বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ অক্টোবর ১৯৯২
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

২.৪

বিচারক স্কোরঃ ০ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

পার্থিব

পার্থিব জুন ২০১৭

পার্থিব ভালবাসা

পার্থিব জুন ২০১৭

নগ্নতা

নগ্নতা মে ২০১৭

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ২.৪ অবহেলা

কথা ঘোষ
comment ২  favorite ০  import_contacts ৭৯
শেষ বিকেলের সূর্য অস্ত গেছে সে অনেকক্ষণ হলো...পশ্চিম আকাশের বুকে এখনো লালচে আভায় রক্তসন্ধ্যা...দূরে কোথাও বউ কথা কও পাখি ডাকছে!সন্ধ্যা তারাটা বড় নিঃসঙ্গ ভাবে আকাশের বুকে জ্বলজ্বল করছে!
আকাশের ঐ সন্ধ্যা তারা টার সাথে নিজের জীবনের খুব মিল খুঁজে পায় মুক্তি।জীবনের শুরু থেকেই ঐ সন্ধ্যা তারা টার মতোই বড় একা ছিলো মুক্তি..
যে অল্প কিছু মানুষের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তার আত্মীক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো তারা কেউ ই জানেনা মুক্তির এই ঠিকানা।অনাথ শিশুদের এই মিশনারি স্কুলে মুক্তির চাকরি হয়েছে আজ সাত বছর..যদিও এমনি এক মিশনারিতেই জন্মের পর থেকে মুক্তির বেরে উঠা ..আজ বহুদিন কারো চিঠি পায়না মুক্তি।অথচ একটা সময় কারো চিঠির প্রতীক্ষাতেই কাটতো মুক্তির দিন রাত্রি....
বুঝতে শেখার পর যে মহিলা টিকে মা বলে ডাকার সৌভাগ্য মুক্তির হয়েছে তাকে সে হয়তো জীবনে গুনে গুনে চার কি পাঁচবার মা ডেকেছিলো।তবু মুক্তির চোখে তার মা ই এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা।সমাজের কঠোর নির্মম নিয়ম নীতি মুক্তির মাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর আর কিছু না দিলেও দিয়েছিলো 'বীরঙ্গনা' খেতাবী।মুক্তি একজন বীরঙ্গনার সন্তান এটাই ছিলো তার অপরাধ।মা এর শত ইচ্ছে থাকা সত্বেও সমাজ এর চাপের সম্মুখীন হয়ে একটি রাতের জন্য হলেও মা এর বুকে মাথা রেখে ঘুমানোর সৌভাগ্য মুক্তির হয়নি।তবু মা বলে তো কথা।যত টুকু মনে পরে আদর্শলিপি শেষ করার পর ভাঙা ভাঙা অক্ষরে সবচেয়ে প্রথম লেখা শুরু করেছিলো মুক্তি তার 'মা' কে।এর পর থেকে জীবনের অনেকটা সময় একটি হলুদ খামের প্রতীক্ষায় মুক্তি দিশেহারা হতো।ব্যস্ত হাইওয়ের দুরপাল্লার যানবাহনের মতোই ছুটে চলতো ছোট্ট মুক্তির চঞ্চল উচ্ছল মন টা।যেদিন মুক্তির মা এর চিঠি আসতো সেদিন হয়তো মুহুর্তের জন্য মুক্তির প্রতীক্ষার অবসান ঘটতো।হলদে চিঠির খাম টিকে বুকে জড়িয়ে মা এর হাতের ছোঁয়া টাকে অনুভব করতে চাইতো মুক্তি...নিজের অজান্তেই মুক্তির চোখ দুটি জলে ভরে উঠতো।এরপর হলুদ খামের মুখ খুলে দিয়ে মা এর বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা শত না বলা কথা গুলো কে মুক্ত করে দিত মুক্তি।
ভালোবাসা আর আদর মাখা সেই সব কথা গুলো বিশুদ্ধ অক্সিজেন এর মত মুক্তির শিরা ধমনী দিয়ে রক্তে মিশে যেতো। সেই চিঠি গুলোর প্রতিটা শব্দ কে হাজার বার পরেও যেন পড়ায় ক্লান্তি আসতো না মুক্তির।প্রতিবার পড়া শেষ হতেই পরম যত্নে চিঠিটা রেখে দিত বালিশের নিচে।পরক্ষনেই আবার হাতে তুলে নিতো।প্রতিটা রাতে বালিশের নিচে চিঠি গুলোকে সাজিয়ে রেখে ঘুমাতো মুক্তি।অনুভূতি টা এমন ছিলো যেন মায়ের বুকে মাথা রেখে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে সে...রাত শেষে সকাল হতেই পুনরায় শুরু হত আরো একটি নতুন চিঠির আশায় অপেক্ষার কালক্ষেপন।হঠাৎ একসময় মুক্তির মা এর চিঠি আসা বন্ধ হয়ে গেল।কিছুদিন পরে মা এর স্বামীর টেলিগ্রামে মা এর অন্ত্যষ্টিক্রিয়ার নিমন্ত্রণ পেল মুক্তি।মা এর মৃত্যুর পরের সময়টাতে মুক্তি বুঝতে পেরেছিল মুক্তিকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণায় কতোটা কাতর ছিল তার মা।মায়ের হৃদয়ের নিরব রক্ত ক্ষরণের যন্ত্রণা প্রতিটা মুহুর্তে যেন অনুভব করতো মুক্তি।সেই সময়টায় কত রাত নির্ঘুম চোখে আকাশের কোনো উজ্জল নক্ষত্রকে মা ভেবে কত শত কথা বলতো মুক্তি!মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হত মা এর সমাধিতে ছুটে যেতে।একবার মা এর সমাধির পাশে যেয়ে দাড়িয়ে মাকে বলতে আমাকে এতটা ভাল না বাসলেও পারতে মা...জানো মা আজও
রাতের পর রাত নির্ঘুম চোখে ছায়াপথে হেঁটে হেঁটে আমি হাজার নক্ষত্রের মাঝে তোমায় খুঁজি। খুব বেশী ক্লান্ত হলে শেষ রাতে একটু জিরিয়ে নিই পুরনো কোনো অশ্বথের ছায়ার নিচে।
আজ হঠাৎ কেন যেন রুদ্র কে খুব মনে পরছে মুক্তির..
রুদ্র কি ভুলতে পেরেছে মুক্তি কে?বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় টাতে রুদ্র প্রায়ই চিঠি লিখতো মুক্তিকে।মুক্তি রুদ্র দুজনই ছিলও নব্বই এর দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী।ক্লাস এর ফাঁকে সেই সময় টায় ছেলে মেয়েরা খুব বেশী গল্প আড্ডায় মাততো না।মিশনারীতে বড় হওয়া অতি সাধারণ মেয়ে মুক্তিকে আটপৌরে সাদা কালো শাড়ীতে সবার চোখেই হয়তো একটু বেশি ভাল লাগতো।তবে কেমন করে যেন রুদ্রর ভালো লাগা টা খুব অল্প সময় তেই ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিলো।নিজের অজান্তেই একসময় মুক্তি নির্ভরতার আকাশ খুঁজে পেয়েছিল রুদ্রর চোখে।মুক্তিকে লেখা রুদ্রর চিঠি গুলো ছিলো বড় মায়া ভরা।রুদ্রর প্রতিটা চিঠিতে মুক্তি খুঁজে পেত কল্পনার রঙে আঁকা স্বপ্নের হাতছানি।
রুদ্রকে প্রথম লেখা চিঠিটার প্রতিটা লাইন এখনো মনে আছে মুক্তির.....

""রুদ্র,
দলছুট এক গাঙচিল আমি!আমার মাঝে জানিনা কি খুঁজে পেলে তুমি!ঝড়ো বাতাসে নিজের ভার বহনে অক্ষম এক বিন্দু ক্ষুদ্র শিশির আমি.. আমি কি পারবো তোমায় আকড়ে রাখতে নিজের মাঝে??স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার ভাগ্য যে আমার কোনো কালেই ছিলো না!তবুও একটু ভালোবাসা পাবার লোভে আজন্ম আমার যতো কাঙালপনা....""

বছর তিনেক রুদ্রর দেয়া নীল খামে মোড়া অসংখ্য চিঠি এসে ছিলো মুক্তির ঠিকানায়।প্রতিটি চিঠিতে ছিলো অসংখ্য স্বপ্ন আর সুখের ছোঁয়া।এরপর সবটাই হয়ে গেল নস্টালজিয়া।শেষ বার মুক্তির চোখের দিকে তাকিয়ে শেষ বিদায় নেওয়ার সাহস হয়তো রুদ্রর হয়নি বলেই মুক্তিকে কিছু না বলেই মুক্তির জীবন থেকে বিদায় নিয়েছিল রুদ্র।মুক্তির আজোও জানে না কিসের কমতি ছিল মুক্তি আর রুদ্রর ভালোবাসায়!বিশ্বাস না অনুভূতি?যদিও মুক্তি জানে রুদ্রর পরিবার আর সমাজের চোখে বীরঙ্গনার সন্তান হওয়াটাই ছিল তার অপরাধ।কিন্তু রুদ্র!ও তো সবটাই জানতো তবে সব জেনে শুনে কেনো সে তার পরিবারকে বোঝাতে পারলোনা!মুক্তির জন্মটা তো তার অপরাধ না পাপ না...এই দেশের স্বাধীনতা পাওয়ার জন্য তার মা এর আত্মত্যাগের ফল মুক্তি।তবে কেন এই সমাজের মানুষের চোখে মুক্তির জন্য এতো অবহেলা...
মিশনারী স্কুলের বড় দিদিমনি এখন মুক্তি।অফিসের কাজে প্রায় ফ্যাক্স ইমেইল করতে হয় মুক্তিকে।তার নামে এখন প্রায় প্রতিদিনই আসে অনেক প্রানহীন ইমেইল আর ফ্যাক্স।কিন্তু বহুকাল মুক্তির নামে চিঠি আসেনা কারো,ঝরনা কলমের কালিতে সাদা কাগজের উপর কারো টানা টানা লেখা।যে লেখার প্রতিটি বর্ণে প্রতিটি শব্দে জড়ানো থাকে স্বপ্ন আশা আর ভালোবাসা।মুক্তি বুঝতেই পারেনি এতটা সময় পার হয়ে গেছে কখন!মিশনারীর ডরমেটরির দেয়াল ঘড়িতে ঢং ঢং করে রাত দশটার ঘন্টা বাজে।মুক্তি সিডি প্লেয়ারে গান অন করে....

"আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে
দিবস গেলে করব নিবেদন--
আমার ব্যথার পূজা হয় নি সমাপন।।""

রাত বাড়তে থাকে।প্রতিটি নির্ঘুম রাতের মতো আজও মিশনারীর বারান্দার হাঁটতে থাকে মুক্তি।হঠাৎ ৩০৬ নাম্বার রূমের খোলা জানালার পাশে এসে থমকে দাড়ায়।অথই,মিথি,মিষ্টি,বন্যা...পাশাপাশি বিছানায় শুয়ে আছে।এখানে আসা প্রতিটি শিশুই অনাথ ঠিক মুক্তির মতো।সমাজ সংসারের একটু অবহেলা মুক্তির মতো হয়তো ওদের ও অনাথ করে দিয়েছে..বড় মায়া মায়া এই মুখ গুলো বড্ড নিষ্পাপ...এই মুখগুলোর দিকে একবার তাকালে ওদের পাশে থাকার জন্য হলেও হাজার বছর বাঁচতে ইচ্ছে করে মুক্তির।রাত প্রায় শেষের দিকে একটু দূরেই সারি সারি নারিকেল গাছের পাতার ফাঁকে ভরা পূর্নিমার চাঁদ দেখা যাচ্ছে।বহুদূর থেকে ভেসে আসছে একটা রাত জাগা ডাহুকের শব্দ...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • অন্তরীক্ষ
    অন্তরীক্ষ গল্পের প্রতিটি শব্দ আমাকে স্পর্শ করেছে। হাড়িয়ে গিয়েছিলাম চিঠি লিখার সেই সময়টাতে। মুক্তির জন্য অনেক শ্রদ্ধা। আর মা, মায়ের জন্য সারাজীবনের ভালবাসা। অসাধারন লিখেছেন। ভোট দিয়েছি। পড়ার সময় অনেক আবেগী হয়েছিলাম। সত্যিই অসাধারন লেখার দরণ।
    প্রত্যুত্তর . ৩ এপ্রিল
  • মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
    মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী বাহ! খুব ভালো লাগলো। গল্পতে অনেক অনেক আবেগ ফুটিয়ে উঠেছে। সামনে আরও ভালো গল্প আশা করছি। ভোট দিলাম। শুভকামনা ও আমার পাতাই আমন্ত্রণ রইলো।
    প্রত্যুত্তর . ৫ এপ্রিল