বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ আগস্ট ১৯৮০
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৭৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৫ / ৩.০

পারাপার

অবহেলা এপ্রিল ২০১৭

অর্থহীন পথচলা

ঐশ্বরিক মার্চ ২০১৭

অপেক্ষা

প্রেম ফেব্রুয়ারী ২০১৭

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

মোট ভোট ৩০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৭৫ নীল নক্ষত্র

মুশফিক রুবেল
comment ২৩  favorite ০  import_contacts ২৯২
গতকাল সারারাত বৃষ্টি হয়েছে , মাঝখানে একটুখানি থেমে আবার শুরু হয়েছে মুষুলধারে বৃষ্টি , ইংরেজীতে যাকে বলে 'cats and dogs' । আলী হায়দার সাহেব বাজার থেকে ইলিশ মাছ এনেছেন পনেরশ টাকা খরচ করে , তার স্ত্রী জামিলা বেগম প্রচন্ড ক্ষেপে আছেন , তার স্বামীর দু চারদিন উলটো পাল্টা খরচের কারণে মাসের শেষের দিকে খুব টানাটানির মধ্যে দিয়ে চালাতে হয় তাকে ।
তাকে বোঝাতে গেলে তিনি চার্বাক দার্শনিকদের মত বলেন , " যতদিন বাঁচব সুখেই বাঁচব , প্রয়োজনে ধার করে ঘি কিনে খাব " , যদি ও তিনি ধার করে ঘি কেনেন না , তিনি ধার করে মাসের শেষ কটা দিন কোনরকমে খাবার জোটানোর চেষ্টা করেন । বিয়ের পর উনি ব্যাবসা শুরু করেন , অল্প কদিনে ব্যাবসায় লালবাতি জ্বলে যাওয়ার পর উনি বুঝলেন যে ব্যাবসা সবার জন্য না । তারপর জামিলা বেগমের মেজো মামা খায়রুল আলম সাহেব তাকে একটি বেসরকারী কোম্পানীতে কেরাণীর চাকরি জোগাড় করে দেন , সেই থেকে উনি বহাল তবিয়াতে চাকরী করে যাচ্ছেন ।
নীলা রান্নাঘরে গুনগুন করে গান গাইছে আর রান্নার ব্যাবস্থা করছে । মা জামিলা বেগম অসুস্থ , তাই রান্নার ভার পড়েছে তার উপরে । ছোট বোন কণা তাকে সাহায্য করছে । রান্না হচ্ছে ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ । নীলার মনটা আজ খুব ভাল , আজই প্রথম দেশের অন্যতম সেরা সাহিত্য পত্রিকায় তার কবিতা ছাপা হয়েছে , কবিতার নাম " জোছনা বিহার " । নীলার ছোট মামা শফিক সেই পত্রিকা হাতে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছে নীলার বাবা আলী হায়দার সাহেবের সামনে । দুলাভাই আমি আগেই বলেছিলাম , আপনার এই মেয়েটা অনেক প্রতিভাবান , এখন দেখলেন তো হাতে নাতে প্রমাণ ।
শফিক তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে শিলিগুড়ি যাচ্ছে বৃষ্টি দেখতে , তাই দুলাভাই এর সাথে দেখা করতে এসেছে কিছু টাকা নিতে । দুলাভাইকে এখন যত শীর্ষে উঠানো যায় ততটাই সে উঠাবে । দুলাভাই যে যাই বলুক না কেন আপনার রোমান্টিক সেন্স কিন্তু দারুণ ইম্প্রেসিভ । ' কিরকম ?' , এই যে ঝরঝর মূখর ও বাদল দিনে ইলিশ মাছ কিনেছেন । ' ও এই কথা , জানো তোমার আপা খুব রেগে আছে ' । আরে বাদ দিন তো দুলাভাই , আজ এই ছুটির দিনে বৃষ্টি কে উপভোগ্য করে তোলার জন্য আপনার মাথায় যে রোমান্টিক আইডিয়াটা এসেছে কজন এর মূল্য বুঝবে । তাছাড়া দুলাভাই আপনার এই চার্বাক ভক্তি ও আমার অসাধারণ লাগে । নীলা চা নিয়ে ঢুকছে , হয়েছে মামা হয়েছে , বাবা তো বেলুনের মতো ফেটে যাবে , এখন একটু থামো । তোমাকে মা ডাকছে , চা খেয়ে মায়ের সাথে দেখা করে আসো ।
নীলা এবং তার বন্ধুরা মিলে একটি পথনাটকের মোহড়া দিচ্ছে । নাটকটির থিম হলো যৌতুক বিরোধী , নীলার এ নাটকে কণের ভুমিকা । অত্যাচারী স্বামীর নির্যাতন ফুটিয়ে তুলতে যেয়ে ওকে যথেষ্ঠ পরিমাণে আউলা ঝাউলা সাজতে হয়েছে , চুলগুলো এলোমেলো , চোখেমুখে বিমর্ষতার ছাপ , কাপড়ের ভাঁজভাঙা এলোমেলো কুঁচকানো । নীলা নিজে ভাল করে শাড়ী পড়তে পারে না , তাই সাতসকালে মায়ের কাছে বকুনি খেতে খেতে শাড়ীর কুঁচিগুলো ঠিক করে নিয়েছে ।
নীলার খুব অস্বস্তি লাগছে , হঠাত করে ওর শরীর খারাপ হয়েছে কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়া , ব্যাগে কোন ন্যাপকিন প্যাড নেই , মোবাইলে সম্ভাব্য ডেট এ রিমেইন্ডার হিসেবে অ্যালার্ম সেট করে রেখেছিল " পেন্টি নিড টু ওয়্যার " , এবার তো সম্ভাব্য ডেটের অনেক আগেই হয়ে গেল । নিজের মাথার চুল সব টেনে টেনে ছিড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে , এমনিতেই ওর পেন্টি পরতে ভাল লাগে না , তাই শরীর খারাপ না হলে পরা ও হয় না । টিউশনিতে যেতে হবে , আগামীকাল থেকে স্টুডেন্ট এর এক্সাম শুরু হচ্ছে , তাই একপ্রকার বাধ্যতামূলক ভাবেই যাওয়া লাগবে । ইউনিভার্সিটির গাড়ি মিস করেছে , তাই বাধ্য হয়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেই যেতে হবে । শাহাবাগে দাড়িয়ে আছে গাড়ির জন্য , রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে অফিস ভাঙা ভীড় । এই দুই কোটি মানুষের শহরে প্রত্যেক গাড়ীতেই একই অবস্থা, তিল ঠাই নাহিরে , অবশেষে অনেক কষ্টে একটি গাড়ীতে উঠতে পারলো নীলা ।
সন্ধ্যা সাতটা বাজে , নীলা বাসায় ফিরছে , শহর তলিতে ওদের বাসার এলাকাটা বেশ ফাঁকা ফাঁকা , প্রতিদিন ফেরার সময় বেশ ভয় ভয় করে । মোড়ে কিছু বখাটে ছেলেরা আড্ডা দেয় আর আজে বাজে টোন করে । আজ ও মোড়ে পাঁচ ছয়টা ছেলে পথের মাঝে দেয়াল হয়ে দাড়িয়ে আছে , নীলা খুব ভদ্রভাবে বললো , ‘ ভাইয়া পথ ছাড়ুন , যেতে দিন ‘ । একজন খুব বাজে ভাবে বললো , ‘ যদি না ছাড়ি তো ? ‘ , নীলা চুপ করে থাকে , এর মাঝে একটি ট্রাক আসলো , তারপর পরপর কয়েকটা গাড়ি আসলো গেল , এই সুযোগে নীলা ও যেন বেরিয়ে গেল বখাটে দেয়ালের ফাটল দিয়ে । নীলার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে , বাসায় ঢুকে পর পর কয় গ্লাস পানি খেল , জামিলা বেগম তাকিয়ে আছেন মেয়ের দিকে , আড়ষ্ঠ কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন কি হয়েছে রে মা ? নীলা নির্বাক , কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না , মা এমনিতেই অনেক অসুস্থ , দুইবার স্ট্রোক করেছে , টেনশন নিতে পারে না । তাই ভেবে চিন্তে নীলা উত্তর দিল , কিছু হয়নি তো ।
রানু সব কিছু ভুলতে চাইলো , ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা হাতে কানে হেডফোন গুজে গান শুনতে শুনতে চলে গেল ছাদে ,
“ কিছু বিষাদ হোক পাখি ,
নগরীর নোনা ধরা দেয়ালে ;
কাঁচ পোকা সারি সারি ,
নির্বাণ , নির্বাণ ডেকে যায় ।।

কিছু ভুল রঙের ফুল ,
ফুটে আছে আজ পথে ,
কিছু মিথ্যে কথার রং
আমাদের হৃদয়ে ।।

এখনো এখানে নীরবে দাড়িয়ে ,
অগণিত প্রতিশোধ জাগে আত্নার ভেতরে ,
কিছু মাতাল হাওয়ার দল
শোনে ঝোড়ো সময়ের গান
এখানে শুরু হোক রোজকার রুপকথা ।।“ (মেঘদল)

নগরীর আকাশে অর্ধেক পূর্নিমার চাঁদ যেন মুচকি হাসছে বাক্সে বাক্সে বন্দী নাগরিক মানুষের দিকে চেয়ে । কতশত ভাবনা উড়ে বেড়ায় নীলার আকাশে , আর দশদিন পরেই নাটকটি মঞ্চস্থ হবে শাহাবাগ ছবির হাটের সামনে , তারপর পর্যায়ক্রমে সমস্ত বিভাগীয় নগরগুলিতে যাবে তাদের দল । মূল পরিকল্পনা গ্রামে গ্রামে যেয়ে গ্রামের মানুষকে সচেতন করা , সেটা শুরু হবে আগামী বছর থেকে । এদিকে মাস্টার্স পরীক্ষার ও বেশিদিন বাকি নেই , তাই রাত জেগে পড়তে হচ্ছে ।
নীলার অদ্ভুত দুটি শখ আছে , এ শখ দুটির কথা কখনো কাউকে বলেনি সে ।
পিরামিডের ভিতরে ঢুকে কিংস চেম্বারটা দেখার ভীষণ ইচ্ছে , টিকে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এবং পুরাতন স্থাপনাটির ভিতরে পা দিয়ে অনুভব করতে চাই মানুষের অগ্রগতির শুরুটাকে । আরেকটা ইচ্ছে হয় কোন এক পূর্নিমার রাতে অ্যান্টারটিকার শ্বেত শুভ্র বরফের উপর দিয়ে হাটার । এসব শখ পূরণ করতে হবে তাকে নিজেকেই । স্কলারশীপ নিয়ে বাইরে যেতে হবে , তাকে অনেক বড় হতে হবে , নীলার রেজাল্ট ও যথেষ্ট ভাল , মাস্টার্সে প্রথম হবে সে আশা ও আছে । এসব অদ্ভুত ছেলেমানুষি সব চিন্তা করে আর দূর নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকে নীলা ।
ক্লাস শেষে বিকেলে নাটকের মোহড়া শুরু হয়েছে , আজ সমাজকল্যাণ বিভাগের দুজন সিনিয়র শিক্ষক এসেছেন নাটকের মোহড়া দেখতে , সাথে এসেছেন তিনজন কানাডিয়ান , যারা একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা , বিভিন্ন সমাজ সচেতনমূলক কাজে প্রতিষ্ঠানটি ডোনেট করে থাকে , একটি ভাল ফান্ড পেলে দল টি নিশিন্তে কাজ করে যেতে পারবে , তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করতে যেয়ে অনেক রাত হয়ে গেছে । তাই নীলার সাথে আজ সৌমিক যাচ্ছে বাসা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে ।
বাসায় যেতে সেই মোড়ে আজ ও দাড়িয়ে আছে ছেলেগুলো , কাছাকাছি যেতেই আজে বাজে মন্তব্য শুরু করলো , বলেছিলাম না এইটা একটা মাগী , বাইরে নষ্টামী করে সাধ মেটে নাই তাই এলাকায় নাগর নিয়ে চলে এসেছে । সৌমিককে বিদায় দিয়ে নীলা বাসায় ঢুকে বাথরুমে যেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লো ।
রাতে না খেয়েই শুয়ে পড়লো নীলা , বুকের মধ্যে আগুন জ্বলছে দাও দাও করে , মনে হচ্ছে সারা পৃথিবী জালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেই । অপমানের জ্বালা কিছুতেই ভুলতে পারছে না । সারারাত এপাশ ওপাশ করে কাটালো ঘুম আসছে না , শেষ রাতের দিকে প্রচন্ড জ্বর এসে হানা দিল , ঝুলে থাকলো চেতন অচেতনের মাঝে – নীলা হাটছে শ্বেত শুভ্র বরফের উপর দিয়ে , চাঁদের আলোয় চারিদিকে ঝকমক করছে , কোন অচেনা সুর ভেসে আসছে দূর থেকে , নগ্ন পায়ে বরফের উপর দিয়ে হাঁটতে নীলার বেশ ভাল লাগছে , পৃথিবীটাকে ভীষণ জীবন্ত মনে হচ্ছে । অচেনা সুরের ভাষা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে ,
“ ভয়ের অস্তাচল থেকে বেরিয়ে আসুক
তোমাদের সূর্যদয় ,
তোমাদের মৃত্যু নেই
আছে শুধু ঘুম ।
তোমরা পৃথিবীর সন্তান
বেঁচে থাকো মহাকালের মতো ,
অনন্ত নক্ষত্রের পানে চেয়ে দেখো
কত সুমহান উজ্জ্বল ,
কত শত নাবিক পথ চিনে নেয়
পথ হারানো অন্ধকারে ,
কত জরাজীর্ণ মৃত্যুর ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে
ছুটে চলা হরিণের দল ।। “
ঘুম থেকে জেগে উঠে নীলার বেশ প্রশান্তি অনুভব হচ্ছে । বাবা বাইরে হাঁটতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত , নীলা ও বাবার সাথে হাঁটতে বের হলো অনেক অনেক দিন পরে । বাইরে বের হয়েই মনটা প্রজাপতির মতো হয়ে গেল , ভোরের জাফরান রঙা সূর্যটা আকাশের নীলে আঁকা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ক্যানভাস ।মৃদু সমীরণে ভাল লাগার শীতল অনুভূতির পরশ , চোখে মুখে আদর জড়িয়ে দিচ্ছে স্নেহশীল মায়ের মতো , রাতের স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল , জীবনে প্রথম আজ এক অন্যরকম অনুভব হলো নিজেকে পৃথিবীর সন্তান ভেবে ।
প্রায় প্রতিদিন ই ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে এলাকার ঐ বখাটে ছেলেগুলো খুব জ্বালাতন করে , তবুও দিনের পর দিন প্রায় মুখবুজেই তা সহ্য করে যাচ্ছে । আজ যেন অন্য যে কোন দিনের চেয়ে সীমা টা ছাড়িয়ে গেল , ছেলে গুলোর মধ্যে একজন তার ওড়না ধরে টান দিলো , নীলা কষে একটা চড় মারলো , তারপর দ্রুত পায়ে বাসায় ফিরে বাবাকে নিয়ে সোজা থানায় চলে গেল । থানায় যেয়ে অভিযোগ লিখিয়ে আসার ঘন্টা খানিক পরেই এলাকার চার পাঁচ জন মুরব্বী শ্রেনীর লোক এলো তাদের বাসায় । তারা খুব উচ্চস্বরে বলতে শুরু করলো , “ আলী হায়দার সাহেব আপনি কাজটা মোটেই ভাল করেননি , আপনি এ এলাকায় নতুন বাড়ি বানিয়ে এসেছেন , কোথায় সবার সাথে তালমিল দিয়ে থাকবেন , তা না করে আপনি এলাকার ময়মুরব্বী রেখে থানায় গেছেন রিপোর্ট করতে । বিচার করতে হয় এলাকার মুরব্বীরা করবেন , আপনি এর মধ্যে থানা পুলিশ টেনে আনলেন কেন , আপনার ঐ নষ্ট মেয়েটার জন্য । প্রচন্ড রাগে কাঁপতে কাঁপতে আলী হায়দার সাহেব বললেন – আপনাদের এত বড় সাহস আমার বাড়িতে এসে আমার মেয়েকে বলছেন নষ্ট , বেরিয়ে যান এখনি । হ্যাঁ , বেরিয়ে যাচ্ছি , যাওয়ার আগে আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি ঐ নষ্ট মেয়েটার ব্যাপারে , রাত বিরাতে ব্যাবসা করে এসে এখানে বাস করা যাবে না । এর মাঝে একদিন খদ্দের এলাকায় ও নিয়ে এসেছিল , এরকম আর এলাকার লোক জন মেনে নেবে না । আপনি যাদের নামে রিপোর্ট করেছেন তাদের মধ্যে একজন সংসদ সদস্যের ভাই ,একজন ওয়ার্ড কমিশনারের ছেলে , যাদের এলাকার লোকজন খুব পছন্দ করে , তাদের পারিবারিক ভাবেই এ এলাকায় সুখ্যাতি আছে , আপনার মেয়ের জন্য তাদের মানসম্মান নষ্ট হতে পারে না , তাই বিচার যদি হতেই হয় তো আপনার মেয়ের বিচার হবে ।
লোক গুলো বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরে আলী হায়দার সাহেব আবার থানায় গেলেন তার বাড়িতে এসে হুমকী দেয়ার জন্য জিডি করতে । পুলিশ জিডি নিল না বরং বললো আমরা খবর পেয়েছি আপনার মেয়ে দেহ ব্যাবসার সাথে জড়িত , তাকে সতর্ক করে দিন , নইলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে । আলী হায়দার সাহেব নির্বাক হয়ে পুলিশ অফিসারের দিকে তাকিয়ে থাকলেন অসহায় দৃষ্টিতে । পুলিশ অফিসারটি খুব কর্কশ ভাষায় বললো এভাবে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে না থেকে বেরিয়ে যান দয়া করে , আমার সময় নষ্ট করবেন না ।
আলী হায়দার সাহেবের মাথা ঝিম ঝিম করছে , শরীর দুর্বল লাগছে , কাঁধটা নীচের দিকে ঝুলে গেছে, মাথা নিচু করে হাটা শুরু করেছেন বাসার দিকে ।
জামিলা বেগম নীলাকে আর বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করে দিলেন , আলী হায়দার সাহেব হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন ও বের হবে প্রতিদিনের মতো ই । পরের দিন নীলা কোথাও গেল না , তারপরের দিন বাবাকে আর কণাকে নিয়ে গেল শাহাবাগে , ছবির হাটের সামনে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মঞ্চস্থ হলো পথনাটকটি , ইউনিভার্সিটির বেশ কিছু শিক্ষকেরা আসলেন , সেই বিদেশী প্রতিনিধিরাও আসলেন , শত শত পথিক জমে গেল , মূহুর্মূহু হাততালিতে উৎসাহ ঢেলে পড়লো , উৎসারিত হলো প্রশংসা ।
মাঝখানে কিছুদিন আলী হায়দার সাহেব মেয়ের সাথে যেতেন আসতেন , কিন্তু সেটা আর কতদিনই বা সম্ভব , তিনিও তো চাকরী করেন , তাছাড়া দুজনের গন্তব্য দুদিকে । তাই যথারীতি নীলা আবার একাই যাতায়ত শুরু করলো , কোথাও কোন সমস্যা নেই , বখাটে ছেলেগুলোকে আর দেখা যেত না । এভাবে বেশ কিছুদিন চলার পর হঠাত একদিন টিউশনি সেরে সন্ধ্যায় বাসায় ফেরার পথে সেই ছেলে গুলোকে দেখতে পেল যথারীতি সেই মোড়ে , কেন জানি আজ মোড়ের সব দোকান গুলো বন্ধ , শুধু একটা কামারের দোকান খোলা আছে , দোকান পাট বন্ধ মোড়টা ও তাই আজ অস্বাভাবিক রকমের ফাঁকা । ছেলে গুলো দূর থেকেই আজেবাজে মন্তব্য শুরু করলো , কাছে আসতেই একজন নীলার ওড়না ধরে টান দিল , আরেকজন নীলার বুকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দিলো , বাকিরা সব পৈচাশিক হাসিতে মেতে উঠলো , একজন বলে উঠলো এখানে এভাবে নয় , আরামসে হবে ,ওইদিকে ঝিলের পাড়ে বেশ ফাঁকা ,ঐ দিকে নিয়ে চল , ওর শরীরের সব জ্বালা আজ বের করে দেব , দেখি ও আজ কত নিতে পারে । ভয়ের বদলে নীলার ভিতরে উন্মত্ত ক্রোধ জেগে উঠলো , ক্রোধের আগুন সমস্ত শরীর কে দানবীয় শক্তি সঞ্চার করলো , হঠাত করে নীলার চোখে যেন ঝিলিক মেরে উঠলো পাশে কামারের দোকানে থাকা একটি বড় দা এর ধারালো অংশ , মূহুর্তের মধ্যেই ছুটে কামারের দোকান থেকে দা নিয়ে এলোপাথাড়ি ভাবে কোপাতে লাগলো , দু তিন জন কে কেটে ফালি ফালি করে দিলো আর বাকি দুতিনজন শরীরে কাটা ছেড়া নিয়ে ভয়ে পালিয়ে গেল । সামনে পড়ে থাকা তিনজনের শরীর দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে টুকরো টুকরো করতে লাগলো , যতক্ষন না জ্ঞান ছিল , তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ।
কিছুদিন পরে আদালতে রায় হলো , ট্রিপল মার্ডারের দায়ে আদালত নীলাকে মৃত্যুদন্ড দিল , সুপ্রিম কোর্ট ও সেই সাজা ই বহাল রাখলো ।
আজ রাত সাড়ে তিনটায় নীলার ফাঁসি কার্যকর হবে । কারাকর্তৃপক্ষ শেষ ইচ্ছে জানতে চাইলে নীলা তার চোখ দুটি দান করার ইচ্ছে পোষণ করলো , পরিবারের কারো সাথে ই শেষ দেখা করতে রাজী হলো না , কারাকর্তৃপক্ষের কাছে বাবার কাছে লেখা একটি চিঠি রেখে গেল ,
প্রিয় বাবা ,
যেদিন মা আমাকে বাইরে বের হতে বারণ করেছিল সেদিন তুমি প্রতিবাদ করে বলেছিলে ও বাইরে যাবে প্রতিদিনের মতোই , সেদিন ই আমি তোমাকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম , এতোদিন ভাবতাম আমার এই নিম্নমধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাবাটি সাদা মাটা আর পাঁচজনের মতোই , কিন্তু না সেদিন ই তুমি তোমার জাত চিনিয়েছিলে , তোমার যে এত শক্ত মেরুদন্ড আমি আগে কখনো বুঝতে পারিনি , তোমার মেয়ে হয়ে বাবা আমার জীবন ধন্য , যে সম্মান আমাকে দিয়েছ তা আমার অন্তরকে আলোকিত করেছে ,আমার সমস্ত ভয়কে দূর করেছে । আমার জন্য শোক করো না , আমাদের আসা যাওয়ার মাঝেই আমাদের পথকে পরিষ্কার করতে হবে , অন্যায়ের প্রতিবাদ করে । যুগে যুগে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে , কখনো কখনো লক্ষ কোটি প্রাণের বিনিময়ে এক একটি ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । আমি ও প্রতিবাদ করলাম আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণ দিয়ে মহৎ কোন ন্যায়ের জন্য । আমার মতো কত সহস্র প্রাণের বিনিময়ে হয়তো একদিন মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে ।
আমার জন্য শোক করো না , আমরা পৃথিবীর সন্তান , আমাদের মৃত্যু নেই আছে শুধু ঘুম । আমরা অখন্ড প্রাণ , হয়তো আমার ইচ্ছেগুলো পূরণ হবে অন্য কোন চেতনায় , হয়তো পৃথিবীর বুকের মাঝে মুখ গুজে ঘুমিয়ে থাকবো অনন্তকাল , কিংবা সবুজ কোন ঘাসের মাঠে আমার স্বপ্নগুলো হেটে বেড়াবে স্বাধীনভাবে ।
রাতের আকাশে নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে দেখ , কোটি কোটি নক্ষত্রের মাঝে সবগুলো সমান উজ্জ্বল নয় , কোন কোনটি বেশি উজ্জ্বল ঠিক যেন সেইসব মহামানবদের মতো যারা মহাকালের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে । আর কিছু কিছু নক্ষত্র অতটা উজ্জ্বল নয় বটে , তবু তারাও কিন্তু আলোর পসরা সাজিয়ে বসে আছে , গাড় অন্ধকারে তারা ও কি আলো ছড়ায় না ?

নীলা

সন্ধ্যায় জামিলা বেগম তৃতীয়বারের মতো স্ট্রোক করলো , তাকে হাসপাতালের ইনসেন্টিভ কেয়ারে রাখা হয়েছে ।
রাত সাড়ে তিনটার সময় আলী হায়দার সাহেব নীলার লাশের জন্য দাড়িয়ে আছেন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে , আকাশ ভাঙা বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে আলী হায়দার সাহেবের চোখের জল । যথাসময়ে নীলার ফাঁসি কার্যকর হলো , প্রচন্ড শব্দে আকাশে মূহুর্মূহু বিদ্যুৎ চমকাতে লাগলো যেন কোন বীরের জন্য তোপধ্বনি হচ্ছে । প্রকৃতি যেন বলতে চাইছে নীলার জন্য শোকগাথা নয় , নীলার জন্য থাকুক বীরগাথা ।





আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন