বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯৮

বিচারক স্কোরঃ ২.৩৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৫ / ৩.০

গল্প - নগ্নতা (মে ২০১৭)

মোট ভোট ২২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯৮ "ল্যাংটা বাবা"

আহম্মেদ সিমান্ত
comment ৯  favorite ০  import_contacts ১৩৪
আজ থেকে ১৫ বছর আগের ঘটনা। আমি তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র। গ্রামের আর ১০টা ছেলেদের মত হইহুল্লর করে সময় পার করতাম।
দল বেধে নদীতে সাঁতার কাটা, বৃষ্টির দিনের কাদাজলে ফুটবল খেলা, নদীতে সখ করে মাছ ধরা, সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকালে ফিরে আসা। এরপর মায়ের একরাশ বকাঝকা এবং মাঝে মাঝে পিঠে কিছু উওম-মধ্যম।
হায়, কোথায় সেই দিন গুলো হারিয়ে গেল! হারিয়ে গেল সেই ছোট্টবেলার বন্ধুদের দল!
মন চায় সেই ছোটবেলার মত করে বন্ধুদের সঙ্গে বৃষ্টির দিনে ফুটবল খেলতে। আমাদের প্রিয় ডাকাতিয়া নদীতে সাঁতার কাটতে। আর মায়ের মিষ্টি সেই শাসন যদি আবার ফিরে পেতাম।
জানি এই সব আর কোন দিন ফিরে আসবে না জীবনে। শুধু স্মৃতির রাজ্যই এর উকিঝুকি মারবে।
আমার বাবা ছিলেন একজন সরকারি কর্মকতা। আমাদের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ছিলাম আমি, বাবা-মা এবং আমার প্রিয় দাদা-দাদি। গ্রামের বাড়িতে বাবা ছাড়া আমরা সবাই থাকতাম। প্রতি মাসে বাবা একবার করে বাড়িতে আসতেন তিন চার দিনের জন্য। সেই সময়টায় আমার কিযে ভালো লাগতো তা বুঝানো যাবেন। সব সময় বাবা অনেক কিছু নিয়ে আসতেন আমার জন্য। বাবার পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশ জুড়ে আমি জড়িয়ে ছিলাম। মা যখন খুব বকাঝকা করতেন আমাকে বাবা তখন বলতেন, কেন এত বকাঝকা করো ওকে? ও এখনো ছোট মানুষ বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
-আপনার এত আদর পেয়ে পেয়ে এই ছেলে দিন দিন বাদর হচ্ছে।
-আমি আদর করি, তুমি করো না?
- না, করি না। বাদরকে আদর করে আর বাদর বানানোর ইচ্ছে নেই আমার।
মায়ের কথা শুনে আমার খুব রাগ হতো তখন মায়ের ওপর। আমার বাবাটা কত্ত ভালো। আর মাটা খুব পঁচা।
তখনো বুঝতে পারিনি অথবা বুঝার চেষ্টা করিনি মায়ের ভালোবাসাটা কোথায় লুকানো ছিল। আর কেনই বা মা এত বকা দিত। জীবনে কি হতে পেরেছি জানি না। তবে যতটুকু হতে পেরেছি তা কেবল আমার মায়ে সেই শাসনের জন্যই হতে পেরেছি।
আসলে একটা পরিবারে সন্তানদের মানুষ করার মূল কারিগর হচ্ছেন মা। বাবা পরিবারের আয়ের দিকটা দেখেন, আর সমস্ত পরিবারের এবং ছোটদের সঠিক ভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব মায়েরাই পালন করেন। আমাদের নাদান মন ছোটবেলার মায়ের সেই ভালোবাসা মিশানো শাসনকে বুঝতে পারেন।
সিএনজি চালকের ডাকে আমার ভাবনার রাজ্যে ছেদ পড়লো।
-ভাই, আপনি এখানে নেমে পড়ুন। এখান থেকে একটা রিকশা চালককে বললেই হবে যে, আমি চাঁন্দের গ্রাম যাবো।
-অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।


শেষ পর্যন্ত আমার প্রিয় জন্মভূমি চান্দের গ্রামে এসে পৌছলাম। গত এক বছরে গ্রামটা অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিস্তৃত সেই সবুজের প্রান্তর আর নেই আগের মত। এখানে সেখানে ছোট-বড় বেশ কিছু নতুন বাড়ি হয়েছে। যে ডাকাতিয়া নদী ছিল আমাদের গর্ব এবং অহংকার সেই নদীর করুন অবস্থা দেখে চোখে পানি এসে গেল। নদীটা শুকিয়ে এখন খালের মত হয়ে গেছে।
আসলেই প্রকৃতির ওপর প্রতিনিয়ত আমরা মনুষ্যজাতি খুব বেশি অত্যাচার করে চলেছি। যার পরিনতিতে প্রকৃতিও প্রতি বছর আমাদের তার প্রতিদান দিয়ে যাচ্ছে। যার কারনে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ভূমিকম্প, ঝড়-জলোচ্ছাস, সুনামি কিছু না কিছু লেগেই থাকে।
গ্রামের বড় রাস্তাটা ধরে একটু বাম দিকে মোড় নিয়ে ছোট রাস্তাটা ধরে হাটছি বাড়ির উদ্দেশ্যে। পিছন থেকে কেউ একজন এসে আমাকে জাপটে ধরলো। পিছনে গাড় ফিরে তাকিয়ে দেখি কালু ভাই।
-কালু ভাই, কেমন আছেন?
-খুব ভালো। তুই কেমন আছিস অভি?
-জ্বি, আমি ভালো আছি।
-দূর থেকে দেখেই আমি তোকে চিনতে পেরেছি। শহরে গিয়ে তুই যতোই সাহেব হসনা কেন আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবি না।
-কালু ভাই, আমি কোন দিন সাহেব হতে চাইও না। আমি সব সময় আপনাদের সেই আগের অভি হয়ে থাকতে চাই।
এবার বলেন, ভাবি, আপনার বাচ্চারা কেমন আছে?
-সবাই ভালো আছে।
এইরে, তোর জামাটা নষ্ট করে দিলাম আমি। আসলে খেতে কাজ করছিলাম। তোকে দেখেই কাঁদাজল শরীর নিয়ে চুটে আসলাম।
-কালু ভাই, কোন সমস্যা নেই। এই মাটি, এই জলের মাঝে হেসে-খেলে আমার শৈশব- কৈশর কেটেছে। কত দিন এই মাটির ঘ্রাণ নেয়া হয় না। বরং আপনি আর একটু কাঁদাজল আমার শরীরে মেখে দিন।
- কিযে বলিসনা অভি! চল, বাড়ি চল।
কালু ভাইয়ের সাথে হাটা শুরু করলাম বাড়ির দিকে। বাড়ির পাশের ছোট রাস্তার ডান পাশে আমাদের পারিবারিক কবরস্থান। এখানেই শুয়ে আছেন আমার প্রিয় দাদিমা ত্রবং দাদাজি।
কালু ভাই, আপনি কি একটু দাঁড়াবেন, আমি দাদিমা এবং দাদাজির কবর জিয়ারত করে আসি।
-দাঁড়াব কিরে! চল আমিও তোর সাথে গিয়ে তাঁদের কবর জিয়ারত করে আসি।
- তা হলে চলেন।
এক বছর পর আমি বাড়িতে আসলাম। যদিও এই এক বছরে বাবা-মা কয়েক বারেই আমার কর্মস্থল রাঙ্গামাটি গিয়ে আমার কাছে কিছু দিন করে থেকে এসেছেন। এবার গ্রামটার কথা মনে পড়ছিল খুব। তাই আর থাকতে পালাম না। চলে আসলাম।
মায়ের সিমাহীন স্নেহ, ভালোবাসায় নিজেকে জড়ি রাখলাম।
-মা?
-কিছু বলবি?
-হ্যাঁ, বলবতো?
-বল কি বলবি।
-মা, আপনি আমাকে সেই ছোট বেলার মত শাসন করেন না কেন? আমার খুব আপনার বকা খেতে ইচ্ছে করছে।
-মা একটু হেসে বললেন, ছোট বেলায় তুই তো অনেক দুষ্টু ছিলি, তাই বকাঝকা শুনতি।
কিন্তু এখন তো তুই অনেক ভালো ছেলে। কোনো রকম দুষ্টামি করিস না। আমি তোকে অযথা কেন শাসন করবো বলতো?
-জানি না মা। মন চায় সেই ছোট বেলায় ফিরে যেতে। আপনার.....
কথাটা শেষ করতে পারলাম এর ভিতরে কালু ভাই রুমে এসে ডুকলেন।
-চাচি আম্মা, অভি আজ রাতের খাবার আমাদের বাড়িতে খাবে।
-কিন্তু আমি তো ওর জন্য রান্না করেছি।
-সেটা আমি জানি না চাচি আম্মা। যদি অভিকে রাতে আমি খেতে নিয়ে যেতে না পারি তবে সাজেদা আমাকে ঘরে ডুকতে দিবে না।
-কালু ভাই, আপনি দেখি ভাবিকে খুব ভয় পান।
-দাঁড়া, চাচা-চাচিআম্মা তো তোর জন্য মেয়ে দেখছে। একবার বিয়েটা কর তখন বুঝবি।
মায়ের সামনে এমন কথায় আমি খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম। লজ্জায় আমার মুখ লাল হয়ে গেল।
মা বললেন, তোরা বস আমি তোদেরকে চা দিচ্ছি।
মা যাবার পর আমি কালু ভাইকে বললাম, কালু ভাই, রেনু আপার কি খবর?
কালু ভাই লজ্জা পেয়ে বললেন, অভি আমি এখন যাই। রাতে তোকে নিতে আসবো।
-আরে দাঁড়ান দাঁড়ান।
না, কালু ভাই আর দাঁড়ালেন না। চা না খেয়েই চলে গেলেন। তিনি যাবার পর আমিও ১৫ বছর আগের স্মৃতির সাগরে ডুব মারলাম।



সময়টা তখন শীতের শেষের দিক। শীত যাই যাই করছিল। তড়িগড়ি করে কালু ভাই কোথায় থেকে এসে আমার রুমে ডুকলেন।
-অভি, তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে।
-জ্বি বলেন।
-আসলে তুই আমার অনেক ছোট। তারপরও কথাটা তোকে বলতেই হবে।
-কি এমন কথা কালু ভাই?
-দেখ, আমি জানি রেনু তোকে খুব স্নেহ করে এবং ভালোও জানে।
-তাতে কি হয়েছে।
-আসলে রেনুকে আমার খুব ভালো লাগে। তাকে আমি ভালোবাসি। তুই যদি তাকে কথাটা বলতি।
কালু ভাইয়ের কথা শুনে আমি মনে মনে বললাম, এই বেটা বলে কি! সে এত কালোর কালো তার দাঁত চাড়া শরীরের আর কোন অংশ চোখে পড়ে না। আফ্রিকার গহিন জঙ্গলের মানুষ এর চেয়ে ঢের র্ফসা। পাতিলের তলার কালোও কালু ভাইয়ের কাছে হার মানবে। আর সে কিনা রেনু আপার মত এত সুন্দর একটা মেয়েকে ভালোবাসে!
-কিরে চুপ করে আছিস যে?
-ভাই, আমি এটা পারবো না। বাবা-মা যদি জানতে পারে তবে আমাকে মেরে পিঠের ছাল তুলে নিবে।
-আমি বুঝতে পারছি অভি। আসলে রেনুকে আমি বললে কোন কাজ হবে না, আমি জানি। এখন তুইও না করে দিলি। আমার শেষ ভরসা এখন ল্যাংটা বাবার মাজার।
-ল্যাংটা বাবার মাজার!!! এটা আবার কেমন মাজার?
-এটা আমার পীরের মাজার।
-আপনার পীর কি ল্যাংটা থাকে নাকি?
-পীরসাহেব তো এখন নেই। তার খাদেমরা এখন মাজার দেখাশোনা করেন।
-কালু ভাই, আপনার পীরের নাম ল্যাংটা বাবা হলো কেন?
-তুই তাহলে শুন ঘটনাটা তোকে বলি।
বাবা তখনো ওতোটা বিখ্যাত হননি। তিনি সব সময় উদাম ল্যাংটা হয়ে ঘুরে বেড়াতেন। একদিন তিনি নদীর পাড়ে ধ্যানে বসলেন। ঐ দিক দিয়ে কিছু লোক নৌকা দিয়ে নদী পার হচ্ছিল। নৌকায় পুরুষ- মহিলা এবং বাচ্চারাও ছিল।
তারা বাবাকে এই অবস্থায় দেখে অনেক খারাপ এবং বাজে মন্তব্য করতে লাগলো। বাবার ধ্যান ভেঙ্গে গেল এবং খুব রাগ হলো ওদের ওপর।
এতটুকু বলে কালু ভাই একটু দম নিলেন। কালু ভাই আবার বলতে শুরু করলেন, এরপর বাবার পুরুষ অঙ্গটা সাপের মত লম্বা হয়ে মাথাটা বল্লমের আকার ধারন করলো। তারপর অনবরত নৌকায় আগাত করে অনেক গুলো গর্ত সৃষ্টি করে সব মানুষদের পানিতে ডুবিয়ে মারলো।
সেই থেকে ল্যাংটা বাবার নাম চারদিকে চড়িয়ে পড়লো।
অভি, তুইও আমার সাথে চল বাবার মাজারে।
আমার পেট পেটে হাসি বের হতে যাচ্ছে। কোনো রকম হাসি থামিয়ে বললাম, কালু ভাই, আমি মরে গেলেও কোন দিন এই সব ল্যাংটা-ফ্যাংটা ভন্ড বাবাদের মাজারে যাবো না। আপনার যেতে মন চাইছে আপনি যান।
-অভি, তুই এই সব কি বলছিস! ল্যাংটা বাবাকে নিয়ে তাচ্ছিল করলি! দেখিস তোর একটা না একটা বিপদ হবেই।
কালু ভাই উঠে তার ল্যাংটা বাবার মাজারের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
একটু পরে মা এসে বললেন, কিরে কালু আসছে কেন?
-বলছিল কোন ল্যাংটা বাবার মাজারে যাবে। আমি তার সাথে যাবো কিনা জানতে চাইলো।
-তুই কি বললি?
-না করেছি।
-ভালো করেছিস।
-মা, কালু ভাই এসব মাজারের ভক্ত হলো কি করে?
-সে অনেক বড় ঘটনা।
-তা বলেন আমি শুনি।
-আমার এখন হাতে সময় নেই। তোর বাবা আজ আসবে বাড়িতে, আমার রান্না করতে যেতে হবে। তুই এক কাজ কর তোর দাদিমার কাছে গিয়ে শুন।
-ঠিক আছে।



দাদিমা আমাকে কালু ভাইয়ের মাজার ভক্তির কারন বর্ননা করতে লাগলেন।-
কালুর কোন ভাই-বোন নেই। সেই তার বাবা-মার একমাত্র সন্তান। কালু জন্মের আগে তার চারজন ভাই-বোন জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের ২-৩ দিনের মাথায় একে একে সবাই মারা যায়। কালু যখন তার মায়ের পেটে আসে তখন তার মা নিয়ত করে ল্যাংটা বাবার মাজারে যায়। ল্যাংটা বাবা কালুর মাকে কিছু শর্ত দেয়। কালুর মা তার সন্তানের জন্যে সব শর্ত মেনে নেয়।
শর্ত নাম্বার ১- প্রতি মাসে একবার করে ৮ মাস পর্যন্ত কালুর মাকে ল্যাংটা বাবার মাজারে আসতে হবে।
শর্ত নাম্বার ২- আফ্রিকার কালো মানুষের মত তার একটা ছেলে সন্তান হবে। ছেলের নাম রাখতে হবে কালু মিয়া।
শর্ত নাম্বার ৩- কালু মিয়ার বয়স যখন ১৮ বছর হবে তখন তাকে ল্যাংটা বাবার মুরিদ করতে হবে।
অলৌকিক ভাবে ল্যাংটা বাবার ভবিষ্যৎ বানী সত্য প্রমানিত হয়ে যায়। কালুর গায়ের রং সব কালো মানুষের গায়ের রংকে হারমানায় এবং সে বেঁচেও যায়।
তার মা তার নাম রাখে কালু মিয়া। কালুর বয়স ১৮ বছর হবার পর তাকে ল্যাংটা বাবার মুরিদ করা হয়।
এই ভাবেই কালুর ভিতরে মাজার প্রীতি এসে যায়।
ও আচ্ছা, এই হলো কাহিনি।
সেদিন রাতেই আমার সারা শরীর কেপে জ্বর আসল। রাত যত বাড়তে থাকে আমার জ্বরের পরিমানও বাড়তে থাকে। জ্বর এমন অবস্থা গেল যে আমি কিছুক্ষন পর পর জ্ঞান হারাতে লাগলাম। জ্বরের গোরে আবল তাবল বকতে লাগলাম।
মাঝে মাঝে আমার কানে আমার মা এবং দাদিমার কান্না ভেসে আসতে লাগলো।
বাবা মাঝ রাতে ছুটে গেলেন ডাক্তারের বাড়িতে। বাবা-মা, দাদাজি-দাদিমার দোয়া, আল্লাহর রহমত এবং ডাক্তারে চেষ্টায় শেষ রাতের দিকে জ্বর কমতে শুরু করলো।
পুরোপুরি সুস্থ হতে আমার ১০ দিন লেগে গেল।
এক সপ্তাহ পরে কালু ভাই তার ল্যাংটা বাবার মাজার থেকে ফিরে আসেন। আমার মায়ের কাছে আমার অসুস্থতার
কথা শুনে আমাকে দেখতে আসেন।
-কিরে অভি, এখন কেমন আছিস?
-জ্বি ভালো।
-তোকে বলেছিনা ল্যাংটা বাবাকে তাচ্ছিল করায় তোর বিপদ হবে। এখন হলো তো। সামনে এই রকম ভুল আর করিস না।
আমি চুপ করে বসে ছিলাম। কোনো রকম কোনো কথা আর বলিনি।
কালু ভাই আরো কিছু সময় বসে গল্প করে চলে গেলেন। তিনি যাবার পর আমি ভাবতে লাগলাম, আমার জ্বরটা কি সত্যি কালু ভাইয়ের ল্যাংটা বাবাকে তাচ্ছিল করার কারনে হলো, নাকি জ্বর হবার আগের দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বন্ধুদের সাথে নদীতে ডুব দিয়ে দিয়ে মাছ ধরার কারনে হলো।


এরপর কেটে গেল কয়েকটা বছর। ল্যাংটা বাবার মাজারের এবং খাদেমদের তাবিজ, পানিপড়ার কোনো প্রভাব পড়েনি রেনু আপার ওপর। রেনু আপার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়।
রাগে দুঃখে কালু ভাইও ল্যাংটা বাবার মাজার ছাড়েন বেশ কয়েক বছর হলো।
তিনি পরবর্তিতে বিয়ে করেছেন সাজেদা ভাবিকে। শুনলে অনেকটা অবাক হবার মত কথা, কালু ভাই এবং সাজেদা ভাবি একে অপরকে পছন্দ করে বিয়ে করেছেন। সাজেদা ভাবি দেখতে রেনু আপার চেয়ে কোনো অংশে সৌন্দর্যে কম না।
একদিন সুযোগ পেয়ে ভাবিকে বললাম, আপনি কি দেখে কালু ভাইকে বিয়ে করলেন?
-দেবরজি, তোমার ভাইয়ের দেহের সৌন্দর্য হয়তো নেই, কিন্তু তার মনের সৌন্দর্যের কাছে অসংখ্য মানুষের দেহের সৌন্দর্য খুবেই নগন্য।
আমি ভাবির কথা শুনে বুঝতে পেরেছি এই মেয়ে অন্য ধাচে তৈয়ারি। যার কাছে মানুষের ভিতরের সৌন্দর্য বড় সৌন্দর্য।
গ্রামের পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে আমি চলে আসলাম ঢাকায়। পড়ালেখা করতাম তিতুমীর কলেজে আর থাকতাম মহাখালিতে।
বর্ষা তখন আসি আসি করছে। সকালে কলেজে যাবার সময় এক পশলা বৃষ্টি এসে ঢাকা শহরকে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। বৃষ্টির পর শহরটাকে কেমন যেন সতেজ এবং পবিত্র পবিত্র লাগছে।
গতকাল গ্রাম থেকে মায়ের একটা চিঠি এসেছে। চিঠিতে লিখেছেন আমার বড় খালার মেয়ে হাসনা আপা খুব দুঃখ করে মাকে চিঠি দিয়ে লিখেছেন, খালা, অভিটা ঢাকাতেই থাকে, অথচ একবারের জন্যও আমার বাসায় আসলো না। মহাখালি থেকে উওরা আর কতটুকু বা দূরত্ব!
আত্মীয়-সজন আসলে ওর দুলাভাই খুব খুশি হয়। আর আমি তো তার বোন হই। বোনের বাসায় কি ভাইয়ের আসাটা দায়িত্বের মাঝে পড়েনা?
খালা, আপনারা চার বোন। সবার মেয়ে সন্তান। আমরা চার পরিবারে ৭ জন বোন। আর অভি আমাদের সবার এক মাত্র ভাই। আর আমরা ওকে কত ভালোবাসি ওকি বুঝে না।
চিঠির শেষে মা লিখেছেন, অভি, বাবা যানা একবার হাসনার বাসায়। মেয়েটা তোকে কত স্নেহ করে আর তুই কিনা লুকিয়ে লুকিয়ে থাকিস।
বুঝতে পারছি মাকে ইমশনাল ব্লাকমেইল করা হয়েছে। তবে এটা সত্যি হাসনা আপা এবং আমার অন্য অন্য খালার মেয়েরা আমাকে খুব স্নেহ করেন। আমি যে উনাদের খালাত ভাই এটা তারা কোনো দিন মনেই করেন না। তারা মনে করেন আমি তাদের আপন ভাই।
সিদ্ধান্ত নিলাম আজ ক্লাসটা করে বিকাল বেলায় হাসনা আপার উওরার বাসাতে যাবো।


বিকাল ৫টায় উওরা এসে পৌছলাম। আমাকে যেতে হবে হাসনা আপার বাসা উওরার উওরখানে। বাস থেকে নেমে ফুট ওভারব্রিজটা মাএ পার হলাম, হঠাৎ কোথায় থেকে এক ল্যাংটা বাবা এসে আমার সামনে হাজির। আমার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বললো, দে, যা আছে দিয়ে দে। যদি না দিস আজ রাতেই তুই মরবি।
ল্যাংটা বাবার শরীরের এবং মুখের দুর্গন্ধে আমার ভিতরের নাড়িভুড়ি বের হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে।
সে আবার বললো, দে,যা আছে দিয়ে দে। না দিলে তুই আজ রাতেই মরবি।
আমি সিদ্ধন্ত নিলাম এই ল্যাংটা বাবা যত কথাই বলুকনা কেন আমি যে তাকে কিছু দিব না এটা নিশ্চিত।
জানি না সে আমার মনে কথা বুঝতে পেরেছে কিনা। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই সে আমার জামার কলার চেপে ধরল।
রাস্তার আশে পাশের সব মানুষ আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি বললাম, ছাড় আমাকে। আমি তোকে এক টাকাও দিব না।
সে আমার কথা শুনে বিড়বিড় করে কি যেন বললো। তারপর সে যে কাজটা করলো এত বছর পরেও তা লিখতে গিয়ে আমার শরীর ঘুলিয়ে আসছে।
আমাকে এবং রাস্তার মানুষদের চমকে দিয়ে সে আমার শরীরে প্রসাব করে দিলো।
ঘৃনায়, লজ্জায় তখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করেছিল। লজ্জার পরিমান আরো বেড়ে গেল, যখন রাস্তার মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে হাসাহাসি শুরু করলো।
সেই নাজেহাল অবস্থা থেকে বাঁচানোর জন্য একজন ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে আসলেন। ট্রাফিক পুলিশের জন্য সে যাত্রা বেঁচে গেলাম।
হাসনা আপার বাসায় আসার পর আমার অবস্থা দেখে এবং আমার মুখে সব শুনে আপা-দুলাভাই হাসতে হাসতে একে অন্যের গায়ের ওপর পড়তে লাগলো।
রাতে আপার বাসায় থেকে গেলাম। সে রাতে আমার ভয় ভয়ও করছিল। কারন ল্যাংটা বাবা বলেছিল তাকে কিছু না দিলে আজ রাতেই আমি মারা যাবো।
একবার কালু ভাইয়ের ল্যাংটা বাবাকে তুচ্ছতাচ্ছিল করায় কি বিপদেনা পড়লাম!
এই ল্যাংটা বাবা নাজানি আবার কি বিপদ নিয়ে আসলো আমার জন্য। কোন সমস্যা ছাড়া রাত কেটে সকাল হলো। ল্যাংটা বাবার অভিশাপের কোন প্রভাব আমার ওপর পড়েনি।
আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে বললাম, হে আল্লাহ, তুমি আবার প্রমান করলা সব কিছুর ভবিষ্যৎ একমাত্র তুমিই জানো। তুমি পরম করুনাময় এবং তুমিই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারি।
এইসব ল্যাংটা, ভন্ড বাবাদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করো।
জীবনে যত রকম দুঃখে,কষ্টে,বিপদে পড়িনা কেন একমাত্র তুমি ছাড়া আর কারো মুখপেক্ষি যেন হতে না হয়।
আমিন।






আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন