বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৬ অক্টোবর ২০১৭
গল্প/কবিতা: ৬টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৭৪

বিচারক স্কোরঃ ২.২৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

অভাগী

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

ভিন্ন পৃথ্বী

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

কুয়াশা

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

গল্প - কামনা (আগস্ট ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৭৪ ইচ্ছেনদী

সেজান খন্দকার
comment ২  favorite ০  import_contacts ৭৭
রোজকার মতো আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে বারান্দার কোণের চেয়ারটায় বসে বাগানের দিকে তাকালাম। বারান্দার কোল ঘেষেই ছোট্ট একটি ফুলের বাগান। বাগানের ওপাশেই পাশাপাশি দুটি সুপারি গাছ।
দুই সুপারি গাছকে অবলম্বন করে একটি মাকড়শা জাল বুনেছে। জালের ঠিক মাঝখানে বসে আছে মাকড়শাটি। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের রাতের ঠাণ্ডার পরিমাণ বোঝা যাচ্ছে মাকড়শাটির জালের গায়ের বিন্দু বিন্দু ছোট-বড় শিশির কণা দেখে।
মাকড়শাটি জালের ওপর মৃদু মৃদু কম্পন সৃষ্টি করছে, হয়তো শীতে, হয়তোবা শিকার পাওয়ার খুশিতে।
প্রায় প্রতিদিনই নীলা ওর বাগানের পানি দিতে এসে এই মাকড়শাটির জালটি ভেঙে দেয়। কিন্তু প্রতিদিন সকালে আমি ওকে এইভাবে জালের ওপর দেখি। অবাক হয়ে যাই মাকড়শাটির ধৈর্য দেখে। বাঁচার তাগিদে প্রতিদিন তাকে এই মরণ ফাঁদ তৈরি করতে হচ্ছে। এই ফাঁদে একটি মৃত্যু, মাকড়শাটির জন্য এক একটি নতুন জীবন।

বড় বউদি চা দিয়ে গেল। আমার অনতিদূরে জলচৌকির ওপর বিল্টু বই খাতা ছড়াচ্ছে। সচরাচর তোহ এই দৃশ্য চোখে পড়ে না। আজ হঠাৎ এতো ঘটা কেনো?
ও, বুঝেছি। কয়েকদিন পরেই পরীক্ষা কিনা!
একট পরে মুখটা কাচুমাচু করে আমার কাছে এলো হাতে গণিত বইটা নিয়ে।
'কাকু, এই ৬ নম্বর অঙ্কটা বুঝছি না, একটু বুঝিয়ে দেবে?'
'সারা বছর কী করে কাটালে শুনি? খুব তো স্কুল মাঠের ক্রিকেটার হয়েছো। কখনোই তোমাকে....'
'কাকু তুমি দেখে নিয়ো, এই ১৩ দিনে আমি সব শেষ করে ফেলবো। এখন এই অঙ্কটা বুঝিয়ে দাও না।'
অঙ্কটা করে নিয়ে আবার জলচৌকিতে গিয়ে বসল। ওর দিকে তাকিয়ে ভাবছি। সময় থাকলে পড়াগুলো অল্প অল্প করে করে রাখলে আজ এরকম পাহাড় হতো না। কিন্তু কে বোঝাবে ওকে? দিনটা বাড়ির মধ্যে থেকেই কেটে গেল।
বিকেল বেলা বিল্টুর বন্ধুরা এসেছিল ওকে খেলার জন্য ডাকতে। কিন্তু ও যায় নি। গোয়ার গোবিন্দ হয়ে বইগুলো নিয়ে বসে আছে সারাদিন। ব্যাপারটা সবার চোখে লাগছে। বউদি, ঠাকুমা যে যেমন পারছে খোঁচা লাগাচ্ছে, ও গায়ে মাখাচ্ছে না। মাঝে মাঝে ওদের কথা শুনে লজ্জায় ওর ফর্সা নাদুসনুদুস গাল আর কান রাঙা হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটু ভাল ফলাফলের জন্য ছেলেটার এই কাণ্ড ভালই লাগছে। এতো অল্প বয়সেই ভাল কিছু পাওয়ার কি আকাঙ্ক্ষা! হোক না সেটা দেরিতে, তাতে দোষ কী?

নীলাকে আজকাল বড় চুপচাপ দেখছি। চলাফেরা করছে হরিণের মতো সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে। মাঝে মাঝে এটা ওটা করতে দেখছি, মাঝে মাঝে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে।
নীলা জন্মাবার পরপরই মা মারা যায়। মা মারা যাবার পর আমরা তিন ভাইবোন ঠাকুমার কাছে মানুষ হতে লাগলাম। বাবার আদর খুব একটা পেতাম না। ব্যবসায়িক মানুষ, মন মেজাজ সব সময় ভাল থাকে না। নীলার যখন দুই বছর বয়স হলো, তখন দাদাভাই বিয়ে করলো। আমরা আবার হাতবদল হলাম। নীলা আর আমি বউদির কাছে বড় হতে লাগলাম। ছেলেবেলা থেকেই ছোট বোন নীলাকে খুব ভালবাসতাম। তবে আমাদের সবার ভালবাসার চেয়েও বেশি ভালবাসা বউদির।
একজন বউ আর মায়ের যে গুণগুলো থাকা দরকার তার সব গুণ আছে বড় বউদিমণির মধ্যে। বউদির আদর যত্ন আমার মাকেও হার মানায়। সংসারকে তিনি সৈনিকের মতো আগলে রেখেছে, তার মধ্যে কোন দুঃখ কষ্টকে প্রবেশ করতে দেন নি তিনি। নারী যে পুরুষের অর্ধাঙ্গিনী এই কথাটি শতভাগ খাটে আমার বউদির সাথে।
কোনোকালে কখনোই তাকে বিচলিত হতে দেখি নি। চোখ দিয়ে তার বুদ্ধির দীপ্তি ছোটে।

আজ সকালে বোদিমণি ঠাকুমাকে নিয়ে পরেশ ডাক্তার এর কাছে গিয়েছিল। ঠাকুমার বয়স তো কম হল না, প্রায় ৮০-৯০ বছর হবে। মাথায় একটিও কাল চুল অবশিষ্ট নেই। কিন্তু সামান্য সর্দি কাশিকেও তিনি যমের মত ভয় করেন। তার কাছে নিজের শরীর ছিল সবার আগে। যত্ন আর মনের জোর কাকে বলে তার কাছ থেকেই শেখা উচিৎ।

আজ কয়দিন ঠাকুমা শরীর ভাল যাচ্ছিল না। ঠাণ্ডা তো লেগেই আছে এই শীতে, তার ওপর কয়েকটা দিন আগের মত শক্তি পাচ্ছে না শরীরে। তাই বৌদিকে বলতেই নিয়ে ছুটেছে পরেশ ডাক্তারের কাছে।
ওষুধ দিয়েছেন নাম মাত্র, তবে বলেছেন যতটা সম্ভব হাটাচলা, কাজ-কর্ম করতে। কারণ ডায়াবেটিস এর লক্ষণ নাকি দেখা যাচ্ছে।
সেদিন থেকেই পরেশ ডাক্তারের বিধি বিধানগুলো মানতে শুরু করলো ঠাকুমা।
পরদিন সকালে আগের মতোই বারান্দার আরাম কেদারায় বসে আছি। পুরো পরিবেশের চিত্র আগের মতোই। বিল্টু বই নিয়ে বসেছে, বউদিমণি রান্নার তোরজোড় করছে, বউদির সাথে নীলাও এটা সেটা করছে, মাকড়শাটিও চুপচাপ বসে আছে। তবে লক্ষ্য করলাম গতকালের ফোঁটা কয়েকটা গোলাপ নেই। সেখানে শুধু কয়েকটা বোটা দেখা যাচ্ছে। ব্যাপারটা খুবই বেমানান। বাইরের কেউ তো এদিকে আসে না। আর বাড়ির কেউ কখনোই ফুল তুলবে না। কারণ নীলা সবসময় ওর বাগানটা চোখে চোখে রাখে।
'আবির, ও আবির।'
ঠাকুমার ডাক শুনে তড়িঘড়ি করে গেলাম।
'কী হয়েছে ঠাকুমা?'
'কচ্চিস কিরে দাদুভাই?'
'কিছু না, বসে আছি।'
'একটা কাজ করে দিতি পারবি?'
'কী কাজ?'
'শুনেচিস তো, কি সব ডায়াবেটিস না কি হয়েচে আমার, মনে হয় আর বাঁঁচবো না।'
'কি যে বল, তোমার তো ডায়াবেটিস হয় নি, লক্ষণ দেখা দিয়েছে মাত্র।'
'ওই হল, যদি সত্যিই হয়ে যায় তখন?'
'তখন আর কি, মরে যাবে।'
'তোর যা অলুক্কুনে কতা, হ্যা রে, আমি মরে গেলি তোর কষ্ট হবি না?'
'আচ্ছা বাদ দাও, কী করতে হবে বললে না তো?'
'দেক আমার জন্যি তেলাকুচির পাতা তুলে আনতি পারিস কিনা, আর তোর বউদিরে ক, আমার রুটি হয়েচে কিনা, দিয়ে যেতে বল।'
বাহির বাড়িতে অনেক জঙ্গল হয়েছে।আগাছায় ভরা। কোথায় সাপ-খোপ আছে কে জানে।
বেছে বেছে অনেক ভাল আর উজ্জ্বল পাতা তুলছি আর ভাবছি। ভগবান হয়ত খুব ভালবাসে ঠাকুমাকে। এতোবছর আয়ু দিয়েছে তাকে, কিন্তু এখনও ঠাকুমার জীবনের সাধ মেটেনি। আরো দুটো দিন বেঁচে থাকার তাগিদে কী কী করবে কে জানে? বসে দুটো কথা বলার লোক নেই। নিজের সাথে নিজে কথা বলে যার দিন কাটে, তারও বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে? অবশ্য দুনিয়ার মানুষের কত অদ্ভুত ইচ্ছা থাকে, তার তুলনায় বেঁচে থাকার ইচ্ছাটা যথেষ্ট উচ্চমানের।

বাড়িমুখো হচ্ছিলাম। হঠাৎ প্রচুর সবুজের ভীরে অল্প রঙের ঝলকানি পেলাম মনে হচ্ছে। বাদিকে ঘুরে দেখার চেষ্টা করলাম এই জঙ্গলের মাঝে কে ওখানে।খুব ভাল দেখা যাচ্ছা না ডালপালার কারণে। মনে হচ্ছে দুজন লোক। একটু এগিয়ে গেলাম।
মনে হচ্ছে নীলা, হ্যা, নীলাই তো। আরেকটা হচ্ছে রতনপুরের প্রাইমারী স্কুলের নতুন মাষ্টার। নীলার হাতে একটি লাল গোলাপ।
ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি থাকলো না।কোনো রাগ হল না, অবাক হলাম না, সত্যি বলতে কি ভেতরে কোনো ভাবান্তরই হল না।

সকাল থেকেই আজ বৃষ্টি হচ্ছে। নিশ্চিত মনে আরাম কেদারায় বসে আছি। মাকড়শাটাকে আজ কোথায় দেখতে পাচ্ছি না। ঠাকুমা আর নীলা দুজনে দুটো চেয়ার নিয়ে বসে আছে বারান্দায়। বৃষ্টির দিকে দুজনেরই শুন্য দৃষ্টি।
ঠাকুমার মনে মনে খুব রাগ হচ্ছে বুঝতে পারছি। এই বৃষ্টি না থাকলে তিনি লাঠির ওপর সমস্ত ভর দিয়ে পুরো উঠোন হেটে বেড়াতেন। তেলাকুচার রস করে খেতেন, কিন্তু কী করার?
নীলার অবস্থাটাও বুঝতে পারছি। বসে আছে এখানে, কিন্তু মন চলে গেছে সুদূর স্কুল মাষ্টারের কাছে।
বৃষ্টি থামলো। ঠাকুমা লাঠি ভর দিয়ে উঠোনে নামতে যাচ্ছিলেন। বউদিমণি দেখে একটু ঝাঁঝালো গলায় শাসিয়ে গেল। তখন আর নামলেন না। আমি সতেজ হওয়ার জন্য গোসলখানায় গেলাম।
হঠাৎ ওমাগো বলে ঠাকুমার চিৎকার শুনলাম। তারপর কিছুক্ষণ সব চুপ। মুহূর্তখানেক পরেই নীলার কণ্ঠে চিৎকারের সাথে কান্না বেরিয়ে এলো।
ঠাকুমা মেঝেতে শুয়ে আছেন। আমরা সবাই সাদা কাপড় পরেছি। আত্মীয়স্বজন যারা ছিল প্রায় সবাই চলে এসেছে।
আমি আমার ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম। ঠাকুমা যে ঘরে থাকতেন তার সামনে এসে ভেতর থেকে অনেক মেয়ে মানুষের জটলা শুনতে পাচ্ছি। তারমানে,
ঠাকুমার গয়না ভাগ শুরু হয়ে গেছে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন