বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ ডিসেম্বর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ২টি

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

ছাই

মেহেদী সম্রাট
comment ৫  favorite ০  import_contacts ৫০
‘লইবো..ও.. ছা..আ..ই?
ছাই লইবোনি?
তিনতলার শোবার ঘরেও পৌঁছলো ছাই বিক্রেতার নারী কণ্ঠ। ফরহাদ সাহেবও শুনলেন। আড়মোড়া দিয়ে উঠে বসলেন তিনি। বালিশের পাশ থেকে স্মার্টফোনটা হাতে নিলেন। লক ওপেন করে সময় দেখলেন। ৭:০০ টা বাজে। সিদ্ধান্ত নিলেন আজ আর হাঁটতে বের হবেন না। অবশ্য আজ উঠতেও খানিকটা দেরি হয়ে গেছে! প্রতিদিন ছয়টায়ই বেরিয়ে পরেন। বিছানা থেকে নেমে রিডিং টেবিলের ওপর রাখা বেন্সন এন্ড হেজেস’র প্যাকেটটা নিলেন। বারান্দায় গিয়ে নিজের বেতের সোফাটায় বসলেন। ফরহাদ সাহেবের বারান্দাকে একটা মিনি বাগান বলা চলে। নার্সারি থেকে খুঁজে খুঁজে এনে পাতাবাহার, মানিপ্ল্যান্ট, বনসাই, ছোট পামগাছ, ফরচুন ট্রি, চায়নিজ কামিনী, রঙ্গন, গোলাপ, রজনীগন্ধা, দোলনচাঁপার গাছ তিনি নিজেই লাগিয়েছেন। বারান্দা জুড়ে ছোট-বড় নানান বাহারি টব। সিগারেট জ্বাললেন। গ্রীলের ফাঁক দিয়ে দেখলেন দূরে হেঁটে যাচ্ছে ছাই বিক্রেতা মহিলা। মাথায় বড়সড় একটা বস্তায় ভরা ছাই। একই সুরে ডেকে চলেছে..

সাদা-কালো চুলের ফরহাদ সাহেব ভাবলেন, মহিলার বস্তার মধ্যে কিসের ছাই? ছাইতো কত কিছুরই হতে পারে! তার মনে পড়ে একাত্তর সালের কথা। কত ছাই তখন তিনি দেখেছেন! স্কুলের উপরের ক্লাসের ছাত্র তখন তিনি। তখন শুধু বাতাসে ছাই উড়তো আর ভেসে বেড়াতো পোড়া গন্ধ। পঁচা গন্ধ। লাশ পঁচা গন্ধ। শুকিয়ে যাওয়া রক্তের গন্ধ। তার স্পষ্ট মনে আছে, একাত্তর সালের এক সন্ধ্যায় ভূবেন বোসদের বাড়িটার সামনে অনেক লোক জমেছিলো ছাই দেখতে! হ্যাঁ ছাই। বোস বাড়ির দগ্ধ খুঁটিগুলো শুধু দাঁড়িয়ে ছিলো। আগরবাতির মত ধোঁয়া বেরোচ্ছিলো সেগুলো থেকে। বাকি সব ছাই! কত ছাই সেদিন সেখানে জমেছিলো! ঘর পোড়া ছাই, বোসদের মন্দির পোড়া ছাই, ভুবেনের দেঢ় বছরের বাচ্চাটার দেহের ছাই, ধানের গোলার ছাই, খুকির স্কুলের বইয়ের ছাই! ফরহাদ সাহেবের চোখদুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে। আরো কত রকমের ছাইয়ের কথা যে মনে পড়ে তার!

একাত্তরের অনেক পরেও এইতো সেদিন, ঐ বস্তিতে যেদিন আগুন দেয়া হলো। কত ছাই সেখানে ছিলো! রিকশা চালক কবিরের দু’কেজি মোটা চালের ছাই, যা সে ঐদিনই কিনেছিলো! সেলাই দিদিমণির মাটির ব্যাংকের ছাই , ছোট বোনের চিকিৎসার জন্য যেখানে তিল তিল সঞ্চয় ছিলো! শিশুশ্রমিক কাজলের স্বপ্নের ছাই, যে স্বপ্ন সে বটতলার ভাসমান স্কুল থেকে দেখতে শিখেছিলো! ফরহাদ সাহেব আরো অনেক রকমের ছাইয়ের কথা ভাবেন। লংদৌ’র ছাইয়ের কথা কে না জানে! পাহাড়িদের দেহ পোড়া ছাই, স¤প্রীতির আশ্বাস পোড়া ছাই, সেটেলারদের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের আগুনে আরো কত কিছুর ছাই যে সেখানে ছিলো!

হঠাৎ সিগারেটের আগুন ঝরে পড়ায় সম্বিত ফিরে পান ফরহাদ সাহেব। তা¤্রকু- শলাকায় ফের টান দিলেন জোরে। তারপর একবুক ধোঁয়া ছাড়লেন। ধোঁয়ার সাথেই বেরিয়ে গেলো একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস। ‘ছাইওয়ালি আজকের সকালটাই এলোমেলো করে দিয়ে গেলো’ -বিড়বিড় করে বললেন তিনি। ততক্ষণে আঙ্গুলের মাঝে সিগারেটটাও ছাই হয়ে গেল! ফরহাদ সাহেব ভাবেন, এই যে এত রকমের ছাই -এর সবই তো দৃশ্যমান। অদৃশ্য কোন ছাই কি আছে? যেমন অন্তরদহনের ছাই! বুকের ভিতর যে ছাই অথবা ছাই চাপা আগুন জমে আছে, সেটাও কি কেউ দেখে? কোন মানুষ? প্রিয়তমা? সমাজপতি? কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র?
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন