বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ২২টি

সমন্বিত স্কোর

বিচারক স্কোরঃ ৩.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮৫ / ৩.০

চোখের জলে নৈশ ভোজ

কামনা আগস্ট ২০১৭

আলোকিত ঘৃণা

ঋণ জুলাই ২০১৭

পার্থিব ও ঐশ্বরিক

পার্থিব জুন ২০১৭

গল্প - নগ্নতা (মে ২০১৭)

মোট ভোট ৩৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট মেকআপ করা বৃষ্টি

রুহুল আমীন রাজু
comment ৫২  favorite ১৯  import_contacts ৫৩৪

মোহাম্মদ মতিউর রহমান। সবাই ডাকে মতি স্যার বলে। একটি বেসরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মতি স্যারের নানাবিধ সমস্যা থাকলেও বর্তমানে দু’টি সমস্যা তাকে ভয়ানক কষ্ট দিচ্ছে। একটি হচ্ছে- সেদিন দশম শ্রেনীর ছাত্র/ছাত্রীদের নদী বিষয়ে রচনা লেখার অবস্থা দেখে তিনি দারুন মর্মাহত। শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ’ই লিখেছে- ’বাংলাদেশ একটি নদী মার্তৃক দেশ। মাঝি নৌকায় পাল তোলে ভাটিয়ালি গান গেয়ে ছুটে চলে গ্রাম থেকে শহরে.....’
মতি স্যার স্থানীয় আড়িয়ালখাঁ-ব্রমপুত্রসহ তিন দিনের ছুটি নিয়ে আরো বেশ কয়েকটি নদী সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখেছেন, নৌকায় কোনো পাল নেই। সব নৌকা ইঞ্জিন চালিত। এমন বিকট ভট ভট শব্দের মাঝে মাঝির গান শুনলো শিক্ষার্থীরা কোথায় থেকে...? তাও আবার বর্ষাকালে এখন আর মাঝির ভাটিয়ালি গান নয়; নৌকার ভটভটি সঙ্গীত... এরপরতো শুধু’ই নদীগুলো ধূ ধু বালুচর। অথচ ওরা এসব কি কাল্পনিক কথা লিখেছে.. ?
মতি স্যার সকল শিক্ষাত্রীকে এই নদী রচনায় শূণ্য নম্বর দিয়েছেন। ঘটনাটি নিয়ে অভিভাবক মহল ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বর্তমান এমপি মোখলেস ভ’ইয়া খবরটি শুনে সাংঘাতিকভাবে ক্ষেপে গেছেন। তার ছোট ছেলেও এই শূণ্য প্রাপ্তির দলে। এমপি সাহেব শীঘ্রই বিষয়টি নিয়ে জরুরী বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়াও এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে আরো অভিযোগ রয়েছে - প্রাইভেট প্র্যাক্টিস, ছাত্র/ছাত্রীদের দিয়ে স্কুলের কাজ করানো... ইত্যাদি।
তবে শূণ্য নম্বর প্রাপ্তিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো ক্ষোভ নেই, দুঃখও নেই। ওরা সবাই শূণ্য পেয়েছে ফার্ষ্টবয়সহ- বিষয়টি নিয়ে এক প্রকার আনন্দ উল্লাস করছে তারা।
অপরদিকে মতি স্যারের দ্বিতীয় সমস্যাটা হচ্ছে, উনার ছোট ছেলেটা গরুর গোস্ত দিয়ে ভ’না খিচুরি খাওয়ার বায়না ধরেছে। পাশের বাড়িতে বৃষ্টি আসলেই খিচুরি খাওয়ার ধুম পড়ে। ওদের বাড়িতে বৃষ্টির দিন মানেই- খিচুরি খাওয়ার দিন। কিন্তুু মতি স্যার চার’শ আশি টাকায় এক কেজি গরুর গোস্ত ক্রয় করার মতো এতো টাকা যোগাড় করতে অপারগ। মাস আসতে আরো বেশ বাকী। স›ধ্যায় স্কুল ঘরে যে টিউশনি করেন, তাতে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো ফি নেন না। মাস শেষে কেউ একটা লাউ মিষ্টি কুমড়া কচু আবার কেউ কেউ কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে থাকে। ইদানীং শূণ্য নম্বর দেওয়ার পর টাকা-পয়সাতো দূরের কথা, লাউ কুমড়া পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তুু মতি স্যার তাদের পড়ানো বন্ধ করেন নি। বরং মূল কøাস এবং প্রাইভেটে লেখাপড়া আরো জোড়দার করেছেন।
ঘরে ফিরলেই ছেলেটির প্রশ্ন- খিচুরির কি খবর বাজান..? গোস্ত কই..? চাইল- ডাইল কই..? ছেলের এই প্রশ্ন এড়াতে বেশ রাত করে বাড়ি ফিরেন তিনি। ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ার পর এক পরাজিত সৈনিকের মতো ঘরে ঢুকেন তিনি। তার ċী রাবেয়া বেগমের মুখে শুনেন ছেলেটির খিচুরি খিচুরি করে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ার গল্প..।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মতি স্যার বলেন, এইতো আর ক’টা দিন- বেতনটা পেলেই খিচুরির আয়োজন করা হবে। ঐদিন মেয়ে দুইটারেও জামাইসহ দাওয়াত দিও রতনের মা।
রাবেয়া বেগম চাপা কষ্ট কন্ঠে বলেন, হ আপনে যহন বেতন পাইবাইন তহন আর বর্ষা থাকতো না। আপনের পোলা বৃষ্টির মইধ্যে খিচুরি খাইবো- লইদের মইধ্যে না।
আরে বৃষ্টি নিয়া চিন্তা কইরো না রাবেয়া। আবহাওয়া এখন আর আগের মতো নাই। দেখবা বৃষ্টি ঠিকই থাকবো। শোনো- জলবায়ুর প্রভাবে বিশ^ এখন.....
রাহুইন আপনের কেলাস। মাষ্টরি করতে করতে অহন ঘরটারেও ইসকুল মনে করতাছুইন, খিচুরি লইয়া কেলাস শুরু অইছে। এই লইন কানের দোল , এইডা বেইচ্চা চাইল ডাইল গোস সব লইয়া আইয়্যুন।
এইডা তুমি কি কইলা ?
কেরে আমি কি হিন্দিতে কইছি ? জানুইন না কানের একটা দোল হেই কবেঅই হারাইয়া গেছে। এক কানো কেউ কি আর দোল পিন্দে ? নেইন এইডা বেইচ্চা পোলারে খিচুরি খাওয়াইন আর চালের দুইডা টিন বদলাইন। ট্যাহা কিছু বাড়লে আফনের লাইগগা একটা নীল পাঞ্জাবী কিনুইনযে।
মতি স্যার কাঁপা কাঁপা হাতে রাবেয়ার কানের দোলটা নিলেন। বিয়ের দোল। তার মায়ের দেওয়া দোল। একটা দোল সেই কবে হারিয়ে গিয়েছিলো। হুবহু আরেকটা দোল বানিয়ে দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন । আজো পারেননি। কিন্তু মায়ের দেওয়া এই দোল কিভাবে হাত ছাড়া করবেন তিনি..? দোলটাতে যে অনেক স্মৃতি........
এমপি সাহেব স্কুলে আসছেন। পুলিশের গাড়ীর কু কু শব্দ শোনা যাচ্ছে। ম্যানেজিং কমিটির সদস্য অভিভাবক ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সবাই উপস্থিত হয়েছেন স্কুলের মাঠে। এমপি সাহেব পাঁচ মিনিট ধরে বসে আছেন। প্রধান শিক্ষক মতি স্যার এখনো বৈঠক স্হলে আসেননি। তিনি নদী রচনাটি কিভাবে বাস্তব ভিত্তিক লিখতে হবে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে কথা বলছেন। অপরদিকে ক্লাস ছেড়ে দিয়ে সকল শিক্ষক/শিক্ষিকারা এমপির সামনে গিয়ে হাজির। কচি ডাবের পানি লেবুর শরবত বেনসন সিগারেট দিয়ে এমপি সাহেব ও তার সফর সঙ্গীদের আপ্যায়নে মহা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
মতি স্যার বৈঠকে উপস্থিত হওয়া মাত্র’ই ইউপি মেম্বার নিয়ামত আলী চড়া গলায় বললেন, কি মাষ্টর সাব এমপি ছ্যার হেই কোন সময় আইয়া বইয়া রইছে আর আপনে পলাইয়া আইছলাইন নাকি ?
মতি স্যার ধরাজ গলায় বললেন, সংযত ভাষায় কথা বলুন মেম্বার সাহেব। আমি পালাবো কেন ? আমি ক্লাস নিচ্ছিলাম।
মেম্বার এবার বেশ চেঁচিয়ে বললেন, এমপি ছ্যার বড় না কেলাস বড় ??
আমার কাছে ক্লাস বড়।
এমপি সাহেব বললেন, বেশ তাই যদি হয় – তাহলে নদী রচনায় সকল ছাত্র/ছাত্রীরা শূণ্য পেলো কেনো ?
স্যার,ওরা রচনাটি ভুল লিখেছে। তাই আমি শূণ্য দিতে বাধ্য হয়েছি।
ওরা কি বই থেকে লেখেনি ?
জি¦ স্যার বই থেকেই লিখেছে। বইয়ে রচনাটি সম্পূর্ণ ভুল।
দেশের বড় বড় পন্ডিত আর ডক্টর ডিগ্রিধারী ব্যক্তিগন এই বই লিখেছেন। আপনি বলছেন উনারা ভুল লিখেছেন !! আপনার কি মাথা নষ্ট হইয়া গেছে ?
মাফ করবেন, আমার মাথা ঠিক’ই আছে স্যার।
মাথা যদি ঠিক থাকে, তাহলেতো দেখছি আপনি রাষ্ট্রদ্রোহী। জানেন মতি সাহেব রাষ্ট্রদ্রোহীর শাস্তি কি ভয়াবহ ?
জানি স্যার। কিন্তু আমি রাষ্ট্রদোহীতার মতো কোনো কাজ করিনি। রচনাটি ভুল ছিলো- আমি তা সংশোধনী করে দিয়েছি। এছাড়া নবম শ্রেনীর অংক বইয়েও একটা হাস্যকর ও নিন্দাজনক অংক ছিলো, যা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে । তৈলাক্ত পিচ্ছিল বাঁশে এক বানরের ওঠা নামা নিয়ে ... আমি এই বানরের লাফালাফি অংকটার স্থলে অন্য একটা কিছু সংযোজনের দাবি জানাচ্ছি। বাংলাদেশে খুব শীঘ্রই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ হচ্ছে... এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ঘটনাটি দিয়ে অংক করার জন্য আপনার কাছে জোড় দাবি জানাইতেছি। সামনের অধিবেশনে বিষয়গুলি জাতীয় সংসদে তুলবেন মাননীয় এমপি সাহেব।
বানরের লাফালাফি..না ? ষ্টপ ষ্টপ ইউর মাউথ । স্যাটেলাইট নিয়া অংক..? সরকারের শিক্ষানীতির উপর বিরুদ্ধচারন... কত বড় সাহস, আমার সাথে বেয়াদবি ! কড়া একটা ধমক দিলেন এমপি সাহেব।
সাথে সাথে চারদিক থেকে হৈচৈ শুরু হয়ে গেলো। বিশেষ করে এমপি সাহেবের লোকজন মতি স্যারের বরখাস্ত চায়লো এবং এখনি করতে হবে। এই হট্টোগোলের মাঝে কে যেনো ছড়িয়ে দিলো- মতি স্যার সরকার বিরোধী শুধু না ; ইসলামও বিরোধী। মসজিদের মাইকে বিষয়টি ঘোষণা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। গ্রামের মানুষের কানে এই খবর পৌঁছার পর স্কুল মাঠ এখন লোকে লোকারণ্য।
মতি স্যারকে এমপি সাহেব দশবার কান ধরে উঠবোস করার জন্য নির্দেশ দিলেন। মতি স্যার অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন, আমাকে গুলি করে মেরে ফেলুন। কিন্তু কানে ধরে উঠবোস করবো না। আমি শিক্ষক, কানে ধরে উঠবোস আমি অন্যকে করাই।
এমপি সাহেব মতি স্যারের গালে মারলেন কষে এক থাপ্পর। মূহুর্তে’ই তার গালে পাঁচ আঙ্গুলের চিহ্ন এঁকে গেলো। মতি স্যার বরফ জমা পাথর হয়ে গেলেন। বাকরুদ্ধ.. যেনো রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে তার। ত্রিশ বছরের আলোর বার্তিকা বাহক মতি স্যার আজ পাথর। হাজার পাওয়ারের চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে আসছে... তিনি অবাক হয়ে ভাবছেন, একজন আইন প্রণেতা সাংসদ সবার সামনে এমন নগ্ন ঘূণ্য আচরণ কি ভাবে করতে পারলেন... ? এই নগ্নতার বিচার কি এই দেশে হবে...? এক খন্ড কাপড়ের অভাবে কোনো দরিদ্র নারী যখন অর্ধনগ্ন ভাবে রাস্তায় হাঁটে, তখন ইজ্জত যায় না। একজন ফ্যাশন সচেতন নারী যদি রাস্তায় হাঁটে , তখন ইজ্জত যায়।
মতি স্যারের মতো আকাশের রূপও হঠাৎ পাল্টে গেলো। আকাশে কালো মেঘের ভেলা। টিপ টিপ বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো। মতি স্যার বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন। রাস্তার পাশে চোখ পড়লো কসাইখানার দিকে। গরুর রান ঝুলছে। এ দেখে মনে পড়ে গেলো তার ছেলেটার খিচুরি খাওয়ার কথা...।
বাড়ি পৌঁছার পর ছেলেটি আজ খিচুরির বায়না করেনি। বাবার গালে হাত বুলিয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো. বাজান তোমার গালে যেই ব্যাডা চড় মারছে আমি বড় অইয়া তার গালোও একটা চড় মারাম বলেই জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। পাশে দাঁড়ানো রাবেয়া বেগম মুখে শাড়ীর আঁচল গুজে নিঃশব্দে কাঁদছে। মতি স্যার বুঝতে পারছেন না এতো তাড়াতাড়ি এ খবর বাড়ী পৌঁছলো কি ভাবে ?
মোবাইল ফোনে দৃশ্যটি ধারণ করে কে যেনো ফেইসবুকে ছেড়ে দিয়েছে। সামাজিক এই মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ প্রচার হচ্ছে।
পরের দিন সব পত্রিকার শিরোনাম- ’ এবার শিক্ষককে প্রকাশ্যে চড় মারলেন এমপি’। এ ঘটনায় বাংলাদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণ বিচারের দাবিতে প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে। চলছে মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ। শিক্ষার্থীরা রাজপথে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের গালে চড় মেরে অভিনব এক প্রতিবাদ জানাচ্ছে।
মতি স্যার এখন কেবলি পাথর। পাথর মানুষ। শুয়ে আছেতো আছে’ই, বসে আছেতো আছে’ই। বাইরে অঝর ধারায় বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দগুলো তার কাছে একটি ধ্বনি’ই উচ্চারিত হচ্ছে- ’খিচুরি’। ছেলেটাকে কি ভাবে গরুর গোস্ত দিয়ে খিচুরি খাওয়ানো যায় ... কিন্ত, তার ছেলে পাঁচ বছর বয়সের রতন ভুলে গেছে খিচুরি বিষয়টি। ওর মাথায় এখন একটি বিষয়’ই বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে- কবে সে বড় হবে.. বাবার গালে যে চড় মেরেছে, তার গালেও একটা চড় মারার...
মতি স্যারের বাড়িতে সহমর্মিতা জানাতে প্রতিদিন ছুটে আসছে শ’ শ’ শিক্ষার্থী। যারা শূণ্য পেয়েছিলো তারাও স্কুলে যাওয়ার পথে এবং ফেরার পথে দল বেঁধে তাকে দেখে শান্তনা দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে জাতীয় সংসদ সদস্য মোখলেস ভ’ইয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ’ঘটনাটি সম্পূর্ন ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। ঐদিন এ ধরনের কোনো ঘটনা’ই ঘটেনি। প্রতিপক্ষ রাজনৈতীক মহল আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বীত হয়ে ঘটনাটি সাজিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ পরিবেশন করেছে।’ এমপি সাহেবের এ বক্তব্যে দেশের মানুষ আরো প্রতিবাদ মুখর হয়ে উঠে।
মতি স্যারের সাবেক ছাত্র/ছাত্রীরা ফেইসবুকে সামনের শুক্রবারে ঐ স্কুল মাঠে এক প্রতিবাদ সমাবেশ করার ষ্ট্যাটাস দিয়েছে। এতে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
স্কুলের মাঠ কানায় কানায় পরিপূর্ন হয়ে গেছে। মতি স্যারকে মঞ্চে চেয়ারে বসিয়ে শুরু হলো জ¦ালাময়ী বক্তৃতা। তিনদিনের মধ্যে এমপি মোখলেস সাহেবকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে, নতুবা সংসদ ভবন ঘেরাও করার কর্মসূচী ঘোষণা করেছে তারা। এছাড়া ছাত্ররা সবাই মিলে সাহসী মতি স্যারকে এক ভরি ওজনের একটি সোনার মেডেল উপহার দিয়েছে। এর’ই মাঝে এক ছাত্র বর্তমানে সাংাবাদিকতায় নিয়োজিত ও গীতিকার মতি স্যারকে নিয়ে একটি গান লিখেছে। গানটি গাওয়ার জন্য বাদ্যযন্ত্রও আনা হয়েছে । গানটি সে নিজেই গাইছে -
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গাড়ি নাই ।।
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখাপড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো গাড়ি নাই।।
উত্তর পাড়ার ঐ মোখলেস
লেখা পড়ার নেই কোনো লেশ
তবুও তার আছে ঘোড়া বিএম ডব্লিউ গাড়ি
টাকা আছে কাড়ি কাড়ি
নাই নাই কোনো অভাব যে নাই।।
লেখা পড়া করে যদি ঘোড়া চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো ঘোড়া নাই
লেখা পড়া করে যদি গাড়ি চড়া যায়
তবে কেনো মতি স্যারের কোনো পাড়ি নাই
কাঠ ফাটা রোদ্রে ছেঁড়া ছাতা মাথায়
মতি স্যার পায়ে হেঁটে স্কুলে যায়..।।
পায়ে হেঁটে মতি স্যার হাজার ফুল ফোটায়-
এই সূর্যের সম্মান ফেরৎ চাই ফেরৎ চাই
মোখলেস গাড়ি হেঁকে হুল ফোটায়-
এই বেয়াদপের বিচার চাই বিচার চাই... ।।

বিচারের ধ্বনিতে কম্পমান বাংলাদেশ। বহু টিভি চ্যানেল এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।
এতো কিছুর পরও মোখলেস সাহেব গাড়ি হাঁকিয়ে ঘুড়ে বেড়াচ্ছে। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী একটি তদন্ত কমিটি করে দিয়ে কি সুন্দর বগল বাজাচ্ছেন। আর যে আমলা কর্মকর্তাকে তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে, তিনি কেমন প্রতিবেন তৈরী করবেন- তা বোঝার কারো বাকী নেই । বিচারের বাণী নিভৃতে আর কতকাল কাঁদবে..?
মতি স্যারের হাতে এখন এক ভরি স্বর্ন। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা। বৃষ্টির জন্য প্রতিদিন অপেক্ষা করছেন তিনি। কিন্তু বৃষ্টির খবর নেই। এখন কাঠ ফাটা রোদ্র । ছেলেটি বৃষ্টির মাঝে খিচুরি খেতে চেয়েছিলো... খিচুরি আয়োজন করার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে- বৃষ্টি নেই। তিনি মনে মনে চিন্তা করলেন- কৃত্রিম বৃষ্টি তৈরী করবেন।
একদিন সোনার মেডেলটি দূরের এক বাজারে বিক্রি করে দিলেন। গরুর গোস্ত চাল ডাল কিনলেন। তার সহধর্মিনীর জন্য হুবহু আরেকটি কানের দোল বানালেন । দুইটা টিনও কিনলেন। আর কিনলেন কিছু পলিথিন।
খিচুরি রান্নার আয়োজন শুরু হলো। মতি স্যারের দুই মেয়ে মেয়ের জামাই ও নাতী/নাতনীরা বেড়াতে এলো। কিন্তু রাবেয়া বেগমের আপত্তি- রতন বৃষ্টি ছাড়া খিচুরি খাইতো না। মতি স্যার বললেন, তোমার রান্ধা তুমি রান্ধো- একটু অপেক্ষা করো দেখবা কেমনে বৃষ্টি আনি...
মতি স্যার দশ/বারোটা পলিথিনে পানি ভরে চালে উঠলেন। চালের উপর বড়ই গাছের ডালে পানি ভর্তি পলিথিন গুলো বিভিন্ন জায়গায় বাঁধলেন। অদ্ভ’ত এক ছেলে মানুষী খেলা শুরু করেছেন তিনি।
বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে রতন সবার আগে খেতে বসে। আজও তাই করলো। মতি স্যার পানি ভর্তি পলিথিন গুলোকে ফুটো করে দিলেন। রিম ঝিম শব্দে বৃষ্টি ঝরতে শুরু করলো... রতন মাটিতে শীতল পাটিতে বসে কি আনন্দ করে খিচুরি খাচ্ছে। মতি স্যার চালের এক ফুটোতে দেখছেন সে দৃশ্য... ঠিক তার বাবার মতো আসন পেতে বসে কত মজা করে রতন খিচুরি খাচ্ছে। আনন্দে মতি স্যারের দু’চোখে ঝরছে বৃষ্টি। কিন্তু মেকআপ করা বৃষ্টির তোড়ে তার চোখের জল ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। চোখের জল কেউ না দেখাটাই ভালো । এটা মানুষের একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়।
হঠাৎ পা পিচলে চাল থেকে পড়ে যায় মতি স্যার। ঘরের পেছনে বিকট এক শব্দে সবাই ছুটে গিয়ে দেখে, মতি স্যার নিঃশব্দে কাঁতরাচ্ছেন । মাথায় ও বুকে প্রচন্ড আঘাতের কারনে কথা বলতে পারছেন না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে। চিকিৎসকদের ভাষ্য- মাথায় প্রচন্ড আঘাতের কারনে মস্তিষ্কে প্রচুর রক্তক্ষরণ ঘটেছে। বাঁচার আশা ক্ষীণ। এতোক্ষন আইসিইউতে কড়াকড়ি থাকলেও এখন শিথিল করা হয়েছে । তার একমাত্র ছেলে রতনকে রোগী দেখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে । রতন মতি স্যারের মাথায় ও গালে হাত বুলাচ্ছে। সন্তানের ষ্পর্শে মতি স্যারের চেতনা কিছুটা ফিরেছে। কিন্তু তা চারদিকে তাক করা কোনো মেশিনে ধরা পড়েনি। তিনি তার ছেলের হাতের ছোঁয়ায় খিচুরির গন্ধ অনূভব করতে পেরেছেন। ছেলেটি হাত ধোয়ার সময় পায়নি। কাজেই ওর হাতে খিচুরির গন্ধটা এখনো লেগে আছে। রতন বার বার তার পিতার ডান পাশের গালে আলতো করে আঙ্গুল ছোঁয়াচ্ছে আর মৃদু সুরে ডাকছে- বাজান বাজান ও বাজান...মতি স্যার তার মায়াভরা ডাক স্পষ্ট শুনতে পারছেন এবং দেখতেও পারছেন তাকে। কিন্তু উত্তর দিতে পারছেন না। অনেক চেষ্টা করছেন কিছু বলার- পারছেন না। বুকে মনে হচ্ছে, বিশাল এক পাথর চাপা দিয়ে রয়েছে। পাথরটা কেউ সরিয়ে দিলেই তিনি কথা বলতে পারতেন। মতি স্যারের বলতে ব্যাকুল ইচ্ছে হচ্ছে- ’ বাবা রতন খুব মন দিয়ে শোনো, আমার গালে যে চড় মেরেছে সে নির্বোধ, বোকা। দেখো, তার এই বোকামীর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে বাংলাদেশ। এখনো নির্বোধটা আমার কাছে ক্ষমা চায়নি। যাক, আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি। বাবা রতন, তুমি মনে মনে যে প্রতিশোধ নেওয়ার পণ করেছো - তা ভুলে যেও।
ছেলেটির মায়াভরা ছল ছল চোখে তিনি আর তাকাতে পারছেন না। চোখের কর্ণিয়া একটু অন্য দিকে ঘুরালেন। চোখে পড়লো- ডেক্ট্রোজ স্যালাইনের দিকে। উনার কেবলি মনে হচ্ছে- নলের ভিতর দিয়ে কৃত্রিম বৃষ্টি বর্ষণ হচ্ছে সরাসরি তার দেহে। তিনি কয়েক ঘন্টা আগে ছেলের বৃষ্টিতে খিচুরি খাওয়ার বায়না মেটাতে পলিথিন দিয়ে এমন বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছিলেন তার ভাঙ্গা চালার ঘরে। ছেলের মতো তারও বায়না ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে- ডিম ভাজি দিয়ে খিচুরি খেতে। সাথে থাকবে শুকনা মরিচ ভাজি। সবই আনা হয়েছে। শুকনা মরিচ ভাজির সুন্দর ঘ্রাণ নাকে ভেসে আসছে।
হঠাৎ তিনি আর এখন কিছুই দেখতে পারছেন না- শুকনা মরিচের ঘ্রাণ পাচ্ছেন না। ডেক্সট্রোজ স্যালাইনের ফোটাও থেমে গেছে। চারদিক ঢেকে গেছে অন্ধকারে, এক ভয়াবহ অন্ধকার...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন