল কতো বছর বয়সে মনে আছে?
-আমার অনেক অল্প বয়সে বিয়ে হয়। আমার বয়স মনে হয় পনেরো ছিল।
-বিয়ের কতো বছর পরে আপনার ছেলে হয়?

এবার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তহুরা বেগম মাথা নীচু করে বসে থাকে। ডাঃ সামিনা খুব মন দিয়ে তহুরা বেগমের প্রতিক্রিয়া দেখতে থাকেন। মনে মনে কি যেন খুঁজতে থাকেন তহুরা বেগমের চোখের দিকে তাকিয়ে।
-দেখুন খালাম্মা, আমাদের কাছে কিছু লুকাবেন না। আমরা ডাক্তার। আমাদের কাছে সবকিছু আপনি না বললে আমরা বুঝবো কি করে আপনার কি হয়েছে?
-মারুফ আমার বোনের ছেলে। ওর জন্মের কিছুদিন পরে আমার বোন মারা গেলে আমি মারুফকে আমার কাছে নিয়ে আসি।
-আপনার নিজের কি কোন বাচ্চা ছিল?
-না। বিয়ের দশবছর পরেও যখন কোন বাচ্চা হল না, তখন আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
-বুঝেছি। কখনও কি এমন মনে হয়েছে আপনার যে আপনি গর্ভধারণ করেছিলেন? না কি এমন কখনও মনেই হয় নাই।
-আমার মনে হয়েছিল একবার পেটে বাচ্চা আসছিল। কিন্তু পরে বুঝি যে আমার ধারণা ভুল ছিল। আমার কোন বাচ্চা পেটে আসেই নাই। কিন্তু লক্ষণ কিছু কিছু তেমনই ছিল।
-আপনার মাসিক বন্ধ হয় কতো বছর বয়সে মনে আছে? ডাঃ সামিনা সরু চোখে তাকালেন তহুরা বেগমের দিকে। ভালো মত মনে করে দেখেন।

কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে ভাবতে থাকেন তহুরা বেগম। পরে বলেন, আমার যখন মনে হইছিল পেটে বাচ্চা আসছে, তার পর থেকে আমার আর কোন মাসিক হয় নাই।
-পেটে বাচ্চা আসার ব্যাপার যখন আপনার মনে হল, তখন কি আপনার কোন রক্তপাত হয়েছিল মাসিকের মত? ভাল করে মনে করে দেখেন।
-জ্বী মনে আছে। হঠাৎ আমার মাসিক বন্ধ হয়ে যায়। তখন মনে করছিলাম বুঝি বাচ্চা আসছে পেটে। খুব বমি হইত আর সেই সাথে তলপেটে অনেক ব্যথা হইত। ন্যাকড়া গরম করে ছ্যাঁক নিছিলাম ব্যথা সহ্য করতে না পেরে। আর এর প্রায় পাঁচ মাস পরে একদিন অনেক পেট ব্যথা শুরু হয়। এরপরে টানা কয়েকদিন ধরে রক্ত আসে। আমি বুঝতে পারি যে আমার আর বাচ্চা নাই। ঝরে গেসে। এরপর আর কিছুই হয় নাই। এই ঘটনার পর থেকে আমার আর মাসিক হয় নাই।
ডাঃ সামিনা তার বাম হাতের বুড়া আঙ্গুল দিয়ে কপাল চুলকাতে থাকেন। তহুরা বেগমের আল্ট্রাসনোগ্রামের রিপোর্ট আবার দেখতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে বলেন। খালাম্মা আপনি বাইরে অপেক্ষা করেন আর আপনার ছেলেকে আসতে বলেন। আমি উনাকে বুঝিয়ে বলি কি করতে হবে।
-খারাপ কিছু হলে আপনি আমাকেও বলতে পারেন। আমি এত চিন্তা করি না।
-না না। চিন্তার কিছু নেই। আপনি আপনার ছেলেকে পাঠিয়ে দিন।


দুই//

এক সপ্তাহ পরের ঘটনা। অপারেশন করে পাথর বের করা হয়েছে আরো পাঁচদিন আগে। তহুরা বেগম তার কেবিনের বেডে শুয়ে আছেন। পাশে বসা নাতনী রিমি ডালিম খাচ্ছে আর দাদীর মুখেও তুলে দিচ্ছে ডালিমের দানা। সামিয়া বাসায় গেছে শাশুড়ীর জন্য স্যুপ রান্না করে আনতে। মারুফ চেয়ারে বসে দাদী আর নাতনীর কান্ড দেখছে। আজকে তহুরা বেগমকে রিলিজ দেয়ার কথা আছে। একটু পরে ডাঃ সামিনা দেখতে আসবেন তহুরা বেগমকে।

সামিয়া স্যুপ নিয়ে কেবিনে ঢোকার প্রায় সাথে সাথে ডাঃ সামিনা প্রবেশ করলেন। নার্সের কাছে বিস্তারিত জেনে নিলেন তহুরা বেগমের বর্তমার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে। তলপেটের কাটা অংশটা দেখে বললেন, কেমন আছেন খালাম্মা? আজকে আপনি বাসায় চলে যেতে পারবেন। পেটে কি ব্যথা আছে এখনও?
-না এখন ব্যথা নেই। তবে উঠে বসতে কষ্ট হয়।
-চিন্তার কারণ নেই। ব্যথা সেরে যাবে। আপনি কি আপনার পেটে থাকা পাথরটা দেখেছেন?
-দেখলাম তো।
-কেমন মনে হল আপনার?
-কেমন আর মনে হবে? এত বড় পাথর আমার পেটে ছিল বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়। এমন কেন? মনে হয় যেন একটা অংশ মাথা আর একটা অংশ শরীর। তহুরা বেগম বড় করে নিঃশ্বাস নিলেন।
-আপনার ছেলে আপনাকে সব বুঝিয়ে দিবে খালাম্মা। আমি উনাকে সব বুঝিয়ে দিয়েছি। আমি সব কাগজপত্র তৈরী করতে বলেছি। রেডী হয়ে গেলে আপনি বাসায় চলে যাবেন। ডাঃ সামিনা চলে গেলেন কেবিন থেকে।


তহুরা বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ডাক্তার কি বলতে বলল তোকে মারুফ? মারুফ কি বলবে বুঝে উঠতে পারলো না। সামিয়ার দিকে তাকালো অসহায় ভঙ্গীতে। সামিয়া মাথা দিয়ে ইশারা করে বুঝালো মাকে সব জানিয়ে দিতে।
-মা। তোমাকে আমি সব বলব কিন্তু তুমি মন খারাপ করতে পারবা না। এই পাথরটা তোমার পেটে প্রায় পঞ্চান্ন বছর ছিল। তুমি কিছুই টের পাও নি।
-কি বলিস তুই? পঞ্চান্ন বছর? এতদিন কারো পেটে পাথর থাকে? তহুরা বেগমের চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
-অনেক কম মানুষের এমন থাকে মা। তোমার কাছে গোপন করার কিছু নেই এখন। ডাক্তার সামিনা আপা আমাকে সব বলেছেন তোমার অপারেশনের আগেই। এই পাথরটা আসলে তোমার বাচ্চা ছিল মা। তুমি টের পাও নি। তোমার পেটে থাকতেই একসময় বাচ্চাটা মরে যায়। কিন্তু তোমার পেট থেকে বের হয়ে আসে নাই। এরপরে আস্তে আস্তে এটা পাথরে পরিণত হয়। আপা বললেন, আমাদের দেশের ইতিহাসে এমন ঘটনা আর কারো ক্ষেত্রে ঘটেছে কিনা উনার জানা নেই। এমন ঘটনা যে একেবারে ঘটেনা তা না। কিন্তু লাখ কোটিতে বা শত বছরে হয়ত এমন দুই একটা ঘটনা ঘটে মা।

তহুরা বেগম কিছুই বললেন না। ফ্যালফ্যাল করে মারুফের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সারাজীবন নিজেকে বাঁজা মেয়েমানুষ মনে করেছিলেন। অথচ নিজের পেটে নিজের বাচ্চাকে ধরে রেখেছেন পঞ্চান্ন বছর ধরে। বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠতে চাইল। অনেক শক্ত মনের মহিলা তিনি। নিজেকে সামলে নিলেন। জানতে চাইলেন, ছেলে ছিল না মেয়ে ছিল কিছু জানা গেছে মারুফ?
-জানা গেছে মা। এটা তোমার ছেলে ছিল।

মুখ ঘুরিয়ে নিলেন তহুরা বেগম। মারুফ মৃদু স্বরে আবার ডাক দিল, মা? কিন্তু তহুরা বেগম সাড়া দিলেন না। মারুফ আলতো করে মায়ের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, বাসায় যেতে হবে মা। তোমার খারাপ লাগছে না তো?
-আমি কোথাও যাব না। তুই যা তোর বাসায়। মারুফের দিকে না তাকিয়ে কথাগুলা বললেন তহুরা বেগম।
-কেন মা? রাগ করলে কেন? আমি কি করলাম? মায়ের মন একটু হাল্কা করার চেষ্টা করে মারুফ। মায়ের রাগের কারণটা ধরতে পারছেন না।

এবার ছেলের দিকে তাকালেন। তহুরা বেগমের দুই চোখে পানি টলটল করছে। ‘তুই বললি, এই পাথরের টুকরা আমার ছেলে? একটা পাথরের টুকরা যা আমার পেটে ছিল, কবে হল কিছুই জানি না। এটা আমার ছেলে হয়ে গেল। কি সুন্দর বলে দিলি। আর তোকে যে আমি তোর জন্মের পর থেকে মানুষ করেছি, সেটা কিছু না? একটা পাথরকে তুই আমার ছেলে বানিয়ে আমাকে পর করে দিলি?


মায়ের কথাগুলা শুনে মারুফের চোখেও পানি এসে যায়। ‘আমার ভুল হয়ে গেছে মা। আর এমন ভুল হবে না। মাফ করে দাও মা’, কথাগুলা বলে মায়ের হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় তুলে নেয় মারুফ।


আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন