বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭০
গল্প/কবিতা: ৭১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.১৪

বিচারক স্কোরঃ ২.১৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৫ / ৩.০

অনেক কথা ১

ঐশ্বরিক মার্চ ২০১৭

বকধার্মিক

এ কেমন প্রেম? আগস্ট ২০১৬

চুপকথা

রহস্যময়ী নারী জুলাই ২০১৬

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট ১৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.১৪ সোনালি ভোরের অধ্যায়

আযাহা সুলতান
comment ৬  favorite ০  import_contacts ১০৪
হৃদ্য! অ হৃদ্য! কোথায় লুকিয়ে আছিস রে হারামি? শুনতে কি পাস না? হারামজাদাটার কাণ্ড দেখো ত--শুনেও শুনে না! হে আল্লাহ্‌, এমন অপদার্থ সন্তান যেন কারও কপালে না জুটে। রাগে আগুনজ্বলা জ্বলছে আর গজগজ করে পালাক্রমে কথাগুলো বলে যাচ্ছে গৃহিণী নিনা জোয়াদ্দার। এমুহূর্তে হৃদ্যকে পেলে বোধহয় সিদ্ধ ছাড়া আলুভর্তা বানিয়ে তবেই দম নিত বুঝা যায়।

একটুপর হৃদ্য কোত্থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, আ-ম্বা, আ-স-সি ট। রাঁধার কাজে ব্যস্ত নিনা ওর দিকে না দেখে আপনা-আপনি বলছে, হাতীর মতো হয়েছে খেয়ে তবু আজও ‘মা’ শব্দটাও সুন্দর করে উচ্চারণ করতে পারে না বেকুবের ডাহা। এত করে বলি, ‘আম্মা’ ‘আম্মা’ ডাকবি। আর ঐ হাবার নবাব ‘আম্মা’ বলতে গেলে মুখে গজায় তার গজেন্দ্রের দাঁত। বলবে ‘আম্বা’ ‘আম্বা’ মনে হয় যেন মা-হারা গাভির বাচ্চা ডাকছে ‘হাম্বা’ ‘হাম্বা’ করে--হাবা কোথাকার। কাঁচের একটা পাত্র হাতে দিয়ে বলছে, ধর, এটা নিয়ে শান্তার মাকে দিয়ে আয়। আর পারলে একটাকে ভেঙে চারটা করিস, তোর ত আবার সেই আদত।

হৃদ্য বার বছরের কাণ্ডজ্ঞানহীন বালক। নিনা জোয়াদ্দারের স্বামী জিরান খন্দকার বার বছর আগে আঁস্তাকুড়ে পেয়েছিল তাকে! হয়তো কোনেক কুমারিত্বহারা কলঙ্কের ত্যাগত ফল। নিনা একসময় তাকে সন্তানের মতো দেখেছে ঠিক, ইদানীং তবে চাকরের চেয়েও বেশি অবজ্ঞা দেখা যাচ্ছে। ঘর থেকে কিছু হারিয়ে গেলে, হৃদ্য হারামজাদাটার কারবার। স্বামীর কোন শুভকাজে অশুভ হলে, হৃদ্য হারামিটাকে দেখে গেলে ত অমন হবেই। সদাই আনতে গিয়ে কিছু ভুলে আসলে বা হারিয়ে এলে (স্বামীকে লক্ষ করে) কত বলছি তোমাকে, এ হারামিটাকে সঙ্গে নিয়ো না, তুমি আমার কথা শুনলেই ত হয়। কদমে কদমে সে নিনার কাছে অপরাধী, যেন তার হালের বলদের গোঁজকাটা পরম শত্রু। ধীরে ধীরে নিনার এমনই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে সে, পারলে গলাটিপে হত্যা করে এমুহূর্তেই আপদ তাড়ায়। তবে তার সেই সামর্থ্য আছে বলে মনে হয় না। কারণ জিরান হৃদ্যকে সন্তানের মতো ভালবাসে। তাই সমস্ত অত্যাচার স্বামীর অগোচরেই হয়? এমন কথা আমরা পরিষ্কার বলতে পারব না। সমস্ত অত্যাচারই যে স্বামীর গোচরে হয়, একথাও আমরা তর্জনি হাঁকিয়ে দেখিয়ে দিতে পারি না। এব্যাপারে আমাদের বক্তব্য নিখুঁত করা গেল না।

নিনা যেটা অনুভব করতে পারে না বা পারলেও বর্তমানে ভুলে গেছে, সেটা জিরান কিভাবে ভুলতে পারে! এটা আমাদের জ্ঞানে আসে না। তাদের একসময় কেটেছিল খুব অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়ে। আজ বলতে গেলে পাহাড়সমান সম্পদের মালিক তারা। সংসারে কিন্তু কে কার উছিলায় টাকা কামাই করে, কে কার উছিলায় বড়লোক হয়, কে কার উছিলায় উন্নতির শীর্ষে পৌঁছে একমাত্র আল্লাহ্‌ ছাড়া কেউ বলতে পারে না। এখানে তবে স্পষ্ট ধারণা হয়, হৃদ্যের উছিলায় জিরান খন্দকার আজ উন্নতির চূড়ায়। কেননা, যেদিন হৃদ্যকে ঘরে আনে সেদিনই চাকরিতে বিরাট পদোন্নতি জিরানের, সামান্য শ্রমিক থেকে তত্ত্বাবধায়ক এবং তার কিছু দিনের মধ্যে একেবারে প্রধান পরিচালক--প্রায় চার হাজার লোকের প্রতিনিধি।

তারপর জিরানের কর্মদক্ষতায় এবং সততায় মুগ্ধ হয়ে কোম্পানিটির মালিক একসময় অন্যত্র একটা নতুন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে এবং জিরানকে সেখানে সমান অংশে অংশীদারি দেয়। এভাবে লটারির মতো একের পর এক ভাগ্যচক্রের চাকা ঘুরে জীবনটা তার দ্রুত পরিবর্তন হতে দেখা যায়। এ কথাটা আমরা জিরানের বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় জিরানের মুখ থেকেও বহুবার শুনতে পাই : আমি একজন প্ল্যাস্টিকসামগ্রী প্রস্তুতকারক কোম্পানির শ্রমিক ছিলাম মাত্র। আমাদের দাম্পত্য বিরাট এক শোকাবহে অতিক্রম করছে। ডাক্তার সাফ বলে দিয়েছে, নিনার গর্ভধারণক্ষমতা অক্ষম। নিনা দিশেহারা, আমি নিরুপায় তবে আমরা একেবারে ভেঙে পড়িনি। মানতেরও কোথাও কার্পণ্য করিনি। যে যেখানে বলেছে ছুটেছি এবং যেটাই করতে বলেছে করেছি। তবু কখনো নিরাশ হইনি। মা-বাবা ভাবছে আমার একটা সদগতি হওয়া দরকার। এমন সময় আমার সংসারে হৃদ্যের আগমন। আমি মাটি ধরলে কবে তা সোনা হচ্ছে আমি নিজেও টের পাচ্ছি না। সোনালি ভোরের অধ্যায় থেকে শুরু হল আমার সোনালি দিন...

সত্যি, এ ভোরের কথা আমরাও কোনদিন ভুলতে পারব না। কারণ এ ভোরে হৃদ্যকে ডাস্টবিনের আবর্জনায় তলিয়ে যাওয়া থেকে উদ্ধার করেছিল জিরান। আরেকটু দেরি হলে বোধহয় গল্পটার দৃশ্যপট অন্যরকম হত।

খুব ভোরে ওঠে জিরানকে বাস চাপতে হত চাকরির পথে। একদিন জনশূন্য বাস স্টপে এসে দেখতে পায়, পাশে ডাস্টবিনে কাকের আন্দোলন। পরিষ্কার কানে আসছে একটি নবজাতকের কান্না! এদিক-ওদিক সবদিকে দেখল কোথাও কেউ নেই। ডাস্টবিনে লক্ষ করে দেখে নাড়ি পেঁচানো এমাত্র জন্ম নেওয়া একটি রক্তাক্ত শিশু। তাড়াতাড়ি তার কাপড়ের থলিটা দিয়ে বেড়িয়ে উঠিয়ে নেয় কোলে। তারপর একদৌড়ে বাড়ি এসে বউয়ের কোলে দিয়ে বলল, মাকে ডেকে কী করতে হয় দেখো; আমার বাস ধরতে হবে, এসে সব বলব; দেরি হলে দায়িত্বের অবহেলা হয় বলে টাকা কয়টা হাতে দিল এবং বলল, ওষুধপত্তর লাগতে পারে, বাবাকে ডাক্তার ডেকে আনতে বলো বলে দ্রুত চলে যায়। নিনা অবাক।

জিরান চাকরি থেকে ফিরে সব বলল। শুনে তার মা-বাবা ও স্ত্রী আশ্চর্য হয়ে দুঃখপ্রকাশ করল। জিরানের বাবা বলল, দেখ বাবা, সৎপথ অবলম্বন করে যে চলতে পারে তাকে কখনো আল্লাহতালা অপূর্ণ রাখে না। আর এ কথাটা যে ভুলে যায় সে কখনো মানুষ হতে পারে না। এধরণের সন্তানদের যারা আশ্রয় দেয় তাদের সংসার অচিরেই স্বর্ণময় হয়। দেখিস, তোর সংসারও একদিন ফুলেফলে ভরপুর হবে।

বাবার কথা সত্য হল, হৃদ্য বছর চারেকে পড়লে নিনা গর্ভবতী হয় এবং একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেয়--নাম রাখা হয় ‘শুভ’। শুভর দুবছরের মাথায় জন্ম হয় দ্বিতীয় কন্যাসন্তান--নাম রাখা হয় ‘সূচনা’। সূচনার সুন্দর মুখ দেখা জিরানের মা-বাবার নসিব হয়নি। শুভর জন্মের বছরখানেকের মধ্যে, কিছু দিনের ব্যবধানে বৃদ্ধরা জান্নাতবাসী হন। তারপর ধীরে ধীরে নিনার কাছে হৃদ্য নামটা চোখের কাঁটায় পরিণত এবং সূচনার জন্মের পর একেবারে অসহ্য।

‘হৃদ্য’ নামটা তবে জিরানের বাবার দেওয়া। ভদ্রলোক অল্পশিক্ষিত হলেও একজন শিক্ষিত লোকের জ্ঞান রাখত। তার কারণ, শিক্ষিত জনের সঙ্গে ওঠাবসা এবং বিভিন্ন বইপত্র অধ্যয়ন। যত দিন তিনি জীবিত ছিলেন কার ক্ষমতা ছিল হৃদ্যকে ‘হুঁ’ বলে। এমন মায়া করতেন, যেন হারিয়ে-পাওয়া তাঁদেরই নাড়িছেঁড়া ধন। আর তিনিবা কেন, তাঁর স্ত্রী ও ছেলে জিরান এবং পুত্রবধূ নিনাও ত কম করছে না। এটা স্বাভাবিক, কেননা তাদের সংসারে তখন শুভ আর সূচনার মতো সন্তানদের আসার সম্ভাব্যকোন চিহ্নই ছিল না। ওদের অপ্রত্যাশিত আগমনে যেখানে খুশির জোয়ার বইছে সেখানে কুড়িয়ে পাওয়া কুড়োর হাবাগিরি সংসারের কারও-না-কারও কাছে অসহ্য হয়ই। আর এটাই সম্ভবত দুনিয়ার দস্তুর--যতই আপন হোক, আদরের বস্তু হোক; নিজসন্তানদের মমতার কাছে কোনকিছু বড় নয়। বলা বাহুল্য, এখানে ত হৃদ্য অসম্পূর্ণও বটে। অতএব, এটা জিরানের কাছে তেমন একটা গুরুত্বের ব্যাপার না হতে পারে ঠিকই কিন্তু নিনার কাছে সন্তানপরিচয় লজ্জার বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে বোঝার বিষয়ও বটে। কারণ এ পৃথিবীতে মানুষ যেখানে নিজের বোঝা বইতে অক্ষম সেখানে পরের বোঝা বওয়ার প্রয়োজনীয়তা কি। সচরাচর মেয়েদের মন মনে হয় এমনই হয়?

হৃদ্য যে কারও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে এ ক্ষমতা বিধাতা তাকে দান করেননি। যতই অন্যায় হোক, অত্যাচার হোক নীরবে সহ্য করবে। যতই মার খাক কখনো এক ফোঁটা চোখের পানি ঝরবে না; দেখা যায়, গাধাটা একটুপর আবার হাসচ্ছে। এ জীবটাকে সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় জ্ঞানহারা করার সঙ্গে সঙ্গে যেকোন অনুভূতিহারাও করেছে! পড়ার মেধাশক্তি নেই কিন্তু স্কুলে যাওয়ার আগ্রহটা প্রবল। জিরান দুয়েকবার স্কুলে ভর্তি করেও সার্থক হতে পারেনি। শিক্ষকদের মন্তব্য, বাকপ্রতিবন্ধীও আজকাল পড়তে পারে এবং সুশিক্ষিত হতে পারে। অন্ধজনও শিক্ষিত হওয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে হৃদ্যের মধ্যে এ লৌকিক জ্ঞানটুকু নেই। তাকে দেখিয়ে দিলে সবকিছু করতে পারবে ঠিক কিন্তু নিজথেকে জ্ঞান খাটিয়ে কিছুই করতে পারবে না। তাকে অন্যরকম মানসিক প্রতিবন্ধী বলা যায়। সেজন্যে আমরা দুঃখ বোধ করব না, দুঃখ বোধ করব এজন্যে যে, প্রভু প্রতিবন্ধী সৃষ্টি করুক কিন্তু তাকে একটা ভাল আশ্রম দান করুক। আর এভাবে কোন প্রসূতি হৃদ্যের মতো সদ্য ভূমিষ্ঠ হওয়া গর্ভধনকে আবর্জনা-আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে শিয়াল-কুকুরের খাদ্য না করুক। দোহাই। কেননা কারও সামান্য আনন্দপ্রাপ্তির মোহে অসামান্য বেদনার গল্প আর সৃষ্টি না হোক।

হৃদ্য আজকাল খুবই অসুস্থ, পাণ্ডু ধরা পড়ছে তার। ডাক্তার বলছে, কিছু দিন বিশ্রামে থাকলে এরোগ তাড়াতাড়ি সেরে যেতে সক্ষম, সুতরাং চিন্তার কোন কারণ নেই। কিন্তু হৃদ্যের কপালে তা জুটলেই ত হয়। শুভ আর সূচনাকে প্রতিদিন স্কুলে নেয়া-আনা, বাজারসাজার এবং ঘরের বিভিন্ন কাজকাম সে ছাড়া আর করবেইবা কে--

হৃদ্য, অ হৃদ্য, (নিনার নিত্যকড়াডাক শুনে সে রীতিমতো ভয়াতুর--ছটপট বিছানা থেকে ওঠে দৌড়ে আসে) যা, শুভদেরকে স্কুলে দিয়ে আয়। কোথাও দাঁড়িয়ে আবার তামাশা দেখিস না। তাড়াতাড়ি আসিস। (টাকা কয়টা হাতে দিয়ে) পারিস ত হারাইস, আসার সময় রঞ্জুর দোকান থেকে চারটা ডিম আর একটা পাউরুটি আনিস। পারলে ডিম চারটাকে ভেঙে একখানে করিস। কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যাবে না, তোর স্বভাবও তেমন পরিবর্তন হবার নয়। হৃদ্য কাঁপতে কাঁপতে বলল, আ-ম্বা, আ-মা-র কে-ম-ন জা-নি লা-গ-চে যে। (হৃদ্যের কথাগুলো একটু তোতলাকারে) ‘কী বললি কামচোর’ বলে ঠাস করে গালে তার সজোরে এক চড় মারে। আরেকটা মারার আগে আগে ‘এঃ এঃ করকি! করকি!’ বলে জিরান তাড়াতাড়ি এসে হৃদ্যকে বুকে জড়াইয়া ধরলে জানতে পারে তার জ্বরোত্তাপের কথা। কপালে হাত রেখে : হায় হায় একি! ছেলেটা যে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে--মানুষ নাকি তুমি। জানোয়ারও ত জানোয়ারের প্রতি মমতা রাখে। কড়াগলায় বলছে, দেখ নিনা, আমি এগুলো আর সহ্য করব না। ইনসানিত বলতে যদি কিছু তোমার না থাকে--থাকতে পারে; তবে আমার আছে, আমি এমন নির্দয় হতে পারব না। তারপর স্বামী-স্ত্রীতে তুমুল লড়াই...হৃদ্যের জন্মকথা...তাদের দরিদ্রতার কথা...উত্থানের কথা...ইত্যাদি--অনেক কথাই ওঠে আসে। নিনা কোন কথা, কোন মতবাদ শুনতে বা মানতে রাজি না। অতঃপর...নিনা...‘থাক তোমার আদরের ছেলেকে নিয়ে’ বলে সন্তানদুটোকে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে যায়! কাজের মেয়েটি মেমসাহেবকে অনেক মিনতি করল কিন্তু কে শোনে কার কথা। হৃদ্য কাঁদছে আর জিরানের হাতধরে টানছে এবং বলছে, ও-ঠ বা-ব্বা, আ-ম্বা চ-লে যা-চ্চে গা, আ-ম্বা-কে ফি-রা-তে হ-বে যে...জিরান হেঁচকা দিয়ে হাত মুক্ত করে এবং অভিমানীকণ্ঠে--দূর হ জানোয়ার আমার সামনে থেকে বলে দ্রুতপায়ে সেও বের হয়ে গেল।

হৃদ্য বিছানায় শোয়ে কাঁদছে আর ভাবছে তার জন্মকথা। আজ চোখের পানি তার কে রোধ করে। জন্মের সকল কান্না, সকল দরদ আজ অনুভব হতে লেগেছে। বিধাতা মনে হয় আজ তাকে বুঝার ক্ষমতা এবং উপলব্ধি-অনুভূতি সকলপ্রকার জ্ঞান একসঙ্গেই দান করেছে! এদিকে জ্বরের তাপে শরীর চুর হয়ে যাচ্ছে। ‘হুঁ...হাঁ’ শব্দ করে করে জোরে জোরে গোঙাচ্ছে। এমুহূর্তে ঘরে হৃদ্য আর কাজের মেয়েটি মাত্র। মেয়েটি জানতে পেরে ছুটে এল এবং দেখল মারাত্মক অবস্থা--জ্বরের তাপে ছেলেটি কী পরিমাণ কাঁপছে! এদিক-ওদিক খুঁজে একটা ট্যাবলেট খাইয়ে দিল তারপর মাথায় পানি ঢেলে সমস্ত শরীর মুছে দিয়ে জ্বরপট্টি লাগাল। কী খাবে জিজ্ঞেস করল। অবস্থা বেগতিক দেখে জিরানের কাছে ফোন করে হালত জানালে জিরান ‘আমি শিগগির আসছি’ বলে এসব সেবাশুশ্রূষা ঘনঘন করার আদেশ দিল।

হৃদ্যকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আজ দুদিন। তার সেবাযত্নের জন্যে আছে পরিচারিকা মেয়েটি। নাম : সুমনা। বয়স : ঊনিশ-বিশ। সাহেবকে বিব্রত দেখে সে নিনার কাছে ফোন করে হৃদ্যের অবস্থার কথা জানাল একবার। নিনা ‘মরুকগে’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল। ফিরে আসার অনুরোধটা পর্যন্ত বুঝিয়ে বলার সুযোগ দিল না।

আজ চার দিন পার হচ্ছে হৃদ্যের কোনরকমের উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। পাশে বসে মাথায় হাত বুলাচ্ছে জিরান, একটু তফাতে বসে আছে সুমনা; হৃদ্যের চোখ দিয়ে অঝরধারায় বয়ে যাচ্ছে পানি। বলছে--বাবা, একি! হৃদ্যের আওয়াজ আজ এভাবে স্পষ্ট হল কী করে! এ ত বিরাট কুদরতি কারবার! এখন একটুও তোতলাচ্ছে না যে! বাবা, আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে। মনে পড়ছে খুব শুভ আর সূচনার কথা। একবার তাদের দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে বাবা। ওদেরকে নিয়ে আস-না, একবার দেখি। আমি আর বাঁচব না ত বাবা। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। জিরান ধমক দিয়ে--কে বলছে তুই বাঁচবি না। আল্লাহ বাঁচাবে তোকে। তুই কি কারও দোষ করেছিস। আর তোর হয়েছেইবা কী, এমন অসুখবিসুখ স্বাভাবিক হয় বাবা। অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখাব তোকে, আমার কি আজ টাকার অভাব আছে বলে সজোরে বুকে জড়িয়ে ধরে সেও কাঁদতে লাগল। সুমনাও কাঁদতে লাগল--কেঁদে কেঁদে বলল, সাব, মেমসাবকে একটা ফোন করেন-না আপনি। আপনি কইলে অবশ্য আইবে। হৃদুর অবস্থা খুববেশি ভাল লাগছে না। জিরানের মায়ের মতো সুমনাই একমাত্র হৃদ্যকে ‘হৃদু’ বলে ডাকে।

স্বামীর কল দেখে নিনা ফোন ধরছে না। মা বলল, ফোন ধরলে এমন কী গজব হবে শুনি, কী বলতে চাচ্ছে অন্তত সেটা ত শুনবি।
নিনা অসহ্যগলায় বলল, কী আর বলবে, হারামিটা হসপিটালে...মরলে ত বাঁচি।
মা বলল, এমন বলতে নেই রে নিনা, আল্লাহ্‌ তোকেও ছেলেপুলে দিছে। কাকে এমন হিংসে করতে নেই মা, একদিন নিজেকে সব ভোগতে হয়। অতীত ভুলে যাওয়া মানুষ অনেকবেশি কষ্ট পায়। এ কথাটা সব সময় মনে রাখিস।

নিনা ফোন ধরল। ওদিক থেকে জিরানের কান্নামিশ্রিতকণ্ঠ--হৃদ্য প্রতিমুহূর্তে তোমাদের কথা বলছে। তোমাদেরকে একবার দেখতে চাচ্ছে। বাঁচার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ডাক্তারেরাও তেমন একটা আশাবাদী নয়। তুমি তার কাছে ক্ষমা চাওয়া একান্ত দরকার। কারণ যার দোষ করে সে যদি ক্ষমা না করে আল্লাহ্‌রও ক্ষমতা নাই তাকে মাফ করে। সুতরাং আর বেশি কিছু বললাম না--বলে হাসপাতালের ঠিকানা দিয়ে বলল, যদি ইচ্ছে হয় এক্ষুনি আস। নিনা আর এক মিনিট দেরি না করে হাসপাতালে ছুটে এল। হৃদ্য নিনাকে ও শুভ-সূচনাকে দেখতে পেয়ে খুব আনন্দিত হল। শুভকে আর সূচনাকে জড়িয়ে ধরে বারবার চুমু খেল, খুব আদর করল। নিনার হাতদুটো ধরে বলল, আম্মা, আমি তোমাকে খুব কষ্ট দিয়েছি, পারো ত আমাকে ক্ষমা করো আম্মা। কোন জনমে যদি আবার আমার জন্ম হয়, তা হলে তোমার শুভসূচনারূপে যেন তোমার কোলে জন্ম নিই, আল্লাহ্‌র কাছে এটুকু চাইব। এ জীবনের অপূর্ণতা যেন সেই জীবনে পূর্ণ করতে পারি আম্মা। হৃদ্যের কথা শুনে নিনা অবাক। হৃদয়ের সমস্ত বিষ তার অমৃতে পরিণত হয় তৎক্ষণাৎ। সজোরে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, কে বলছে তুই আমার কোলে জন্ম নেস নি, তুই আমারই বুকের ধন, শুভ আর সূচনা তোরই আপন ভাইবোন। আমি তোর প্রতি অনেক অন্যায়-অবিচার করছি রে হৃদ্য, এ অপরাধিনী মাকে মাফ করে দে রে বাপ, একবার মাফ করে দে...
হৃদ্য কেঁদে বলল, আম্মা, আমি আল্লাহ্‌কে ত কোনদিন দেখিনি, তবে তোমাদেরকে দেখেছি। আমি তোমাদেরকে অনেকবেশি ভালবাসি। তুমি কোনদিন অনুভব করতে চাওনি আম্মা। তবে আল্লাহ্‌কে যদি কোনদিন দেখি--জিজ্ঞেস করব...
নিনা--আমি অন্ধ হয়ে গেছিলাম রে বাপ, তুই আমার সকল অন্ধত্ব দূর করে দিলি হৃদ্য, আমরাও তোকে অনেকবেশি ভালবাসি--বাসব--

হৃদ্যকে বোধহয় শুভ-সূচনার চেয়েও বেশি ভালবাসত জিরান। কারণ তার হারানোব্যথা জিরানকে পাগলের মতো করে দিল অনেকটা। নিনাও আজ তাই। এখন হাড়ে হাড়ে টের পারছে তারা হৃদ্যের তাৎপর্য। কিছু জিনিস সহজে পেলে তার কদর হয় না। কিছু জিনিস হারালে মানুষ তার মর্যাদা বুঝে। হৃদ্য চলে যাওয়ার পর থেকে জিরান একবিন্দু সুখ উপলব্ধি করতে পারেনি কোনদিন, না করতে পেরেছে নিনা। সংসারে নেমে এল বিপর্যয়। আস্তে আস্তে জিরানের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্যে অবনতি দেখা দিল। তখন দুজনারই বুঝার বাকি রয় না--তাদের সংসারে হৃদ্যই একমাত্র উন্নতির সিঁড়ি ছিল।

কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে আবার চলে যায়--কারও জন্যে কিছু করতে নাপারার মধ্যেই আবার অনেক কিছু করে যায়। কিছু মানুষের স্মৃতি, কিছু মানুষের কথা এবং কিছু মানুষের মায়ামমতা অন্যদেরকে আজীবন কাঁদায়। হৃদ্য চলে গেল, রেখে গেল জিরানের সংসারে অনেক মায়ামমতার স্মৃতি, দুঃখকষ্ট, হাসিমাতি ও নির্বুদ্ধিতা...

৪ বৈশাখ, ১৪২০, মানামা, আমিরাত।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন