বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮২
গল্প/কবিতা: ৭টি

জলসঙ্কটে

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

আঁধারের আতঙ্ক

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

অদ্ভুত ভূত

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

ফ্রড

অমিতাভ সাহা
comment ৪  favorite ০  import_contacts ৫৭
বছরদুয়েক আগেকার কথা।

অলকবাবু আমার পড়শি। নিপাট ভদ্রলোক। সরকারী অফিসে কেরানীর চাকরি করতেন। মাস দুয়েক হল রিটায়ার করেছেন। ওনার কাছে গল্প শুনেছি পঞ্চাশ টাকা বেতনে চাকরি জয়েন করেছিলেন ত্রিশ বছর আগে। যখন রিটায়ার করলেন তখন বেতন বত্রিশ হাজার টাকা। সারাজীবন অনেক স্ট্রাগল করেছেন। কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে কিছুই পাননি। ওনার বাবা ছিলেন একজন ফেরিওয়ালা। ছেলেকে অনেক কষ্টে কলেজ পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। যা আর্থিক অবস্থা ছিল, তাতে এতদূর পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে যাবার কথা নয়। তবু বাবা অনেক কষ্ট করে ওনাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। উনি বাবার ঋণ কখনো অস্বীকার করতেন না। বাবা গত হয়েছেন প্রায় দশ বছর। অলকবাবুর দুই মেয়ে। ছোট মেয়ের জন্মের সময়েই স্ত্রী মারা যান। তখন থেকে দুই মেয়েকে অনেক আগলে বড় করেছেন। মধ্যবিত্ত আর্থিক অবস্থার মধ্যেও যখন যা আবদার করেছে সাধ্যমত পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। মেয়েদুটিও বাপের খুব ন্যাওটা।

বড় মেয়ে দোলনের বিয়ে দিয়েছেন বছর চারেক হল। সম্বন্ধ করে নয়। প্রেম করে বিয়ে। ওনার অনেক ইচ্ছে ছিল, নিজের পছন্দমত সুপাত্রে কন্যাদান করতে। মেয়ে নিজেই পাত্র ঠিক করাতে উনি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। ছেলেটিকে ওনার ঠিক পছন্দ হয়নি। একটু লাফাঙ্গা টাইপের। বেশিরভাগ সময়েই বাইক নিয়ে বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়াত, আড্ডা মারত। ওনার মেয়ের সঙ্গে একই কলেজে পড়ত। সেই সময় থেকেই দোলনকে প্রায়ই বিরক্ত করত। তারপর কিভাবে কিভাবে দোলনকে ফাঁসিয়ে নিল। কলেজ পাস করার পর দোলন এসএসসি দিয়ে স্কুলে জয়েন করেছিল। একদিন অলকবাবুকে এসে বলল, বাবা আমি দেবজ্যোতিকে বিয়ে করতে চাই। উনি সাফ মানা করে দিয়েছিলেন। ছেলেটা একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করত। অলকবাবু চেয়েছিলেন ওনার জামাই কোন সরকারী চাকুরে হবে। এই বিয়েতে ওনার আদৌ সম্মতি ছিল না। কিন্তু মেয়েকে এমনভাবে ফাঁসিয়েছে যে মেয়ে ঐ ছেলে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না। একদিন দোলন বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে ছেলেটার বাড়িতে ওঠে। পরে বংশের সম্মান বাঁচাতে গিয়ে অলকবাবু বিয়েটা মেনে নেন। মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে খুব ভালো নেই, সেটা উনি জানতেন। কারণ ছেলের ফ্যামিলি ষ্ট্যাণ্ডার্ড একেবারেই ভালো না। ছেলের বাবার লটারির ব্যবসা। জয়েন্ট ফ্যামিলি, বাড়িতে অনেক লোকজন। একটা চাকর পর্যন্ত রাখেনি। মেয়েটাকে স্কুলের ঝক্কি সামলানোর পরেও সংসারের সব কাজ করতে হত। মেয়ে অবশ্য কষ্টের কথা স্বীকার করতে চাইত না। কারণ, এখন বললে বাবার কাছে মুখ থাকবে না। বিয়ের আগে বাবা অনেকবার বারণ করেছিলেন।

ছোট মেয়ে নীলা যাতে এরকম ভুল না করে সেজন্য অলকবাবু সতর্ক ছিলেন। মেয়ের উপর নজর রাখতেন যাতে কোন লাফাঙ্গা ছেলের পাল্লায় না পড়ে। নীলা কলেজ পাস করার সাথে সাথেই ওর জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করে দিয়েছিলেন। একটা ভালো ছেলের সন্ধান পেলেন। সরকারী চাকুরে, বড় পদস্থ অফিসার। তারপর দেখাসাক্ষাতের পর্ব চলল। নীলা যথেষ্টই সুন্দরী। তাই এক দেখাতেই পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়ে গেল। এতদিনে একটু শান্তি পেলেন। ছোট মেয়েটা অন্তত ভালো ঘরে পড়বে।

রিটায়ার করার পর অলকবাবু লাম্পসাম কিছু টাকা পেয়েছিলেন প্রভিডেন্ড ফান্ড আর গ্র্যাচুইটি মিলে। এটাই সম্বল। ছোট মেয়ের বিয়েটা ধুমধাম করেই দেবেন ঠিক করে রেখেছেন। এখন সারাদিন মেয়ের বিয়ের প্ল্যানিং করছেন। খরচা ত কম নয়। খাট-পালঙ্ক, সোনা-দানা, ডেকোরেটার্স-ক্যাটারার সব লিস্টি করছেন। এখন অবসর জীবন আরাম-আয়েস করেই কাটে, টিভি দেখে, গান শুনে নাহলে খবরের কাগজ পড়ে। একদিন সকালবেলা বাজার থেকে ফিরে টিভিতে নিউজ দেখছিলেন। একটা ফোন এলো। ফোন ধরার পর শুনতে পেলেন, “আমি স্টেট ব্যাঙ্কের ম্যানেজার বলছি। আপনার KYC আপটুডেট করা নেই। আমরা অনেকবার আপনাকে ম্যাসেজ করে রিমাইন্ডার দিয়েছি। কিন্তু আপনি ব্যাঙ্কের সাথে কোন যোগাযোগ করেন নি”।

অলকবাবু বললেন, “আমি তো কোন ম্যাসেজ পাইনি”।

অপরপ্রান্ত থেকে বলে উঠল, “আপনার আধার কার্ড, এটিএম কার্ড সব নিয়ে আসুন। আমি এখুনি আপটুডেট করে দিচ্ছি। না হলে কিন্তু এক ঘন্টার মধ্যে আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যাবে”।

অলকবাবু বললেন, “ঠিক আছে আমি এখুনি ব্যাঙ্কে যাচ্ছি”।

ফোনের লোকটি বলল, “আপনি ফোনেই বলে দিন। কষ্ট করে আসতে হবে না”।

অলকবাবু এটিএম কার্ড নিয়ে এসে যাবতীয় তথ্য বলে দিলেন। ফোনের লোকটি বললেন, “দেখুন আপনার মোবাইলে একটা পাসওয়ার্ড গেছে। ঐ নম্বরটা বলুন”।

অলকবাবু মেসেজে গিয়ে পাসওয়ার্ড বলে দিলেন। ফোনের লোকটি বললেন, “ঠিক আছে, আপটুডেট হয়ে যাবে” বলে ফোন রেখে দিলেন। কিছুক্ষণ পর দেখলেন মোবাইলে মেসেজ এলো, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে এক লক্ষ টাকা ডেবিট হয়েছে।

অলকবাবু কিছু বুঝতে না পেরে ব্যাঙ্কে যোগাযোগ করলেন। ব্যাঙ্ক কতৃপক্ষ জানালো, “আমরা কখনও কোন গ্রাহককে ফোন করে এটিএম ডিটেলস জানতে চাই না। আপনারা এত শিক্ষিত লোক হয়ে এসব জানেন না। ব্যাঙ্কের সামনে বড় বড় করে পোস্টার টাঙ্গানো আছে। আপনাকে কোন ফ্রড কল করেছিল। ব্যাঙ্ক এধরনের ট্রানজাকশনের কোন দায় নেবে না”।

অলকবাবু দিশেহারা হয়ে পড়লেন। আমার কাছে এসে ছেলেমানুষের মত কাঁদতে লাগলেন। কে এত বড় সর্বনাশ করল, কিছুতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলেন না। উনি আমাকে পুত্রতুল্য স্নেহ করতেন। মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো এতগুলো টাকা এভাবে কোন অজানা শত্রু এসে খাবলা মেরে নিয়ে চলে গেল। ওনার কান্না দেখে আমার বুক ফেটে গেল। ওনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা আমার ছিল না। ওনাকে নিয়ে থানায় গেলাম। ডায়রি করলাম। থানার বড়বাবু আমার বিশেষ পরিচিত ছিলেন। উনি বললেন, একটা চক্র আজকাল সক্রিয় হয়ে উঠেছে যারা এইভাবে গ্রাম-গঞ্জের মানুষকে ব্যাঙ্কের কর্মী পরিচয় দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে সর্বস্বান্ত করছে।

আমার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। আমি জানতে চাইলাম, “এ ধরনের অনলাইন ফ্রড কি ট্র্যাক করা যায়?” উনি বললেন, “প্রায় অসম্ভব”। আমি বললাম, “প্লিজ, আপ্রাণ চেষ্টা করুন। সাইবার ক্রাইম বিভাগে তো আপনার জানাশোনা আছে। তাছাড়া ঘটনাটা ঘটার বেশি সময় হয়নি। ট্রাঞ্জাকশন ডিটেলস চেক করলে নিশ্চয়ই বের করা যাবে”।

বড়বাবু তৎক্ষণাৎ অ্যাকশন নিলেন। আমাকে ও অলকবাবুকে জিপে বসিয়ে স্টেট ব্যাঙ্কে গেলেন। তারপর আমরা ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজারের ঘরে ঢুকলাম। উনি পুরো ব্যাপারটা যথেষ্ট সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনা করলেন। অলকবাবুর অ্যাকাউন্টের ট্রাঞ্জাকশন হিস্টরি চেক করার পর অলকবাবুকে বললেন, আপনার কার্ড ডিটেলস ইউজ করে কোন ফ্রড অনলাইন শপিং করেছে। মার্চেন্ট অ্যাড্রেসঃ ফ্লিপকার্ট, ট্রাঞ্জাকশন আইডি, টাইম ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য প্রিন্ট আউট করে দিলেন। আমরা ফ্লিপকার্ট কাস্টোমার কেয়ারে যোগাযোগ করলে ওরা কোন রকম তথ্য দেবে না জানিয়ে দিল কারণ এটা ওদের প্রাইভেসি পলিসি ভায়োলেট করে।

তারপর আমরা বড়বাবুর তৎপরতায় কোলকাতা পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের দ্বারস্থ হলাম। ওরা ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিলেন। কারণ এ ধরনের অভিযোগ আকসার আসছিল এবং তদন্ত শুরু করলেন। ফ্লিপকার্টের সঙ্গে থ্রু প্রোপার চ্যানেলে যোগাযোগ করে তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য পাওয়া গেল। কোন আইডি থেকে অর্ডার প্লেস করা হয়েছে, কি কি প্রোডাক্ট, প্রোডাক্ট ডেলিভারী অ্যাড্রেস ইত্যাদি। আশ্চর্য ব্যাপার দেখা গেল, আমাদের পাশের শহরেরই কোন বাড়ির ঠিকানা। যথারীতি যেদিন কুরিয়ার ডেলিভারি হল সেদিন বড়বাবু পুলিশ নিয়ে হাজির হলেন। যে ভদ্রলোকের ঠিকানা দেওয়া ছিল, ওনাকে গ্রেপ্তার করা হল। থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর উনি বললেন, “বিশ্বাস করুন, আমি এগুলো অর্ডার দিই নি। আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিল ও কিছুদিনের জন্য শহরের বাইরে যাচ্ছে। তাই আমার ঠিকানায় কিছু জিনিসপত্র কুরিয়ারে আসবে। ও পরে এসে নিয়ে যাবে”।

“আপনার বন্ধুটি কে”?- বড়বাবু প্রশ্ন করলেন।
প্রশ্নের উত্তর শুনে অলকবাবুর বিশ্বাসই হচ্ছিল না।

কারণ, ওই গুণধর বন্ধুটি হলেন ওনার বড় জামাই দেবজ্যোতি।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন