বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪১টি

সমন্বিত স্কোর

৭.৪৫

বিচারক স্কোরঃ ৪.৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৫৫ / ৩.০

অন্ধকারের গান

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

থাকে শুধু অন্ধকার

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

সৌর-ঋণ

ঋণ জুলাই ২০১৭

মুক্তিযোদ্ধা (ডিসেম্বর ২০১২)

মোট ভোট ৮৫ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৭.৪৫ গ্রে’জ অ্যানাটমি

এশরার লতিফ
comment ৩৯  favorite ৮  import_contacts ১,৮০০

ডক্টর হাসান চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে উঠে গেলেন। সারা গা ঘামে ভিজে গেছে। অথচ কত হবে তাপমাত্রা এখন ? আট-নয় ডিগ্রী সেলসিয়াস, কিম্বা তারও কম? প্রায়ই ভোর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নের ভেতর ভেসে ওঠে ভাইয়ার উপড়ানো দুটো চোখ..ফিনকী দিয়ে বের হয়ে আসা রক্ত... গলা কাটা মুরগীর মতো প্রবল যন্ত্রণায় তড়পাতে তড়পাতে নিথর হয়ে আসা প্রথম যৌবনের স্বপ্ন-নায়কের দেহ...।
ডক্টর হাসান সাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিয়ে মুখ লাগিয়েই ঢক ঢক করে নিঃশেষ করে ফেল্লেন।
এই সময় নীরা পাশে থাকলে উনি অনেক শান্তি পান। নীরা এখন ঢাকায়। বাচ্চাদের নিয়ে বোনের মেয়ের বিয়ে খাচ্ছে। আগামী সপ্তাহে ডক্টর হাসানও যাবেন, প্লেনের টিকেট কাটা, ব্যাগ গুছানো সব নীরাই করে গেছে।
বাথরুমে গিয়ে ডক্টর হাসান আয়নায় নিজের দিকে তাকালেন। চেহারায় বার্ধক্যের আভাস। অর্ধেকেরও বেশী চুল সাদা হয়ে গেছে।মাথার ঠিক মাঝখানে চুল পাতলা হয়ে এসেছে।খুব নজর দিয়ে দেখলে মুখে কিছু ক্ষীণ বলি রেখাও চোখে পড়ে। তারপরও তার পাঁচ ফুট নয় ইঞ্চি শরীরে একধরনের ঋজুটা আর স্থিরতা আছে, যা একজন শল্য চিকিৎসকের কিম্বা একজন পেশাদার ঘাতকের জন্য খুবই প্রয়োজন। পেশা হিসেবে মানুষ বাঁচানো এবং মানুষ মারা দুটোই ভয়ানক প্রিসিশনের কাজ।
রয়াল লন্ডন হসপিটালের করিডোর দিয়ে যখন তিনি হাঁটেন খুব খুঁটিয়ে না দেখলে বোঝার কোন উপায়ই থাকে না যে ওনার একটি পা প্রস্থেটিকের।
ডক্টর হাসান ওজু সেরে নামাজে দাঁড়ালেন। আজ ভাইয়ার মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতি বছর ফজরের নামাজে তিনি এই সূরাটি তিনবার পড়েনঃ
আসা রাব্বুকুম আন ইয়ারহামোকুমওয়াইন আত্তুম উদনা ওয়াজাআলনা জাহান্নমা লিল্কা ফিরিনা হাসিরান
যদি তোমরা আবার পাপে নিমজ্জিত হও, আমি আবারও শাস্তি প্রদান করব।

১৯৭১। আরিফ আর হাসানদের বাসাটা ছিল জেলখানার ঠিক উলটো দিকে নাজিমুদ্দিন রোডে। আরিফ বয়সে হাসানের মাত্র তিন বছরের বড়। পাঁচ ফিট দশের মত উচ্চতা, অ্যাথলেটিক দেহ, ঘন কালো কোঁকড়ানো চুল, যে কোন বিচারেই গল্পের রাজকুমার বলে চালিয়ে দেয়া সম্ভব। একটা শ্রেণীহীন সমাজ গঠনের প্রতি অঙ্গিকারবদ্ধতা আর সুগভীর নিষ্ঠা ওকে বাম রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাম আন্দোলনের চীনপন্থি ধারাটি যখন তাত্ত্বিক অবস্থানের গ্যাঁড়াকলে পড়ে নিজেরাও বিভ্রান্ত এবং অপরকেও বিভ্রান্ত করছে , একুশ বছরের এই সাহসী যুবকটি তখন প্রিয় রাজনৈতিক দলটির সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে যোগ দিয়েছে ঢাকা শহরের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ গেরিলা গ্রুপ ক্র্যাক প্লাটুনে। সেখানে আছে মেলাঘর থেকে ক্যাপ্টেন হায়দারের নিজ হাতে কমান্ডো ট্রেনিং নেয়া কাজি, জুয়েল আলম, বদি, শাহাদাত চৌধুরী আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় থার্ড স্ট্যান্ড করা রুমীর মত টগবগে উত্তপ্ত তরুণরা। মৃত্যু নিয়ে কারোই তেমন ভয়-ডর নেই, সেক্টর কমান্ডার কর্নেল খালেদ মোশারফ তো প্রায়ই বলতেন ‘কোন স্বাধীন দেশ জীবিত গেরিলা চায় না, চায় রক্তস্নাত শহীদ’।
গেরিলাদের প্রধান কাজ ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্রীজ এবং স্থাপনাগুলো অকার্যকর করে দেয়া। একদিকে হানাদারদের আর্টিলারি আক্রমন, অন্যদিকে এয়ার রেইড, এরই মাঝে কখনো রাতের নিভৃতে কখনো দিনে দুপুরে চলত ঢাকা-কেন্দ্রিক অপারেশন। উলান, গুলবাগ, ধানমন্ডি, ফার্মগেট । প্লাস্টিক এক্সপ্লসিভ দিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের এক অংশ উড়িয়ে দেয়ার পর তো পাকিদের মাথার ঘুম হারাম হয়ে যায়। ২৯শে আগস্ট কোন একজনের বিশ্বাসঘাতকতায় রুমী, বদিসহ ক্র্যাক প্লাটুনের অনেকেই ধরা পড়ে ।
আরিফ কিছুদিনের জন্য গা ঢাকা দিয়ে শুরু করে গেরিলা গ্রুপের পুনঃসংগঠন । যে কাজটা রুমীরা করে যেতে পারেনি, সেই সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেয়াই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সময় তখন প্রতিকূলে। ভারী ট্যাংক আর রিকয়েললেস রাইফেল সজ্জিত পাকি মিলিটারি ঘিন ঘিনে মাছির মত গিজ গিজ করছে ঢাকা শহরে। রাজধানীর পতন মানে তো প্রতীকী ভাবে দেশেরই পতন, এটা হতে দেয়া যায় না!
সূর্যের চেয়ে বালির গরম বেশী, পাক হানাদারদের চেয়েও বেশী সক্রিয় দেশী দালালরা। তারা হয়ে দাঁড়িয়েছে অশরীরী কমিউনিটি ওয়াচ ডগ। তাদের ছোক ছোক দৃষ্টি এড়িয়ে কিছু করাই মুশকিল। বাইরে থেকে রসদ আর হাতিয়ার সাপ্লাইও অনিয়মিত। পুরনো ঢাকার আঁকাবাঁকা আর সংকীর্ণ অলিগলিতেই সীমিত হয়ে পড়েছে আরিফদের জনযুদ্ধ। প্রতিটা গলিতেই গায়ে গা ঘেঁষা দোতালা-তেতালা বাড়ি,খোলা বারান্দা। কৌশলগতভাবে নাগরিক গেরিলা যুদ্ধের সবচেয়ে সুবিধাজনক ক্ষেত্র।
কিন্তু নভেম্বরের মাঝমাঝি থেকে হঠাৎ করেই একের পর এক আরিফদের অপারেশনগুলো ভণ্ডুল হয়ে যাচ্ছে। আরিফকে খুবই চিন্তিত দেখায়। কোথাও একটা কিছু গড়বড় আছে । ক্লোজ কোয়ার্টার ব্যাট্‌ল্‌ ভয়াবহরকম ঝুঁকিপূর্ণ যদি গেরিলাদের ভেতরে ইনফিলট্রেশন হয়। ওদের গেরিলা গ্রুপটি খুবই ছোট। আরিফ, ছোট ভাই হাসান, টিকাটুলির আবির, ভজহরি লেইনের প্রমথেশ আর হানিফ ভাই, এই পাঁচ জন কোর মেম্বার। হাসান ওর নিজের ছোট ভাই, আবিরকে কোনভাবেই সন্দেহ করা যায় না, বেশ কয়েকবার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ও অপারেশন চালিয়েছে, শেষ বার বোমার স্প্লিনটার লেগে বাম হাতের কড়ে আঙ্গুল উড়ে গেছে। প্রমথেশের বাবা ছিল জগন্নাথ হলের কেয়ারটেইকার । পঁচিশে মার্চের রাতেই তাকে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয় ফুলার রোডের কাছে। আর হানিফ ভাইয়ের তো প্রশ্নই ওঠে না। শুরু থেকেই রুমীদের সাথে । বলা যায় রুমীদের ইনফর্মাল প্রজেক্ট কোঅরডিনেটর। রসদ আর হাতিয়ার কোত্থেকে আসবে, কবে কোথায় আক্রমন করা হবে, প্ল্যান বি কি হবে, খুব গুরুত্বপূর্ণ দু একটা পরিকল্পনা বাদে আর সবই ছিল হানিফ ভাইয়ের এখতিয়ারে। হানিফ ভাই না থাকলে রুমীরা মুহুর্মুহু আক্রমনে ঢাকা শহর কাঁপিয়ে দিতে পারত না। বড়োই সৌখিন আর আমুদে ধরনের লোক হানিফ ভাই, এই যুদ্ধের বাজারেও এক দিন পর পর শেভ করেন, জামা কাপড় ধোপদুরস্ত। পচানব্বুই শতাংশ বিশ্বাসঘাতক আর দালালদের একটা স্টেরিওটাইপ থাকে। তার ভেতর এরা কেউই পড়ে না।
সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার প্লান্টে আক্রমনের চিন্তা আপাতত হিমাগারে । যেমন নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী, দেখে হঠাৎ মনে হবে ভেতরে টিক্কা খান মিটিং করছেন । ব্যর্থ বড় অ্যাকশনে গোষ্ঠীসুদ্ধ খতম হওয়ার চেয়ে ছোট ছোট আক্রমন করে ঘুন পোকার মত ভেতর কাটাই বরং আপাতত ভালো।
এদিকে অপারেশন চেঙ্গিসের পর থেকে দেশের অবস্থাও দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। তেসরা ডিসেম্বর ভারতীয় বিমান গুলো তেজগাঁ আর কুর্মিটোলা বিমান বন্দরকে তামা বানিয়ে দিয়েছে। মিত্রশক্তির আক্রমনের মুখে যুদ্ধের একটা নতুন ভারসাম্য তৈরী হচ্ছে। এই প্রথম নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে যুদ্ধটা একটা দিকে এগুচ্ছে। আর বড় জোর ছয় মাস।
পাঁচ তারিখ খুব ভোরবেলা হাসানদের নাজিমুদ্দিন রোডের বাসায় এসে হাজির হানিফ ভাই। আরিফই দরজা খুললো।
‘কী ব্যাপার হানিফ ভাই, এতো ভোরে’
‘ভালো খবর আরিফ। চা খাওয়াও আগে’
ওরা চা নিয়ে বসল। খুব বড় ঘটনা না থাকলে হানিফ ভাই সাধারনত এরকম হুট করে চলে আসে না।
‘কাদেরিয়া বাহিনীর ভালো কিছু হাতিয়ার টাংগাইল থেকে আসবে। ধামরাই গিয়ে আনা লাগবে। হাসান আর তুমি বিকেলে রেডি থেকো। এ্যাম্বুলেন্স ম্যানেজ করেছি’
‘কি হাতিয়ার হানিফ ভাই’
‘এস এম জি, এল এম জি, গ্রেনেড, পি ই, অ্যামুনিশন। এবার তুমি হাত খুলে পাওয়ার প্লান্ট উড়াতে পারবে।‘
বিকেলে হানিফ ভাই এ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসলেন, একটা আকাশী রঙের ভক্সওয়াগন এইট সিটারকে কনভার্ট করা হয়েছে। গাড়ি হোসনী দালান পার হয়ে আরিচার দিকে ছুটল। আজিমপুরের কাছে এসে হানিফ ভাই বল্লেন,
‘এখানে একটু থামতে হবে। চলো শফিকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই,’
‘কোন শফিক হানিফ ভাই?’ আরিফ চেনার চেষ্টা করছে।
‘এরা মুন্সীগঞ্জে অপারেশন চালিয়েছে, গয়ালিমন্দ্র, বারইখালি, রতনপুরে পাকিদের টেঁসে দিয়েছে, মুন্সীগঞ্জ এখন একটা স্বাধীন জেলা বলতে পারো। আমাদের পরের অপারেশনে ওরাও থাকবে’
একটা পুরনো দোতালা বাড়ির সামনে এসে ওরা দাঁড়ালো। তিনবার টোকা দিতেই মেহগনি কাঠের দরজাটা খুলে গেলো। গরিলার মত একটা যুবক সামনে দাঁড়িয়ে। ইনিই শফিক। ওর পেছন পেছন সিঁড়ি ভেঙ্গে সবাই দোতালায় উঠে গেলো। করিডোরের শেষ মাথায় একটা বড় ঘর।কাঠের দরোজার বাইরে একটা লোহার কলাপ্সিবল দরোজা। সবাই ঢুকতেই ভেতর থেকে দরোজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো।
আরও তিনটে ছেলে এক কোনে দাঁড়িয়ে আছে। প্রায় ফাঁকা ঘর, কতগুলো লোহার চেয়ার, একটা চৌকি, আর একটা স্টিলের আলমারি ।
হানিফ ভাই দুটো লোহার চেয়ার এগিয়ে দিলো ‘আরিফ, হাসান, বসো’
ওরা বসার সাথে সাথে পেছন থেকে দুটো ছেলে ওদের হাত চেয়ারের সাথে বেঁধে ফেল্ল।
‘হানিফ ভাই ...?’
হানিফ ভাইয়ের মুখ চোখে একটা শীতল পেশাদার ভাব ফুটে উঠেছে।
‘নাথিং পার্সোনাল আরিফ, আমি শুধু হুকুম পালন করি।‘
‘আপনি কার হুকুম পালন করেন হানিফ ভাই’
‘আই এস আই, ইন্টার সারভিসেজ ইন্টালিজেন্স’
‘রুমী ভাই, বদি ভাইকে কী আপনিই...’ হানিফ কথা কেড়ে নিলো।
‘আই জাস্ট ডু মাই ব্লাডি জব...। দে অয়্যার টাফ গাইজ দো, সো স্টাবর্‌ন্‌...ওদের মুখ থেকে কিছুই বের করা যায় নি’
‘আমাদের ব্যাপারে কি হুকুম?’
হানিফ কিছু বল্ল না । আস্তে আস্তে স্টিলের আলমারির কাছে গেলো, চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুল্ল। ভেতর থেকে একটা চকচকে কিছু বের করল আনল।
হানিফ ধীর পায়ে আরিফের দিকে এগুচ্ছে, ডান হাতেএকটা স্কাল্পেল-অস্ত্রপ্রচারের ধারালো ছুরি। দুজন যুবক আরিফকে শক্ত করে ধরে আছে। একজন ওর চুল টেনে মুখটা ছাঁদের দিকে ঘুরিয়ে রেখেছে।

‘ইউ নো হোয়াট, আই হ্যাড বিন ইন দা আর্মি, আই ওয়াজ ট্রেইন্ড ইন স্যান্ডহার্‌স্ট্‌, আই নো হাউ দিজ ফা** ইন্ডিয়ান্স্‌ আর ...অ্যাকচুয়ালি আই ডু হ্যাভ আ পারসোনাল গ্রাজ্‌ এগেইন্স্‌ট্‌ ইউ, হুইচ ইজ...মালাওনদের লগে বইসা দেশ ভাঙ্গার ফিকির করস, শালা বাইঞ্চত...’
হানিফ ছুড়ি ঘুরিয়ে আরিফের ডান চোখটা টান মেরে বের করে নিয়ে আসল। কিছু বোঝার আগেই বাম চোখটাও। তারপর গলায় একটা পোচ।
আরিফের দুই চোখ আর গলা দিয়ে গল্‌গল্‌ করে কলের পানির মত রক্ত পড়ছে। আরিফ কাঁপতে কাঁপতে চেয়ারসুদ্ধ মেঝেতে পড়ে গেলো। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ও কাতরাচ্ছে। এক সময় সব দাপানি আর কম্পন থেমে গেলো। হাসান আর নিতে পারছে না। হাসান জোরে চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।
যখন জ্ঞান ফিরল তখন হাসান হাসপাতালের খাটে। হাঁটুর নীচ থেকে ডান পা’টা নেই। হানিফ করাত দিয়ে কেটে ট্রফি হিসেবে নিয়ে গেছে। হাসানকে পাওয়া গিয়েছিল চায়না বিল্ডিঙের কাছে একটা ডাস্টবিনে।
দেশ স্বাধীন হলো ষোলই ডিসেম্বর। হানিফের আর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। শোনা যায় বিজয়ের পরপরই ওদের একটা গ্রুপ দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।


এরপর অনেক কিছুই খুব দ্রুত ঘটে যায়। সি আর পির মিস ভ্যালেরি টেইলরের হস্তক্ষেপে হাসানকে ইংল্যান্ডে পাঠানো। সেখানেই প্রস্থেটিক পা সংস্থাপন। সেইন্ট জর্জ হসপিটাল মেডিকেল স্কুলে স্কলারশিপ। পচাত্তরে বাবার মৃত্যু। আশিতে নীরার সাথে বিয়ে। প্রথম চাকুরী বার্মিংহ্যাম হসপিটালে। অনেক শহর ঘুরে এখন রয়্যাল লন্ডন হসপিটালে বিশেষজ্ঞ কারডিয়থরেসিক সার্জন।
ছাত্র জীবনে ওনার প্রিয় বই ছিল ‘গ্রে’জ অ্যানাটমি’। চোখের ব্যাবচ্ছেদের উপর একটা বিরাট সাবসেকশন আছে, দি অরগান অফ সাইট। মহান আল্লাহর এক অপরূপ সৃষ্টি এই চোখ। একটা আধ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের গোলক ঘিরে আছে অসংখ্য নার্ভ, আর সামনে স্বচ্ছ কর্নিয়ার জানালা। বাইরের আলো ঢুকে, মনের আলো বের হয়। গোলকের ভেতরে রেটিনার লাইনিং। কেমন আজব তরিকায় আলো এসে হয়ে যায় ইলেকট্রিক সিগন্যাল, তারপর অপ্টিক নার্ভ দিয়ে সোজা মগজে। অনেকগুলো পেশী চোখটাকে ধরে রেখেছে অক্ষিকোটরে, সুপেরিওর অব্লিক, সুপেরিওর রেক্টাস, ইনফেরিওর অব্লিক, ইনফেরিওর রেক্টাস, মেডিয়াল রেক্টাস, ল্যাটেরাল রেক্টাস। এতগুলো পেশী ছিঁড়ে যখন চোখটাকে টেনে বের করা হয় তখন কেমন লাগে? ভাইয়ার কেমন লেগেছিল?
এক সময় এই ইউনিভার্সিটিরই লেকচারার ছিলেন হেনরি গ্রে। ১৮৫৮সালে তিনি যখন গ্রে’জ অ্যানাটমি প্রথম বের করেন বইটির নাম ছিল ‘অ্যানাটমিঃ ডেস্ক্রিপ্টিভ অ্যান্ড সার্জিকাল ’। অনেক ঝামেলা হয়েছিল লিখতে। বেওয়ারিশ লাশ কী যখন তখন মেলে? এই মর্গে দৌড়াও তো ওই ওয়ার্কহাউজে। এই অফিসে আবেদনপত্র জমা দাও তো ওই অফিসে টাকা ঢালো। একাত্তরে যত মানুষকে পাকিস্তানীরা ব্যবচ্ছেদ করেছে, যত হাত, পা, লিভা্‌ কিডনি, চোখ ওরা বধ্যভুমিতে ছড়িয়েছে, গ্রে বেঁচে থাকলে ডক্টর হাসান ওনাকে বলতেন, স্যার আসেন একবার আমাদের বাংলাদেশে, একটা রিভাইস্‌ড্‌ এডিশন গ্রেই’জ অ্যানাটমি লিখবেন, গ্রে’জ অ্যানাটমি উইথ এক্সটেনসিভ ইলাস্ট্রেশন্‌স্‌।
নামাজ থেকে উঠে ডক্টর হাসান ভাবছিলেন আজ সকালের সার্জারির কথা। এক্ষুনি রওনা হতে হবে। গতকাল সন্ধ্যায় ক্যাথরিন ফোন করেছিল। ডক্টর আন্ডার উডের সেক্রেটারী। ডক্টর উড অসুস্থ। কিন্তু ওনার এক পেশেন্টের বাই পাস সার্জারি। সকাল দশটায়। ডক্টর হাসান কী অনুগ্রহ করে কাজটি করতে পারবেন। হি উইল রিসিপ্রকেইট ইন গুড টাইম। ডক্টর উড সিনিয়র কলিগ, না করে উপায় নাই।
ডক্টর হাসানের বাসা থেকে হসপিটাল সাড়ে তিন মাইল। উনি সাধারনত পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেন। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই হোলবোর্‌ন টিউব স্টেশন, সেখান থেকে মাইল এন্ডে একটা চেঞ্জ, তারপর হোয়াইট চ্যাপেল, তারপর আরও পাঁচ মিনিট হাঁটলে হসপিটাল। আজ আর আন্ডার গ্রাউন্ডে ঘেঁষাঘেঁষি করে যেতে ভাল্লাগছে না। তেল-সাশ্রয়ী ৬৯৮ সিসি স্মার্ট কার নিয়ে বের হলেন। এখন লন্ডন কত বদলে গেছে।এক সময় এদিককার রাস্তার দু’ধারে ছিল ইহুদিদের কাপড়ের দোকান।বাঙ্গালীরা এসে প্রথম প্রথম ওদের অধীনেই কাজ করত। যেমন কাজ, তেমন বেতন, কোন ঝামেলা নাই। সোশ্যাল মোবিলাইজেশন হয়ে ইহুদীরা এখন মার্কস এন্ড স্পেন্সারের মত বড় কোম্পানির মালিক।চেলসি আর মে ফেয়ার এর মত অভিজাত এলাকায় বাসা। তারপর অনেকদিন এখানে বাঙ্গালীদের রাজত্ব।ইদানীং ইস্ট ইউরোপিয়ানদের আধিপত্য বাড়ছে। অলিম্পিকের সময় অনেক নতুন এপার্টমেন্ট হয়েছে, বড় লোকদের ও আনাগোনা চোখে পড়ে। একদিকে সোশ্যাল মোবিলাইজেশন অন্যদিকে আর্বান জেন্ট্রিফিকেশন।
ট্র্যাফিক সিগন্যালে গাড়ি থামাতেই পাশে একটা বি এম ডব্লিউ এক্স সিক্স এসে দাঁড়ালো। ভেতর থেকে বিকট শব্দে গানের আওয়াজ ভেসে আসছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ডক্টর হাসান একবার আড়চোখে তাকালেন। দুটো এশিয়ান ছেলে, রিয়ার ভিউ মিররের নীচে একটা ছোট পাকিস্তানের পতাকা ঝুলছে। ডক্টর হাসান চাইলে এরকম গাড়ি মাসে দু’মাসে একটা কিনতে পারেন।নীতিগতভাবে কিনবেন না। ভালগার ডিসপ্লে অফ ওয়েলথ। কিন্তু এই ছেলেগুলোর এত টাকা আসে কোত্থেকে? অনেক বলে ড্রাগের পয়সা। ইদানীং পাকিস্তানী অরিজিনের লোকদের সেক্স আর ড্রাগের মোচ্ছব নিয়ে ব্রিটিশ জনগন তিক্ত বিরক্ত। প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাক স্ট্র তো রাজনীতির প্রোটকল ভেঙে বলেই বসলেন ‘এই পাকিস্তানীরা মানসিকভাবে নাজুক সাদা মেয়েদেরকে সহজলভ্য মাংস মনে করে, মেয়েগুলোকে উপহার আর ড্রাগ দিয়ে ফাঁদে ফেলে...’। বিয়ে করার সময় ঠিক ঠিকই সুদূর মুলতান থেকে আনা বুরকাওয়ালী মেয়ে চাইই চাই।
সবুজ বাতি জ্বলতেই দুটো হর্ন দিয়ে পাশের গাড়িটা সা’ করে চলে গেলো।
একটু সামনেই এগুতেই আবার গাড়ির দীর্ঘ সারি।ভাগ্যিস হাতে সময় নিয়েই বেরিয়েছেন। হাসান রেডিওতে বিবিসি’র বাংলা সার্ভিস টিউন করলেন। একজন প্রথাবিরোধী বাঙ্গালী লেখকের ধারণকৃত সাক্ষাৎকার প্রচারিত হচ্ছে। ভদ্রলোক মিউনিখে মারা যান। এ নিয়ে ডক্টর হাসানের একটা কন্সপিরেসী থিওরী আছে। ধরেন ঢাকায় বাংলা একাডেমীর কাছে একজন লেখককে কেউ বঁটি আর দা’ দিয়ে আক্রমন করল। ভদ্রলোক কোনরকমে বেঁচে গেলেন। কিন্তু খুবই শঙ্কিত। সবাই পরামর্শ দিলো কিছুদিন দেশের বাইরে চলে যাও।উত্তেজনা থিতু হোক। ভদ্রলোক একটা রাইটিং ফেলোশিপ নিয়ে মিউনিখ চলে গেলেন। লন্ডনে আক্রমনকারীদের ইউরোপিয়ান হেড কোয়ার্টারে খবর গেলো। ধরা যাক হাসান ওদের সদস্য এবং ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। কিভাবে কোন চিহ্ন না রেখে হার্ট বন্ধ করা লাগে উনি তার একশ’ না হোক তিনটা ফিকির জানেন। ওনাকে স্পেশাল অ্যাসাইনমেন্‌ট্‌ দেয়া হলো। উনি মঙ্গলবার দিন সকাল পাঁচটা চল্লিশে লন্ডন সেইন্ট প্যাঙ্ক্রিয়াস থেকে ট্রেনে প্যারিস গেলেন আড়াই ঘন্টায়। তারপর প্যারিস থেকে মিউনিখের ট্রেইন নিলেন এগারটা পঁচিশে। বিকেল পাঁচটা তিরিশে হাসান মিউনিখ। সন্ধ্যা সাতটায় প্রথাবিরোধী লেখকের এপার্টমেন্টের দরজায় টোকা। ‘আমি ভুল সময়ে জন্মেছিলাম। আমার সময় তখনো আসেনি’-ঠিক ভাইজান, তাহলেআপনার সময়ে আইসেন । রাত আটটায় আবার প্যারিসের ট্রেনে । সকাল সাতটা পঞ্চাশে প্যারিস থেকে এবার প্লেইন। আটটা পনেরতে হিথরো। সাড়ে দশটায় অফিস। আগেরদিন সিক লিভ নিয়েছিলেন। সবাই ওনার দিকে তাকিয়ে বলল, হাসান ইউ আর স্টিল ইল, ইওর আইজ আর রেড, গো হোম নাও, জয়েন টুমরো। হাসান বাসায় গিয়ে একটা ডিম পোঁচ করে খেলেন। যদি কেউ সন্দেহও করে, পথ ভেঙে ভেঙে যাওয়ায় বড় জোর প্যারিস পর্যন্ত ভ্রমনটা ট্রেস করা যাবে। মেইনল্যান্ড ইউরোপে তো কোন বর্ডার চেক নাই। এমন হতেই তো পারে, পারে না?
এই সব আবোলতাবোল ভাবতে ভাবতে ডক্টর হাসান হসপিটালের সামনে গাড়ি পার্ক করলেন। এই হসপিটাল হাসানের বড়ই প্রিয়। জীবনের অনেক সম্মান অনেক মূল্যায়ন তিনি এই হসপিটালেই অর্জন করেছেন। আল হামদু লিল্লাহ তার হাতে এখন পর্যন্ত একজন রোগীও মরেনি। প্রতিটা সফল অপারেশনের পর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া পড়েছেন, আর মনে হয়েছে মহান আল্লাহও প্রসন্ন দৃষ্টিতে তার বান্দাকে দেখছেন।
অফিসে ঢুকতেই নার্স এসে রোগীর ফাইল দিয়ে গেলো। রোগীর কোন অ্যালার্জির সমস্যা নাই, ব্লাড কাউন্ট ভালো, লিভার ফাংশন চলনসই, পিটি, আই এন আর ভালো, এবিজি ঠিক আছে। মনে হচ্ছে না এই রোগী নিয়ে কোন ঝামেলা হবে।
ফাইলটা ড্রয়ারে রাখতে গিয়ে কী মনে করে আরেকবার খুললেন। বুকটা ছ্যাঁত করে উঠলো। এইটা হানিফ ভাই না?

ডক্টর হাসান স্কাল্পেল হাতে দাঁড়িয়ে ।
অপারেশন টেবিলে অচেতন হয়ে পড়ে আছে একজন নির্মম, কুৎসিত, জঘন্য যুদ্ধাপরাধী। ঘুমন্ত মানুষদের অনেক সময় ফেরেশতার মতো লাগে। হানিফকে লাগছে একটা শীতল নির্জীব সরীসৃপের মতো।
বাইপাস সার্জারি একটা রুটিন প্রসেজুর। এ ধরনের অপারেশন প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দুটো তিনিই করেন। এই হসপিটালে রিকভারী রেইট আশি পারসেন্ট। তারপরেও তো বাকি বিশ পারসেন্ট জীবনের ওই পারে। ডক্টর হাসান চাইলেই ডেথ রেইটের পরিসংখ্যানে আরেকটি ইনপুট হতে পারে হানিফ রাজাকার!
অপারশন থিয়েটারে কোন জানালা নেই। অপারেশন থিয়েটারে আসেনা কোন জ্যোৎস্নার ফকফকা আলো কিম্বা বসন্তের বাউলা বাতাস। এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয় ঠাণ্ডা মাথায় এবং ক্ষিপ্র গতিতে। কিন্তু আজ সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে। একচল্লিশ বছর পর মহান আল্লাহ এই জালিমকে তার হাতে তুলে দিয়েছেন।
ভাইয়ার কথা বার বার মনে পড়ছে, ভাইয়ার উপড়ানো দুটো চোখ..ফিনকী দিয়ে বের হয়ে আসা রক্ত....।
আবার মনে পড়ছে মেডিকেল এথিক্স ‘ ফার্স্ট, ডু নো হার্ম’...।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন