বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৮

বিচারক স্কোরঃ ২.১৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৬৫ / ৩.০

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট ১১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৮ "আত্মজা"

আহম্মেদ সিমান্ত
comment ২০  favorite ০  import_contacts ২১৮


আমাদের এই ছোট্ট জেলা শহর রাজশাহীতে আমার জন্ম। ছোট থেকে এখানে বেড়ে উঠেছি আমি। আমার পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশ জুড়ে আছে আমার মা। মা নাকি মেয়েদের সব চেয়ে বড় বন্ধু হয় সব সময়, অথচ আমি একটা ছেলে আর আমার কাছের বন্ধু, প্রিয় বন্ধু আমার মা। আমি নামের আমার যে একটা বই আছে তার প্রতিটা পৃষ্ঠা আমার মায়ের কাছে সব সময় খোলা।
বাবা যে আমাকে ভালোবাসে না তা বলব না, তবে বাবা সব সময় তার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
আমাদের জেলা শহরের মতো আমাদের ছোট্ট পরিবার। আমি আর আমার বাবা-মা। মাকে একদিন বললাম, আমার আর একটা ভাই-বোন হলে কত মজা হতো। মা বললেন, আল্লাহ চায়নি তাই হয়নি।
গত বছর MBA শেষ করার পর মা আমার পিছনে লেগে পড়েছে। - বাবা, আর কত দিন আমাকে এই ভাবে ঘুরাবি? তোর বাবা সব সময় তার ব্যবসা নিয়ে পড়ে থাকে। তুই বন্ধুদের সাথে বাহিরে আড্ডা দিয়ে বেড়াস। আমি একলা বাসায় পড়ে থাকি। আমার যে আর কিছুতেই সময় যেতে চায় না। এবার আমাকে একজন সঙ্গী আনার ব্যবস্থা করেদে। বাবা, তুই বিয়েতে রাজি হয়ে যা।
-মা আমি এখনো বেকার। মাত্র পড়ালেখা শেষ করলাম। আগে একটা চাকরি পাই তারপর।
-তোর চাকরি করতে হবে কেন? তুই তোর বাবার সাথে তার ব্যবসা দেখাশোনা কর।
-মা, আমি পড়ালেখা করেছি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য, বাবার ব্যবসা দেখার জন্য না।
মা মন খারপ করে চলে গেল। জানি মাকে কষ্ট দিয়ে পেলাম। কিন্তু আমার একটা চাকরি আগে প্রয়োজন।
পরের বছর মোটামোটি ভাল একটা চাকরি পেয়ে গেলাম। একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে। রাজশাহী ছাড়াও ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটে ওদের ব্রাঞ্চ আছে। ভাগ্য ভাল বলতে হবে, কম্পানি তাদের রাজশাহী অফিসেই আমাকে নিয়োগ দিয়েছে।
এবার মায়ের হাত থেকে বাঁচা মুশকিল আমি জানি। সকালে নাস্তার টেবেলে বাবার সামনে মা বিয়ে কথা উঠালেন।
-হিমেল?
-জি মা।
-আমি আর তোর বাবা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোর বিয়ের ব্যাপারে।
-কিন্তু মা....
- কোন কিন্তু না। আমরা যা বলব তোকে তাই করতে হবে।
বাবাও পাশ থেকে মায়ের কথার সাথে একেই সুরে কথা বললেন।
-ঠিক আছে তোমাদের যা ভালো মনে হয় তোমরা করো।
বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পর মা বললেন, হিমেল?
-জি মা।
-বাবা, তোর কোন মেয়েকে কি পছন্দ করা আছে?
-না মা সে রকম কেউ নেই।
-কি বলছিস বাবা! বর্তমান যুগের ছেলে-মেয়েরা প্রেমটেম করে আর তুই কি না...।
-মা, আমার ওসব প্রেম করার সময় ছিল না। পড়ালেখা আর খেলাধুলাই ছিল আমার প্রেম। তুমি তোমার পছন্দ মতো মেয়ে দেখ, তুমি যাকে পছন্দ করবে আমি তাকেই বিয়ে করব।
-আমার পছন্দ যদি তোর ভালো না লাগে।
-লাগবে মা। তোমার পচন্দই আমার পছন্দ।
এর পরের দুই মাস মা শুধু একটার পর একটা মেয়েই দেখে গেল কিন্তু কোন মেয়েকেই তাঁর পুত্রবধু হিসেবে পছন্দ হয় না।
শেষে আমার ছোট মামার মেয়ে রিমি একটা মেয়ের সন্ধান দিল আমার মাকে। মেয়ের নাম হুমায়রা। রিমির বান্ধবী। এ বছর রিমির সাথে রাজশাহী ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজকল্যানে অনার্স পাস করেছে। তাদের বাসাও রাজশাহী শহরে।
হুমায়রাকে এক দেখাতেই আমার মায়ে পছন্দ হয়ে গেল। মা যে রকম মেয়ে এত দিন খুজছিল হুমায়রা নাকি দেখতে সেই রকম।
আমার কাছে হুমায়রার প্রশংসা করতে করতে মা অস্থির। আমি বললাম, মা তুমি থামো। তোমার পছন্দ হয়েছে এটাই যতেষ্ট।
-তারপরও তুই একবার গিয়ে দেখে আয়।
-আমার দেখতে হবে না মা। তুমি দেখেছ তাতেই হবে।
সব চেয়ে মজার ব্যপার হুমায়রাও আমাকে দেখতে চায়নি। তার বাবা-মার পছন্দে বিয়েতে রাজি হয়ে গেল।


মহাধুমদামের সাথে আমার আর হুমায়রার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো।
বাসর রাতটা প্রতিটি নারী-পুরুষের জন্য একটা খুবেই গুরুত্বপূন্য রাত। আমার আর হুমায়রার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই রাতের স্মৃতি আমার মনে থাকবে।
লাল বেনারশি শাড়িতে লম্বা একটা গোমটা দিয়ে হুমায়রা বসে আছে। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। তার গোমটা টা একটু উঠিয়ে তার দিকে চাইলাম। সে চোখ বন্ধ করে আছে। এই প্রথম তাকে আমি দেখলাম। আমার বার বার কবি গুরু রবি ঠাকুরের "হৈমন্তি" গল্পের হৈমন্তির কথা মনে পড়ছিল।
"আমি পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম।"
এক স্বর্গের অপ্সরী বসে আছে আমার সামনে। আমার মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছিল না।
এক মধুর অনুভুতির মধ্য দিয়ে সেই মধুর রাতটা আমরা পার করলাম।
২ মাসের মধ্যেই আত্মিয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি, আমার বাবা-মার মন জয় করে বসে আছে হুমায়রা।
যেই হুমায়রাকে দেখে, তার সাথে কথা বলে সেই পরে বলে, হিমেলের বউটা কি সুন্দর, কি লক্ষী একটা মেয়ে। কত সুন্দর করে কথা বলে।
মানুষের কথা শুনে গর্বে আমার বুক ফুলে উঠে। অন্য রকম একটা আনন্দ বয়ে যায় মনে।
কিন্তু সমস্যা অন্যখানে। হুমায়রা আমার মায়ের ভালোবাসায় ভাগ বসাচ্ছে। আগে মায়ের সব ভালোবাসা আমি পেতাম কিন্তু এখন হুমায়রারও সেখানে ভাগ চাই।
মা আমাকে খাইয়ে দিতে চাইলে বলবে, মা, এটা হবে না। আপনি ছোট কাল থেকে ওকে খাইয়ে দিয়েছেন ঠিক আছে। কিন্তু এখন আপনার সন্তান কিন্তু দুইজন। ওকে নিজ হাতে খাইয়ে দিলে আমাকে দিতে হবে।
আমরা দুজনেই সব সময় মাকে আমাদের নিজ নিজ পক্ষে পাবার জন্য খুনসুটি করতাম। মা পড়েছে মিষ্টি যন্ত্রনায়। শেষে মা বললেন, আমি দুজনের পক্ষে। আজ থেকে দুজনকেই খাইয়ে দিব।
আমি ঠিক জানি না পৃথিবীতে আমার মায়ের মত কয়জনের মা আছে। বর্তমান বাংলার বেশির ভাগ ঘরে বৌ-শ্বাশড়ীর একটা না একটা গন্ডগোল লেগেই থাকে। কিন্তু আমাদের ঘরে আমার মা হুমায়রা ছাড়া কিছুই বুঝে না আর হুমায়রাও মায়ের আচলের নিচে থাকতে পছন্দ করে।
মাঝে মাঝে আমি বলি, সারাক্ষণ মায়ের কাছে থাকো কেন? স্বামীর দিকে কি কোন খেয়াল আছে?
-তুমি যে কি বলো না! সংসার জীবনে মায়ের অনেক বছরের অভিগতা। মায়ের কাছে কাছে না থাকলে এসব শিখব কি করে।
-আচ্ছা ঠিক আছে বুঝলাম। এবার একটু আসো, ফুটবল খেলি।
-যাও এখান থেকে। লাজ-লজ্জা কি গেল সব তোমার?
-বারে নিজের স্ত্রীর সাথে ফুটবল খেলব তাতে লজ্জার কি আছে।
- সত্যি দিন দিন তুমি খুব র্নিলজ্জ হয়ে যাচ্ছো। রাত মাত্র ৯ টা বাজে আর তুমি এখন আসছো...। আমি যাই বাবা-মাকে খাবার দিতে হবে।
রাত ১১ টা। আমার হালকা চোখ লেগে ত্রসেছিল। হুমায়রা কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলছিল, হিমেল, আসো আমরা ফুটবল খেলি। তার কথা শুনেই আমার ঘুম পালালো। ভনিতা করে বললাম, আমি ছোট মানুষ। আমি এসব ফুটবল খেলতে পারি না।
-ওরে আমার ন্যাকারে। দাঁড়াও দেখাচ্ছি তোমার না পারা।
আমার ওপর জাপিয়ে পড়ল হুমায়রা। আমি বললাম, ছাড়ো ছাড়ো আমি কিন্তু মাকে ডেকে বলব তুমি আমার ইজ্জত কেড়ে নিচ্ছো।
-ডেকে বলো দেখি।
-আমি কি পাগল মাকে ডাকব। আরো গভির ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলাম হুমায়রাকে।


আমার আর হুমায়রার বিয়ের ২য় বছর। খুব খুশির এবং আনন্দের সংবাদ দিয়েছিল সকাল বেলায় হুমায়রা আমাকে।
খুশি যে কেবল আমি তা না। আমার চেয়ে হাজার গুন খুশি হুমায়রা, তার চেয়েও কয়েক গুন খুশি আমার বাবা-মা।
হুমায়রা মা হতে চলেছে, আমি বাবা। ওহ, এর চেয়ে বড় কোন আনন্দের সংবাদ হতেই পারে না এখন আমাদের পরিবারে।
সংবাদটা খুব দ্রুত চার পাশে চড়িয়ে পড়ল। আত্মিয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশির শুভকামনা আসতে লাগল।
প্রতিমাসে আমি, মা হুমায়রাকে নিয়ে রাজশাহীর নাম করা গাইনি ডাক্তার ফাতেমা হামিদের কাছে নিয়ে যেতাম। সব ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু ৭ মাসের মাথায় ডাক্তার ফাতেমা হামিদ হুমায়রার আল্ট্রাসনোগ্রাম রির্পোট দেখে গম্ভির হয়ে গেলেন। বলেন, বুঝতে পারছি না এক মাসের ভিতর এই রকম পরির্বতন হলো কি করে! তিনি আরো ২ বার আল্ট্রাসনোগ্রাম করালেন। রিপোর্ট একেই রকম।
আমি বললাম, ডাক্তার ম্যাডাম, কোন সমস্যা?
- বড় একটা সমস্যা মনে হচ্ছে। আপনারা একটা কাজ করুন উনাকে রাজশাহীতে না রেখে ঢাকায় নিয়ে যান। আমি রেফার করে দিচ্ছি ঢাকা ইভনেসিনা হসপিটালে, আমার পরিচিতি খুব ভাল একজন ডাক্তারের কাছে। আমার মনে হয় এখান থেকে ঐ খানে উনার ডেলিভারি হলে ভাল হবে।
-মা-এবং আমি বললাম, আপনি যা ভালো মনে করেন ম্যাডাম।
-আমি রির্পোট গুলো দিয়ে দিচ্ছি এবং উনাকে ফোনে সব কিছু বলে দিব। আগামি ৩ মাস উনার অধীনে থাকবে আপনার স্ত্রী।
-ঠিক আছে ম্যডাম।
আমরা ঢাকায় গিয়ে বড় মামার বাসায় উঠলাম। ডাক্তার জহির উদ্দিন সব রির্পোট দেখলেন। তিনি হুমায়রার চেকআপ করলেন।
বললেন, দেখুন নরমাল ডেলিভারি হবে বলে মনে হচ্ছে না। তারপরও আমরা একটা মেডিকেল বোর্ড বসাব। যদি সম্ভাব হয় নরমাল ডেলিভারি হবে তা না হলে সিজার করাতে হবে।এরপর তিন মাস আমরা ডাক্তারের কথা মতোই চললাম। কিন্তু নিদিষ্ট দিনেও হুমায়রার পেইন উঠল না। একদিন পর ভয়াবহ ভাবে পেইন উঠল। কিন্তু বাবু ডেলিভারি হচ্ছে না। অবস্থা খুব খারাপের দিকে যাচ্ছে।


-ডাক্তার জহির উদ্দিন সাহেব এসে আমাকে বললেন, অবস্থা এমন এক পর্যায়ে সিদ্ধান্ত এখন আপনাকে নিতে হবে, আমি কি করবো।
-কি হয়েছে ডাক্তার সাহেব?
-নরমাল ডেলিভারিতে বাচ্চার মায়ের জীবন বাঁচাতে আমরা পারবো না, যদিও বাঁচা মরার মালিক আল্লাহতালা। আর সিজার হলেও বাচ্চা যে জীবিত হবে তার কোন গ্যারান্টি নেই। কারন মায়ের পেটে বাচ্চার নড়াচড় বন্ধ হয়ে গেছে। আমার ৩৫ বছরের ডাক্তারি জীবনে এই রকম জটিল পরিস্থিতিতে আমি পড়িনি।
প্লিজ তাড়াতাড়ি বলুন কি করবো?
আমি সে দিন স্বার্থপরের মত বললাম, ডাক্তার সাহেব, হুমায়রা বেঁচে থাকলে সে আবার মা হতে পারবে। আপনি যে করে হোক হুমায়রাকে বাঁচান।
-ঠিক আছে আমি দেখছি।
২ ঘন্টা পর ডাক্তার অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসলেন। গম্ভির মুখে আমাকে বললেন, হিমেলসাহেব, আপনার খুব সুন্দর একটা মেয়ে বাবু হয়েছে এবং সে সুস্থ্য আছে।
-হুমায়রার কি অবস্থা ডাক্তার?
-সরি, আমরা মাকে বাঁচাতে পারলাম না।
-আমি চিৎকার করে বললাম, কেন ডাক্তার? আমি আপনাকে কত করে বললাম আমার সন্তান চাই না আমার হুমায়রাকে চাই।
-দেখুন আমি আপনার কথা মতোই কাজ শুরু করতে যাচ্ছিলাম কিন্তু আপনার স্ত্রী আমাকে বলল, আমি জানি আমার বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। আপনার কাছে আমার একটা অনুরুদ, আমি যদি মরে যাই আমাকে মরে যেতেদিন কিন্তু দয়া করে আমার বাবুকে নরমাল ডেলিভারি হতেদিন।
আমি মা হবার সেই সুখের যন্ত্রনাটা পেতে চাই। আপনি সিজার করবেন কিন্তু আমি বুঝতেই পারব না ওকি আমার সন্তান না অন্য কারো।
-কিন্তু আপনার স্বামী যে বলেছে...।
-ও আমাকে খুব ভালোবাসে এই কারনে হয়তো অনেক কিছু বলতে পারে। আজ যদি আমি মরে যাই তবে সে আমার এই সন্তানের মাঝেই আমাকে খুজে পাবে।
-কিন্তু..
-কোন কিন্তু না ডাক্তার সাহেব। আজ যদি আমি বেঁচে যাই আর আমার সন্তান যদি পৃথিবীর মুখ দেখতে না পায় তবে আমার বেঁচে থাকা আর না থাকা সমান।
হিমেলসাহেব, আমরা বহুত চেষ্টা করেছি মা-বাচ্চা দুজনকেই বাঁচাতে। কিন্তু....। সরি।
একটু একটু করে আমার সারা পৃথিবী অন্ধকার হয়ে এলো। মা-বাবা, রিমি, মামা-মামী, হুমায়রার বাবা-মায়ের কান্নায় হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে গেল।
আমার এত দিনের সব শিক্ষা সব জাহালিয়াতের অন্ধকার যুগে চলে গেল। আমার সকল রাগ, অভিমান গিয়ে পড়ল জন্ম নেয়া ছোট বাবুটার ওপর। একটু পর ছোট একটা পুতুলের মতো বাবু আমার সামনে ধরে রিমি বলল, হিমেল ভাই, দেখ হুমায়রা কি সুন্দর এক মেয়ে বাবু তোমাকে উপহার দিয়ে গেল।
- সরাও এই অপয়া মেয়েকে আমার সামনে থেকে। ওর জন্য আজ আমাকে হুমায়রাকে হারাতে হয়েছে।
-হিমেল ভাই, তুমি কি পাগল হলে? কি বলছ এসব?
এই নিঃশ্বপাপ বাবুটার কি দোষ?
-সব দোষ ওর। ওর জন্যই অকালে হুমায়রাকে চলে যেতে হলো।
-সত্যি হিমেল ভাই, তুমি পাগল হয়ে গেলে।
বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে অঝর ধারায়। আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল হুমায়রা আমাদের ছেড়ে চলে গেল না ফেরার দেশে।
জানালার পাশে বসে ভাবছি সেই সব সোনালী মিষ্টি দিন গুলোর কথা। কত আনন্দের, কত সুখেরনা ছিল আমার আর হুমায়রার কাটানো সেই সব দিন গুলো। আর কোন দিন ফিরে আসবে না হুমায়রা, ফিরে আসবে না সেই সময় গুলো।
না, এই রাজশাহী শহরে, এই বাড়িতে আর থাকবো না। আমি যে দিকে তাকাই ঘরের সব জায়গায় শুধু হুমায়রার চিহ্ন চড়িয়েচিটিয়ে আছে।
সিদ্ধান্ত নিলাম বদলি হয়ে কম্পানির সিলেট ব্রাঞ্চে চলে যাবো। এই শহরে আর ফিরব না। কোন দিন না।
গত এক সাপ্তাহ থেকে ছোট বাবুটা শুধু কেঁদেই চলেছে। রিমি আপ্রান চেষ্টা করছে তার কান্না থামাতে। এই এক সপ্তাহ আমি একবারের জন্যও ঐ অপয়া মেয়েটার মুখ দেখিনি।
আবার মেয়েটা চিৎকার করে কান্না শুরু করলো। আমার মেজাজ চরমে উঠে গেল। চিৎকার করে বললাম, কেউ কি এই অপয়াটার কান্না থামাবে? নাকি আমি ওর গলা টিপে মেরে পেলবো।
রিমি বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ওকে তাদের বাসায় নিয়ে গেল।
এর তিন দিন পর মা-বাবা, হুমায়রার মা-বাবা সবার সব বাধা অমান্য করে সিলেট চলে আসলাম। রিমি ভয়ে ছোট বাবুটাকে আর এক বারের জন্যও আমার আশেপাশে নিয়ে আসেনি।


আজ ৩ বছর আমি সিলেটে। এই ৩ বছরে একবারের জন্যও রাজশাহী শহর যাওয়া হয়নি। মা-বাবা, বার বার যেতে বলেছে বাট আমি যাইনি। কেন যাব? কার কাছে যাব?
যে ভালোবাসার ঢালা সাজিয়ে বসে থাকত আমার জন্য আজ সেই যখন নেই তবে কি লাভ সেখানে গিয়ে।
আর ঐ অপয়া মেয়েটাকে দেখার কোন ইচ্ছে নেই আমার। ওকে দেখলেই মাথায় রক্ত উঠে যাবে।
তার চেয়ে এই আছি, বেশ আছি।
গতকাল বাবা ফোন করেছে। মা নাকি খুব অসুস্থ্য। বার বার আমাকে দেখতে চাইছে। মার জন্য খুব খারাপ লাগছে। কত ভালোবাসে আমাকে, আর আমি গত তিনটা বছর একবারের জন্যও তাকে দেখতে গেলাম না। খুব একটা অপরাধবোধ কাজ করছে।
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে হুইচাল বাজিয়ে আপন গতিতে চুটে চলছে ট্রেন। পিছনে চলে যাচ্ছে গ্রাম-গঞ্জ, নদী-নালা, খাল-বিল। শীতের পরিমানটা রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তেই লাগল। চাদরটা ভাল করে শরীরের জড়িয়ে ট্রেনের ভিতরে বসে রইলাম। আমার ভাবনার রাজ্যে আবার হুমায়রার স্মৃতিরা এসে ভিড় করতে লাগল। এটাসেটা চিন্তা করতে করতে ট্রেনে ঘুমিয়ে পড়লাম। এক ঘুমে সকাল ৭টা। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখি রাজশাহী শহরে এসে গেছি।
বাসায় যেতে যেতে ৮টা বেজে গেল। গিয়ে দেখি সত্যি মা খুব অসুস্থ্য। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাদতে লাগলেন। ৩ বছর পর আমাদের মা-ছেলের দেখা।
বসে বসে মায়ের সাথে কথা বলছিলাম, হঠাৎ কোথায় থেকে একটা ছোট বাবু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আব্বু আব্বু। ছোট আম্মু আব্বু এসেছে।
বাবুটার মুখ দেখে আমার সারা পৃথিবী কেপে উঠল। এ কি! এই আমি কাকে দেখছি! এতো হুবহু....।
আমার এত দিনের সব রাগ, অভিমান সব বরফের মত গলতে লাগল। মন চাইছে বাবুটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটু কান্না করি। কিন্তু মা-বাবা দুজনেই আমার দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জা লাগছিল খুব আমার।
রিমি কোথায় থেকে দৌড়ে এসে বাবুটাকে কোলে নিয়ে বলল, না আম্মু উনি তোমার আব্বু না। চলো, চলে এসো এখান থেকে।
-ছোট আম্মু, আব্বু।
-বললাম তো উনি তোমার আব্বু না।
রিমি বাবুটাকে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল। আমি মাথা নিচু করে চুপ করে বসেছিলাম।
বাবা বললেন, হিমেল, চিনতে পেরেছিস বাবুটা কে?
মা বললেন, ও তোর মেয়ে। না না আমি ভুল বলছি। এ হুমায়রার আর রিমির মেয়ে।
দেখলি কত সুন্দর লাগছে ওকে দেখতে। হুবহু হুমায়রার কার্বনকপি।
তুই তো জানিস না, রিমিই এখন ওর পৃথিবী আর রিমির পৃথিবী ও। রিমি তার নাম রেখেছে "অথৈ"। অথৈকে দেখাশুনা রিমিই করছে।
আচ্ছা আমি এসব কথা তোকে বলছি কেন? তুই তো দুই দিনের জন্য এসেছিস। কালকেই তো আবার চলে যাবি সিলেটে। যা গিয়ে রেস্ট নে। তবে বাবা একটা কথা বলি, মনে হয় জীবনে বড় ধরনের একটা ভুল করেছিস। ভুল বললেও ভুল হবে। পাপ করেছিস।
রাত ২টা। সমস্ত রাজশাহী শহর নিরব নিস্তব্ধ। গলির শেষ মাথায় দুই-তিনটা কুকুর মাঝে মাঝে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে উঠছিল। ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে সব মানুষ। আমার দু চোখে ঘুম নেই।
এ আমি কি করলাম! এত বড় পাপ কি করে করলাম! মৃত্যুর পর আল্লাহর কাছে কি জবাব দিব। হুমায়রাকে কি বলব। অথৈ যখন বড় হয়ে আমাকে প্রশ্ন করবে, আব্বু আমার কি অপরাধ ছিল? কেন তুমি আমাকে তোমার স্নেহ, ভালোবাসা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে? তখন আমি কি জবাব দিব তাকে।
রাতে চুপিচুপি রিমি আর অথৈ এর রুমে গেলাম। রিমিকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে অথৈ। ঘরের ডিমলাইটের আলোয় অথৈ এর মায়াবী মুখটা আরো মায়াবী লাগছে। তার বিচানার পাশে হাঠু গেড়ে বসে পড়লাম। তার ছোট কোমল একটা হাত আমার দু হাতের মোঠুতে নিয়ে বসে কাদতে লাগলাম।
মনে মনে বললাম, আম্মু আব্বুকে ক্ষমা করে দাও। এই পৃথিবীতে আমার মত পাষন্ড আব্বু যেন কার না হয়। শেষ রাতে তার কোপালে চুমু দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।


পরের দিন রাজশাহী থেকে সিলেটে চলে আসলাম। তার দুই দিন পর অফিসের সব কিছু আমার স্যারকে বুঝিয়ে দিয়ে চাকরি থেকে রিজাইন দিয়ে রাজশাহী ফিরে আসলাম।
আমাকে দেখে সবাই তো অবাক। মাকে বললাম, চাকরিটা চেড়ে দিয়েছি। আজ থেকে বাবার সাথে তার ব্যবসা দেখাশোনা করবো। মা তো খুব খুশি আমার কথা শুনে।
রিমি এসে বলল, ফুফি, তাহলে আজ থেকে আমি অথৈকে নিয়ে আমাদের বাসায় থাকবো। আমি চাই না আমার মেয়ে কারো সমস্যার কারন হোক।
আমি বললাম, আমার কোন সমস্যা নেই, তোমরা এখানেই থাকো।
আমার পাশ থেকে মা বললেন, আমার নাতনিকে না দেখে আমি এক মিনিটও থাকতে পারবো না। রিমি তুই অথৈকে নিয়ে এখানেই থাক।
-কিন্তু ফুফি....
-না আমি কোন কিন্তু শুনবো না।
-আচ্ছা ঠিক আছে আপনি যা বলবেন তাই হবে।
এরপর থেকে বাবার সাথে কাজ শুরু করলাম। প্রতিদিন অফিসে যাবার আগে লুকিয়ে লুকিয়ে অথৈকে দেখতাম। তাকে দেখা মানি হুমায়রাকে দেখা সমান কথা। মানুষে মানুষে এত মিল কি করে হয় জানি না!
ছোট ছোট পা পেলে সারা ঘর চষে বেড়ায় সে। কখনো আমার সামনে পড়লে আব্বু বলে ডাকে। কিযে ভাল লাগে তখন আমার তা আমি কাউকে বুঝাতে পারবো না। কিন্তু রিমি সব সময় তাকে চোখে চোখে রাখে। আমার সামনে আসার সুযোগ খুব কমেই হয় তার। যদিও মাঝে মাঝে হয় রিমি দৌড়ে এসে ওকে নিয়ে চলে যেত।
প্রতি রাত ২টা- ৩টার সময় আমি চুপিচুপি রিমি আর অথৈ এর রুমে যেতাম। অথৈ এর মাথার পাশে বসে তার চুলে বিলি কেটে দিতাম। মনে মনে গোপনে কত কথা যে বলতাম তার সাথে তার হিসাব নেই।
একদিন রাত যেই না অথৈ এর বিচানার পাশে বসলাম, ওমনি রিমি বলল, কে? কে এখানে।
আমি উঠে চলে আসার জন্য পা বাড়ালাম।
-রিমি বলল, দাড়াও হিমেল ভাই।
আমি স্টেচুর মতো দাড়িয়ে পড়লাম।
-তুমি এত রাতে ত্রখানে?
-না, মানি....
-হিমের ভাই, অথৈকে দেখতে এসেছো তাই না? ও আসলে দেখতে এমনি, যে ওকে একবার দেখে সে ওকে বার বার দেখতে চাইবে।আর তুমি তো তার বাবা।
তোমার মনে আছে হিমেল ভাই, হুমায়রাকেও সবাই এই ভাবে দেখতে চাইত, কথা বলতে চাইত। ও তো ওর মায়ের মতোই দেখতে হয়েছে।
-আমাকে ক্ষমা করে দাও রিমি।
-অপরাধ তো তুমি আমার কাছে করনি। আমি ক্ষমা করার কে হিমেল ভাই? ক্ষমা যদি চাইতে হয় তুমি অথৈ এর কাছে চাও, হুমায়রার কাছে চাও, আল্লাহর কাছে চাও। এই তিনজনের কাছে তুমি অপরাধী।
-চাইবো রিমি, নিশ্চয়ই চাইবো।
-হিমেল ভাই, কাল সকাল থেকেই তুমি তোমার মেয়েকে কাছে পাবে। আমি এমন ভাবে সেই ছোট্টটি থেকে তাকে শিক্ষা দিয়ে আসছি যেন সে তোমাকে, হুমায়রাকে কোন দিন ভুলে না যেতে পারে। তুমি কি খেয়াল করেছো প্রথম যেদিন সে তোমাকে দেখল সে দিনেই আব্বু আব্বু বলে জড়িয়ে ধরেছিল। আমি তোমার আর হুমায়রার ছবি দেখিয়ে শিখিয়েছি এরা তোমার বাবা-মা, আরো ওকে শিখিয়েছি আমাকে ছোট আম্মু বলতে।
হিমেল ভাই, আমি কোন দিন হুমায়রার স্থানটা দখল করতে পারবো না এবং আমি তা চাইও না। হুমায়রা এমন এক মেয়ে, এমন এক নারী যে সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে গিয়ে নিজে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। সেই মহীয়সী নারীকে তার সন্তান বড় হয়ে চিনতে পারবে না, সেটা আমি কোন দিন মেনে নিতে পারিনি। তাই গত তিন বছর থেকে ওকে আমি শিখিয়েছি, দেখিয়েছি তার সত্যিকার মা কে।
-তোমার এই ঋণ আমি কি করে শোধ করব রিমি?
-হিমের ভাই, তোমার আর হুমায়রার বিয়ের মধ্যস্থতা আমি করেছি। সে কেবল আমার ভাবী ছিল না, সে ছিল আমার সব থেকে কাছের বান্ধবী। যা আমি করেছি সবটাই হুমায়রার এবং অথৈ এর জন্য করেছি।
তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি এখন যাও হিমেল ভাই, রাত প্রায় শেষ হয়ে এলো।


পরের দিন আর অফিসে গেলাম না। আজ আমি আমার আত্মজার সাথে খেলব, সারা দিন গল্প করবো। আজ আর আমাদের বাবা-মেয়ের মাঝে কোন বাধা রইলো না। আমার কাছে আসতে রিমি আর অথৈকে কোন বাধা দিল না।
আমাদের এই বাবা-মেয়ের মিলনে খুশি আমাদের পরিবারের সবাই।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলো রাতে। অথৈ আমাকে ছাড়া ঘুমাবে না আবার তার ছোট আম্মুকে ছাড়াও ঘুমাবে না। আমরা যে কেউ তার চোখের আড়াল হলেই কান্না শুরু করে দেয়। তার পাশে সে তার আব্বুকেও চায়, আবার ছোট আম্মুকেও। কাউকেই সে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।
আমার আর রিমির জন্য ত্রকটা বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। প্রথম রাত আমি অথৈ এবং রিমির রুমে গিয়ে অথৈকে ঘুম পাড়িয়ে চলে আসলাম। ২য় তয় রাত একেই পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে লাগল।
রিমি আমার কাছে এসেসে বলল, হিমেল ভাই, এ তো মহা ঝামেলা সৃষ্টি হলো দেখি। অথৈ তো দিন দিন খুব জ্বালাতন করছে। তুমি ঘুম পাড়িয়ে চলে যাবার পর যখন রাতে তার ঘুম ভাঙ্গে তোমাকে পাশে না দেখতে পেয়ে আব্বু আব্বু বলে আবার কান্না শুরু করে।
-আর ২-১ দিন দেখো। হয় তো সব ঠিক হয়ে যাবে।
রিমি তোমাকে একটা কথা বলবো ভাবছি কিছু দিন থেকে।
- কি কথা হিমেল ভাই?
-হুমায়রা বেঁচে থাকতে আমাকে বলেছিল তোমাদের ক্লাসের সায়েম এর সাথে তোমার একটা সম্পর্ক চলছে। কি খবর সায়েমের?
-তুমি ঠিক শুনেছো। গত বছর সে একটা ভাল চাকরি পেয়েছে। চাকরি পেয়েই আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। আমাদের পরিবারেও বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসেছে।
আমি তাকে বললাম, সায়েম আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। তুমি আমাকে বিয়ে করতে চাও এটা আমার সুভাগ্য। কিন্তু তোমার কাছে আমার একটা দাবি আছে।
-কি?
-অথৈকে আমাদের পরিচয়ে সমাজে বড় করতে হবে। ও আমাদের সন্তান হিসাবে মানুষ হবে।
-তুমি কি পাগল নাকি! অন্যের সন্তানকে কেন আমরা আমাদের পরিচয়ে বড় করবো। তুমি এতদিন লালন-পালন করেছো
ঠিক আছে, এখন যাদের বাচ্চা তাদেরকে দিয়ে এসো।
-তা আমি কোন দিন পারবো না সায়েম। সেই ছোট্টটি থেকে মা হারা, বাবা থেকেও নেই, এই দুধের বাচ্চাকে আমি কোলে-পিঠে করে এত বড় করলাম। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন বুকে আগলে রাখলাম। সেই অথৈকে ছেড়ে আসতে বলছো তুমি! যার সাথে আমার অন্তরআত্মা মিশে আছে। যে আমার জীবন বড় একটা অংশ এখন। যার ত্রকটু কান্নার শব্দে ভূমিকম্পের মত আমার পৃথিবী দুলতে থাকে সেই অথৈকে ছেড়ে আসতে বলছো?
অথৈবিহীন স্বামী-সংসার সুখ চাই না আমি সায়েম। যদি অথৈকে মেনে নিয়ে আমাকে বিয়ে করতে চাও তবে আমি তোমাকে বিয়ে করতে রাজি আছি। আর তা না হলে তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব না।
হিমেল ভাই, ৬ মাস আগে সায়েম অন্য জায়গায় বিয়ে করেছে। সে হয় তো তার জায়গায় সঠিক ছিল। তাই তার প্রতি আমার কোনো রাগ, খোব, কষ্ট নেই।
যে আমার সুখের জন্য অথৈকে মেনে নিতে পারেনি, তাকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত আমারও সঠিক ছিল।
আমি বাকরুদ্ধ রিমির কথা শুনে। শুধু অথৈ এর জন্য সে তার ভালোবাসার মানুষকে, তার সারা জীবনের সুখকে চেড়ে চলে আসল, আর আমি অথৈ এর বাবা হয়ে কি করলাম?



গত কিছু দিন থেকে রিমিকে খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে। প্রশ্ন করলে বলে, না হিমেল ভাই আমি ঠিক আছি। আমি বুঝতে পারছি কিছু একটা সে লুকাচ্ছে। আমি বেশি একটা ঘাটাঘাটি করলাম না।
রিমি বলল, হিমেল ভাই তুমি এখন থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর অথৈকে পড়াতে বসো। এই সময়টায় আমার কিছু কাজ থাকে আমি তা সেরে নিতে পারি। বললাম, ঠিক আছে রিমি।
এরপর প্রতিদিন সন্ধ্যার পর আমি অথৈকে পড়াতে বসতাম। আর রিমি তার রুমে বসে একটা মোটা ডাইরিতে কি সব যেন লিখত। একদিন বললাম, রিমি, তুমি প্রতিদিন ডাইরিতে কি লেখ এত?
-হিমেল ভাই মেয়েদের কিছু ব্যক্তিগত কাজ থাকে তা তুমি জানো না? এটাও আমার ব্যক্তিগত কাজ। আর মেয়েদের ব্যক্তিগত কাজের ব্যাপারে সব সময় জানতে নেই। যাও তুমি এখন এখান থেকে।
মা একটা কথা বলবো ভাবছি তোমাকে।
- কি কথা?
-তুমি কি একটু ছোট মামার সাথে কথা বলবে?
-কিসের কথা?
-রিমির বিয়ের।
-রিমির বিয়ের!!
-জি মা। রিমির জীবনটা এই ভাবে চলতে পারে না। আমাদের সবার তাকে নিয়ে এখন ভাবা দরকার। অথৈকে দেখার জন্য এখন আমি আছি।
একটা ভাল ছেলে দেখে রিমিকে বিয়ে দেয়া উচিত।
-ছেলে দেখতে হবে কেন? আমি বলছি কি তুই রিমিকে বিয়ে করে পেল। অথৈ তোদের দুজনকে খুব ভালোবাসে। তোরা একে অপরকে বিয়ে করলে অথৈ এর জন্যও খুব ভালো হবে।
-কি বলছো মা এসব? আমি কল্পনাতেও তা ভাবতে পারি না। রিমি আমার বোন। আমি ছোট বেলা থেকেই তাকে বোনের মতো দেখে আসছি। কি করে তুমি এই রকম একটা বাজে চিন্তা করতে পারলে! মা, তোমার কাছে হাত জোড় করে বলছি, আমাকে আর রিমির কাছে ছোট করো না। এমনিতেই বহুত ঋণের জালে আবদ্ধ হয়ে আছি তার কাছে।
-কিন্তু বাবা..
-প্লিজ মা এটা নিয়ে আর কোন কথা হবে না।
পরের সপ্তাহে বাবার অফিসের কাজে দুই দিনের জন্য কুমিল্লায় যেতে হলো আমাকে। যাবার পরের দিন বাবা ফোন দিয়ে বলল, অথৈ খুব কান্নাকাটি করছে তোর জন্য, তুই আজেই বাড়ি চলে আয়।
-কিন্তু বাবা কাজ তো শেষ হয়নি।
-এই কাজ পরে করলেও চলবে।
আমার কাছে কেমন যেন খটকা লাগল। বললাম, বাবা, কোনো সমস্যা কি হয়েছে বাড়িতে?
-না কোন সমস্যা নেই। তুই আজকেই চলে আয়।
রাতের বাসেই রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। সকালে বাসায় এসে দেখি কেউ নেই বাসায়। কাজের মেয়েটাকে বললাম, বাড়ির সবাই কোথায়?
- সবাই হাসপাতালে গেছে।
-কেন?
-রিমি আপা অসুস্থ্য।
আমির ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি হাসপাতে রওয়ানা দিলাম। গিয়ে দেখি আমার বাবা-মা, অথৈ, ছোট মামা-মামী রিমির বিচানার পাশে।
অথৈ আমাকে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
একটু আগে ডাক্তার এসে রিমিকে ঘুমের ঔষুধ দিয়ে গেল। বাবা আমাকে বললেন।
বললাম, কি হয়েছে রিমির?
-ডাক্তার তো বলল,অনেক দিন থেকে ঠিক ভাবে না খাওয়ার কারনে শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দুই-তিন দিন ভাল ভাবে রেস্ট নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
দুই দিন পর রিমিকে বাসায় নিয়ে আসলাম। তিন দিনের মাথায় আবার সে অসুস্থ্য হয়ে পড়ল। ডাক্তার অনেক রকম টেস্ট করালেন রিমির, কিন্তু সঠিক কোন রোগ ধরতে পারলেন না। রিমির শরীরের অবস্থা দিন দিন খারপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাকে ঢাকায় নিয়েও অনেক বড় বড় ডাক্তার দেখানো হলো। কিন্তু ফলাফল সেই আগের মতোই।
রিমি একদিন আমাকে কাছে ডেকে বলল, হিমেল ভাই, কিছু কথা তোমাকে বলতে চাই।
-বল রিমি।
-হিমেল ভাই, তোমরা বৃথা চেষ্টা করছো আমাকে নিয়ে। আমার ওপাড়ের ডাক এসে গেছে। হুমায়রা আমাকে ডাকছে হিমেল ভাই।
-কি বলছো এসব রিমি। এসব বাজে কথা আর একটাও বলবে না।
-না হিমের ভাই, বাজে কথা না। তুমি আমার কথা আগে শুনো। পৃথিবীর কোন ডাক্তার আমার এই রোগ ধরতে পারবে না। আমি জানি আমার রোগটা কি। রোগটা এখন এত বড় হয়ে গেছে যে এটার আর কোন নিরাময় নেই।
তুমি আমার, হুমায়রার, তোমার আত্মজা অথৈকে দেখো। কোন দিন একটা ফুলের টুকাও যেন ওর গায়ে না লাগে। আমাদের তিন জনের ভালোবাসা এক সাথ করে তুমি তাকে ভালোবাসবে। মরে গেলে মানুষ নাকি আকাশের তারা হয়ে যায়। যদি এমন কিছু হয় তবে ঐ দূর আকাশ থেকে আমি, হুমায়রা তোমাকে, অথৈকে দেখব।
-প্লিজ রিমি থামো, আমার এসব কথা শুনতে খুব কষ্ট হচ্ছে।
- হিমেল ভাই, থেমে তো চিরদিনের জন্য যাবই। যাবার আগে আর একটু কষ্ট না হয় তোমাকে দিয়ে গেলাম।


ডাক্তার, নার্স, আমাদের সকল চেষ্টাকে বৃথা করে দিয়ে সত্যি রিমি হুমায়রার মত না ফেরার দেশে চলে গেল। সব চেয়ে কষ্টের কথা, জানতেই পারলাম না কি রোগে এত কষ্ট পেয়ে রিমিকে চলে যেতে হলো। ডাক্তার এত চেষ্টা করেও রোগটা ধরতে পারলেন না। মৃত্যুর আগে রিমির শরীরটা শুকিয়ে কঙ্ককাল হয়ে গিয়েছিল।
বুঝতে পারছি না কেন একে একে সব ভালো মানুষ গুলো পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
অথৈকে সামলানো আমার জন্য ভয়াবহ রকম মুশকিল হয়ে পড়েছে। সারাক্ষন ছোট আম্মু ছোট আম্মু বলে কেঁদে কেঁদে অস্থির।
আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,আব্বু, ছোট আম্মু কোথায়? আমি ছোট আম্মুর কাছে যাবো। তুমি আমার ছোট আম্মুকে এনে দাও।
তাকে কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না। হুমায়রার মৃত্যুর চেয়ে শত গুন কষ্টের সাগরে ভাসিয়েছে আমাদের পরিবারের সবাইকে রিমির মৃত্যু। আমার বাবা-মা, ছোট মামা-মামী তো রিতিমত ভেঙ্গে পড়েছিল। নিজেকে শক্ত করে আমাকেই সব দিক সামলাতে হয়েছে।
রিমির চলে গেছে আজ ১৫ দিন। সকাল বেলায় রিমি যে রুমে থাকতো সে রুমে গেলাম। সব কিছু পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। রিমি সব কিছু সব সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এবং সাজানো গোছানো পছন্দ করতো।
তার পড়ার টেবিলে এটা সেটা দেখতে দেখতে আমার চোখ তার রেখে যাওয়া মোটা ডাইরিতে পড়লো। কৌতুহল নিয়ে ডাইরিটা খুললাম।
কি সুন্দর রিমির হাতের লেখা। গুটি গুটি অক্ষরে প্রথম পৃষ্ঠায় তার নাম, ঠিকানা লেখা। তারপর লেখা "আমি এবং আমার জীবন"।
সেই ছোট বেলার ছোট ছোট ঘটনা থেকে মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগ পর্যন্ত তারিখ বাই তারিখ অল্প অল্প শব্দে সে তার জীবনের সব কিছু লিখে গেছে। আমি একটা একটা পৃষ্ঠা পড়ছি আর অবাক হচ্ছি। কতটা ধৈর্য্য নিয়ে রিমি এসব লিখেছে।
ছোট বেলায় আমি, বড় খালার বড় ছেলে শফিক ভাই, হেনা আপু আমরা যখন নানার বাড়ি যেতাম তখন রিমিসহ নদীতে সাঁতার কাটা, গুল্লাছুট খেলা সহ সব মজার মজার ঘটনা সে লিখে রেখেছে। অথচ সেই সব আনন্দঘন স্মৃতি আমি কবেই ভুলে বসে আছি।
ডাইরির এর পরের পৃষ্ঠা গুলোতে তার স্কুল জীবন, কলেজ জীবন, সেই সময়কার বন্ধুরা, বাবা-মা, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন, হুমায়রার সাথে পরিচয়, কি করে হুমায়রা তার সব চেয়ে প্রিয় বান্ধবী হলো, আমার আর হুমায়রার বিয়ে, হুমায়রার মৃত্যু, অথৈকে নিয়ে, অথৈ এর প্রতি আমার অবহেলা অনাদর। এরপরে লেখা আমার ফিরে আসার ঘটনা।
তারপরের ৫ টা পৃষ্ঠা আমাকে তিন-চারবার পড়তে হয়েছে। যত বার পড়েছি ততো বারেই আমার মাথা ঘুরছিল, আর বুঝতে পারলাম রিমির রোগটা কোথায় ছিল।
৫ টা পৃষ্ঠা পুরাটাই তার আর সায়েমকে নিয়ে লেখা। ভালোবাসা যে মানুষকে কাঙ্গালও করে দিতে পারে রিমির ডাইরির এই ৫ টা পৃষ্ঠা না পড়লে আমি হয়তো কোন দিন জানতেও পারতাম না।
এত ভালোবাসতো সে সায়েমকে আমার মনে হয় তার ছিটেফোটাও আমি হুমায়রাকে বাসতে পারিনি।
সায়েম অথৈকে গ্রহন না করা এবং রিমিকে ছেড়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করাটা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি রিমি।
সে একটু একটু করে সেদিন থেকে বিষের জ্বালায় জ্বলেছে। আমাদের সামনে সব সময় ভালো থাকার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে নিজেকে মৃত্যুর দুয়ারে নিয়ে গেছে। অথচ আমরা কেউ একবারের জন্য বুঝতেও পারলাম না।
হায় চিকিৎসা বিজ্ঞান কত কি আবিস্কার করলে। নিমেষে জটিল থেকে জটিল রোগের সমাধান দিয়ে দিতে পারো। অথচ মানুষের চিন্তার, মানুষের মনের রোগ ধরার কোন যন্ত্র আবিস্কার করতে পারলে না।
হাজার সালাম রিমি তোমাকে। ভালোবাসা কি এবং কাকে বলে সত্যি আজ নতুন করে তোমার কাছ থেকে শিখলাম।
আজ আমার মেয়ে অথৈ'র মেট্টকি পরীক্ষার রেজাল্ট দিবে। সকাল থেকেই সে মন খারাপ করে বসে আছে।
-আম্মু এভাবে মন খারাপ করে বসে আছো কেন?
-আব্বু যদি গোল্ডেন এ+ না পাই তবে আমি কি করে তোমাকে মুখ দেখাবো। তোমার এত ভালোবাসা, এত স্নেহের যদি মূল্য দিতে না পারি!
-তুমি অযথা চিন্তা করছো আম্মু। ছোট থেকে তুমি কোন দিন সেকেন্ড হওনি, আজও হবে না। আর ভালোবাসা, স্নেহের কথা বলছো? তোমার আম্মু, ছোট আম্মুর তুলনায় আমার এই ভালোবাসা একটা ছোট্ট বিন্দুর সমান।
-আচ্ছা আব্বু, তুমিও বল, দাদা-দাদিও বলেছে আম্মু আর ছোট আম্মু নাকি আমাকে খুব ভালোবাসতেন।
-আম্মু, তোমার আম্মু তোমাকে এই পৃথিবীর মুখ দেখাতে গিয়ে নিজে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে। আর তোমার ছোট আম্মু তোমাকে মানুষ করতে গিয়ে তার সারা জীবনের সুখকে ছেড়ে এসেছে।
-আব্বু, আম্মু এবং ছোট আম্মু আমাকে এত ভালোবাসতো কেন? আর তুমিও কেন এত ভালোবাসো?
- কারন তুমি আমাদের আত্মজা। আমি তোমার মাঝেই পৃথিবীর সব সুখ খুজে পাই। আম্মু আজ হয়তো অনেক কিছু বুঝবে না। কিন্তু যেদিন তুমি বড় হবে, মা হবে সে দিন বুঝবে সন্তান বাবা-মার কাছে কত প্রিয়। সন্তানের সুখেই বাবা-মার সুখ। সন্তানের কষ্টেই বাবা-মার কষ্ট।
-আব্বু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
-আমিও তোমাকে অনেক ভালোবাসি আম্মু।









আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন