বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৯৪
গল্প/কবিতা: ৪টি

সমন্বিত স্কোর

২.৭৩

বিচারক স্কোরঃ ১.৩৮ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৩৫ / ৩.০

গল্প - আঁধার (অক্টোবর ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৭৩ স্বপ্নময়ী অহনার আঁধারে জীবন

শুভ্র শীবু
comment ৯  favorite ০  import_contacts ১৫৩
সময়টা জানুয়ারী মাসের ১৬ তারিখ হবে। কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠান সদ্য শেষ হলো। কয়েকদিন পর, কলেজের পূর্ণাঙ্গ ক্লাস শুরু হবে। আমি সদ্য শ্রীমঙ্গল সরকারী কলেজের ছাত্র, কলেজের কোন দিকে গেলে সমস্যা হবে, বা হবে না তা আমি জানি না। কলেজের স্যারদের পাঠ নেওয়া শেষ হলে বাসায়
ফিরে যাই। এভাবে আমার অধ্যয়ন জীবন বেশ ভালো-ই যাচ্ছে। একাদশ শ্রেণীর ফাইনাল পরীক্ষার প্রথমদিনে পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত সিটে বসলাম। আমার পেছনের এক সিটে বসেছেন একজন মেয়ে। আমাদের রুমে যিনি আমাদের পরীক্ষকের দায়িত্ব ছিলেন, রুমা ম্যাডাম। উনার ই মেয়ে বুঝতে আর বাকি রইলো না। রুমা ম্যাডাম কিছুক্ষণ পর পর, আমার পেছনের সিটে এসে মেয়েটিকে খুব সর্তকতার মাঝে লুকিয়ে, লুকিয়ে মেয়েটিকে বলে দিচ্ছিলেন।

আমার খুব হিংসে হচ্ছিলো, তাই আমি দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় সবার সামনেই বলে দিলাম

শীবু:- এটা কিন্তু ঠিক না?

রুমা ম্যাডাম :- কেনো কি হয়েছে!

শীবু:- ম্যাডাম, আপনি বার বার কেনো, ওকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখাচ্ছিলেন?

রুমা ম্যাডাম :- তোমার কাজ তুমি করো!!

আর কিছু না বলে বসে পড়লাম। ঐ দিন পরীক্ষার হলে ম্যাডামকে জব্দ করতে পেরে আমি খুব খুশী। পরের দিন পরীক্ষার হলে প্রবেশ করতেই দেখি, ঐ মেয়েটি। আমি আমার বেঞ্চে বসার পরই, মেয়েটি আমাকে বললো এই যে, আমি অহনা। বলে হাত বাড়িয়ে দিলো করমর্দনের জন্য। আমি ও হাত মিলিয়ে করমর্দন করে

শীবু:- আমি শীবু

অহনা:- আপনার বাসা কোথায়?

শীবু:- সাঁতগাও, শ্রীমঙ্গল, তোমার?

অহনা:- আমাদের বাসা রুপসপুর ভাড়া থাকি!
শীবু:- আচ্ছা, পরে কথা হবে।

এদিন পরীক্ষার খাতায় আমি তেমন লিখতে পারছিলাম না। তারপর ও একটু সকাল-ই পরীক্ষার রুম থেকে বের হলাম। পেছন থেকে মেয়ের কণ্ঠে কে যেন, ডাকছে আমায়? পেছনে অহনা ডাকতেছে!!! শুভ্র, শুভ্র, শুভ্র। শুভ্র আমার ডাক নাম, আর এই নামে শুধু আমার পরিবারের সবাই ডাকেন। যাই হোক, আমি ওর দিকেই
যাচ্ছি। দুজনেই সামনা-সামনি, অহনা আমার হাত ধরে আমাকে ধন্যবাদ জানালো। আর বললো, আজ যদি আপনি না আমায় দেখাতেন, তাহলে আমি হয়তো ফেল করতাম। সমান তালে গল্প করে, দুজনে একে অপরের বেশ ভালো বন্ধু হয়ে গেলাম।

প্রতিদিন-ই সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, শুভ সকাল ও রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্বে-শুভ রাত্রি! খুব ভালো যাচ্ছিলো আমাদের বন্ধুত্ব। একদিন আমি অহনাকে তার ইংরেজীর খাতায় "ভালোবাসি তোমায়" লিখেছিলাম। অহনা আমার লেখা পড়েনি, কারণ সে হয়তো খাতায় লেখাগুলো দেখেনি! জীবনের সব কিছু ঘিরে শুধু অহনাই ছিলো। কলেজের ক্যাম্পাস
জুড়ে আমি আর অহনা শুধু গল্প আর আড্ডায় কাটিয়ে দিলাম কলেজ জীবনেই ছয় বছর। ইন্টার-অনার্স ছয় বছর কাটিয়ে আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেই। পরিবারের কেউ আমাদের এই সম্পর্কের স্বীকৃতি দিবে না। কেননা, দুজনেই দুই বর্ণের। আমার পুরো নাম শুভ্র শীল অপরদিকে অহনার পুরো নাম অহনা চক্রবর্ত্তী ।

শীল আর চক্রবর্ত্তী হিন্দুসমাজে বিয়ে হয়না। কারণ দুইজন দুই বর্ণের, একজন পুরোহিত বংশের আর আরেক শুদ্র বংশের। পুরোহিত মানে পুজারী আর শুদ্র মানে সেবার বিনিময়ে যেসব কাজ করে থাকেন। শিক্ষিত লোক যারা আছেন, তাদেঁর অনেকেই গুরুবাদ, জাত-পাত, বর্ণ প্রথা, অসস্পৃশ্যতা, ইত্যাদি বিশ্বাস করেন না। আমাদের বিয়ে হলো কোর্টে। আমরা কোর্টে
বিয়ে করে আমরা আমাদের পরিবারকে জানাই। প্রথমে পরিবারের কেউ মেনে নেয়নি, কিন্তু মেনে নিয়েছেন অনেক পরে। তখনকার আমি আর অহনা নিজেদের সংসার আর কর্মব্যস্ততা আমাদের কাছে মূল বিষয় ছিলো। ভালোবাসার তৈরী এই সংসারে, মানুষ কর্তৃক অপসমাজে আমাদেন টাঁই হয়নি। যাই হোক- এই অপসমাজ আমাদের কাছে হার মেনে নিয়েছে। এই সমাজের কু-সংস্কার গুলো আজ একধরণের আইন হয়ে গেছে।

বিয়ের পর সংসার জীবনের এক যুগ পর মেনে নিলে ও আমি আমার বাবার মৃত্যুর পর আমাকে আমার কোন কাজ করতে দেওয়া হয়নি। দুই সন্তান নিয়ে আমরা বেশ সুখেই ছিলাম। সময়ের কাছে আমি অসহায় ছিলাম। এক ছেলে দিপ্র আর এক মেয়ে তিথি। এভাবেই অহনার হাতে হাত রেখে আমরা দুজনেই সংসারে সকল কাজ ভাগ করে নেই।
কিন্তু সংসারে একসময় কালো ছায়া পড়ে, অহনা আমাদের সবাইকে ছেড়ে অজানার পথে পাড়ি জমায়। অহনা হঠাৎ করে চলে যাওয়ায় আমি পুরো-ই নি:স্ব হয়ে গিয়েছিলাম।

যৌবন হারিয়ে বার্ধ্যকের কাছে হার আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে। বয়সের কারণে আজ আমি বৃদ্ধ। বুকভরা কস্ট নিয়ে ছেলেকে পুলিশ কমিশনার আর মেয়েকে মহিলা ক্রিকেটার হিসাবে তৈরী করি! তারা এখন সারাক্ষন নিজেদের কর্মব্যস্ততার মাঝে থাকে। নিজের ভালো-মন্দ সবকিছু এখন অহনা, আমাদের দিপ্র আর তিথি বুঝে নিতে পারে। অহনা তুমি চলে যাওয়ার পর আমাকে তুমি তোমার অবর্তমানে, বাবা হিসাবে আমার যে গুরুদায়িত্ব ছিলো আমি তা শেষ করেছি। আমার মনে হয় এখন, আমি তোমারই কাছে আসার সময় হয়ে গিয়েছে অহনা। পৃথিবীর মানুষগুলো আজ খুব বর্বর। অহনা আজ তোমারই শ্বশানের পাশে তোমার শীবু বসে আছে। তুমি নেই, কিন্তু তুমি আছো হৃদমন্দিরে। ভালোবাসার জন্য তোমার ত্যাগে আমার চিত্ত খানি আজ ও তোমায় খুঁজে বেড়ায়। আমি আবার চিৎকার করে বলছি তোমায় - "অহনা" আজো ভালোবাসি তোমায়।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন