বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১৬ মার্চ ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ১টি

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

বৈকল্পিক

আসলাম হোসেন সজল
comment ৪  favorite ৩  import_contacts ১০১
[এক]
মাঝে মাঝে এমন সব জায়গায় এমন সব মানুষের সাথে দেখা হয় যে অবাক হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। চারুকলার পাশে দেখা আরাতের সাথে, যার কিনা ছবি বা শিল্প-সাহিত্যের প্রতি কোন কালেই আগ্রহ ছিল বলে আমার জানা নেই। তার হাতে দেখলাম একটি প্যাকেট। বাইরে থেকে বুঝা যাচ্ছে না ভিতরে কি আছে। জিজ্ঞেস করতে বলল যে তার পরিচিত একজন শিল্পীর কাছ থেকে একটা পোট্রেট আঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দেখতে চাইলাম কিন্তু বলল সময় নেই পরে দেখাবে। আর আমার হাতে ভাঙ্গাচুরা হাত-ঘড়ির মত কি যেনো একটা জিনিস সে এমন ভাবে দিল যে মনে হল এটা নেয়ার জন্যই আজ আমি তার সাথে দেখা করতে এসেছি। আমাদের সাথে যে হঠাৎ দেখা হয়েছে গিয়েছে সেরকম মনে হল না। জিনিসটা দিয়েই চলে গেল আর যাবার আগে বলল ‘ফোনে কথা হবে, আপাতত জিনিসটা তোর কাছে রেখে দে’। আমার মুখে আশ্চর্যের ভাব দেখে বলল ‘বোমা নয় এটা, তোর কোন ক্ষতি নিশ্চয়ই হবে না’।

যার কথা বলছিলাম সে হচ্ছে আমার মতো গরীবের একমাত্র ধনী বন্ধু ‘আরাত’। ধনী অবশ্য সে নিজে নয়, তার বাবা। আর সে তার বাবার দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে। তার বড় ভাইও তার বাবার মত বড়লোক, তারা একসাথে ব্যবসা করে। তার মানে সে একাধারে বড়লোকের ছেলে এবং বড়লোকের ভাই। কিভাবে যেনো এই ধনীর ছেলের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেলো বলতে পারবো না।
আরাত ফিজিক্সে MSc শেষ করেছে। তবে পড়া লেখার পাশা পাশি তিন-চার বছর যাবত সে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শিখছে অনলাইনে এবং অফলাইনে বিভিন্ন কোর্স করে। আমার ধারণা সে ফিজিক্সের চেয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংটাই ভালো বুঝে। আমি নিজেও কম্পিউটার প্রোগ্রামিং মোটামুটি বুঝি বলেই বলতে পারছি।
অনেকদিন পরে তার সাথে আমার দেখা হল, ইদানিং তাকে দেখাই যায় না। আর দেখা হওয়ার পর যেভাবে সে এই জিনিসটা আমার হাতে দিল মনে হচ্ছিল গতকালই তার সাথে আমার দেখা হয়েছিল এবং এটা নেয়ার কথা ছিল। কারো সাথেই ইদানিং নাকি তার তেমন যোগাযোগ নেই। কি যেনো একটা বিষয় নিয়ে নাকি সে গবেষনা করছে শুনেছি। তবে কি নিয়ে গবেষনা করছে তার কিছুই আমি জানি না। সারা দিন সে তার বাসায়ই থাকে।
সে একা একটা বিশাল ফ্ল্যাটে থাকে যেখানে কেউ তাকে বিরক্ত করতে যায় না। আর তাকে বিরক্ত করার সময়ও কারো নেই। তার মা মারা গেছে অনেকদিন আগে। তার বাবা আর ভাই তো তাদের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত। তারা আরাতের যত আর্থিক চাহিদা আছে তার সবই পূরণ করে কিন্তু এই আর্থিক চাহিদা ছাড়াও যে আরও কোনো চাহিদা থাকতে পারে তা নিয়ে তারা ভাবে না। আরাত নিজেই হয়তো এই বিষয় নিয়ে খুব একটা ভাবে না। আমিই শুধু শুধু ভাবছি। ওর সাথে ওর বাবা-ভাইয়ের দেখা হয় অনেকদিন পরপর, উনারা দেশের বাইরেই থাকে বেশিরভাগ সময়। তবে ফোনে হয়তো কথা মাঝে মাঝে।

যাইহোক ঐ দিনের পর তার সাথে বেশ কিছুদিন যোগাযোগ হয়নি। তার দেয়া জিনিসটা আমি বাসায় এসে আমার ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি। ওটার কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।
আমি বরাবরের মত আমার জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলাম। আমার জীবন , আমার ক্যারিয়ার, আমার সংসার, আমি যা কিছু নিয়ে ব্যস্ত তার সবকিছুই আমার। সংসার অবশ্য এখনো হয়নি। বেশিরভাগ মানুষই তো তাই করে। আমার ছাড়াও যে দুনিয়াতে আরও অনেকের অনেক কিছু আছে যা নিয়ে আমাদের কিছু করার আছে বা দায়িত্ব আছে কিংবা আমাদের প্রতি কিছু মানুষের প্রত্যাশা থাকে তা ভুলেই যাই। নিজের ব্যাপারগুলোকে এড়িয়ে গিয়ে অন্যের ব্যাপারে কথা বলতে পারি। একটু আগে যেমন আরাতের বাবা আর ভাইয়ের কথা বললাম। আমাদের বেলায়ও এরকম হয় কিন্তু আমরা ভাবি ‘আমার ব্যাপারটা অন্যরকম’। আসলে তো সব একই রকম শুধু নিজেদের ব্যপারগুলো নিজেরা দেখতে পারি না। যদি নিজের শরীর থেকে বের হয়ে নিজেকে দেখা যেতো তাহলে হয়তো বুঝতে পারতাম।

[দুই]
একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন এলো একদিন। আমি বাড়িতেই ছিলাম। গলা শুনেই বুঝতে পারলাম এটা আরাত। কোন কথা না বলেই প্রথমে বলল ‘তোর কাছে যে জিনিসটা দিয়েছিলাম সেটা তোর সাথেই আছে?’ মনে হচ্ছিল যে ওটা আমার সাথে রাখারই কথা ছিল।
বললাম, ‘আছে বাড়িতেই’
-তুই এই মুহুর্তে ওইটা তোর হাতে পরে নে।
-কেনো
- পরতে বলছি পর।
আমি ড্রয়ার থেকে বের করে হাতে পরলাম।
সে বলল ‘পরেছিস’
- হ্যা পরেছি।
- এখন দেখ ওইটার এক পাশে একটা দুইটা বাতন আছে। সবুজ রঙেরটায় ক্লিক কর।
আমি তাই করলাম। ক্লিক করার সাথে সাথে মনে হলো আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কি যেন একটা স্রোতের মতো বয়ে গেল, খুবই হালকা, মনোযোগ দিয়ে অনুভব না করলে বুঝা যাবে না এমন হালকা।
আমি কিছুটা ভয় পেয়ে গেলাম। সে বলল, ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এটা তোর শরীরটাকে স্ক্যান করছে’। আমি বললাম, ‘মানে?’।
-মানে পরে বলবো, এখন বল তুই এখন কি করছিস?
-আমি এইতো বসে আছি।
- তুই তো মিথ্যা বলছিস।
-কেন মনে হল আমি মিথ্যা বলছি?
- তুই তো মাথা চুলকাচ্ছিস। আর মিথ্যা কথা বলার সময়ই তো মানুষ মাথা চুলকিয়ে কথা বলে।
- মানে? তুই জানলি কিভাবে? তুই কি আমার আশে পাশে আছিস?
-না আমি আমার বাসায়। আচ্ছা তোকে সব বলব, তুই কালকে আমার বাসায় আসবি?
- আচ্ছা আসবো। কিন্তু ঘটনা কি বল তো।
-তুই বাসায় আয় তারপর তোকে সব বলবো।

বলেই সে ফোনের লাইন কেটে দিল। আমি তো কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি ওই জিনিসটা বেশ ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করতে লাগলাম। দেখার চেষ্টা করলাম ওইটার কোথাও কোনো ক্যামেরা আছে কিনা। কিন্তু তেমন কিছু খুজে পেলাম না।
আমি সারাদিন ওইটা নিয়েই ভাবতে লাগলাম। আরাতকে ফোনও করলাম কিন্তু ও রিসিভ করলো না। কোন কাজই ঠিক মত করতে পারছি না। সারাক্ষন ওই একই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মাথা থেকে চিন্তাটা দূর করার চেষ্টা করলাম। নিজেকে বুঝালাম এত টেনশনের কিছু নেই কালকেই তো যাবো ওর বাসায় তখন সব জানতে পারবো। কিন্তু আমার আজকে এখনি যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু গেলাম না, একটা দিন অপেক্ষা করলাম।
রাতে ঠিকমত ঘুমও হল না।

পরের দিন সব কাজ বাদ দিয়ে আরাতের বাসায় চলে গেলাম। গিয়ে দেখলাম ও বসে আছে। লক্ষ করলাম ওর হাতেও একই জিনিস যেটা ও আমার হাতে দিয়েছিলো। জিনিসটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে ওটা অনেকবার মেরামত করা হয়েছে। বসে বসে জিনিসটা হাতরাতে হাতরাতে ওর বাবাকে ডাকলো এবং বলল যে আমি এসেছি। আমি অবাক হলাম এই সময় ওর বাবা ওর বাসায় থাকতে পারে আমি তা কখনো কল্পনাও করিনি। ভেতর থেকে ওর বাবা আসলো এবং কুশল বিনিময়ের পর আবার চলে গেলো। তারপর ও আমাকে একটা রুম দেখিয়ে সেখানে যেতে বলল আর বলল সে একটু পর আসছে। আমি গেলাম সেই রুমে। রুমে আবছা আলো জ্বলছে। এটা তো একটা ল্যাবরেটরির মত মনে হচ্ছে। আমি গিয়ে একটা চেয়ারে বসলাম আর চারদিকে দেখতে লাগলাম। আমার কাছে সবকিছুই এলোমেলো লাগছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। আসলে ঘটনা কি?
কিছুক্ষন পর অন্য একটা দরজা দিয়ে আরাত রুমে প্রবেশ করলো। আমার কাছ থেকে কয়েক ফিট দূরে একটা চেয়ারে সে বসলো। আমি জানতে চাইলাম ঘটনা কি?
আমার কথার উত্তর না দিয়ে সে বলল –
- তারপর কেমন আছিস?
- ভালো।
- তোর মা কেমন আছেন?
- এইতো ভালো।
- আচ্ছা তোর মা তো গ্রামে থাকেন তাই না?
- হ্যা।
- একা থাকেন?
- একজন কাজের লোক আছে যে মাকে দেখাশুনা করে।
- তুই যাস না মায়ের সাথে দেখা করতে?
- যাই মাঝে মাঝে ।
- শেষবার কবে গিয়েছিলি?
- এইতো ৬/৭ মাস আগে। ফোনে কথা হয় মাঝে মাঝেই। ব্যস্ততার কারণে ঘন ঘন যাওয়া হয় না।
- আগে তো প্রায় প্রতি মাসেই কয়েকবার যাওয়া হত, যখন ছাত্র ছিলি।
- হ্যা তা যেতাম। কিন্তু এখন তো আর সময় করতে পারি না।
- আগে তো একদিনের জন্য হলেও যাওয়া হত আমি যতদূর জানি।
- হ্যা যেতাম। এখন আসলে সময় পরিবর্তন হয়েছে না।
- একা একা একজন বয়স্ক মানুষ থাকেন, তোর তো উচিৎ তোর মাকে যথেষ্ট সময় দেয়া। এরকম তো না যে তুই তোর মাকে সময় দিয়ে দয়া করবি। এটা তোর মায়ের প্রাপ্য নয় কি? তার জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তো তিনি তোকে দিয়েছেন। তাই না?
- হ্যা ঠিকই বলেছিস। কিন্তু আমার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। আমি আসলে মাকে অনেক ভালবাসি কিন্তু সময় করে উঠতে পারি না।
- ও আচ্ছা তোর ব্যাপারটা অন্যরকম।
তারপর কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলা শুরু করল,
আচ্ছা বাদ দে ওসব কথা। আসল কথায় চলে যাই।
‘আমি ফিজিক্স আর কম্পিউটার কোডিং এর মিশ্রনে একটা ডিভাইস বানিয়েছি। আসলে কোডিংটাই আমার ক্রেডিট বলা যায়, ফিজিক্সের কাজগুলো বড় বড় বিজ্ঞানীরাই করে দিয়েছেন আগেই। আমি শুধু সেগুলোকে একটু ইডিট করেছি আর কি। কোডিং তো তুই জানিস, মানুষের কথা বা আদেশ-নিষেধ কম্পিউটারকে বুঝানোর জন্য যে ভাষা ব্যবহার করা হয় তাকেই তো প্রোগ্রামাররা কোডিং বলে। এরকম অনেকগুলো কোডের সমন্বয়েই সফটওয়্যার তৈরি হয়।
আচ্ছা চিন্তা কর তুই তোর মায়ের কাছে নেই কিন্তু যখনি তুই তোর মাকে ফোন করছিস তোর মা তোকে তার সামনে দেখতে পাচ্ছে, তোকে অনুভব করতে পারছে। ভিডিও কলের মত না, সরাসরি দেখতে পাচ্ছে তার চোঁখের সামনে, তুই যা যা করছিস সবই দেখতে পাচ্ছে, তুই তোর মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিস সেটাও অনুভব করতে পারছে। কেমন হয় ব্যপারটা?
- ভালোই তো। কিন্তু সেটা কি সম্ভব নাকি?
‘এরকমই কিছু একটা আমি বানিয়েছি। এই যে তোর কাছে যে জিনিসটা আমি দিয়েছি সেটা একটা নেটওয়ার্ক সিস্টেমে পরিচালিত। ওটাতে আমি একটা স্ক্যানার যোগ করেছি যা তোর সারা শরীর স্ক্যান করবে। যখনি তুই এটা কানেক্ট করবি তখনি ওটা তোর সারা শরীর বিশেষ করে তোর যে সব অঙ্গ নাড়াচাড়া করা যায় সেগুলো সব স্ক্যান করবে। এবং স্ক্যান করা হয়ে গেলে নেটওয়ার্ক সিস্টেমের মাধ্যমে সব তথ্য পাঠিয়ে দেয়া হবে এই যন্ত্রের সাথে কানেক্ট করা হয়েছে এমন আরেকটি ডিভাইসে । তোর এই তথ্য গুলো যেখানে পাঠানো হবে সেখানে থাকবে একটি রোবট।’
-রোবট ?
‘হ্যা রোবট। সেই রোবট তোর শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গের স্ক্যান করা সব তথ্য নিজের মধ্যে ধারণ করবে। তোর শরীরের যে যে অংশ ফ্লেক্সিবল রোবটটিরও ঐ অংশগুলো ফ্লেক্সিবল। তোর ঠোট, ঘাড়, হাত-পা এবং অন্যান্য যে সব অঙ্গ তুই নাড়াতে পারিস সবই রোবটও পারে। তোর কাছে থাকা ঐ ডিভাইসের মাধ্যমে পাঠানো সব তথ্য নিজের মধ্যে নিয়ে তোর মুভমেন্ট অনুসরণ করবে রোবটটি। তুই যা করবি তাই ঐ রোবটটিও করবে। তুই কথা বললে সে কথা গুলো বেরিয়ে আসবে রোবটটির মুখ দিয়ে, কারণ স্পিকারটা মুখের কাছে লাগানো থাকবে। তুই হাটলে রোবটটিও হাটবে। এক কথায় তুই যা করবি তাই ঐ রোবটিও করবে অর্থাৎ ওটা হবে তোর ডুপ্লিকেট ভারসন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঐ রোবটিওতে একটা সেন্সর থাকবে যার মাধ্যমে তুই বুঝতে পারবি কেউ ওটাতে স্পর্শ করলো কিনা। ধর, তোর মা তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, সেটা তুই অনুভব করতে পারবি ঐ সেন্সরের মাধ্যমে।’
- এটা কি আসলেই সম্ভব? তুই কোন পরীক্ষা চালিয়েছিস?
‘হ্যা, আমি পরীক্ষা চালিয়েছি, তোর উপর পরীক্ষা চালিয়েছি।’
-তুই রোবট পেলি কোথায়?
‘বিদেশ থেকে আনিয়েছি। একবারে আনাইনি। আলাদা আলাদা ভাবে বিভিন্ন অংশ এনে আমি সেটিং করেছি। একবারে আস্ত রোবট আনলে তো এয়ারপোর্ট এ জামেলা হতে পারে কিংবা লোকজন জানাজানি হয়ে যেতে পারে। আমি সব যন্ত্রাংশ এনে তাতে নতুন কিছু যোগ করছি আর ঐ ডিভাইসটার সাথে কানেক্ট করেছি।’
-তোর আবিস্কার নিঃসন্দেহে ভালো কিন্তু এটা সাধারণ মানুষের জন্য নয়। তোর বাবার টাকা আছে তাই তুই রোবট কিনতে পেরেছিস সবাই তো আর তা পারবে না।
‘সেটা আমিও ভেবেছি। কিন্তু তুই ভেবে দেখ এই যে মোবাইল ফোন, এই যে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন সবই একসময় অনেক দামি ছিলো। শুধু কথা বলা যেতো এমন মোবাইল আগে মানুষ লাখ লাখ টাকা দিয়ে কিনতো আর এখন কয়েক হাজার টাকায় স্মার্টফোন পাওয়া যা দিয়ে সব কিছুই করা যায়। তাহলে এমন সময় তো অবশ্যই আসবে যখন এই রোবটও মানুষের সাধ্যের মধ্যেই থাকবে। তখন মানুষের ঘরে ঘরে রোবট থাকবে। এরকমও তো হতে পারে যে এখন যেমন অনেক ফেরিওয়ালারা পুরাতন জিনিসপত্র ভাঙ্গারির দরে কেজি হিসেবে কিনে নেয় সেরকম ভাবে হয়তো একদিন রোবটের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে সুর করে বলতে থাকবে ‘বেচবেন কেউ পুরাতন রোবট!’ আর চীনারা আছে কি করতে, ওরা একসময় ঠিকই সব কম দামে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দেবে।’
কিছুক্ষন থেমে আবার বলা শুরু করলো,
‘একবার ভেবে দেখ আমার এই ডিভাইসটা যদি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যায় তাহলে মানুষের কত সুবিধা হবে। একজন ভালো শিক্ষক একই সময়ে অনেকগুলো ক্লাস নিতে পারবেন। ক্লাসের কেউ প্রশ্ন করলে তিনি তো শুনতেই পাবেন এবং সব প্রশ্নের উত্তরও তিনি কৌশলে দিয়ে দিতে পারবেন এতে সব শিক্ষার্থীরাই উত্তরটি পেয়ে উপকৃত হবে। আবার অনেকে আমার এই ডিভাইস ব্যবহার করে তাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারবে। মানুষ তো আসলে প্রাইওরিটি কম বুঝে যাকে সময় দেয়া দরকার তাকে দিতে চায় না, তারা এই ডিভাইসের মাধ্যমে তাদের দায়িত্বগুলো এটাকে দিয়ে দিতে পারবে। এর ফলে বিপরীত পাশের মানুষটি অন্তত সান্তনা পাবে।’
আমি কিছু ভেবে পাচ্ছিলাম না কি করবো বা বলবো। আমার অবাক লাগছে এই অবিশ্বাস্য একটা আবিস্কারের কথা শুনে। এটাও সম্ভব? আমি ওর রোবটটি দেখতে চাইলাম সে বলল সময় হলেই নাকি দেখাবে। সে আমাকে তার কম্পিউটার দেখিয়ে দিয়ে বলল যে তার প্রোগ্রামের ফাইল নোটপ্যাডে ওপেন করা আছে আমি চাইলে দেখতে পারি, আমি আগেই বলেছি কম্পিউটার প্রোগ্রামিং আমি ভালোই বুঝি । আমি দেখতে গেলাম। তার কোডিং দেখে আমি অবাক হলাম। এতো সুন্দরভাবে সাজানো কোডগুলো ভাবা যায় না। কবিতা, গান যেমন শিল্প-সাহিত্য তেমনই তার কোডগুলোকেও শিল্প-সাহিত্যের মত মনে হল। আমি দেখছিলাম আর উত্তেজিত হচ্ছিলাম। কি করেছে সে এগুলো ! উত্তেজনা আমি ওর কাছে গিয়ে ওকে উড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করতে চাইলাম। ধরলামও তাকে।
আর তাকে স্পর্শ করার সাথে সাথে সব কিছু আমার কাছে আরও পরিস্কার হয়ে গেলো।
আমি বুঝতে পারলাম সে চারুকলায় কেনো গিয়েছিলো? এই সময়ে তার বাবা বাড়িতে কেনো? আর সে এই আবছা আলোয় কেন আমার সাথে কথা বলছে? আর কেনই বা সে আমার সাথে এই ঘরে না ঢুকে একটু পরে ঢুকলো?
সব যেনো আমার চোঁখের সামনে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠলো।

আমি যাকে জড়িয়ে ধরেছি এটা কোন মানুষের শরীর হতে পারে না। এটা মেটাল জাতীয় কিছু। অর্থাৎ এতোক্ষন যে আমার সাথে কথা বলছিলো সে আসল আরাত না। বুঝতে পারলাম সে সেদিন চারুকলায় তার পোট্রেট বানাতে যায়নি বরং মুখোশ আঁকতে গিয়েছিলো যা হুবহু আসল মানুষের মত লাগে। যার মধ্যে একটা তার বাবার মুখোশ যা সে একটা রোবটকে পড়িয়েছে সেই রোবটটিই এই অসময়ে বাড়িতে আছে। আর তার বাবার সাথে সে কানেক্ট করেছিলো আমি যাখন বাসায় আসি। আর তখন তার বাবার ডুপ্লিকেট আমার সাথে এসে কুশল বিনিময় করেছে। আসলে তার বাবা আমার সাথে অনেক দূর থেকেই হয়তো কথা বলেছেন যা শুনতে পেয়েছি ঐ রোবটির কাছ থেকে। আরাত যেহেতু রোবট এনেছে একটি তাই সে আমার সাথে রুমে না ঢুকে একটু পরে ওই রোবটটিকেই নিজের মুখোশ পড়িয়ে আমার কাছে পাঠিয়ে দেয় তার নিজের সাথে থাকা একটা ডিভাইসে কানেক্ট করে। আর যেহেতু অনেকক্ষন তার সাথে আমার কথা বলতে হবে তাই আবছা আলোয় কথা বলছিলো যাতে আমি তার উপর সুক্ষ পর্যবেক্ষন চালাতে না পারি, পাছে ধরা খেয়ে যায়। সে হয়তো পাশের রুমে বসেই আমার সাথে কথা বলছিল। নিজের উপর এক্সপেরিমেন্ট চালাচ্ছিল।
আমি হতভম্ব হয়ে তাকে ছেড়ে দিলাম আর আমার মুখ থেকে বেড়িয়ে এলো ‘আরাত তুই কোথায়?’ সাথে সাথে ঘরের আলো জ্বলে উঠলো আর পেছনে দরজা খোলার শব্দ শুনলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আরাত দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে হাসছে। এই হাসি দেখেই আমি বুঝতে পারলাম এটাই আসল আরাত। এই হাসি কোন রোবটের কাছ থেকে আশা করা যায় না। এ হাসির অর্থ আমি জানি। এটা বিজয়ের হাসি। নিজের সফলতার হাসি। এতে কোন ভেজাল নেই। এই আবেগগুলোই হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মানুষ আর রোবটের মধ্যে পার্থক্য করে দেবে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন