বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৯৭টি

ইলিনা এবং হন্তারকের কাহিনী

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

সেই মেয়েটি

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

জ্যোৎস্নায় জলরঙ

কামনা আগস্ট ২০১৭

গল্প - আঁধার (অক্টোবর ২০১৭)

ট্রিক অর ট্রিট

সেলিনা ইসলাম
comment ১৩  favorite ০  import_contacts ২০৪
এক

সারাদিন ঘরের সব কাজ করে। পরিবারের সবার সেবা যত্ন শেষ করে। রাতে যখন মিথিলা পরী আর নুরীকে ঘুম পড়াতে যায়? মেয়ে দুটো মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আবদার করে বলে-'মা একটা গল্প বল না প্লিজ।' মিথিলা'র একেবারে গল্প বলতে ইচ্ছে হয় না। রাজ্যের ক্লান্তি এসে শরীরে ভর করে। মনে হয় মেয়েদের সাথেই ওদের বিছানায় ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু গল্প না বলা পর্যন্ত ওরা ঘুমাবে না-এটাও সে জানে। ওদের ছোটবেলা থেকেই যে এভাবে ঘুম পড়াতে মিথিলাই অভ্যাস করেছে। তাই বড় একটা হাই তুলে মিথিলা গল্প বলা শুরু করে-
-একদিন একটা ইঁদুর রাস্তা পার হতে পারছিল না। সাথে সাথে পরীর প্রশ্নঃ-
- ইঁদুরের রাস্তা পার হতে তো ড্রেইন আছে। সে রাস্তায় কেন আসবে? এই মেয়েটাকে নিয়ে মিথিলা'র হয়েছে যত জ্বালা! আরে গল্প বলছি শোন। তারপর ঘুমা। তা না... প্রশ্ন করে করে ওর ঘুমের সাথে সাথে নিজের ঘুমেরও বারটা বাজিয়ে ছাড়ে। মিথিলা খেয়াল করেছে-মেয়েটা বড় হচ্ছে আর যেন একটু বেশিই ঠোঁট কাঁটা স্বভাবের হয়ে যাচ্ছে। এতটা স্পষ্টভাষী হওয়া ওর নিজের জন্যই ক্ষতিকর। তাও এত অল্প বয়সে। যারা মুখের উপর সত্য বলে। তারা বেশির ভাগ মানুষেরই অপছন্দ। তারা সবার অপ্রিয় হয়ে যায়। শত্রু বেড়ে যায়। সব সময় সব সত্য সব জায়গায় প্রকাশ করতে নেই। এই টুকুন মেয়ে কী তা বুঝে? আসলে মেয়েটাকে বুঝাতে হবে। না হলে কখন কী বিপদ ঘটে কে জানে! মিথিলার কপালে স্পষ্ট হয় চিন্তার ভাঁজ।

মিথিলা কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার কথা বলা শুরু করে-
-আচ্ছা এবার ভূতের গল্প বলি শুনো। নুরী ভূতের কথা শুনেই মাকে জড়িয়ে ধরেছে...! বলে-
-মা ভূত...! আমি ভূতকে ভীষণ ভয় পাই মা! নুরীর কথা শুনে পরী ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে আছে মায়ের দিকে। ডিম লাইটের আলোতেও মেয়েটার চোখ জ্বলজ্বল করছে। মেয়েটা যে অনেক বিরক্ত তা বুঝতে মিথিলার একটুও দেরি হল না। তবুও সে গল্প বলে-
-একটা অন্ধকার গুহা! সেই গুহার ভীতরে একটা ভূত থাকে।
পরী ওমনি বলে উঠে-
- নুরী ভয় পাস না! আম্মু মিথ্যে বলছে।
মিথিলা এবার মৃদ্যু ধমক দিয়ে বলে-
-কে বলল আমি মিথ্যে বলছি? পরীর স্বাভাবিক জবাব-
- তুমিই তো বললে অন্ধকার গুহা। অন্ধকারে কী ভূত দেখা যায়?
-কেন যাবে না?
-অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না।
-কে বলেছে? অন্ধকার কালো আর ভূত যদি সাদা হয়। তাহলে কী ভূত দেখা যাবে না?
পরী এবার গভীরভাবে চিন্তা করছে। নুরী বলে উঠে-
-কিন্তু মা ভূত তো কালো। মস্ত বড় আর গুল গুল চোখ থাকে। 'গুল গুল চোখ' মেয়ের কথা শুনে হাসি আসে। তবু মিথিলা হাসে না।
এবার পরী বলে- নুরী তুই জানিস না! ভূত বলে আসলে কিছু নেই। যা আছে সেগুলো খারাপ জিন আর পরী। ওরা দেখতে সাদা ফর্সা আগুণের মত। মা তুমি বোকা এটাও জান না।
মেয়ের কথা শুনে মিথিলা 'হা' হয়ে যায়! বিস্ময়ে সে যেন কথা বলা ভুলে যায়। এই মেয়ে এত কিছু কীভাবে জানে? নিশ্চয় স্কুলে এসব শেখায় না। কার কাছে শিখল? তাহলে কী পরী অন্য কারো সাথে মেলামেশা করছে? যা হয়ত মিথিলা জানে না! সকালে স্কুলে ওদের বাবা নিয়ে যায়। দুপুরের পরে সে নিজেই গিয়ে মেয়েদের নিয়ে আসে। এই সময়টুকু ওরা স্কুলে থাকে। বাসায় এনে মিথিলা আর বুয়াই ওদের দেখাশুনা করে। তাহলে পরি এসব জানলো কোথায়! মিথিলাকে কী এক অজানা ভয় জড়িয়ে ধরে। থিরথির করে হৃদয় কেঁপে যায়। পরীকে বুকে টেনে নেয়। ওর কপালে চুমু দিয়ে বলে- মা তোমাকে কে এসব গল্প বলেছে?
-কেন তুমি তাকে বকা দেবে মা?
মিথিলার ভয়টা আরও গাঢ় হয়। গভীরভাবে পরীকে দেখে। তারপর বলে-
-না মা বকা দেব না। তুমি বল কে তোমাকে এসব বলেছে?
এবার পরি ফিক করে হেসে দিয়ে বলে-
-মা এগুলো সব সত্যি তাই না? মাকে যেন হারিয়ে দিতে পেরে বিজয়ী হয়ে গেছে। এমন জয়ের হাসি দেয় পরি। তারপর বলে-
-এসব দাদু আমাকে বলেছে। আর আমাদের টিচারও বলেছে ভূত বলে আসলে কিছু নেই,নেই নেই। সব পচা মানুষেরা ভয় দেবার জন্য মিথ্যে বলে।
মিথিলা আরও অবাক হয়। ওর দাদু মানে মিথিলার শ্বশুর। সে তো মারা গেছে প্রায় দুই বছর হল। এবার সত্যি সত্যি মিথিলা ভয় পায়। মেয়েকে তবু প্রশ্ন করে
-এসব তোমার দাদু কবে বলেছে?
-আমি যখন নুরীর মত বড় ছিলাম তখন বলেছে।
-তোমার এখনও সব মনে আছে? প্রশ্নটা করেই মিথিলার নিজেকে সত্যিই বোকা মনে হল। মিথিলা জানে গল্প মানেই হচ্ছে মনগড়া কল্পকাহিনী! কিন্তু মেয়ে এসব কী বলছে! এদিকে নুরীর এখন পাঁচ চলছে। তারমানে পরি ঐ বয়সে যা কিছু শুনেছে তা স্পষ্ট করে ওর মনে আছে! সে ভাবে এই বয়সে বলা প্রতিটা কথায় বাচ্চাদের মনে গেঁথে থাকে। এটাইতো শেখার শুরু। বিশ্বাসকে পাকাপোক্ত করার সময়। মিথিলা খেয়াল করলো মায়ের সাথে এসব নিয়ে আলাপ করতে মেয়েটা আনন্দই পাচ্ছে। মিথিলার বুঝতে অসুবিধা হল না-মেয়েটা আসলে ওর দাদুকে খুব মিস করছে। ওর দাদু ওদেরকে অনেক সময় দিত। গল্প করত,লুডু খেলত। ওদের দিদা হয়েছে ওদের বাবার মত। খুব কম কথা বলে। তবে সবার কথা খুব খেয়াল দিয়ে শোনে। মিথিলা ভীষণভাবে অনুভব করে-'আমার আসলে সংসারের নানা কাজ কিছুটা কমিয়ে দিতে হবে। মেয়েদেরকে আরও সময় দেয়া খুব প্রয়োজন। ওরা বাসায় এসে যেন নিঃসঙ্গ বোধ না করে। সেদিকে আমাকেই খেয়াল রাখতে হবে।' কিন্তু কীভাবে?ওর স্বামীর যে আয় তা দিয়ে একটা কাজের লোক রাখা দায় হয়ে যায়। প্রতিদিন ভেবে ভেবে একটা সমাধান খুঁজে চলে মিথিলা।

দুই

মিথিলাকে ইদানীং গল্প বলতে অনেক কৌশলী হতে হয়। কোন গল্প বলেই সে পরীকে বুঝাতে পারে না। মেয়েটা একেবারে যা সত্য মনে হবে তাই মুখের উপর বলে ফেলবে। মিথিলা ভাবে "আসলেও পরীর কথায় যুক্তি আছে। এভাবে মনগড়া গল্প বলে বলে আমরা বাচ্চাদের মনে কখনো ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছি। আবার কখনোবা মিথ্যে স্বপ্নের জাল বুনার সরঞ্জাম ঢেলে দিচ্ছি,কচি মনের পাতায়। যা বড় হয়ে মিথ্যে প্রমাণিত হবে। যে স্বপ্নের জাল বুনে বড় হওয়া? সেই জাল ছিঁড়ে যাবে মিথ্যে জানার সাথে সাথে। এটা যে কতটা মানসিক আঘাত করবে তা ভাব্বার বিষয়। যা কিছু মিথ্যে তা কেন বলবে বাচ্চাদের কাছে? এভাবে বাচ্চাদেরকে মিথ্যে বলে একরকম ফাঁকিই দেয়া হচ্ছে! নুরী যেভাবে মাকে বিশ্বাস করে,তাতে মায়ের বলা গল্পটাও ওর কাছে ধীরে ধীরে সত্যি মনে হয়। তাইতো ভূতের গল্পে ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। আবার রূপকথার গল্পে ওর চোখে মুখে একটা উজ্জ্বল আলো খেলে যায়। ওর ধারণা রাক্ষস,দৈত্য,ভূত,ডালিম কুমার,রাজপুত্র,রাজকন্যা-এগুলো সব সত্য। ওর মন খারাপ হলেই,ও ভাবে কোন রাজকুমার এসে ওর মন ভালো করে দেবে। আবার দামি কিছু পেতে মন চাইলে ভাবে-কোন যাদুর ছোঁয়ায় সেই জিনিষটা সে পেয়ে যাবে। মেয়েটা মাঝে মাঝেই নিজেকে কোন রাজার রাজকন্যা ভেবে নানা রকম স্বপ্ন দেখে। ওর বাবাকে তো একদিন সরাসরি বলে বসল-
- আচ্ছা বাবা তুমি কেমন রাজা? তোমার মুকুট নেই,সিংহাসন নেই। তোমার তো কোন রাণীও নেই! তাহলে তুমি কী? মেয়ের কথা শুনে ওর বাবা মিথিলার মুখের দিকে তাকিয়েই আছে। কী উত্তর দেবে বুঝে পাচ্ছে না। মিথিলা যেমন সুন্দর করে মিথ্যে বলতে পারে। কল্পনার আবিরে মন রাঙাতে পারে। মাহিন তা পারে না। ও একটা বাস্তববাদী ছেলে। ওর কাছে কল্পনার চেয়ে বাস্তবতার মূল্য অনেক বেশি। স্বল্পভাষী কর্মঠ মাহিন নিজের পরিশ্রম আর মেধায় বিশ্বাসী। স্বপ্নের মাঝে রাজকীয় জীবন নিয়ে সে বেঁচে থাকার চেয়ে;নিজের যোগ্যতায় বাস্তবে ভিখেরি হয়ে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। মেয়ের করা প্রশ্নে তাই,মিথিলার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে-
-নেউ ঠ্যালা সামলাও। এখন আমাকেও মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি বানিয়ে মেয়েকে গল্প শুনাও।
মিথিলা ঢোক গিলে! মৃদ্যু হেসে সেদিন মাহিনকে এই মহা বিপদ থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে।
বলে-
- মা তোমার বাবা রাজা হবে কেন? রাজা হতে তো রাজকন্যাদের অনেক পড়াশুনা করে জ্ঞ্যানি হতে হয়। তোমার বাবার...
ওর কথা শেষ হবার আগেই পরী ফট করে বলে উঠে-
- মা আমার বাবা আমার কাছে রাজার মত। বাবা আমাদেরকে সব কিছু দেয়। যেসব বাবারা ছেলেমেয়ে যা চায় তাই দিতে পারে! সেসব বাবা রাজাই তো। নুরী আমাদের বাবাও রাজা বুঝলি।
মিথিলা আর মাহিন মেয়ের কথায় অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। মিথিলা ভাবে এইটুকুন মেয়েটার বুদ্ধির কাছে সে আজ হেরে গেলো! নিজের মনের ভীতরে কেমন যেন তোলপাড় করতে লাগলো। মেয়েটা ওর বিশ্বাসটাকেও নিজে নিজেই মনের মাঝে বাড়তে দিচ্ছে। আসলে এই প্রযুক্তির যুগে উপমা সমৃদ্ধ রূপকথা বা কাল্পনিক ভৌতিক গল্পগুলোর মাঝে কোন আকর্ষণ বাচ্চারা খুঁজে পাবে না। ওরা সত্যটা জানতে চায়।সত্যটা কীভাবে বাস্তবায়িত হল? তার ভিত্তির গভীরতা বুঝতে চায়। আমরা আমাদের মায়ের বলা গল্পে যা কিছু অর্জন করেছি! সেই অর্জন থেকেই তো সন্তানকে সবকিছু বলছি। মায়ের বলা সেই গল্পগুলোর মাঝে যে বিশ্বাস লুকিয়ে ছিল। বড় হতে হতে সেই বিশ্বাসের জায়গাটা কিছুটা হলেও ফাঁকা থেকে গেছে। যে টুকু অর্জন তা সেই গল্প থেকে নেয়া ভালো শিক্ষাটুকুই। যা নিজে থেকে অর্জন করেছি। মনে হয়েছে সন্তানকে দেয়া মায়ের সময়টুকু সব বৃথা যায়নি। সময়ে মানুষকে কথার ধরণটাও যে পাল্টে দিতে হয়। সন্তান সত্য জেনে বড় হবে। সাহসী হয়ে,গর্বিত হয়ে,সেই সত্যটাকেই আঁকড়ে রবে। নিজের অধিকার পাবার পথ চিনে নেবে। মিথ্যে মরীচিকায় মন গড়লে আর যাই হোক সাহসী হতে পারবে না। মিথিলা বুঝতে পারে গল্প করার ছলে ওদের জ্ঞ্যানের পরিধি বাড়বে। এমন কিছু তো একটা উপায় তাকে বের করতেই হবে । হাজার হোক সন্তানের ভবিষ্যৎ-এর ব্যাপার। এই নিয়ে এখনই তাকে ভাবতে হবে। 'উফঃ' ভাগ্যিস ছোট মেয়েটা কেবল স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। আর ওর দাদু যখন গল্প বলেছে ? তখন তো সে অনেক ছোট! হয়ত পরীর মত এতোটা খেয়াল করে শোনেনি। যতটা খেয়াল করে এখন শুনে! সে মায়ের গল্প শুনে গল্পের মাঝে ডুবে যায়।

নানা দুশ্চিন্তায় মায়ের মন খুঁতখুঁত করতেই থাকে। কল্পনার জগতে পরীর কী তবে যাওয়া হবে না? মেয়েটা কী কোনদিনই স্বপ্ন দেখবে না? স্বপ্ন ছাড়া কী বেঁচে থাকা যায়? জীবনে এতোটা সত্য আঁকড়ে ধরে বেড়ে উঠা আসলে কতটা ভালো বা ক্ষতিকর? আপন মনে খেয়ালী জগতে চলতে পারার মাঝেও বেঁচে থাকার আনন্দ পাওয়া যায়। মেয়েটাকে কীভাবে সেই জগতে নেবে মিথিলা? নানা রকম ভাবনাগুলো মিথিলাকে ভাবিয়ে তোলে। এক সময় মেয়েরা ঘুমিয়ে গেলেও মিথিলার চোখে আর ঘুম আসে না। ভাবনা জুড়ে খেলে যায় কত কথা।

মিথিলার মনে পড়ে ছোট বেলার কথা। তখন বাবা প্রতিদিন জুম্মার নামাজে যেত বাসার সব ছেলেদেরকে নিয়ে। শুক্রবার এলেই যেন ঈদ উৎসব মনে হত। বাসায় অনেক মজার মাজর রান্না হত। বাসার ছেলেরা নামাজ পড়ে বাসায় এলে সবাই একসাথে বসে খাওয়া হত। প্রায়ই বাবা জুম্মার নামাজ শেষে মহল্লার মুরুব্বিদের সাথে মহল্লার নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করত। যদি কোন বাড়ির কোন ছেলে মেয়ে খারাপ পথে যেত। সবাই মিলে কীভাবে সেই ছেলে অথবা মেয়েকে ভালো পথে আনা যায়-তা নিয়ে আলাপ করত। যে ছেলেটি বখে গেছে তার বাবাকে ব্যাপারটি অবহিত করলে,সে নিজেই তার সন্তানকে শাসনের মাধ্যমে ঠিক করে ফেলত। প্রয়োজনে নানা বাড়ি বা দাদা বাড়ি,অথবা কোন স্বজনের বাড়িতে রেখে হলেও সন্তানকে বাধ্য করত ভালো হতে। মিথিলা দেখেছে বাবা বাসায় এসে এই নিয়ে সবার সাথে কথা বলতেন। এমন কী ওদের বাসার সবাইকে শাসিয়ে দিতেন! যেন এমন কিছু না করা হয়। যাতে বাবার মাথা নিচু হয়ে যায়। কিন্তু এখনকার বাবা মায়েরা আমরা নিজেদেরকে নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত হয়ে গেছি যে সন্তানের ছোট ছোট ব্যাপারগুলোতেও ঠিকমত নজর দিতে পারি না।

বর্তমান সময়ের পারিপার্শ্বিকতার কথা ভেবে মাঝে মাঝে সে শিউরে উঠে। কারো প্রতি কারো দয়া,মায়া,ভালোবাসা কিছুই নেই। খুন ধর্ষণ যেভাবে বেড়েছে। মেয়ে দুটোকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে সে। যখনই কোন খুন বা ধর্ষণে কোন মেয়েকে দেখে। মিথিলা সেই মৃত ধর্ষিতার মায়ের মনের অবস্থা অনুভব করতে পারে। পরী আর নুরীকে বুকের মাঝে জাপটে ধরে ভীত পাখির মত ছটফট করে। কী এক অন্ধকার আগামীর দিকে যাচ্ছি আমরা? বাবা মা হয়ে এই আমরা আমাদের সন্তানকে কোন অন্ধকার পৃথিবীতে রেখে যাচ্ছি...? শেষ রাতের দিকে মিথিলার মনে একটা দ্যুতি খেলে যায়। মনে হয় সে যেন কোন আশ্চর্য প্রদীপ খুঁজে পেয়েছে।

শেষ

পরেরদিন মিথিলা মেয়েদেরকে নিয়ে বাইরে যায়। নিজের জন্য কিছু বই কিনে আনে। মেয়েদেরকেও বলে তাদের পছন্দের শিশুদের বই পছন্দ করতে। ওরা বইয়ের প্রচ্ছদ দেখে দেখে কয়েকটা বই পছন্দ করে। পরী নিয়েছে 'কচ্ছপ ও কুমির' এর জীবন বৃত্তান্ত। আর নুরী নিয়েছে 'ছবি ও ছড়া' বই। মিথিলা বুঝতে পারে 'আসলে বাচ্চাদের গল্প বলার যেমন প্রয়োজন আছে। তেমনি তাদেরকে গল্প বই পড়ায় উৎসাহী করারও প্রয়োজন আছে। নিজেদের পছন্দ মত বই পেয়ে দুজনেই খুশি। মিথিলাও খুশি হয় ভেবে-দেরিতে হলেও সে একটা খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। বই পড়ার অভ্যাসটা যদি সন্তানদের মাঝে একবার পোক্ত করতে পারে? তাহলে একদিন ওরাই নিজেরা নিজেদের বিশ্বাসের জায়গা থেকেই সেইসব কাহিনীর বই নিয়ে পড়বে। জানবে অজানাকে। দেখবে অদেখা অনেক কিছু। একটা বই পড়লে শুধু জ্ঞানার্জন হয় না। সেই সাথে নিয়ে যায় কাহিনীর প্রতিটা জায়গায়। চিনিয়ে দেয় অনেক অচেনাকে। শিখিয়ে দেয় অনেক কাঁটাযুক্ত পথ কী করে পার হতে হয়। কীভাবে মনের ভীত শক্ত করে ফুলে ভরা বাগান গড়তে হয়। বই পড়ার মাঝে যে সুখ আছে! মিথিলা সেই সুখের সাথে মেয়েদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয়।

এখন ওরা দুজনেই মাঝেই মাঝে নিজেরা গল্প করে। কখনো কখনো মিথিলাকেও ওরা গল্প শুনায়। খুব খেয়াল করে ওদের প্রতিটা কথা মিথিলা শুনে যায়। বাচ্চাদের গল্প শুনতে শুনতে ঘুম পড়ার অভ্যাসটাও মিথিলা ধরে রাখে। তবে কল্প কাহিনী বাদ দিয়ে,সত্য কাহিনী নিয়ে সে গল্প বলে। নবী করিম (সঃ)দের জীবনী বলে শুনায়। কারবালা,হাসান হোসেন প্রভৃতি সবার কাহিনী বলে যায়। ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যা সাগর,বেগম রোকেয়াসহ অন্যান্য কিংবদন্তীদের কথা যখন সে বলে? যখন একটা ধর্ম, জাতিকে কত রক্ত ঝরিয়ে প্রতিষ্ঠা পেতে হয়েছে! কীভাবে নারীর লেখাপড়ার জন্য সমাজের মানুষের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে! তখন মিথিলা দেখতে পায়-মেয়ে দুটো অবাক হয়ে যায় তাঁদের কঠিন ও দুর্বিসহ জীবন বৃত্তান্ত শুনে! মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনে ওদের চোখে জল ঝরে যায়। পাকিস্থানি সেনাদারের অত্যাচারের কথায় ওদের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়! পরী প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে ওর জানার পরিধি বাড়িয়ে নেয়-
"মা তাঁরা এত কষ্ট করেছেন বলেই আমাদের কষ্ট কম হচ্ছে। তাই না মা?”
"মা আমি চাইলে কী উনাদের মত হতে পারব?" পরী'র প্রশ্ন করা থেমে নেই। কিন্তু নুরীর ভয়ের জায়গাটা দখল করেছে সাহস। সেও এখন পরীর মত নানা প্রশ্ন করে। মিথিলার সব কাজের মাঝে বাড়তি আরও একটা কাজ যোগ হয়েছে। বই কিনে নিজেকে আগে পড়তে হয়। নিজেকে আগে খুব ভালো করে জেনে নিতে হয় প্রতিটি অধ্যায়। আর সেই জানা থেকে প্রধান প্রধান অংশগুলোই মেয়েদেরকে বলে শুনায়। এতদিনে সে বুঝতে পেরেছে- বাচ্চাদের মনে বিশ্বাসের ভীতটা তো পরিবার থেকেই মজবুত হতে শুরু করে! মনগড়া মিথ্যে,অস্তিত্বহীন কাহিনী বলে বাচ্চাদেরকে ফাঁকি দেয়াটা ঠিক নয়। তাতে আলোর চেয়ে অন্ধকারের দেখাই বেশী মেলে। মিথিলা পরীর ঘুমন্ত মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে- ছোট হলেও বুদ্ধিমতী মেয়েটা! সে কী চালাকিটাই না করেছে। আর তার ফলটাও খুব ভালো পেয়েছে! মাঝে মাঝে কিছু ট্রিট একেবারে খারাপ না। যদি তা বাস্তব ভিত্তিক,শিক্ষণীয় এবং আনন্দের হয়। মা হয়ে কী ভুলটাই না সে করছিল!

এখন পরী আর নুরী মাকে আর গল্প নিয়ে খুব বেশি বিরক্ত করে না। ওদের জ্ঞানের ভাণ্ডারে দিন দিন জমা হচ্ছে ঐতিহ্য ইতিহাস...! যা একটা জাতিকে বিশ্বের কাছে গর্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে। মিথিলা অনুভব করে- পরী আর নুরীরাই জাতির গর্বকে উদ্ভাসিত করে বীর জাতিকে সমৃদ্ধ করবে। না হলে ওদের সামনের পথ জুড়ে থাকবে কেবলই গহীন অন্ধকার।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন