বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ৩.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.২৫ / ৩.০

রূপকথার জন্য মেঘবালিকা

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

ঘুম নেই

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

ভূত-বিভ্রাট

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - ঋণ (জুলাই ২০১৭)

মোট ভোট ৩০ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৯৮ কৃতজ্ঞতাপাশ

বিনায়ক চক্রবর্তী
comment ২২  favorite ০  import_contacts ৭৩৬
১.

মোড়ের মাথায় রামুর চা-দোকানের একপাশে যে আবছা সাদাটে ধুলোমাখা চতুস্পদটিকে মাঝেসাঝে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকতে দেখা যায়; পরিচিত মহলে তারই নাম ভুলু। ডাকনাম। হয়তো পোশাকিও। ভুলু জন্মসূত্রে নেড়ি। তার পেডিগ্রিতে খানদানী কোন ডোবারম্যান অ্যালশেসিয়ান ছিল না। এবং এ নিয়ে তার যে খুব একটা দুঃখবোধ আছে, তাও নয়।

ভুলুর লেজটা এক চতুর্থাংশ উচ্ছিষ্ট রেখে বাকিটুকু নিপুণ করে কাটা। খোদায় মালুম কে, কোন শুভক্ষনে ও কম্মোটি করেছিল। আর নিতান্তই ‘স্ট্রীট ডগ’ হওয়ার সুবাদে ঐটে ছাড়া চোখে পড়বার মতো আর দ্বিতীয় কোন বৈচিত্র্যও তার ছিল না। ভুলু ঝগড়া করতে ভারী ভালোবাসত এবং দ্বিতীয় বসন্ত কাটাবার পূর্বেই যে সে আপন শরীরে খান পনেরো উল্কি আঁকিয়ে নিতে পেরেছিলো এও তার অসীম পরাক্রমই বলতে হবে।
ভুলুর রাস্তায় জন্ম, রাস্তাতেই মানুষ। তাই হয়ত খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে তার খুব একটা ছুঁতমার্গ ছিল না।

সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসলে বড়রাস্তা ধরে গলির ভেতর দিয়ে গোটা বাজারটা বার তিনেক টহল দেওয়া ভুলুর দৈনন্দিন রুটিন। এরপর রাত্তিরে ফের দোকানের চালাঘরটার পাশটিতে ওর বরাদ্দ জায়গায় এসে শুয়ে পড়ত। রামুর যারা ‘ডেলি খদ্দের’ তারাও ওকে বেশ চেনে। ফলে দুটো চারটে বিস্কুট আর এটাসেটা ওর কপালে জুটেই যায়। ভুলুর দিন মন্দ কাটে না।

২.

এমন সময় সেখানে এক বুড়ো ভিখিরি আসতে শুরু করল। রামুর দোকানের উল্টো পাদে বাজারে ঢোকার ঠিক মুখটাতে। বেচারা কোন চোখেই দেখতে পায় না। রোজ সকালে এক বুড়ি এসে তাকে সেখানে বসিয়ে রেখে যেত। দুপুরবেলায় আর একবার আসত একটা টিফিন ক্যারিয়ার রেখে যেতে। ফের রাত্তিরে এসে বুড়োর টিনের কৌটো ঝেড়ে টেড়ে খুচরো পয়সা গুনে, বুড়োকে উঠিয়ে নিয়ে চলে যেত।

ঘটনাপ্রবাহ বেশ কয়েকদিন মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করার পর ভুলুকে এখন প্রায়শই বুড়োর কাছেপিঠে ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। বিশেষত ওই দুপুরের দিকটায়, যখন বুড়ো তার টিফিন ক্যারিয়ারের ঢাকনা খোলে। ভুলু সামনে দাঁড়িয়ে বিচিত্র ভঙ্গীতে লুপ্তপ্রায় লেজাংশটুকু দোলাতে থাকে পেন্ডুলাম দ্রুততায়।

বুড়ো একদিন কীভাবে যেন টের পেল।ডান হাতের লাঠিটা দিয়ে সামনের বাতাস খানিকটা সাঁতরিয়ে, চেঁচিয়ে ওঠে “কে? কে ওখানে?” ভুলু এগিয়ে এসে বুড়োর হাতটা চেটে দেয়। বুড়ো তার কান থেকে লেজ পর্যন্ত হাত বোলায়। ঘাড়টা মৃদু চাপড়ে দিয়ে বলে “বাঃ ভারী সুন্দর দেখতে তো তোকে! আয় ব্যাটা। এই নে।” আন্দাজ করে একমুঠো খাবার ছুঁড়ে দেয়, ভুলুর দিকে। ভুলু গোগ্রাসে গিলতে থাকে।

যতদূর জানি, ওদের বন্ধুত্বটা শুরু হয়েছিল এভাবেই। ও হ্যাঁ, বুড়ো ভুলুর নাম দিয়েছিল… ‘টাইগার’!

৩.

ভুলু এখন দিনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়ে দেয় বুড়োর কোল ঘেঁষে শুয়ে থেকে। চিন্তাশীলের মতো ঘাড় বেঁকিয়ে তাকে ভিক্ষে করতে দেখে সকাল থেকে সন্ধ্যে অব্দি। এমনকি কেউ যদি সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায় বুড়োর তোয়াক্কা না রেখে; ভুলু চেল্লাতে চেল্লাতে তাকে ধাওয়া করে। প্যান্ট কামড়ে টেনে নিয়ে আসে ফের। বুড়োর কৌটোতে নিদেন একটাকার কয়েন ফেললে তবে নিস্তার!

শনিবার ছিল হাটবার। অনেক দূর দূর থেকে লোকেরা সব বেচাকেনা করতে আসত। খুব ভিড় হতো সেদিন। ঐদিন যারা নিয়মিত বাজারে আসত তাদের মধ্যে এক বিটকেল বিচ্ছু ছিল, যাকে বুড়ো যমের মতো ভয় করত। সে ছোঁড়া যেমন বদমাইশ তেমনই অভব্য। কারণে অকারণে বুড়োকে জ্বালাতন করে মজা দেখত। দেখা হলেই দাঁত খিঁচিয়ে জিজ্ঞেস করত “কি রে কানা কী কোচ্ছিশ?” শুধু তাই নয়, এরপর সে বুড়োর কৌটো থেকে ছোঁ মেরে টাকা তুলে নেওয়ারও ফিকির খুঁজত। হাটবার ছিল তাই বুড়োর কাছে শিরেসংক্রান্তি।

বাজারে অবশ্য আরও অনেকে আসত যাদের সাথে বুড়োর ভারী ভাব হয়ে গেছিল। এক জোয়ান গোছের বেলুনওলা। এক লম্বাটে শীর্ণকায় চশমাপরা বুড়ো। সে আসত অনেকগুলো পুরনো বই আর ম্যাগাজিন ট্যাগাজিন ফেরি করতে। আর ছিল এক মাঝবয়সী জলদগম্ভীর লোক। তার কাছে নানান রকমের রঙচঙে ফিতে পাওয়া যেত। এরা সকলেই বাজারের একেবারে ভেতরে না গিয়ে রামুর দোকানের পাশে ফাঁকা জায়গাটাতে সপ্তায় তিনদিন দোকান খাঁটাত।

৪.

এমনই একদিন, বুড়ো হঠাৎ শুনতে পায়, কতকটা দূর থেকে বেলুনওলাটা যেন হেঁকে বলছে – “খুব সাবধান বুড়ো, নচ্ছারটা ওই দিকেই যাচ্ছে।”
“হায় ভগবান! আজ কি শনিবার ?” বুড়ো ধড়ফড়িয়ে বাতাস হাতড়াতে থাকে। “টাইগার টাইগার কোথায় গেলি বাবা…শিগগির আয়। শয়তানটা ফিরে আসছে।”
ছেলেটা ঘনিয়ে আসে। বুড়োর জাপটে ধরে রাখা টিনের কৌটোটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে ওঠে “শ্শা‌লা কানা, ভাব দেখায় যেন কিছুটি দেখতে পাও না…তবে কী করে বুঝলি রে আমি আস…আঃ মাগো!
মোক্ষম সময়ে ভুলু এক প্রকান্ড কামড় বসিয়েছে ছেলেটার কবজিতে। তারপর তাড়া করে তাকে বোধহয় শহরের চৌহদ্দিই পার করিয়ে দিলে।

মুচকি হেসে সুবিমলবাবু মন্তব্য করেন “কী দেখছ কী রামু, তোমার কুকুর তো বুড়োর ভয়ানক ন্যাওটা হয়ে পড়েছে হে।” রামু চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিয়ে বিনীত জানায় “কুকুর তো আমার ছিল না বাবু।”

৫.

ঝিরঝিরিয়ে বৃষ্টি পড়ছিল। সেদিন সন্ধ্যেতে বুড়ি আর নিতে আসেনি বুড়োকে।

অন্ধের দ্বিতীয় যষ্ঠি ছিল না।

“এই নাও, অম্নি অম্নিই দিচ্ছি তোমায়। কুকুরটা যখন তোমার এতই দেখভাল্‌ করছে, তখন বেঁধে দাও ওর গলায়। থাকুক তোমার সাথে।” — বুড়োকে তার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ফেরার আগে একটা সাদা ফিতে এগিয়ে দেয় ফিতেবিক্রেতা।

৬.

ভুলুর জীবন বিনা নোটিশে দুম করেই পাল্টে গেল। তাকে এখন বুড়ির জায়গাটা নিতে হয়েছে। ইতিপূর্বে বেচারা সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার বানী শোনেনি বোধহয়। তাইই হয়তো ঘোরতর কিছু স্লোগান দিতেও তাকে দেখা যায় নি। তবে নিজস্ব স্বত্বা-টত্তা বলে আর কিস্যু বেঁচে নেই। তার পৃথিবীর আহ্নিক গতি এখন বুড়োর হাতে প্যাঁচানো থাকে।

বুড়োও এখন আর বসে বসে ভিক্ষে করে না। সকাল থেকেই সে একটা ঘন্টা বাজিয়ে বটতলা ধরে শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে গোটা চত্বরটা চক্কর কাটতে থাকে। সে খেয়াল করেছে এতে আগের থেকে প্রায় তিনগুন বেশি আয় হয়।
চলতে চলতে যখনই লোকজনের কথাবার্তা কানে আসে, দাঁড়িয়ে পড়ে। কৌটোটা সামনে বাড়িয়ে দেয়। লোকজন বিনা বাক্যব্যয়ে পয়সা ফেলে তাতে। স্কুলযাত্রী ছেলেমেয়েরাও কৌতূহলে ঘিরে ধরে মাঝেসাঝে। টিফিনের ভাগ দেয়।

ভুলুর পা ব্যাথা করে। ইচ্ছে না থাকলেও তাকে হাঁটতে হয় বুড়োর পাশে পাশে। হাঁপিয়ে গেলেও বুড়ো রেয়াত করে না। জোর করে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে – “কেন রে ব্যাটা… আমি কি খেতে দিই না নাকি তোকে?”
বুড়ো টাকার স্বাদ বিলক্ষণ বুঝেছে। দুপুরের খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে সে আর বসতেই চায় না। কারন কিছু দুর্বোধ্যও নয়। জিরিয়ে নেওয়া মানেই অযথা সময় নষ্ট। তারচে’ ওই সময়টা হাঁটলে বরং…।

পুরনো বন্ধুদের সাথে দেখা সাক্ষাৎ হলে ভুলু কখনও কখনও বা খুশিয়াল হয়ে ডাক ছাড়ে। কুশল বিনিময়েরই, খুব সম্ভব। জোরসে লাফ দিয়ে ওঠে। নিতান্ত ভুল করেই অবশ্য।
হাতের দড়িতে টান পড়ায়, সাথেসাথেই তার পেটে লাথি কষিয়ে বুড়ো সযত্নে সে ভুল সংশোধন করে দেয়; “আমায় ডিগবাজী খাওয়ানোর ধান্দা, না?”

৭.

আজকাল ভুলুকে দেখলে আর চেনাই যায় না। তার হাঁকডাক কদাচিৎই শোনা যায়। পিঠের লোমগুলো ইতিউতি উঠে গিয়ে সে এক খোলতাই চেহারা হয়েছে। পাঁজরাগুলো অক্লেশে গোনা যায়। সে আর বুড়োর অবাধ্য হয় না। জ্ঞাতিভাইদের সাথে ক্বচিৎ মুখোমুখি হয়ে পড়লেও বিশেষ আগ্রহ দেখায় না।
ভুলু আক্ষরিক ভাবেই শৃঙ্খলা শিখে নিয়েছে।

একদিন এক কান্ড হল। বুড়ো তার দৈনন্দিন কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে রামুর দোকানটাকে সবে অতিক্রম করেছে কি করেনি, বেলুনওলাটা তার কাঁচি নিয়ে চুপিসাড়ে ছুটে গিয়ে ফিতেটা কেটে দিল।
মুক্তি পেয়ে ভুলু প্রথমটায় ভ্যাবাচাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। মুহূর্তখানেক হবে। তারপর পেল্লায় এক ডাক ছেড়ে একদৌড়ে পগার পার।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল বুড়োটাও। ব্যাপার তার বোধের অগম্য। নিদেন ‘টাইগার’ বলে চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও পারল না যেন।

“ঠিক হয়েচে। বেশ হয়েচে। খচ্চর বুড়ো। ও আর ফিরছে না, মিলিয়ে নিও।” – পা টিপে টিপে ফিরে আসার সময় বেলুনওলা চাপা স্বরে অভিশাপ দেয়।

এরপর ক’দিন আর ও তল্লাটে কারুর দেখা পাওয়া গেল না। না পিশাচ বুড়োর। না তার টাইগারের।

৮.

আকাশের চাঁদটা বুমেরাং থেকে নিটোল বৃত্তের আকার নিয়েছে প্রায়।

তারপর একদিন, হঠাৎ করেই, ফের শোনা গেল। শোনা গেল বুড়োর ঘন্টার সেই চেনা টুং-টুং শব্দ। সকলে বড়োরাস্তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে দেখল…হ্যাঁ তাইতো, বুড়োই বটে… আর, সাথে ভুলুও আসছে।

অতঃপর পাকড়ানো। জেরার মৌতাত।

তেরচা হেসে বুড়ো বলতে থাকে – “আর বোলো না হে। কীভাবে কে জানে এ ব্যাটা একদিন তাল বুঝে ভেগে পড়েছিল। আমার তো দিশেহারা অবস্থা, বুঝলে। কোনক্রমে হাতড়ে হাতড়ে বাড়ি পৌঁছে বেঁচে গেছি সে যাত্রা। তারপরে তো বিশ্রী দুর্ভোগ। ক’দিন ধরে বেরোতে পারি না। ভিক্ষেও জোটে না। খাওয়া-দাওয়ার অবধি ঠিক নেই। শেষটায় তো জ্বর-জ্বালা ধরে গেল। অবশেষে মহাপ্রভু ফিরে এলেন।”

“কবে কবে?” প্রায় হামলে পড়ে সব্বাই।

“পরশু রাত্তিরে। এঁটোকাঁটা খেয়ে আর কদ্দিন! পেটে টান পড়তেই ঠিক সুড়সুড় করে পথে এসেছে বাছাধন। অ্যামওওন এক থাপ্পড় কষিয়েছি যে বাপের জন্মে আর…” বলতে বলতে বুড়ো এগিয়ে যায়।

তার বাঁ হাতে জং ধরা টিনের কৌটোটা। ডান হাতে বেল দেওয়া লাঠি, আর পাঞ্জার সাথে পেঁচিয়ে রাখা একটা লোহার শেকল।

ঘণ্টার আওয়াজ মিলিয়ে গেলে পর বেলুনওলা বিড়বিড় করে…”না মরলে মুক্তি নেই হতভাগার।”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন