বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮
গল্প/কবিতা: ৮টি

জীবনকে প্রশ্ন

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

মোহিত স্যার

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

শেফালীর জীবনের এক কল্প কাহিনী

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

গল্প - স্বপ্ন (জানুয়ারী ২০১৮)

লেখক

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
comment ৮  favorite ০  import_contacts ৮৫
মধ্য কলকাতায় বহু বছরের পুরনো এক জরাজীর্ণ বাড়ী । বাড়ীটিকে দেখলেই বোঝা যায় অনেককাল যাবৎ কোন মেরামতির কাজ হয় নি । বাড়ীটির একতলায় ছোট একটি ঘরে ভাড়াটে হিসাবে পরিবার নিয়ে থাকেন গৌরপল্লব রায় । বাড়ীটির মত পরিবারটির ও জরাজীর্ণ অবস্থা । চারিদিকে চরম দারিদ্রের ছাপ । স্যাঁতস্যাঁতে ঘরটার কোনার দিকে একটা পুরোনো চেয়ারে বসে সামনের ছোট টেবিলে বাহাতটা ভর দিয়ে রেখে আপন মনে লিখে চলেছেন । আসন্ন দুর্গাপুজোর " সুভিনিয়রে " পাড়ার ছেলেরা অনুরোধ করেছে - " অশুভ শক্তির বিনাশের " উপর একটা লেখা দেবার জন্য । অনেকদিন ধরেই তিনি নানা ধরনের গল্প , কবিতা লিখে চলেছেন । বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পাঠিয়েছেন ছাপার জন্য । কিন্তু কোন জায়গা থেকে উত্তর তিনি আর পান না । কয়েকদিন আগে এক গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় , তাঁর লেখা গল্প " লেখকের জীবন " প্রথম পুরস্কার লাভ করার পর পাড়ার কিছু লোক জানতে পারে যে গৌরপল্লব বাবু লেখালেখি করেন । প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পাবার পর নিজেকে একটু একটু লেখক ভাবা শুরু করেছেন । আর বেশি উৎসাহ নিয়ে শুধু লিখেই চলেছেন । তবে সবসময় একটা আদর্শের নীতি নিয়েই তিনি লিখতে ভালবাসেন ।

সত্যবতী দেবী ভাঙ্গা জানালায় ময়লা পর্দাটা সরিয়ে কিছু একটা দেখে গৌরপল্লব বাবুকে বললেন -- আমাদের বাড়ীর একটু কাছেই দুখানা বড় বড় গাড়ী এসে দাঁড়িয়েছে । গাড়ী থেকে কয়েকজন লোক নেমে হাতে একটা কাগজ নিয়ে লোকজনদের জিজ্ঞাসা করে কিছু একটা খোঁজাখুঁজি করছে । গৌরপল্লব বাবু লিখতে লিখতে মাথাটা নিচু করে কোন আমল না দিয়ে বললেন -- সামনে বিধানসভা নির্বাচন , বোধহয় কাগজওয়ালারা " এম এল এ " মাধববাবুর বাড়ীতে এসেছে নির্বাচনের ব্যপারে কোন ইন্টারভিউ নিতে । হঠাৎ দরজার বাইরে একটা কোলাহল আর তারপরেই জোরে জোরে কড়া নাড়ার আওয়াজ । সত্যবতী দরজাটা খুলে দেখলেন -- ঝকঝকে পোষাকের কয়েকজন লোক আর পাড়ার কিছু ছেলের সঙ্গে তাঁদের ছেলে বিল্টুও রয়েছে । বিল্টুই লোকেদের ঘরে আমন্ত্রণ জানিয়ে বেশ উৎফুল্ল আর কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বললো -- মা , এনারা সব ফিল্মের লোকজন । মাঝখানে যিনি রয়েছেন , উনি হচ্ছেন স্বনামধন্য পরিচালক কান্তি হালদার । ওনার প্রায় সব সিনেমার " হিরো " মহানায়ক কাজলকুমার । সব সিনেমাই সুপার হিট ।যেমনি নাচ তেমনি গান আর সঙ্গে দেশ বিদেশের মনোরম দৃশ্য আর নায়কের সঙ্গে ছবির ভিলেনের সেকি ঝাড়পিট .......। বাবা , এনারা সবাই তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন ।

নমস্কার পর্ব শেষ হবার পর কান্তি বাবু বললেন -- গৌরপল্লব বাবু , আপনার লেখা " লেখকের জীবন " গল্পটা আমরা পড়েছি । এককথায় অসাধারন লিখেছেন । গল্পটা আমাদের পছন্দ হয়েছে । গল্পটা নিয়ে আমাদের " ফিল্ম " বানাবার ইচ্ছে আছে । অবশ্যই লেখকের ভুমিকায় অভিনয় করবেন মহানায়ক কাজলকুমার । এই কথা শুনে গৌরপল্লব বাবু মনের মধ্যে এক চাপা আনন্দ অনুভব করছিলেন । এতদিন পর তাঁরই লেখা গল্প নিয়ে সিনেমা তৈরি হবে । এটা তাঁর কাছে প্রায় স্বপ্নের মতো । কান্তি বাবু বিশদ ভাবে বললেন -- গল্পের নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আমরা মহানায়িকা অনুরাধাদির কথা ভেবে রেখেছি , এছাড়া গল্পের অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করবেন নামিদামি শিল্পীরা । আসলে গল্পটা আপনি এত সুন্দর লিখেছেন যদি আমাদের ভাগ্যে থাকে তবে বছরের সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কারটি ও ছিনিয়ে নিতে পারি । গল্পটির লেখক হিসেবে আপনাকে আমরা ৫০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেবো । আমরা চাই আপনি আরো ভালো ভালো গল্প লিখুন । আমরা এর পরে আরো অনেক বেশি টাকা আপনাকে দেবো আপনার গল্পের জন্য । গৌরপল্লব বাবু টাকার অঙ্কটা শুনে একেবারে লটারির টিকিটে পুরস্কার পাবার মত অবস্থা । তাঁদের এই চরম দারিদ্রের সংসারে ৫০ হাজার টাকা প্রায় লাখ টাকা পাবার মত অবস্থা । মনে মনে ভাবলেন ৫০ হাজার টাকাটা হাতে পেলে তাঁদের অভাবের সংসারে ভীষণ ভাবে উপকার হয় । আর ফিল্মের দৌলতে তাঁর নামটাও লোকেদের কাছে পরিচিত হয়ে যাবে । দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সত্যবতী দেবী সব কথা শুনে , তাঁদের এই দারিদ্রের সংসারের জন্য প্রথমেই কি কি করবেন তার একটা লিস্ট মনে মনে ঠিক করে ফেললেন ।

লোকগুলি গৌরপল্লব বাবুকে বললেন -- আমাদের সংস্থার নাম -- " শ্রী শ্রী লক্ষীমাতা ফিল্ম কোম্পানি " । আমাদের ব্যানারে প্রায় সব ছবিই সুপার-ডুপার হিট । বাণিজ্যিক সফলতা ছাড়াও বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করেছে । আশা করি - আপনার লেখা " লেখকের জীবন " গল্পটাকে আমরা একটা হিট পিকচার বানিয়ে দিতে পারবো । তবে , একটু থেমে তাঁরা বললেন -----

আপনার গল্পতে " লেখক " মানে আমাদের ভাষায় " হিরো " কে দেখিয়েছেন -- অত্যন্ত গরীব , ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে অসাধারণ সব গল্প লিখে চলেছেন । যে সমস্ত গল্প আজকালকার নামি দামি লেখকদের কলম থেকে বিশেষ ভাবে বের হয় না । আপনার গল্পের নায়ক অনেক নারীর সঙ্গে মেলামেশা , প্রেম করা , পছন্দ করে না ।আপনার গল্পের নায়ক নাচতে , গাইতে পারে না । আপনি দেখিয়েছেন চরম দারিদ্রের মধ্যে ও কোনো লোককে তোষামোদ না করে , অন্যায়ের সঙ্গে কোনোরকম আপোষ না করে নিজের লেখনির ধাঁরে এই সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায় । .... আপনার গল্পটি অসাধারন , সে বিষয়ে আমাদের কোনো দ্বিমত নেই । আর সেই জন্যই আপনি বিচারকদের বিচারে আপনার লেখা গল্পের জন্য সেরা পুরস্কার অর্জন করেছেন । এই কথাগুলি এক নিঃশ্বাসে বলে একটু থেমে গৌরপল্লব বাবুর মনের অবস্থা একবার পরখ করে নিয়ে তারপর বললেন -- আপনার লেখা গল্পটাকে আজকের যুগে সিনেমা হিসেবে বানাতে গেলে সামান্য কিছু পরিবর্তন গল্পতে করতে হবে .......।

আপনার গল্পের নায়ককে গরীব থেকে বড়োলোক বানাতে হবে । ছেঁড়া কাঁথায় শুয়ে সমাজের আদর্শের কথা লেখককে চিন্তা না করে বড়লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা দেখাতে হবে । বড়োলোক হিরো না দেখালে আমরা তো গল্পের খাতিরে বিদেশে গিয়ে শুটিং করতে পারবো না । এবারে আমাদের ইচ্ছে আছে নূতন ছবির অর্ধেকটাই সুইজারল্যান্ডে শুটিং করবার । আর খান তিনেক গানের দৃশ্য সুইজারল্যান্ডের আশেপাশে টেক করবো । আপনার গল্পের নায়ককে হোটেলে যেতে হবে , বিদেশি মদ খেতে হবে । বিভিন্ন মহিলাদের সঙ্গে প্রেম করা দেখাতে হবে আর সেটার উপর ভিত্তি করে ছবির ভিলেনের সঙ্গে মারপিটের দৃশ্য গুলি আমরা দেখাবো । এখন বাজারে এই গল্পই বেশি করে চলছে । এখন আর আদর্শের গল্প বাজারে চলে না । এখন স্ট্যান্টের যুগ । মিথ্যের ফুলঝুরি দিয়ে গল্প চালাতে হবে । গল্পতে থাকবে হেলিকপ্টার থেকে নায়কের ঝাঁপ দেওয়া , সুইমিংপুলে নায়িকার সঙ্গে একসঙ্গে স্নান করা । অবশ্য এগুলি আপনাকে গল্পে লিখতে হবে না , আমরা আমাদের নিজেদের মতো করে বানিয়ে নেবো । আর একটা কথা -- গল্পের নামটাকে আপনার পরিবর্তন করতে হবে । এই ধরুন -- " নায়কের বেডরুমে নায়িকা " । সারা শহরজুড়ে ছবির পোস্টার ছড়িয়ে দেওয়া হবে -- নায়কের বুকের মাঝে নায়িকা শুয়ে আছে । সিনেমার নাম আর পোস্টার দেখেই লোকে হলে ছুটবে । যদি কোনোরকমে চার সপ্তাহ " ফুল " মেরে দিতে পারি তবেই আমাদের খরচা উঠে লাভ দেখা শুরু করবো । অবশ্য পোস্টারে লেখা থাকবে কাহিনীকার হিসাবে আপনার নাম আর বড়ো করে লেখা থাকবে " পুরস্কার প্রাপ্ত গল্পের কাহিনী অবলম্বনে সিনেমা ........." ।

গৌরপল্লব বাবুর সারা শরীর রাগে থরথর করে কাঁপছে । একটা সময় আর না পেরে চিৎকার করে বললেন -- আপনারা দয়া করে থামবেন ? আমি চাই না আপনারা আমার লেখা নিয়ে ছবি করুন । আমি সবসময় একটা আদর্শের কথা চিন্তা করি । আমি চাই না টাকার লোভে আমার আদর্শকে আপনাদের কাছে বিক্রি করে দিই । শুধু বিদেশে কয়েক জায়গায় শুটিং আর নায়ক , নায়িকাকে অতিরঞ্জিত করে তাদের মুখ দিয়ে কতগুলি " বস্তাপচা " ডায়লগ দিয়ে ছবি বানানোকে আমি অত্যন্ত ঘৃণা করি । আপনারা এখন আসতে পারেন । আর একটা কথা , দেশ - বিদেশের নাম করা পরিচালকদের বানানো ছবিগুলি দেখবেন । কত সুন্দর সুন্দর ভালো ছবি তাঁদের হাত দিয়ে তৈরী হয়েছে আর এখনও হচ্ছে ..... । গৌরপল্লব বাবুকে তাঁরা থামিয়ে দিয়ে বললেন -- দেখুন , একটা কথা বলি --- মানে , গল্পের থিমটা ভালো লেগেছে বলেই ......, আচ্ছা ঠিক আছে , আমরা আপনাকে ৫০ হাজারের জায়গায় নাহয় ৬০ হাজারই দেবো । আপনি আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান । ভাবুনতো আপনার লেখা গল্প নিয়ে ছবি হবে , আপনি রাতারাতি
" সেলিব্রেটি " হয়ে যাবেন । আপনি শুটিং জোনে উপস্থিত ......
লাইট ....একশান ....কাট .....। প্লিজ , আপনারা চুপ করুন । আমি নিজেকে আপনাদের মতো লোকেদের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রী হয়ে " সেলিব্রেটি " হতে চাই না ....না । আপনার এখুনি আমাদের বাড়ী থেকে বেরিয়ে যান ।

সত্যবতী দেবী ধাক্কা দিয়ে গৌরপল্লব বাবুর ঘুম ভাঙয়িয়ে বললেন --
ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে কি বলছিলে -- লাইট ....একশান.... কাট.... সেলিব্রেটি .....। গৌরপল্লব বাবু সম্বিত ফিরে আপন মনে বললেন -- না , কিছু না , আসলে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন