বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৭
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৯২

বিচারক স্কোরঃ ২.৮২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

শেফালীর জীবনের এক কল্প কাহিনী

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

আঁধারে অন্য রূপ

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

ভয়কে জয়

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - আঁধার (অক্টোবর ২০১৭)

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৯২ আঁধারের উপাখ্যান

বিশ্বরঞ্জন দত্তগুপ্ত
comment ১১  favorite ০  import_contacts ২৪৫
শিয়ালদহ স্টেশন । রাত ৭ - ২৫ এর বনগাঁ যাবার লোকাল
ট্রেন ৫ নং প্লাটফর্মে ঢুকছে .......

সারাদিনের ব্যবসার কাজ-কর্ম শেষ করে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে রাত ৭ - ২৫ এর বনগাঁ লোকাল ধরে গোবরডাঙ্গা স্টেশনে নামি । স্টেশনের বাহিরে একটা দোকানে সাইকেল জমা থাকে । স্টেশন থেকে সাইকেলে বাড়ী পৌঁছাতে রাত প্রায় সাড়ে নটা বেজে যায় । এটাই আমার নিত্য দিনের রুটিন । ৭ - ২৫ এর লোকালে দীর্ঘদিন ফেরার ফলে অন্যান্য সহযাত্রীদের সঙ্গে একটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে । সারাদিন খাটাখাটনির পর সবাই একসঙ্গে মিলে নানা ধরনের গল্প , মজা করতে করতে বাড়ী ফিরি । বেশ হৈ হৈ করে সময়টাও কেটে যায় , আর ভালোও লাগে ।

প্রায় প্রতিদিন রাতের এই ৭ - ২৫ এর বনগাঁ লোকালে এক মহিলাকে দেখতাম কোলে একটি ফুটফুটে সুন্দর ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে ভিক্ষে করতে । শিশুটিকে দেখে আমাদের বড় মায়া হতো । আমরা সবাই মহিলাটিকে আমাদের সাধ্যমত সাহায্য করতাম । প্রায় রোজই সাক্ষাৎতের ফলে আমাদের সঙ্গে মোটামুটি একটা পরিচয় হয়ে গিয়েছিল । মহিলাটির নাম জুঁই নস্কর । বয়স ৩৫ এর কাছাকাছি । একটু গোলগাল চেহারা । মুখশ্রী খারাপ নয় । পরনে ময়লা শাড়ী । চোখেমুখে এক অসহায় ভাব । গলার স্বরটি খুব নিচু । কথা বলার সময় মুখটাকে নামিয়ে কথা বলে । আমাদের সহযাত্রীদের মধ্যে যারা বয়েসে আমাদের থেকে বেশ খানিকটা ছোট , তারা আড়ালে মহিলাটিকে মজা করে নাম দিয়েছে -- " আঁধারের সুন্দরী জুঁই " ।

মহিলার থেকেই শোনা -- তার জীবনটাই আঁধারে ঢাকা । অত্যন্ত গরীব ঘরের একজন গৃহবধূ । দারিদ্র্যের সঙ্গে রোজ লড়াই করে চলেছে । বাড়ীতে পক্ষাঘাতে পঙ্গু স্বামী অসুস্থতার কারণে সবসময় শুয়েই থাকে । সকাল থেকে স্বামীকে দেখাশুনা করতে হয় , শিশুটির পরিচর্যা করতে হয় । নিজেদের পেট চালাবার জন্য এই ছোট শিশুটিকে কোলে নিয়ে দুপুর থেকে ভিক্ষে করতে বের হয় আর বাড়ী ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায় । একটা সময় ক্ষিদের তাড়নায় কোলের শিশুটি চিৎকার করতে করতে ঘুমিয়ে পরে । সারাদিনের ভিক্ষের সামান্য উপার্জনে রাতের বেলায় ঘরে ফিরে একবেলা খেয়ে কোন রকমে বেঁচে থাকে ।

বেশ কিছুদিন ধরে রাতের এই বনগাঁ লোকালে শিশু কোলে নিয়ে ভিক্ষে করতে আসা মহিলাটিকে আর আমরা দেখতে পাই না । ভাবলাম , মহিলাটির স্বামী অথবা তার কোলের শিশুটি হয়তো খুবই অসুস্থ , তাদের দেখভালের জন্য বোধহয় ভিক্ষে করতে বেরোতে পারে না । আমাদের ও খুব খারাপ লাগত বিশেষ করে মহিলাটির কোলে থাকা ফুটফুটে শিশুটির কথা ভেবে ।

মাস খানেক পরের ঘটনা ...। আমার এক আত্মীয়ের বাড়ীতে যাবার জন্য রাত ৮-৩০ নাগাদ রানাঘাট স্টেশনে নেমেছি । স্টেশনে নেমে দেখলাম বেশ জোরে বৃষ্টি হচ্ছে । দৌড়ে গিয়ে একটা শেডের তলায় দাঁড়াতে , একটু পাশ থেকে এক মহিলার কর্কশ কণ্ঠের স্বর কানে এসে লাগলো । একটু তফাত থেকে মহিলাটিকে দেখে চিনতে পেরে বেশ অবাকই হয়ে গেলাম । জ্বলন্ত বিড়ি হাতে মহিলাটি বেশ ঝাঁঝালো কণ্ঠে এক অতি বয়স্ক বুড়িকে বলছে -- আঁধার নামলে তোর ন্যাকামি শুরু হয় ... , পারবি না মানে ? তোকে যেতেই হবে বুড়ি । ন্যাকা , - শরীরের ব্যাথায় উঠতে পারছি না ! ওসব বাজে কথা অন্য জায়গায় বলবি বুড়ি , রাত কত হোল জানিস ? লাঠিটা ধর , এই বৃষ্টির মধ্যেই তোকে বেরোতে হবে । তুইতো একটা ঘাটের মরা , কিছুদিন পরেইতো শ্মশানে যাবি । তোর লাঠির বাড়ি আজ আমার পিঠে পরবে । কাপলা শেখ আজ আমাকে আর আস্ত রাখবে না । আজ রাতের অন্ধকারে আমার দেহটাকে তো খাবে আর তোর জন্য এই ভালো ডিউটি থেকে সরিয়ে দেবে । দুপুরে তোকে এখানে বসিয়ে দিয়ে আমি একটু তফাতে পাহারায় থাকি । আমিতো দেখি -- সারাক্ষণ বসে বসে তুই শুধু ঝিমাস , স্টেশন দিয়ে এত লোক যাতায়াত করে তাদের কাছে চিৎকার করে ভিক্ষা করতে পারিস না বুড়ি ? বয়েসের ভারে ন্যুব্জ বুড়িটা কোনোরকমে দম নিয়ে ভয়ে ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো -- আমি যে ক্ষিদের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ঝিমোতে থাকি । এই আঁধার নামলেই আমার ভয় শুরু হয় - একদিকে তুই আমাকে মারিস আর গলা খিঁচুনি দিস আর বাড়ীতে গেলেই বউ আর ছেলেটা লাঠি দিয়ে মারে , আমি যে এই অত্যাচার আর সহ্য করতে ....... মহিলাটি এক ধমক দিয়ে বুড়ির কথা বলা থামিয়ে হাতের জ্বলন্ত বিড়িটায় শেষ সুখ টান দিয়ে মাটিতে ফেলে , পা দিয়ে বিড়িটাকে মাড়িয়ে অত্যন্ত একটা বাজে ভাষা উচ্চারণ করে বুড়িটাকে নিয়ে যাবার জন্য টানাটানি শুরু করলো । আমি মনে মনে ভেবে অবাক হচ্ছি -- যে মহিলা ঘুমন্ত শিশু কোলে নিয়ে ট্রেনে ভিক্ষা করার সময় মাথা নিচু করে খুব ধীরে কথা বলতো , এই কি সেই মহিলা ? হাতে বিড়ি , ব্যবহারে উদ্ধত আর মুখে নোংরা ভাষা । রাতের আঁধারে এদের রূপটাই যেন বহুরূপি !

মহিলাটির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে , আমাকে এই সময় এই স্টেশনে দেখে অবাক না হয়ে বেশ হালকা ভাবেই বললো -- বাবু , ভালো আছেন ? এই স্টেশনে কোন কাজে এসেছেন বুঝি ? আপনার সঙ্গে বেশ কয়েকদিন পর দেখা হোল । আপনার বন্ধুরা সবাই ভালো আছে তো ? আসলে আপনাদের লাইনে ৭ - ২৫ এর বনগাঁ লোকালে এখন আমার আর ডিউটি নেই । আমি এখন অন্য জায়গায় অন্য রূপে " টেনেশফেরার " হয়ে গেছি । আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ।মনে মনে ভাবছি -- কিসের ডিউটি ! কিসের ট্রান্সফার ! আর তার কোলের শিশুটির কি খবর ? মহিলাটি বোধহয় আমার মনের কথা বুঝতে পেরে , কোন রকম ভনিতা না করে একেবারে নির্বিকার ভাবে আমাকে " টেনেশফেরার " ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলো ।

মহিলাটি বললো -- আগে ভিক্ষে করার সময় যে শিশুটি তার কোলে থাকতো , সেটি তার নিজের শিশু নয় । আমরা যে " কুমপানি " তে কাজ করি , সেখান থেকে শিশুটিকে আমাকে দিয়েছিল ওকে দেখিয়ে ভিক্ষে করবার জন্য । " কুমপানি " এই সব শিশুদের ভাড়া নেয় কয়েক ঘন্টার জন্য অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের থেকে যারা রাস্তায় বসবাস কোরে কোন রকমে দিন কাটায় । শিশুটি কোলে থাকার সময় যাতে কান্নাকাটি না করে সেই জন্য ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেওয়া হয় । ভিক্ষে করবার সময় আমার হাবভাব কি রকম হবে , আমাকে কি বলতে হবে আর কি ভাবে বলতে হবে , সবকিছু " কুমপানি " আমাদের শিখিয়ে দেয় । দিনের শেষে রাত্রিবেলা ভিক্ষে করা থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা " কুমপানি " কে দিতে হয় । তারপর বাড়তি যে টাকা উঠবে সবটাই আমার । শিশুটিকে কোলে নিয়ে ভিক্ষের সময় আমার " ইনকাম " খুব ভাল হতো । কিন্তু সারাটা সময় ঘুমন্ত শিশুটিকে কোলে রাখতে অসুবিধা হতো বলে কাপলা শেখকে বলে ডিউটির ধরনটা পালটে নিলাম । সহজে কি দেয় ? কয়েকদিন রাতে আমার শরীরটাকে চেটেপুটে খেল তারপর আমাকে " টেনেশফেরার " করে এই বুড়ির ডিউটিটা দিল । আবার " কুমপানি " থেকে আমরা সুবিধাও পাই । সত্যি সত্যি শরীর খারাপ হলে বা কোন বিশেষ দরকারে কাজে যেতে না পারলে , " কুমপানি " সেদিনের জন্য কিছু টাকা হাতে দেয় । রোজ " কুমপানির " নির্দিষ্ট টাকাটা দিয়ে গেলে , " কুমপানি " খুশি হয়ে বকশিস দেয় , পুজোর সময় বোনাস ও দেয় । আমি অবাক বিস্ময়ে মহিলাটির কথা শুনে শিহরিত হচ্ছি ।

মহিলাটি একটা বিড়ি ধরিয়ে , বুড়ির ভিক্ষে করা পয়সাগুলি গুনতে গুনতে বললো -- এই বুড়ির ডিউটিটা অনেক হালকা । আমার খাটনিটাও আগের ডিউটির তুলনায় অনেক কম । দুপুরবেলা স্টেশনে এনে ভিক্ষে করবার জন্য বসিয়ে দিয়ে শুধু দুর থেকে নজর রাখি আর আমি আয়েশ করে বসে " ওয়াগন ব্রেকারদের " সাথে গুলতানি করি । বিকেলবেলা বুড়িটাকে এক ভাঁড় চা আর একটা বিস্কুট খাইয়ে দিই । বুড়িটা যখন ঝিমোয় , তখন চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে কয়েক ঘা দিয়ে ঝিমুনি কাটাই ভিক্ষে করবার জন্য । জানেন বাবু , এই বুড়িটাও ভাড়া করা । রেল লাইনের পাশে ঝুপড়িতে থাকে । বুড়ির ছেলেটা কিছুই করে না । সারাদিন বাড়ীতে বসে চোলাই মদ খায় । বউটা কয়েকটা বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে । বাড়ীতে ছোট ছোট চারটে ছেলে মেয়ে । ছেলেটাই তো জোর করে বয়স্ক বুড়ি মা টাকে এই লাইনে নামিয়ে দিল ।

বাহিরেটা দেখে নিয়ে মহিলাটি বললো -- আমাকে এবার যেতে হবে , বৃষ্টিটা মনে হয় একটু কমেছে । বুড়িটাকে ঝুপড়িতে পৌঁছে দিতে হবে । আজ আমার কপালে দুর্ভোগ আছে । " কুমপানি " কে দেয়ার মতো রোজের টাকাতো ওঠেই নি আর আমার ইনকামের কথা ছেড়েই দিন । আজ রাতে বোধ হয় বাড়ী ফেরা হবে না , কাপলা শেখের সারা গা টিপে দিতে হবে । কাপলা শেখকে বলবো -- এই সব বাজে " মাল " দিয়ে " ব্যবসা " করা যায় না । এই " মাল " টাকে বদলিয়ে একটু শক্ত পোক্ত " মাল " এর ব্যাবস্থা করে দিতে । নিজের মনে বকবক করতে করতে অথর্ব বুড়িটাকে টানতে টানতে নিয়ে চললো যেমনভাবে গ্রামের লোক সারাদিন মাঠে গরু চড়িয়ে আঁধার নামলে দড়ি দিয়ে টেনে টেনে গোয়াল ঘরে নিয়ে যায় ।

মহিলাটি যাবার সময় বললো -- যদি কোনদিন আবার পুরোনো ডিউটিতে
" টেনেশফেরার " হই তখন হয়তো আপনাদের সঙ্গে রাতের ৭ - ২৫ এর বনগাঁ লোকালে দেখা হয়ে যাবে । একটু অন্যমনস্ক হয়ে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বললো -- বাবু , আমাদের জীবনটাই আঁধার-আচ্ছন্ন , আলো চলে গিয়ে আঁধার নামলেই আমাদের বেশী ভয় -- এই বলে নির্বিকার ভাবে বুড়িটাকে টানতে টানতে স্টেশন পেরিয়ে রেল লাইনের ধারে আঁধার মাখানো ঝুপড়ি ঘরগুলির দিকে এগিয়ে চললো .......।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন