বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ২টি

প্রাপ্ত পয়েন্ট

গল্প - অবহেলা (এপ্রিল ২০১৭)

মোট ভোট বিষফল...

পল্লব শাহরিয়ার
comment ১  favorite ০  import_contacts ৭৩

সময় হয়েছে দরজা খোলার
জন্মের পর জন্ম ধরে জমিয়ে তোলা জালের আড়ালে তুমি কেবল গুটিয়ে সরে জালের মধ্যে জাল হয়ে মিশে থাকবে আর কত জন্মের পর জন্ম আমি কেবল জালের জটিল দরজায় ধাক্কা দিয়ে ফিরে ফিরে যাব? কতবার তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষকে মারবে আর তারপর নিজের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে দিবে আমার হাতে! লড়াই। লড়াই। হিং¯্র আরক্ত লড়াই। নিজের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে আমার হাতে রাখা যে হাত সেই হাত ধরে আমি এক লহমায় তোমাকে জালের গর্ত থেকে বার করে আকাশে মিলিয়ে যাওয়া দু’টো বিন্দুর মতো উড়তে-উড়তে কোথায় নিয়ে চললাম মনে পড়ে?
না মনে পড়ে না। কোথায়?
মনে করো। মনে করো সেই নীল আবছা কুয়াশায় ভাসা বন। ডালে আটকা পড়া চাঁদ। আকাশ গলে জলে মিশে যাওয়া জ্যোৎ¯œা। গলানো রুপোর ¯্রােত। পাগল-পাগল হাওয়া। আরÑ
আর?
আর বনের মাঝে আমাদের ছোট্ট কুটির।
কুটির?
হ্যাঁ। কুটো লতা ডালপাতার ছোট্ট কুটির। কুটিরে লেখার চৌকি।
আর?
আর তুমি কলম। আমি পাতা। আমাদেও ঘিওে সোনার ডাল রুপোর ফল। চাঁদ। জ্যোৎ¯œা। পাতার ফিসফিস। হৃদের কূল ছাপিয়ে ভাসা। এভাবেই অনেক অনেক দিন।
তারপর?
এরপর আর কী? একদিন জ্যোৎস্নার বনদেবী
বনদেবী!
হ্যাঁ গো, বনদেবী। সেই যে যিনি হৃদেও জলে গরা জ্যোৎস্না শরীওে মাখতে নেমেছিলেন আর চোখের ইশারায় তোমাকে কাছে ডাকছিলেন।
আমাকে?
হ্যাঁ। আর তুমিও নিশি পাওয়ার মতো সেদিকে এগিয়ে চলেছিলেÑ আর তিনি খিলখিল হেসে গড়িয়ে আঁজলা ভরা জ্যোৎ¯œার গুড়ো গুড়ো রুপো তোমায় ছুড়ে মারছিলেন। আর তুমিও জীর্ণ সব বাকল-টাকল খসিয়ে কেমন ঝিকমিকে নীল হয়ে উঠছিলে!
আর তুমি? তুমি তখন কী করছিলে?
আমি? আমি কী করছিলাম? কত গালমন্দ, শাপশাপান্ত, চোখের জল, ঠোঁট ফোলানো শেষে তোমার পায়ে অবধি ধরলাম।
পায়ে ধরলে!
হ্যাঁ। পায়ে ধরলাম। ঠিক কুমির যেভাবে ধরে। ডুবসাঁতারে তোমাদের ঠিক মাঝখানে পৌছে তোমার একটা পা কামড়ে ধওে টেনে নিয়ে চললাম একেবারে গভীর জলে। তুমি শ্বাস বন্ধ হয়ে জ্ঞান হারালে। আর জ্ঞানহারা তোমাকে নিয়ে অবাক মাছদেও পাম কাটিয়ে আমি তলিয়ে চললাম আরও নীচে, আরও অন্ধকাওে, যেখানে কেবল জলজ উদ্ভিদ আর প্রবালের প্রাসাদ সেই দেশে। গোপনে টুটি টিপে হত্যা করা একটা শবদেহের মতো আমি তোমাকে সমস্ত পৃথিবী থেকে লুকিয়ে রেখেছি কত কত দিন।
শবদেহের মতো!
হ্যাঁ। আমি স্বভাবত নিষ্ঠুর। স্বভাবত হিংস্র। আমি হয় পাবো নয় নষ্ট করবো যাকে পাইনে তাকে দয়া করতে পারিনে। তাকে ভেঙে ফেলাও খুব একরকম করে পাওয়া। ঠিক কি না?

০২.
আমার হাতের পাতা নীলে পুড়ে নয়নাভিরাম
আকাশের মধ্যে হাত ডুবিয়েছিলাম

হ্যাঁ, পুড়লাম। নয়নাভিরাম নীলে। সে ছিল অন্য এক আকাশে বিদ্যুত। অন্য এক আকাশের বুকে তার ছুটে বেড়ানো মুহুর্মুহু, আঁকাবাঁকা ঝলসানো রুপে আমার চোখ পুড়লো। বুক পুড়লো। স্বামীÑসংসার বিস্বাদ হল। শিওে বাজ পড়ে যদি এ আশায়’ আমি ঘর-বর সব ছেড়ে মাঠে এসে শরীর ঢেলে দিলাম। যাতে তার মুহুর্মুহু ছোবলে আমি পুড়ে নীল থেকে আরও নীল হয়ে যাই। সেই অন্য এক আকাশের মুখ আঁধার করে একদিন আমার চুরি করা বিদ্যুৎ মেলে ধরা মাঠে নেমে এল। সমস্ত চরাচওে লুটোপুটি নীল আগুনের শিখা। যে সব সহস্র ভাগ্যে পেয়ে যাওয়া মুহুর্তে ‘গায়ে অগ্নিগাছ জন্ম নেয় / লুপ্ত হও হে ন্যায় অন্যায়’ সেই নয়নাভিরাম আগুন আমার ঘর-বর পুড়িয়ে, সবুজ মাঠকে ফুটিফাটা ছাই করে মিলিয়ে গেল দূওে কত দূওে আকাশের মধ্যে কোন আকাশে, আর তার কোন চিহ্ন দেখা গেল না। আর সমস্ত শরীরে সেই দহনচিহ্ন ধারণ করে একটা বাজে-পোড়া মাঠ হয়ে আমার কেটে গেল কত-কত কাল।

০৩.
আয় টুঁটি ছিঁড়ে আদর করি তোকে
ঠোঁট জিভ তালু আহা কচি গাল
চুম্বনে চুষে চুষে বার করি হাড়

সে কতদিন?
সে অনেক অনেক যুগ। তারপর মরা মাঠ একদিন চার পায়ে উঠে দাঁড়াল। সে তখর একটা আহত তাড়া খাওয়া জন্তু। আস্তে আস্তে সে চলে গেল লোকালয় থেকে অনেক অনেক দূরে।
কোথায়?
জঙ্গলে।
জঙ্গলে?
হ্যাঁ। তার দেহ একটু-একটু কওে সেওে উঠল।
দেহ!
হ্যাঁ দেহ। যেমন অহল্যা আ ফ্রগ প্রিন্স বা শাপগ্রস্থ গন্ধর্ব কোনও দৈব-স্পর্শে এক লহমায় সেওে ওঠে তেমনই। মন নয় কিন্তু। শুধু দেহ।
আর মন?
তার মনে তখনও লম্বা কালো ঝলসানো দাগ। চাঁদেও গভীর ক্রেটার ক্ষত। ক্ষতচিহ্ন। লক্স জিহ্ব্ াসহ¯্র দাত। সরল মোহিনী মায়া সেজে সে তখন জঙ্গলে জঙ্গলে তোমাকে খোঁজে।
আমাকে?
হ্যাঁ। কত ঝড়ঝাপটা বাজবিদ্যুৎ পেরিয়ে, ঝড়ে ওলটপালট খেতে-খেতে, তোমরা দু’জনে দু’জনকেই তো খুঁজে ফিলেছ জন্মেও পর জন্ম পেরিয়েও।
তাই?
হ্যাঁ তাই। কত মৃত সর্ম্পকের ক্ষত পেরিয়ে তুমি আবার তার কাছে ফিওে আসবে বলে সে তোমাকে খোঁজে। তার বয়স চলে গিয়েছে। চোখে ক্লান্তি। কিন্তু ভিতওে দম ধওে আছে স্থিও প্রতীক্ষা। দম ধওে আছে তীব্র আকুর চাওয়া আর সহস্র বছরের না পাওয়া। এই জঙ্গলে-জঙ্গলে সে রোজ খুঁজে ফেওে তোমাকে একবার দেখতে পেলে ঝাঁপ দিয়ে টুটি টিপে ধরবে বলে।
হ্যাঁ টুটি ছিড়ে আদর করবে বলে। বুকে মাথা চেপে ধরে/ পিষে গুড়িয়ে ফেলে/ কষে আদর করবে বলে
এমন হিংস্র সংহার কেন?
যাতে আর ফেলে পালাতে না পারো কোনওদিন।

০৪.
একদিন স্বপ্ন থেকে জেগে উঠকে ওরা। কষ্ট মরে যাবে, ইচ্ছে মরে যাবে,
করীর ধ্বসে যাবে, গনগনে রাগের উনুনে পড়ে থাকবে শুধু এক মুঠো ছাই।

একদিন আমার নাম ছিল আনা। আমার স্বামী মি. কারেনিন-কে ছেড়ে এসছিলাম একদিন। ভ্রনস্কি-র জন্য। অথবা ছেড়ে আসতে পারিনি। মৃত সর্ম্পক একটা অনন্ত শিকল, একটা হাঁ-মুক সাপ হয়ে তাড়া করছিল পিছনে। আর আমরা তিনজন সফেন লেজ আছড়ানো সমুদ্রের মধ্যে একটা পিচ্ছিল পাথর বেয়ে বারবার ওঠার চেষ্টা করছিলাম। আমাদেও হাত নেই। পা খুব ছোট। বিশাল পিচ্ছিল দেহ রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্নে ভরা। সামনে বেরিয়ে থাকা দু’টো হিংস্র লম্বা দাঁত। আমরা কেউ মানুষ নই। তিনজন তিনটে সিলমাছ। পরস্পরের বুকে দাঁত বসাতে বারবার পিচ্ছিল পাথর বেয়ে উঠছিলাম আর গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম। ঢেউ আঁজলা ভওে ধুয়ে দিচ্ছিল আমাদেও ক্ষত। আমাদেও যন্ত্রনার সূর্য গড়িয়ে রক্ত হয়ে সমুদ্রের জলে মিশে যাচ্ছিলেন আর আমি ভাবছিলাম
কী ভাবছিলাম?
চতুর্দিকে স্তুপ-স্তুপ বরফের প্রান্তর। শুধু সাদা ঝলসানো সাদা। মধ্যে দিয়ে ছুটে চলা ধোঁয়া ওঠা তীব্র কালো রেল। বরফ প্রান্তওে প্রথম দেখা। আমি আর ভ্রনস্কি। রেলের তীব্র গতি। ঘসঘস সাদা ধোঁয়া। কালো রেললাইন আর মদ্য থেকে তিনটে জীবন ছারখার।
আর কী ভাবছিলাম?
এরপরের দৃশ্য আর বরফেল নয়। খুব নরম বিকেল। আপেল বাগান। ফাঁক দিয়ে গোরাপি হয়ে আসা নরম সূর্য। পায়ের তরায রাশি-রশি খসে পড়া পাতা। পিছনে ফেলে আসা সংসার আর সামনে অনন্ত পালানো। আমাদেও গোপন পালানো একটা কেশর ফোলানো টসবগে অধৈর্য ঘোড়া। সমাজ সংসার লোকালয় থেকে উদ্দাম ছুটে চলল একটা অতিকায় হাঁ-মুখ গহ্বরের দিকে যতক্ষণ না মুখ থেকে ফেনা ঝরল, পা দুমড়ে শিরদাঁড়া ভেঙ্গে সে মুখ থুবড়ে পড়ল পাথরে। আর উঠল না।
আর আমরা দু’জন তখন কি করলাম?
পরস্পরকে ফালাফারা করলাম রোজ।
দু’জনে দু’জনকে দায়ী করলাম, দোষী করলাম। উচু পাহাড়ের উপর থেকে ধাক্কা মারলাম। হাত- পা শিকলে বেঁধে বাক্সে ভওে সমুদ্রে ফেলে এলাম। ধুধু মরুভুমির তপ্ত বালি খুড়ে পুতে রেখে এলাম দিকচিহ্নহীন প্রান্তওে, কিন্তু কেউ কাউকে ছাড়লাম না। একটা কালো অভিশাপের মতো বহন করলাম সারা জীবন যতক্ষণ না আর একটা রেল দু’জনের কাটা দেহ ছিটকে ফেলল দু’দিকে।

০৫.
আর তা ছাড়া, ওরা বলছিল
ভালোবানা কথাটার গায়ে ঝুলে আছে মৌচাক।
সব বাজ-পড়া প্রান্তর, গুমখুন, দোষ-সন্দেহ, সব ষড়যন্ত্র প্রতিহিংসা ওপরেও একদিন বৃষ্টি আসে। অঝোর বৃষ্টি এসে ধুয়ে দেয় সব কাদা। সব বিষ। দিন সপ্তাহ মাস ধওে ঝরে-ঝওে কেঁদে-কেঁদে যখন ক্লান্ত হয়ে থামে তখন মেঘ সরিয়ে অল্প একটু সোনার আলো ফোটে। সব পোড়া মাঠে বাজ-পড়া গাছে ঘাসের ডগায় পাতায় তখনও বিন্দু-বিন্দু ভেসে আছে চোখের জল। অল্প একটু মেঘ সরানো আলো পেয়ে তারা সব জ্বলজ্বল কওে হেসে উঠে। তুমিও কত যুগের বুুকচাপা দীর্ঘশ্বাস সরিয়ে আবর উঠে বসো। দিগন্ত বৃষ্টিতে ধুয়ে আবছা একটা রেখার মতো। তারও ওপাওে ভেঙ্গে পড়া সেতু। তার গায়ে আগাছা। কাঁটাঝোপ। বিষাদ লতাগুল্ম। তলায় খাদ। এপারের ভাঙা অংশটি আকুল হয়ে চেয়ে আছে ওপারের ভাঙা অংশটির দিকে। তুমিও আস্তে উঠে দিগন্তরেখার দিকে এগিয়ে চললে। ওদেও জুড়ে দিতে হবে। আকাশের জল মুছে বসাতে হবে আস্ত একটা রামধনু। আগাছা উপড়ে ফুলগাছ। ভাঙা সেতুর ক্সত সারিয়ে তার কাছে পৌছতে এখনও কত পথ বাকি। তুমি এগিয়ে চললে দিগন্তরেখার দিকে। দূও থেকে আরও দূরে। আকাশ-ভাঙা আলোর নীচে সোনার একটা বিন্দুর মতো।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন