বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৯৪টি

বাবা (জুন ২০১৭)

শাশ্বত ও শ্রেষ্ঠ মানুষ বাবা

সেলিনা ইসলাম
comment ০  favorite ০  import_contacts ৫০
যুদ্ধটা যে অনিবার্য তা বুঝতে আব্বার একটুও সময় লাগলো না। আর তাই নিজের ইগোকে দূরে রেখে শুধু মাত্র যুবতি মেয়েদের কথা ভাবলেন। পাকিস্থানি ব্যবসায়ী প্রতিবেশীর অত্যাচার যখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে? তখন বাধ্য হয়েই বাড়ীটা বিক্রি করে নতুন জমি কিনলেন বিলের মাঝে। বুকের মাঝে হাজারো স্বপ্ন ঢেউ তুলে গেলেও-কোথায় যেন একটু হলেও আছে অনিশ্চয়তার ভয়। যে ভয় সারাক্ষণ উইপোকার মত কুরে কুরে খাচ্ছে মনের ভিত! আর তাই কোন রকমে জায়গাটাতে মাটি ভরাট করে। সেখানে নলি বাঁশের বেড়া আর গোলপাতার ছাউনি দিয়ে দুই রুমের একটা ঘর তোলা হয়েছে। ছোট্ট একটা উঠান যার মাঝে লম্বা সরু গর্ত করে তার উপরে রাখা হয়েছে বালির বস্তা। পাকিস্থানি যুদ্ধ বিমান এয়ার স্ট্রাইক শুরু করলেই বেজে উঠত সাইরেন! সাইরেন শুরু হলেই যে যেখানেই থাকুক না কেন? হুড়মুড় করে এই গর্তের মধ্যে ঢুকে যায়! শুকনো খাবার আর পানি এই গর্তে আগে থেকেই রেখে দেয়া আছে! যদি গুলি করে তা থেকে বাঁচার কিছুটা চেষ্টা করা।

বাড়ির চারদিকে শুধু পুকুর আর পুকুর। বামে তালুকদারের পুকুর,ডানে নিলুদের পুকুর আর পিছনে শরিফ সাহেবের বিশাল পুকুর। মেইন রাস্তায় আসার জন্য তক্তা আর বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে সাঁকো! সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে এই সাঁকো খুলে রাখা হত যেন কেউ আসতে না পারে সেইজন্য।
আমাদের বাসার চারদিকে আরও বেশ কতগুলো বাড়ি। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে নেমে আসে ভূতুড়ে পরিবেশ। হ্যারিকেনের টিমটিম আলোতে সবাই কোন রকম খাওয়া দাওয়া শেষ করে একেবারে দলা পাকিয়ে একজন আরেকজনের গায়ের সাথে মিশে আধাঘুমে থাকি। কষ্টের রাতগুলো হয় ভীষণ বড়। কারোর চোখেই যেন ঘুম নেই। আমার আব্বা ট্রানজিস্টার রেডিওতে বিবিসির খবর শোনার অনেক চেষ্টা করছে। ঘ্যার ঘ্যার শব্দে স্পষ্ট কিছু শোনাও যাচ্ছে না। ট্রানজিস্টার রেডিওর সাদা রঙের এন্টিনা একেবারে যেন ঘরের চালা ছুঁয়ে গেছে! তবুও কিছুই শোনা যাচ্ছে না। আব্বা ভীষণ বিরক্ত হলেন। হঠাৎ তুমুল গুলাগুলির আওয়াজ। সেই সাথে হাজারো মানুষের চিৎকার! আব্বা মাকে ফিসফিস করে হ্যারিকেন একেবারে বন্ধ করে দিতে বললেন। কেমন যেন থমথম করছে চারদিক। উনি আস্তে আস্তে উঠানে এসে দাঁড়ালেন। আমাকে কোলে নিয়ে পিছনে পিছনে মাও এলেন। উত্তর দিকের আকাশে তাকিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন মা। বিশাল আগুণের কুন্ডুলি আর ধোঁয়ায় পুরো আকাশটা লাল হয়ে গেছে। আব্বাকে ভীষণ অস্থির দেখাল। অস্থিরতায় পায়চারি করতে লাগলেন। এমন সময় জ্যোৎস্নার আলোতে স্পষ্ট দেখা গেলো- কেউ একজন আমাদের বাড়ির দিকেই আসছে। আব্বা মাকে বললেন ভীতরে যাও। ছায়ামূর্তি কাছে আসতেই দেখি জাকির কাকা। তিনি উত্তেজিত হয়ে আব্বাকে বললেন
- "ভাইসাব মনে হচ্ছে নদীর ওপারে মিলিটারি গ্রামে আগুন লাগাই দিছে!" আব্বা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন
-"আমারও তাই মনে হচ্ছে। ওপারে অনেক হিন্দুরা বাস করে। সম্ভবত ওদের বাড়িঘরই...!"একটু থেমে কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন-"মনে হচ্ছে পরিবার আর শহরে রাখা যাবে না। ওরা যে কোন সময় আমাগের মহল্লায়ও হানা দিতে পারে!"
-"ভাই গাড়ী ঘোড়া তো কিছু চলে না। লঞ্চও বন্ধ। আমাগোর পরিবার লইয়ে কীভাবে গোপালগঞ্জ-এ পাঠাবিনে!? মরলি এইহেনেই মরতি হবে!" জাকির কাকার কথা শুনে আব্বা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন-
- "মিয়া চিন্তা কর না। আমার পরিবার যেখানে যাবে তোমার পরিবারকে সাথে নিয়েই যাবে। তুমি এখন বাসায় যাও।" আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন-"মনে হচ্ছে আগুন এখন কমে গেছে।" মানুষের চিৎকারও অনেকটাই কমে এসেছে। আগুণের পোড়া গন্ধ বাতাসে ভেসে নদী পার হয়ে আমাদের নাকে লাগছে। আব্বা ঘরে ঢুকে আবার ট্রানজিস্টার রেডিও নিয়ে ব্যস্ত হলেন। মা অজানা আশঙ্কায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর তজবি আদায় করছে। সারা রাত ধরে আব্বা একটু পরপর বাইরে এসে টর্চ মেরে মেইন রাস্তায় দেখার চেষ্টা করছেন কেউ আসছে কিনা।

তখন প্রায় ভোর হয় হয়। মা কেবল একটু ঝিমুনি দিয়েছে। এমন সময় পানির ছলাত ছলাত ঢেউয়ের আওয়াজ। মনে হচ্ছে পানি ভেঙে কারা যেন এদিকেই ছুটে আসছে! মা ধড়ফড় করে উঠে বসলেন। বাবা ঠোঁটে হাত দিয়ে শব্দ করতে নিষেধ করলেন। হাতে তুলে নিলেন বড় রামদা। শব্দটা একেবারে ঘরের দরজায় এসে থামল। "ঠাক ঠাক" করে দরজায় বাড়ি মারছে কেউ। আব্বা দেখার চেষ্টা করল কিন্তু কিছুই দেখা যাচ্ছে না। এমন সময় এক নারী কণ্ঠ "ও মাসিমা দরজা খুলেন আমি নীলিমা" আব্বা সাথে সাথে দরজা খুলে দিলেন। তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করল নীলিমা আর তার তিন মেয়ে। মা ডিম দেয়া হ্যারিকেনে একটু তেজ করে দিতেই দেখলেন সবাই ভিজে চপচপ করছে। কাছে এসে নীলিমাকে ধরে বসালেন একটা চেয়ারে। একে একে দেখলেন তিন মেয়ের ভয়ার্ত মুখ। তারপর আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করলেন " নীলিমা তোমার বড় মেয়ে কৈ? তোমার স্বামী কৈ? হরেন দা?"

এবার নীলিমা হাউমাউ করে কেঁদে বললেন-"মাসিমা গো আমার বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার স্বামী আর বড় মেয়েরে রাজাকারেরা তুলে নিয়ে গেছে। আমি বহু কষ্টে তিন মেয়ে নিয়ে নদী সাঁতরে এপারে আসিছি। ও ও মাসিমা গো সারা গ্রামে আগুন দিছে...। হাঁয় ভগবান...কত মানুষ জ্যান্ত পুড়ে মরে গেলো রে...! ও মেসো তুমি আমার মেয়ে আর স্বামীরে এনে দাও... আমি ওপারে চলে যাব। ও মেসো তোমার পায়ে ধরি আমার মেয়েরে এনে দাও"! এতক্ষণে বুঝা গেলো নদীর ওপারে আগুন মিলিটারি নয়। রাজাকারেরা লাগিয়েছে। আব্বা কিছু না বলে বের হয়ে গেলেন। মা ভয় পেলেন ভীষণ।
সকাল হয়ে দুপুর গড়িয়ে গেলো আব্বা ফিরলেন না। মা খাওয়া দাওয়া বাদ দিয়ে জায়নামাজে বসে আল্লাহের কাছে ফরিয়াদ করতে লাগলেন। আর নীলিমা সেই ভিজে কাপড়ে উপোষ করে মেঝেতে বসে ভগবানকে ডাকতে লাগলেন। আব্বা কেন ফিরে আসছে না তা ভেবে মা কান্নাকাটি করতে লাগলেন।

সারাদিন বাসায় চুলা জ্বলেনি। আব্বাকে খুঁজতে চারদিকে লোক পাঠানো হল। কিন্তু আব্বার কোন খবর কেউ পেলো না। আমার খালা খালু তখন জাসদের এক্টিভ সদস্য। আব্বার বন্ধু মনুকাকাও মেজর জিয়ার আন্ডারে যুদ্ধে গেছেন। বাসায় বড় বোন আর তার জামাই। বড় বোন গর্ভবতী। কেমন একটা শোকের ছায়া পড়েছে সারা মহল্লাতেই যেন। আমাদের মহল্লায় রাজাকারও একেবারে কম ছিল না। হাজার হোক খান এ সবুর-এর শহর! মা বুঝে পেলেন না তিনি মনুকাকাকে না নিজের বোন বুনাইকে খবর দিবেন? একবার ভাবলেন খান এ সবুর এর মুসলিম লীগের যে অফিস আছে সেখানে কাউকে পাঠাবেন কিনা। কিন্তু সাহস করলেন না। সেই সময়ে কাউকে বিশ্বাস করাও ছিল ভয়ঙ্কর বিপদ। সবাই সবাইকে সন্দেহের নজরে রাখে। কথাবার্তা নিজেদের মাঝে এমন ভাবে বলে যেন দেয়ালও না শুনতে পায়। তার উপর ঘরে হিন্দুদের আশ্রয় দিয়েছে! এই কথা জানাজানি হলে ঘরের সবাইকেই জ্যান্ত পুড়িয়ে মারবে! আতঙ্কে সবাই প্রায় আধমরা হয়ে আছে। আল্লাহ-ই একমাত্র ভরসা।

সন্ধ্যার দিকে আব্বা এলেন। মুক্তিসেনাদের সাথে নিয়ে মিলিটারি ও রাজাকারদের সাথে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়েছে। যুদ্ধ শেষে ছিনিয়ে এনেছেন নীলিমাদির বড় মেয়ে এবং তার আহত স্বামীকে। পুরো সময়টা যে ওদের উপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে সারারাত,তা ওদেরকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে! আব্বাকে বেশ বিধ্বস্ত লাগছিল। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেলেন। কারো সাথে কোন কথা বললেন না। মা বুঝতে পারলেন বড় ধরণের কোন ঘটনা ঘটেছে। মায়ের ভয়টা যেন আরও গাঢ় হল। কিন্তু আব্বাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেলেন না। একসময় আব্বা খুব ধীর লয়ে মাকে বললেন ভাত,ডাল আর একটা তরকারি রান্না করতে। কিন্তু বাজার! এখন তরকারি কোথায় পাবে? চারদিকে ধ্বংসস্তূপ আর জান বাঁচানোর লড়াই। এই সময়ে বাজার সদাই কোথায় পাবে? ডাল আছে আগেই সংগ্রহে রেখেছিল বলে। মা শুধু ভাত,ডাল আর কয়েকটা ডিম ভাঁজি করে রেডি করে রাখলেন। রাত গভীরে কয়েকজন ছেলে এসে খাবারগুলো সব নিয়ে গেলো। আর যাবার বেলা আব্বার সাথে ফিসফিস করে কীসব যেন বলে যায়। আব্বা শুধু মাথা নেড়ে সাঁয় দেয়। সেদিন রাতে আব্বাকে ভীষণ চিন্তিত দেখাল। নীলিমাদি তার পরিবার নিয়ে তার কোন আত্মীয়ের গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন। আব্বা বেশ ব্যস্ত হয়ে গেলেন আমাদেরকে শহর ছেড়ে গ্রামে পাঠাবার জন্য। মা কিছুতেই শহরে তাঁকে একা রেখে যাবেন না। কিন্তু আব্বা বেশ রেগে গেলেন।

পরের দিনই আব্বার পরিবর্তনের কারণ সবাই বুঝে গেলো। খবর এলো রাজাকার এবং মিলিটারিরা মিলে আমাদের খাদ্য গুদামটিসহ দুইটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আব্বা এখান থেকেই খাবার সরবরাহ করত। আমি আব্বাকে সেদিনই প্রথম অগ্নিমূর্তি ধারণ করতে দেখেছিলাম। তাঁকে দেখে বেশ ভয়ও পেয়েছিলাম। তিনি কেবল বিড়বিড় করে বলছিলেন-'সব শেষ করে দিলো জানোয়ার গুলো। আমার সুখের পৃথিবীটায়ও ওদের হিংস্র নজর পড়েছে। ওরা এখন সবাইকে ধরে নিয়ে যাবে। মেরে ফেলবে!' মা আব্বার কথায় আর শহর ছেড়ে যেতে অবাধ্য হলেন না। শহরের পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে মামারাও নৌকা নিয়ে হাজির হলেন। যা ছিল করুণাময়ের অশেষ কৃপা।

একদিন পরেই খুব ভোরে আমাদের সবাইকে নিয়ে মা নৌকায় করে গ্রামের দিকে রওনা দিলেন। পিছনে ফেলে রেখে গেলেন আপন ধরণী। যে ধরণী জুড়ে কেটেছে মায়ের সারাটা জীবন। মা মুখে আঁচল চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে গেলেন। আর আমি দেখলাম আমার বীর বাবাকে। যে একাই থেকে গেলেন শহরে শুধু মাত্র মুক্তিসেনাদের সহযোগিতা করতে। শত্রুর মোকাবেলা করতে। বাবা বুঝি এমনই হয়! নিজের জীবনের চেয়েও পরিবার,সন্তান অনেক বেশি মূল্যবান! সন্তানদের জীবন বাঁচাতে বাবা আগুনেও ঝাঁপ দিতে পারেন! কথাটা ভাবতেই বুকের ভিতরে চাপচাপ ব্যথা অনুভূত হল। 'মা আব্বাকে আবার দেখতে পাবো তো?' আমার বলা কথায় মা আমাকে জড়িয়ে ধরে বেশ জোরেই কেঁদে দিলেন। বেশ কিছু লাশ ভাসতে দেখলাম নদীতে! বৈঠা দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে যাবার পথ করে নেয়! নৌকা ছলাত ছলাত দ্রুত গতিতে দূরে যেতে যেতে বহু দূরে চলে যায়। আমি ঝাপসা চোখে দেখলাম আব্বা জেটিতে দাঁড়িয়ে তখনও হাত নেড়ে যাচ্ছে। দেখলাম এক সময় বাবা হাত উঁচু করে দুই আঙুলে ভিক্টরি সাইন দেখেচ্ছেন-'বিজয় আমাদেরই হবে দেখে নিও মা!' মনে হল বাবা আমার মনের কথা আর ভয়ের কারণ বুঝে গেছেন। এক সময় ধীরে ধীরে বিন্দু হতে হতে মিলিয়ে গেলেন-পৃথিবীর শাশ্বত ও শ্রেষ্ঠ একজন মানুষ,আমার বাবা।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন