বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২ জানুয়ারী ১৯৮৬
গল্প/কবিতা: ৬টি

সোনার হরিণ

স্বপ্ন জানুয়ারী ২০১৮

কি অপরাধ করেছিল আমার বুকের ধন?

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

ছোট্ট খোকার প্রশ্ন

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

প্রবাসীর স্বপ্ন

এস জামান হোসাইন
comment ১  favorite ০  import_contacts ৫৩


- "মানুষ যেন আর কাউকে বিশ্বাস করে না । পৃথিবীর কোন মানুষকেও না । এমনকি নিজের ভাই বোনকেও না । মানুষ বড়ই স্বার্থপর । নিজের স্বার্থ ফুরালে সবাই কেটে পরে ।" কাতার প্রবাসী শ্রমিক আনিস দুঃখ করে এই কথাগুলো বলতেছিল । বড় আশা এবং স্বপ্ন নিয়ে সে গিয়েছিল বিদেশে কিন্তু তার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল ; স্বপ্ন আর বাস্তবে রূপ নিল না কিছু স্বার্থপর মানুষের জন্য । অন্য মানুষ নয় ; নিজের বোন আনিসা এবং বোন জামাই জাবেদের জন্য ।

আনিসের স্বপ্ন ছিল কাতারে গিয়ে সে প্রচুর অর্থ আয় করবে । আর নিজ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখবে । দেশের উন্নয়নে নিজের অবদান রাখবে । আর সুন্দর একটি বাড়ি । বাড়ি হল ঠিকই কিন্তু তার জন্য নয়; বাড়ির মালিকানা হাতিয়ে নিয়েছে তার প্রতারক বোন এবং বোন জামাই ।

আনিসের বিদেশে যাওয়ার সময় তার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুরা তাকে অনেক দূর এগিয়ে দেয় । আনিসের গালে পানের পিক দেখে বন্ধুরা হাসতে হাসতে জিজ্ঞাসা করে,
- কিরে আনিস তোর গালে পানের পিক কেন? আনিস যখন তার মায়ের কাছে বিদায় নেয় তখন তার মা তাকে আদর করে গালে চুমু দেয় । আর এতেই তার গালে পানের পিক লেগে যায় । সে তার মাকে ধমকের সুরে বলে,
- মা, তুমি কিচ্ছু দেখ না? আমার গালে পানের পিক ভরিয়ে দিয়েছ?
- বাবা, আমি বুড়ি মানুষ । একটু পানের পিক লেগেছে তো কি হয়েছে? ছোট বেলায় তোর কত প্রসাব পায়খানা আমার শরীরে লেগেছে আমি তো কোন দিন রাগ করি নাই । বাবা, তুই বিদেশে যাচ্ছিস, আমার জন্য দোয়া করিস । জীবন মরণ আল্লাহর হাতে । তোর সাথে আর দেখা হবে কিনা? কাঁদতে থাকে আনিসের মা আলেয়া বেগম ।
- কেঁদ না মা । আমার জন্যও দোয়া করিও । আমি যেন ভালোভাবে দেশে ফিরতে পারি । আনিস সবার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায় স্বপ্নের দেশ কাতারে ।



আনিসের মনটা খুব খারাপ । আজ প্রায় এক বছর হল সে নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে কাতারে এসেছে । সকালে ঘুম থেকে উঠেই দুঃসংবাদ পায় । মোবাইল ফোনের রিংটোনটা বাজার সাথে সাথেই আনিস রিসিভ করে । সাথে সাথেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ভেসে আসে কান্নার আওয়াজ । তার হৃদয়টা কেঁপে উঠে । তার বোন আনিসা ফোন দিয়ে জানায়,
- মা আর নেই ।
- মা নেই । মা চলে গেলেন এই পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য । আর দেখা হল না মায়ের সোনা মুখখানি । আনিস আর কিছু বলতে পারে না । মোবাইলটি রেখে দেয় বালিশের উপর । তার মনে পরে এক বছর আগের কথা । তিন কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা পায়ে হেঁটে তার মা তাকে বিদায় জানায় । আর তার গালে মায়ের মুখের পানের পিক লাগার কারণে হাসতেছিল তার বন্ধুরা । আজ তার মা নেই এই পৃথিবীতে ।

আনিস কাতারে আসার পর নিয়মিত টাকা পাঠায় দেশে । থাকা খাওয়ার পর যে টাকা বাঁচত তার পুরোটাই পাঠিয়ে দিত বাড়িতে । যে টাকা ঋণ করে সে বিদেশে এসেছিল তা সে এক বছরে শোধ করে দেয় । মা মারা যাওয়ার কিছুদিন পর তার বোন আনিসা মোবাইল করে,
- হ্যালো, ভাই আনিস । কেমন আনিস?
- আপা আমি ভাল আছি । তুমি কেমন আছ?
- আমি ও ভাল আছি । শোন ভাই, আমাদের বাড়ির পাশে জাকের চাচা পনের শতক জমি বিক্রি করবে । রাস্তার পাশেই জমি । বাড়ি করার উপযুক্ত জায়গা । জমিটা তুই কিনে নে । এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা লাগবে ।
- এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা! এত টাকা কোথায় পাব আপা?
- কিছু একটা ব্যবস্থা কর । রাস্তার সাথে জমি । সুন্দর বাড়ি করা যাবে ।
- আচ্ছা, দেখি কি করা যায়? জমি কিন্তু আমার নামে কওলা নিবা ।
- আচ্ছা, ঠিক আছে । জমি তোর নামেই কওলা হবে ।
আনিস অনেক কষ্ট করে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার টাকা বোনের কাছে পাঠিয়ে দেয় । কিছু টাকা সে বন্ধুদের থেকে ধার নেয় । আনিসা টাকাগুলো পেয়ে জমি কিনে ঠিকই কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি করে নিজের নামে । আর আনিসকে জানায় যে তার নামেই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে ।

জমি কেনার জন্য ধার করা টাকা সম্পূর্ণ পরিশোধ হলে আনিস বাড়ি করার জন্য ধীরে ধীরে টাকা পাঠায় । আর আনিসের বোন সেই টাকা দিয়ে সুন্দর মনোমুগ্ধকর টিন শেডের একটি বাড়ি করে । গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর এবং নিউ মডেলের বাড়ি এটি । কিন্তু এই বাড়ির মালিক আনিস নয় ; তার বোন আনিসা । আর একাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে তার স্বামী জাবেদ ।

- হ্যালো, আনিস । বাড়ির কাজ তো শেষ । বাড়ির কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পর আনিসা মোবাইল করে আনিসকে ।
- আপা, বাড়িটা কেমন হয়েছে? আমার সুন্দর একটা বাড়ি করার স্বপ্ন ছিল ।
- গ্রামে দেখার মত বাড়ি একটাই । আর সেটা তোর । আনিসা মিথ্যা আশ্বাস দেয় তার নিজের ভাইকে ।
- আমি আগামী মাসেই বাড়ি যাব, আপা ।
- বাড়িতে আসলে বিয়ে করতে হবে কিন্তু, ভাই ।



এক মাস পরে আনিস বাড়িতে এসে দেখে সুন্দর বাড়ি । খুশিতে সে আত্মহারা হয় । ভাবে তার স্বপ্ন বুঝি আজ পূরণ হল ।
- কিরে বাড়ি পছন্দ হয়নি? তার বোন তাকে জিজ্ঞাসা করে ।
- খুব পছন্দ হয়েছে । বোন, তোমার তুলনা হয় না ।
- নে, এবার বিয়ে সাদীর ব্যবস্থা কর । মেয়ে দেখা শুরু কর ।

আনিস এবার মেয়ে দেখা শুরু করে । দেখতে দেখতে মেয়ে ও পছন্দ হয় । ঘটা করে বিয়ে সম্পূর্ণ করে । তারা এই নতুন বাড়িতে বসবাস করতে লাগল বেশ আনন্দের সাথে ।

আজ এক সপ্তাহ হল আনিসের বিয়ের । একদিন দুপুরে খাওয়ার পর হঠাৎ আনিসা বলল,
- আনিস, তোর বউসহ বেরিয়ে যা এই বাড়ি থেকে ।
- কি? বের হয়ে যাব এই বাড়ি থেকে? কোথায় যাব? আনিসের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরে ।
- কোথায় যাবি তা আমি কি জানি?
- মানে? আনিস কিছুই বুঝতে পারে না ।
- মানে কি? এই বাড়ি তোর না । তোকে চলে যেতে বলছি চলে যা । কোথায় যাবি তা সম্পূর্ণ তোর ব্যাপার । বদলে গেছে আনিসা । আনিসা আর নিজের মায়ের পেটের বোন নেই । মনে হয় সে আনিসকে অনুগ্রহ করে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে এনে বিয়ের ব্যবস্থা করেছে । আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল এখন তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে ।
- আমার বাড়িতে আমি থাকতে পারব না? আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব?
- কে বলেছে এটা তোর বাড়ি? চলে যাবি না লাঠি ধরব । আনিসের বোন জামাই জাবেদ রেগে গিয়ে বলে ।
আমি বিদেশ থেকে অনেক কষ্টে আয় করে তোমাদেরকে টাকা পাঠিয়েছি জমি কেনার জন্য এবং বাড়ি করার জন্য । আর তোমরা বলছ এটা আমার বাড়ি না?
- তুই এক টাকাও পাঠাসনি । এটা আমাদের বাড়ি । আমাদের টাকা দিয়ে জমি কিনে আমাদের টাকা দিয়ে আমরা বাড়ি বানিয়েছি । আনিসা বলল ।

এরপর অনেক কথা কাটাকাটি হয় । এক পর্যায়ে ধস্তাধস্তি হয় । আনিস আইনের আশ্রয় নেয় কিন্তু কোন লাভ হয়না । কারণ জমি রেজিস্ট্রি হয় আনিসার নামে । মনের দুঃখে আনিস বাড়ি ছেড়ে কিছু দিন শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান করে । এরপর আবার কাতারে চলে আসে । নিজের বোন তার সাথে কিভাবে এতবড় প্রতারণা করতে পারে । সে আর কাউকে বিশ্বাস করতে চায় না ।



বার বছর হল আনিস কাতারে এসেছে । সে আর বাড়ি বানাতে পারেনি । তিনটি সন্তান । তিনটিই মেয়ে । পরপর দুটি সন্তান মেয়ে হওয়ার পর পরের সন্তানটি নেয় ছেলের আশায় কিন্তু তৃতীয় সন্তানটি ও হয় মেয়ে । তাদের পড়াশোনা এবং পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করার পর তার আর অর্থ জমা হয়না । বাড়ি ও করা হয়না ।

রাত তিনটা । আনিসের চোখে ঘুম নেই । সে বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে বাহিরে বের হয় । পাশের একটি মাঠের এককোণায় এসে বসে । তার মাথা আজ চিন্তায় ভারি হয়ে গেছে । জীবনের হিসাব মিলাতে পারছে না । আজ মনে পরে তার মায়ের কথা । মনে পরে সেই সুন্দর বাড়ির কথা । তার টাকায় বানানো বাড়িতে বসবাস করছে তার প্রতারক বোন এবং বোন জামাই । মেয়েদের লেখাপড়া এবং সংসারের খরচ চালাতে ক্লান্ত সে । আর কদিন পর মেয়ের বিয়ে দিতে হবে । তাকিয়ে থাকে মাতৃভূমি পূর্বদিগন্তে । হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে আযানের সুর ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া
    মামুনুর রশীদ ভূঁইয়া স্বপ্নডানায় উড়ে যাওয়া প্রবাসীদের স্বপ্নগুলো দীর্ঘশ্বাসের সাথে এভাবেই মিলিয়ে যায়। আমার গল্পের পাতায় আমন্ত্রন। ভালো লাগল গল্পটি। শুভকামনা।
    প্রত্যুত্তর . ২ জানুয়ারী