বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ৪১টি

সমন্বিত স্কোর

৬.৪২

বিচারক স্কোরঃ ৩.৯৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪৫ / ৩.০

অন্ধকারের গান

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

থাকে শুধু অন্ধকার

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

সৌর-ঋণ

ঋণ জুলাই ২০১৭

গল্প - ত্যাগ (মার্চ ২০১৬)

মোট ভোট ৫৩ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৬.৪২ লক্ষ যোজন দূরে

এশরার লতিফ
comment ২৭  favorite ৪  import_contacts ১,১৪৮


রশীদ ট্রাভেলসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসটা এন৫ হাইওয়ের উপর দিয়ে সর্বোচ্চ গতিসীমার চেয়ে অন্তত দশ কিলোমিটার বেশী বেগে চলছে। বুড়িমারি পৌঁছুতে আরও ৫ ঘন্টা।ঝঝকে নূতন বাস। তারপরও দ্রুতির কারনে খানাখন্দের উপর দিয়ে যাওয়ার সময় বাসটি তীব্রভাবে ঝাঁকি দিয়ে উঠছে। অন্যসময় হলে সেলিনা বাস ড্রাইভারের কাছে গিয়ে ধমকাধমকি আরম্ভ করতেন। কিন্তু এই মুহূর্তে ড্রাইভারকে ঘাঁটানোর মানসিকতা ওনার নেই। উনি ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে উনি ভাবনার অতলে ডুবে যাচ্ছেন। যেই চিঠির কারনে আজকের এইযাত্রা, সেলিনা ব্যাগ থেকে সেই চিঠিটা বের করে আবার মনোযোগ দিয়ে পড়া আরম্ভ করলেন।


‘শ্রদ্ধেয়া সেলিনা রহমান,

আমায় আপনি চিনবেন না। কিন্তু যৎসামান্য হলেও আমি আপনাকে জানি। স্যাটেলাইটের কল্যানে। ওপারের অনেক টিভি চ্যানেলই তো এখন এপার থেকে দেখা যায়। গ্যালো ডিসেম্বরে প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ওপর টক শো চলছিল। আপনাকে প্রথম দেখি তেমন একটা অনুষ্ঠানে। খুব যে মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম তা না। হাতের একটা কাজ সারছিলাম, সঙ্গ দেয়ার জন্য টিভিটাও চলছিল পাশাপাশি। হঠাৎ ‘সাহেবপাড়া’ শব্দটা শুনে উৎকর্ণ হই। আপনি বলছিলেন,সাহেবপাড়া,রূপপুর,সাহাপুর অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের কথা। আপনি বলছিলেন মুক্তিযুদ্ধে আপনার স্বামীর ভুমিকার কথা।

আপনি যখন ওনার নামটি উচ্চারণ করলেন আর টিভি স্ক্রিনে খাকি পোশাক পড়া এক যুদ্ধংদেহী যুবকের ব্রোঞ্জ রঙের ছবি ভেসে উঠলো,আমি চমকে গেলাম। স্মৃতির মন্দিরে অসংখ্য কাঁসার ঘন্টা ঢং ঢং করে বেজে উঠলো।

আপনি বলছিলেন সাহেবপাড়ার যুদ্ধের আগে রায়হানের সাথে আপনার শেষ যোগাযোগ। একাত্তরের সেপ্টেম্বর মাসের ঘটনা। তারপর থেকে আর কোন খবর নেই। অনেকের মত আপনার স্বামীও যুদ্ধ শেষে ফেরেননি। সাহেব পাড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গনকবর আছে। প্রতি সেপ্টেম্বরে আপনি সেই গনকবরে আসেন। রায়হানের আত্মার শান্তি প্রার্থনা করেন।

আপনার কথাগুলো শোনার পর থেকে আমি একটা তীব্র অপরাধবোধ আর দায়বদ্ধতায় ভুগছি। আপনার স্বামীর একটা মূল্যবান সম্পদ আমার সংগ্রহে আছে। আর আছে কিছু সত্য উন্মোচনের তাড়া।

আপনি নিশ্চয় অবাক হচ্ছেন। ভাবছেন কে এই লোক? এতগুলো বছর পর ইনি এসব কি বলছেন? রায়হানের সঙ্গে এই লোকের কী সম্পর্ক?

পুরো ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করবার জন্য আপনার সাথে সামনা সামনি দেখা হওয়াটা খুবই জরুরী। পারলে আমিই আসতাম। অথচ সমস্যা কি জানেন, আমার শরীর আর আগের মত লম্বা ভ্রমণের উপযোগী নয়। আমি মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত। গত অর্ধ শতকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এমন বেঢপ উন্নতি হয়েছে যে রোগীকে সারাতে না পারলেও রোগীর মৃত্যুর পূর্বাভাষটি এরা ঠিকই দিয়ে দিতে পারে। তাতে যন্ত্রণা বাড়ে বৈ কমে না। জীবনের শেষ আর মৃত্যুর মাঝে যে সময়ের সাঁকো, আমাকে তার দৈর্ঘ্য মেপে দেয়া হয়েছে। এক বছর। আমি সাঁকোর ঠিক মাঝে দাঁড়িয়ে আপনাকে এই চিঠি লিখছি।

আমি কালিম্পং-এ থাকি। এখানে আমার একটা ছোটখাট ইকো রিসোর্টের ব্যবসা আছে। আপনার কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ একবার আমার এখানে আসুন। এক দু’দিন বেড়িয়ে যান এই সুন্দর শহরটি। মৃত্যুর আগে আমাকে দায়মোচনের সুযোগ দিন।

ধন্যবাদান্তে,
অনিমেষ দত্ত,
গায়ত্রী ইকো রিসোর্ট,
গায়ত্রী হিল,কালিম্পং,
দার্জিলিং,৭৩৪৩০২
ফোনঃ ০০৯১৯৩৩১০০২১৭৮

কালিম্পং, ০৭.০১.৯৯’

সেলিনা চিঠিটা চার ভাঁজ করে আবার ব্যাগে ভরে রাখলেন। জীবন কখনো কখনো গল্পের চেয়েও অদ্ভুত,করুণ এবং কাকতালীয়। কে জানত আটাশ বছরের পুরনো স্মৃতির জখমে আরও একবার অস্ত্রপ্রচার চলবে? চিঠিটা পেয়ে সেলিনা কোন দ্বিধা করেন নি। যত দ্রুত সম্ভব অনিমেষের সাথে সাক্ষাতের আয়োজন করেছেন। জীবনের এই প্রান্তে এসে পাবার বা হারাবার কিছু নেই। কিন্তু তারপরও নূতন অনুধাবন আর অভিজ্ঞান ঘটেই যাচ্ছে।





পাহাড়ের ঢালকে ত্রিমাত্রায় ধারণ করে ধাপে ধাপে রিসোর্টটি চূড়া অবধি উঠে গ্যাছে। অভ্যাস নেই,তাই সিঁড়ি বেয়ে উপরে পৌঁছুতে সেলিনা হাঁপিয়ে উঠল।প্রথমেই টাইল বিছানো বড় আঙ্গিনা। আঙ্গিনার এক পাশে দালান,বাকিটা রেলিং ঘেরা খোলা পাহাড়। সেলিনা রেলিং-এর কাছ ঘেঁষে দাঁড়ালো।

ঘন কুয়াশার মত মেঘ কোথা থেকে ভেসে এসে গা আর্দ্র করে দিচ্ছে। নীচে মাছের আঁশের মত সারি বাঁধা সবুজ বাদামী পাহাড়। সাদা তুলোয় ঢাকা। আরও দূরে একটা নীলাভ সবুজ নদী নাকি একটা চঞ্চলা জরির সুতো ঠিকরে আসা আলোয় চক চক করছে।

‘কেমন লাগছে আমাদের শহর?’

অনিমেষ কখন নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। অনিমেশ খুক খুক করে দু’বার কাশলেন। অনেকদিনের অসুস্থতার চেপে বসা কাশি। তারপর বললেন,

‘আমিই সেই পত্রলেখক,আমার উপর আস্থা রেখে এদ্দুর আসবার জন্য অনেক ধন্যবাদ’

‘খুব সুন্দর শহর আপনাদের, এখানে আসতে কোন কারন থাকার প্রয়োজন নেই’

সেলিনা নার্ভাস বোধ করছেন। একটা অজানা ঔৎসুক্য নিয়ে তিনি এখানে এসেছেন। রায়হানের শেষ দিনগুলোর সাথে তার কোন পরিচয় নেই। রায়হান তার জন্য কি কোন মেসেজ রেখে গিয়েছিল? সেটা কেন তাহলে আগে দেয়া হলো না। এত বছর পরে দেয়ার মানেটাই বা কি?

অনিমেষ বোধ হয় সেটা আঁচ করতে পারলেন। বললেন,

‘আপনি সবে এসেছেন। একটু বিশ্রাম করুন,অনেক কিছু জানানোর আছে। আমরা সন্ধ্যায় কথা বলব’।



জানালার বাইরে ঘন অন্ধকার। মাঝে মধ্যে নীল আলোর উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ জ্বলেই আবার নিভে যাচ্ছে। কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে।

সেলিনা অনিমেষের মাথার কাছে কাঠের চেয়ার টেনে বসেছেন। একটু আগে গৃহকর্মী এসে জানিয়েছে অনিমেষ অসুস্থতা বেড়ে গ্যাছে,উনি শোবার ঘরেই কথা বলবেন।

অনিমেষের বার বার খুকুর খুকুর করে কাশছেন। শুকনো কাশি। কাশির দমক একটু কমে আসতেই অনিমেষ কথা আরম্ভ করলেন,

‘আপনার স্বামী খুব উদার এবং সাহসী মানুষ ছিলেন’

একটু দম নিয়ে আবার বললন,

‘ওনাকে কোথায় দেখি জানেন?নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে’

সেলিনা চমকে উঠে বললেন, ‘কোথায়?’

‘নর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে। একাত্তরের অক্টোবর মাসে। এই হাসপাতালটির জন্ম আটষট্টি সালে। শিলিগুড়িতে। অনেক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এর যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল। সারা দেশ থেকে সেরা ডাক্তারদের নিয়ে আসা হয়েছিল ভালো মাইনে দিয়ে।’

‘আমার হাজব্যান্ড ওখানে কীভাবে?আমি তো জানি…’ সেলিনা এমনভাবে বলছিলেন যেন সবকিছু এখনই ঘটছে, স্মৃতির রূপালী তটে এ যেন কোন দূর অতীতের জলতরঙ্গ কিম্বা অভিঘাত নয়।

‘আপনার হাজবেন্ড ওখানে কেন ছিলেন সে কথাতেই আমি আসছি। সাহেবপাড়ার কাহিনী আপনি জানেন। যে কথাটা হয়তো জানেন না তাহলো এর আগে আর পরে কি ঘটেছিল’

‘বলুন আমি শুনছি’,সেলিনার হৃদকম্পন আবার ফিরে এসেছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের প্রথম মাসেই রায়হান সীমান্ত অতিক্রম করে এদিকে চলে আসে। রায়হান ছাড়াও আর প্রায় তিনশ’মুক্তিযোদ্ধার প্রশিক্ষণ হয় বহরমপুরে। রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানলাইসিস উইং এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে।র’ এর কথা শুনে ভ্রু কুঞ্চিত করছেন না তো? র’কিন্তু আপনাদের দেশে তখনো এতটা বিতর্কিত হয়নি। রিসার্চ আন্ড অ্যানালিসিস উইং কিম্বা র’এর জন্ম হয়েছে তখন সবে তিন বছর। মূল উদ্দেশ্য চায়নাকে সামাল দেয়া যাতে করে ১৯৬২ সালের ভুলের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।আমি তখন র’এর টেকনিক্যাল ডিপার্টমেন্টে কাজ করছি। ডেইটা ইন্টারসেপ্টর। আমার গনিতজ্ঞ্যান এবং পারঙ্গমতা ছিল ঈর্ষণীয়। পাকিস্তানী আর্মিরা বেতার তরঙ্গে গোপন তথ্য ভাসিয়ে দিয়ে এপার ওপার করত আর আমি সেই তথ্যে ঘাপটি মেরে এর জট ছড়াতাম। যেমন ধরুন, পাকিস্তান যখন ফেব্রুয়ারী মার্চে পূর্ব বাংলায় সৈন্য পাচারের চিন্তা করল, আমরা তখন ভারতের আকাশসীমা ওদের জন্য বন্ধ করে দিলাম। কীভাবে করলাম? তথ্য ইনটারসেপ্ট আরডিসাইফার করে। আমরা নিজেরাই আমাদের একটা বিমান ছিনতাই করে পাকিস্তান উড়িয়ে নিয়ে গেলাম। তারপর নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের আকাশসীমা পাকিস্তানের জন্য বন্ধ করে দিলাম। বাধ্য হয়ে তখন পাকিস্তানের হানাদারবাহী বিমানগুলো শ্রীলংকা হয়ে, সেখান থেকে পুনরায় জ্বালানি ভরে পূর্ব পাকিস্তানে আসা আরম্ভ করল। শুধু যুদ্ধের শুরুতে না, পুরো যুদ্ধের সময় জুড়ে এইই ঘটেছে। তো শ্রীলংকার এই ভয়াবহ শত্রুতা কিন্তু আপনারা বেমালুম ভুলে গ্যাছেন। যা বলছিলাম, তথ্যের জট ছাড়ানোর কাজ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ, সফটওয়ারটফটওয়ার কত কি আছে। কিন্তু সত্তর একাত্তর সালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে আমার মত লোকের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতে গোনা।একারনেই হয়তো র’ এর প্রধান আর এন কাও-এর প্রিয় কিম্বা প্রয়োজনভাজন ছিলাম আমি।’,এ পর্যন্ত বলে অনিমেষ একটু থামলেন।একটানা কথা বলে ওনার হাঁফ ধরে গ্যাছে। অথচ মনের ভার লাঘবেরও তর সইছে না।

‘কিন্তু আমার একটা সমস্যা ছিল। সমস্যাটা শরীরঘটিত। অবস্থা এমন যে চিকিৎসা না হলে যে কোন সময় আমার মৃত্যু হতে পারে। সেই সময়ে এ দেশে এর চিকিৎসা সুলভ তো নয়ই সহজলভ্যও নয়। ব্যাপারটা আর এন কাও জানতেন। আমার যেন সুচিকিৎসা হয় তিনি তার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।’

‘কী হয়েছিল আপনার?’ সেলিনার মনে হলো সবকিছু এখন আরও জট পাকিয়ে যাচ্ছে।

‘সে ব্যাপারে আসছি, আগে আপনার স্বামীর কথা বলি। অনেক মুক্তিযোদ্ধাই আমাদের এখানে প্রশিক্ষণের সুত্র ধরে র’এর বিশ্বাসভাজন হয়ে কাজ করত। তারা ছিল সাময়িকভাবে র’য়ের নেটওয়ার্কের অধীন। যুদ্ধের অংশগ্রহণের পাশাপাশি র’কে তারা ইন্টালিজেন্স পাঠাতো। উল্টোদিকে র’এর হাতে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এলে এবং প্রাসঙ্গিক হলে সেই তথ্য এদেরকেই প্রথম জানানো হত। আপনার স্বামী ছিল এই অন্তর্জালের অংশ’।


‘আপনি বলতে চাইছেন আমার স্বামী র’এর এজেন্ট ছিলেন?ভারতের দালাল? এটা বলার জন্যই আমাকে এত দূর এনেছেন?’

‘একটা দেশের এজেন্ট, দালাল এসব আপনি তখনই বলবেন যখন কেউ সেই দেশের স্বার্থে কাজ করে। আপনার স্বামী বাংলাদেশের হয়ে কাজ করছিলেন, ভারতের না। বাংলাদেশের স্বার্থেই তিনি ছিলেন র’এর অন্তর্জালের অংশ। ইফ ইট ইজ অফ এনি কনসোলেশন, বাঘ উপাধী পাওয়া আপনাদের খুব নামকরা একজন মুক্তিযোদ্ধাও কিন্তু তা’ই ছিলেন। যা হোক,ঈশ্বরদীর ঘটনায় আসি। ঈশ্বরদীতে যে একটা ভয়াবহ কিছু ঘটতে যাচ্ছে সেই খবর প্রথম আমিই জানতে পারি পাকিস্তানীদের রেডিও ট্রান্সমিশন ইন্টারসেপ্ট করে।ওইদিন বরাইগ্রাম, চাটমোহর আর রামচন্দনপুরের প্রায় তিন হাজার উদ্বাস্তুঈশ্বরদী অভিমুখে রওনাহয়। তিন হাজার শরণার্থী বেশীর ভাগই নারী শিশু আর বৃদ্ধ। বেশীরভাগই হিন্দু পরিবারের। উদ্দেশ্য কৈলাসনগর সীমান্ত দিয়ে ভারতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া।আপনার স্বামী এবং আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা শরণার্থীদের দলে ভিড়ে যায়। আরও পনেরজন মুক্তিযোদ্ধাদের একটা দল তখন ঈশ্বরদীতে ঘাঁটি গাড়ে।শরণার্থীদের দ্রুত সীমান্তের ওপারে পাঠানোর জন্যসেইফ করিডোর তৈরীর গোপন প্রস্তুতিওএকই সময় আরম্ভ হয়।’
একটি আগের অযথা উত্তেজনা সেলিনাকে লজ্জিত করল। সেলিনা সম্মতিসূচক দৃষ্টিতে অনিমেষের দিকে চাইলেন।

‘শরণার্থীদের দলটি যখন ঈশ্বরদী পৌঁছল তখন তেমন কিছুই ঘটল না। বারো জন স্বেচ্ছাসেবকের একটা দল উদ্বাস্তুদের পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো ঈশ্বরদী হাইস্কুলের ময়দানে। সবাইকে ময়দানে সার বেঁধে বসালো। কলসী ভরে ভরে জল আনা হলো। মুড়ির ব্যবস্থা হলো। আঁজলা ভরে জল পান করে এই অসহায় মানুষগুলো একটু হলেও যেন প্রাণ ফিরে পেলো।এইসব যত্নআত্মি সেরে এদেরকে রেইল স্টেশনে নিয়ে আসা হলো। বেশীরভাগ কমিউটার ট্রেনগুলো তখন সৈন্যদের দখলে। শরণার্থীদের জন্য তাই মালবাহী ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জানালা নেই তো কি, এই ট্রেন যেএদেরকে সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছে দেবে সেইই ঢের। লম্বা একটা হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন ধীরে ধীর যাত্রা আরম্ভ হলো’

‘আর রায়হান?’

‘রায়হান তখন ট্রেন্রে। শরণার্থীদের সীমান্তে নিয়ে আসার দায়িত্ব তো তারই। ঈশ্বরদীর ব্যাপারে আমাদের সব গোয়েন্দা তথ্য আর প্রস্তুতি ভুল প্রমানিত হওয়ায় সে কিছুটা বিভ্রান্ত।’

‘তারপর’

‘আধঘন্টা চলার পর হারডিঞ্জ ব্রীজের উপর এসে হঠাৎ করেই ট্রেনের সবগুলো ইঞ্জিন থেমে গেলো। রায়হানেরখটকা লাগল। সে সীমান্তের ওপারে এক্সট্রা রেনফোরসমেন্টের জন্য বেতারবার্তা পাঠালো, জাস্ট ইন কেইস। কিন্ত যাত্রীরা খুব বেশী চিন্তিতমনে হলো না। কি হবে, হয়তোমিটার গেইজ লাইনে হয়তো কোন সমস্যা হয়েছে। এর চেয়ে অনেক ভয়ঙ্কর সময় এরা পার করে এসেছে’

উৎকণ্ঠায় এবার সেলিনার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

‘মিনিট দশেক পরেই ট্রেনের বগীর দরজাগুলো বাইরে থেকে খুলে গেলো। শুরু হলো বুলেট বৃষ্টি। রায়হান বুঝলো ঈশ্বরদীতে ওদেরকে বোকা বানানো হয়েছে। নির্বোধের মত খোলা ময়দান ছেড়ে ওরা লোহার পাঁচিল ঘেরা চলন্ত বধ্যভূমিতে উঠেছে। আলাদা আলাদা লোহার বাক্সে ঠাসা মানুষগুলো তখন বিচ্ছিন্ন এবং দুর্বল। সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের কোন উপায় নেই’

‘ঈশ্বরদীতে মুক্তিবাহিনীর কথা ওরা আগেই জানতে পেরেছিল।কিভাবে পেরেছিল সেটা আজও রহস্য। ওদের ইন্টালিজেন্স গ্যাদারিং হয়তো আমাদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কিম্বা এমনও হতে পারে আমাদের নেটওয়ার্কে কোথাও কোন বিশ্বাসঘাতকতা ঘটেছিল। সেই অনুযায়ী ঈশ্বরদীর রাজাকারগুলো গেইমপ্ল্যান বদলে ফেলে’

‘রায়হান কি তখনই’ বাকি কথাটা সেলিনা নিজেই উচ্চারণ করতে পারলেন না।

‘না। ছ ঘন্টা পর মুক্তিযোদ্ধা আর ভারতীয় বাহিনীর একটা গ্রুপ ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ছয় নম্বর বগিতে লাশের স্তূপের মাঝে রায়হানকে পাওয়া যায়। শরীরে চারটা বুলেত উন্ড। তাছাড়া…’

‘তাছাড়া কি?’

‘ওর চোখ দুটোও উপড়ে ফেলা হয়’

সেলিনার চোখ দিয়ে টপ টপ অশ্রু ঝরছে।

‘যারা তখনও বেঁচে ছিল তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় শিলিগুড়িরনর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে। একমাস ধরে রায়হানকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টাই চালানো হয়। মাল্টিপল বুলেট উন্ড কজিংমাল্টিপল অরগান ফেইলিউর। এ যেন যমে মানুষে এক অসম লড়াই’

এতগুলোকথা বলে অনিমেষ নিজেও ক্লান্ত। বললেন,

‘আজ এটুকুই থাক। কাল সকালে বাকিটা বলব।’




পাহাড়ের রেলিং ঘেঁষে গোল করে চেয়ার বসানো।মাঝে একটা গোল কাঁচের টেবিল। পুব আকাশ থেকে ছিটকে পড়া সূর্যের আলোয় যায়গাটা রুপোর আধুলির মত ঝক ঝক করছে। অনিমেষের হাতে দি স্টেইটসম্যান। এই ভোরের আলোয় অনিমেষকে আরও ভগ্ন এবং দুর্বল লাগছে। সেলিনার উদ্বেগ আঁচ করে অনিমেষ বললেন,

‘আসলে একা মানুষ তো, নিজের শরীরেরতেমন যত্ন করিনি। এই তো দু বছর আগেও প্রতিদিন দু প্যাকেট গোল্ড ফ্লেইক চলত। ফুসফুস কর্কট আক্রান্ত হবার পর পান-সংক্রান্ত সব অভ্যাসই ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছি। হাউএভার, ইটস টু লেইট নাও’

‘অনিমেষ দা’,আমাকে দুপুরেই রওনা হতে হবে।’

‘হ্যাঁ জানি, খুব বেশী আর সময় নেব না। আমি তো বলেছিলাম শিলিগুড়ি মেডিকেল কলেজকে স্টেইট অফ দি আর্ট হাসপাতাল হিসেবে বানানো হয়েছিল। সারা দেশের সেরা মেধাগুলিকে জড়ো করা হয়েছিল এখানে। কিন্তু রায়হানের অনেকগুলো অর্গান ফেইল করছিল, কিছুতেই কিছু উপায় হচ্ছিল না। রায়হান ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিল। জ্ঞ্যান থাকতে থাকতেই রায়হান চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বার্থে তার দেহ দান করার ইচ্ছা ব্যাক্ত করে।’

সেলিনার প্রশ্নটা না করেই পারলেন না,

‘ও আমাদের সাথে কোন যোগাযোগ করল না?’

‘আমি এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিলাম। রায়হান চায়নি তার বিকৃত হয়ে যাওয়া অবয়ব এবং যন্ত্রণাঘন মৃত্যু প্রিয় কেউ প্রত্যক্ষ করুক। এমন কি নিজের ঠিকানাটা পর্যন্ত সে কাউকে দ্যায়নি’

‘আপনার সাথে রায়হানের সম্পর্ক?’

‘মনে আছে আপনাকে বলেছিলাম আমি জন্মগতভাবেই শারীরিক ত্রুটিগ্রস্ত?ভেন্ট্রিকুলার সেপ্টাল ডিফেক্ট প্লাস হাইপোপ্লাস্টিক লেফট হার্ট।হৃদপিণ্ডের ঝুঁকিটা দিনকে দিন বাড়ছিল। র’এর প্রধান আর এন কাও আমার জন্য সব হাসপাতালগুলিতে খোঁজ দিয়ে রেখেছিলেন। রায়হান যখন তার দেহ দান করল, তখন তার রক্তগ্রুপ এবং আরও অনেক তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্য ব্যাঙ্কে জমা হলো। এমন অনেকেরইথাকে। রায়হানের সাথে আমারটা মিলে গ্যালো। ভারতে তখনো হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি থেকে দু যুগ পিছিয়ে। ঠিক হলো বাইরে থেকে সেরা এক্সপারটাইজ আনা হবে’

সেলিনা কি বলবে বুঝতে পারছে না।

‘মৃত্যুর পনের দিন আগেনর্থ বেঙ্গল মেডিকেল কলেজে রায়হানের সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। ওই পনেরদিন রায়হান আমাকে অনেক কিছুই বললো। আপনার কথা,ওর বাবা মা ভাই বোনের কথা, সাহেব পাড়ার যুদ্ধ আর হার্ডিঞ্জ ব্রীজে অ্যামবুশের কথা। দশই অক্টোবর রায়হান কোমায় চলে যায়। বিশে অক্টোবর ওর লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়। রায়হানের হৃদপিণ্ড আমার শরীরে প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি আরম্ভ হয় এর পরপরই। ব্যাপারটা বলতে যত সহজ আসলে তত সহজ ছিল না। ডক্টর ক্রিস্টিয়ান বারনার্ডকে উড়িয়ে আনা হয় সাউথ আফ্রিকার কেইপ টাউন থেকে। ১৯৬৭ সালে তিনিই প্রথম মানুষের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করেছিলেন। তিনি বললেন এটা একটা ক্লিনিকাল এক্সপেরিমেন্ট।শরীরের স্বভাব হলো বাইরের কোষকে দেহে প্রবেশে বাঁধা দেয়া।তখনো ইমিউনোসাপ্রেসেন্ট ড্রাগ সেভাবে তৈরি হয়নি।এমন হতেই পারে যে আমি মাসখানেকের বেশী সারভাইভ করব না। তাইআমি যে এতদিন বেঁচে আছি সেটা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক চরম বিস্ময়’

গৃহকর্মী চা এনে রেখেছে। অনিমেষ চায়ে চুমুক দিয়ে বললো,

‘এতগুলো বছর ধরে আপনার স্বামীকে আপনি হৃদয়ে ধারন করে আছেন আর আমি আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ডটি ধারণ করে আছি।’

‘না,আমার দিকের কথাটা অতিরঞ্জিত হয়ে গেল। আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ড বরং আমার এই অক্ষম শরীরটার সঞ্চালক হয়েছে। এর শিরায় উপশিরায় আর কৌশিক জালিকায় রক্ত পাম্প করে এতোগুলো বছর ধরে একে জিইয়ে রেখেছে। কিন্তু এখন আমার নিজের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। আমি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আপনার স্বামীর হৃদপিণ্ডটিও বন্ধ হয়ে যাবে। আমি তো আর এর মালিক নই। তারপর এর কী হবে সে সিদ্ধান্ত আপনার’

অনিমেষ আর কথা বলতে পারছেন না। প্রচণ্ড কাশিতে মনে হচ্ছে ওনার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসবে। সেলিনাও বাকরুদ্ধ, কিন্তু ভিন্ন কারনে।



সেলিনা ঘরে ফিরে ব্যাগ গুছালেন। তারপর অনিমেষের ঘরে এসে চেয়ার টেনে বসলেন। অনিমেষ ম্রিয়মান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন। সেলিনা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

‘রায়হান চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য শরীরটা দান করে গ্যাছে। তাই ওই হৃৎপিণ্ডের অধিকার আপনারই। আপনার মৃত্যুর পর কী হবে সে সিদ্ধান্ত আপনিই নিন’

সেলিনা উঠে দাঁড়ালেন।কালিম্পং স্টেশন থেকে সাড়ে এগারটার বাস ধরতে হবে। চ্যাংরাবান্ধায় বাস বদল। সেখান থেকে ঢাকা।

দরজার কাছে এসে সেলিনা একবার ঘুরে তাকালেন।

‘অনিমেষ দা’

‘হুম’

একটু ইতস্তত করে সেলিনা বললেন,

‘একবার কি আপনার হার্ট বিটটা…’

সেলিনার কথা শেষ হবার আগেই অনিমেষ মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন।

অনিমেষের বুকে উপর সেলিনার মাথা। অনিমেষের বুকের ভেতর রায়হানের হৃদপিণ্ড। হৃদপিণ্ডটা ধুকপুক ধুকপুক শব্দ করছে। যেন লক্ষ যোজন দূর থেকে ভেসে আসছে বিজয় দিবসের তোপধ্বনি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন