বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৭ মার্চ ১৯৮৭
গল্প/কবিতা: ১টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৫

বিচারক স্কোরঃ ২.১ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট ১৬ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৫ সন্ধ্যাবেলার গল্প

দিপণ জুবায়ের
comment ৮  favorite ২  import_contacts ৭১৮
ওরা দুজন মুখোমুখি বসে আছে । বহুদিন পর আজ দেখা হলো দুজনের । ঠিক এই দিনটার জন্য ওরা অপেক্ষা করে ছিল এতদিন । ওরা পার্কের যে কোণটাতে বসে আছে সেখানটা খুব নির্জন । ওদের দুজনেরই এই নির্জনতাটার খুব দরকার ছিল । ওদের মুখে কোন কথা নেই । মনের ভেতর অনেক কথা জমে থাকলে কি এরকম হয় ? হবে হয়তবা । একটা নিরেট জড়তা ওদেরকে ঘিরে ধরেছে । থাক জড়তা , তবু তো পাশাপাশি বসে আছে ওরা । এটাই কি অনেক বড় নয় ? হ্যা , ওদের জন্য এটা অনেক বড় ব্যাপার , অন্তত এতদিন পর । ওদের সামনে একটা আধমরা দীঘি । এই দীঘিতে হয়ত একসময় বুকভরা জল ছিল । যেমনটা ছিল ওদের বুকের মধ্যে । বাহ , এই দীঘিটার সাথে তো অদ্ভুত মিল আছে আমাদের ! কথাটা ভেবে বেশ অবাক হয় ছেলেটি । ও একবার তিথীর দিকে তাকায় । অবশেষে তিথী নিরবতা ভাঙে
তুমি কিছু বলবে না রাব্বি ?
তুমি বল, আমি শুনি । আমার কেন যেন কোন কথা আসছে না মুখে ।
রাব্বি তিথীর দিকে একটানা চেয়ে থাকে । তিথী কি আগের মতই আছে ? বোঝা যাচ্ছে না । তবে একটু মোটা হয়েছে । মুখেও একটু লাবণ্য এসেছে বোধহয় । তাহলে তিথী কি খুব সুখে আছে ? মানুষ সুখে থাকলেইতো মুখে এরকম লাবণ্য আসে । রাব্বির কি একটু একটু হিংসে হচ্ছে ? হিংসে হতেই পারে । তাকে ছাড়া তিথী কেন সুখে থাকবে ? তিথী সামনের দীঘিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
আমি জানতাম , একদিন ঠিক দেখা হবে আমাদের ।
সত্যি ? তুমি এতদিন বিশ্বাস করেছিলে -একদিন আমি আসবই ? এখনও আমাকে এতটা বিশ্বাস কর ?
আমি তোমাকে কখনও অবিশ্বাস করিনি ।
রাব্বি মুখ নিচু করে বলল ,
জান , আমি অনেক ভেবে দেখেছি , আমি কোনভাবেই তোমার যোগ্য নই ।
এটা তোমার ভাবনার ভুল । যদি সত্যি তাই হত , তবে তোমাকে এতটা ভালবাসতে পারতাম না ।
আচ্ছা , তুমি কেন আমাকে এতটা ভালবেসেছিলে ? রাব্বি তিথীর মুখের দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করে ।
জানি না , কখনও হিসেব করিনি ।
ঠিক বলেছ । হিসেব করলে আমাকে এতটা ভালবাসতে পারতে না ।
তিথী দিঘীর দিকে চেয়ে থেকেই বলল ,
আমার কষ্টটা কি জান ? আমি শুধু একাই ভালবেসেছিলাম , একজন পাথরের মত মানুষকে ।
রাব্বির বুকের মধ্যে একটা শক্ত মোচড় দিয়ে ওঠে । ও মুখটাকে আরও একটুখানি নিচু করে বলল ,
কতদিন ভেবেছি তোমার সামনে এসে একবার দাঁড়াবো । কিন্তু পারিনি – লজ্জায়।
লজ্জা ? হাসালে , পাথরের আবার লজ্জা ! তিথীর কন্ঠটাকে কি কান্নাজড়ানো মনে হলো ? রাব্বির হঠাৎ খুব লজ্জা করে ।তিথীর সাথে ওরকম একটা বাজে ব্যবহার করা মোটেই উচিত হয়নি । কিন্তু এখন বুঝে আর কি লাভ । রাব্বি বলল ,Ñতুমি খুব বেশী কষ্ট পেয়েছিলে , না ?
তোমার কি মনে হয় ?
বললে তো , আমি পাথর । পাথরের কি কারও কষ্ট বুঝবার ক্ষমতা থাকে ।
বাহ্ , চমৎকার বললে । কবিতার মতো কথা । কথা তুমি বরাবরই ভাল বলতে পার । ঐ কথা শুনেই তো মুগ্ধ হয়েছিলাম ।
তুমি চলে যাওয়ার পর থেকে বারবার মনে হয় কোনদিন সুখী হতে পারবো না ।
তাই নাকি ? ধন্য হলাম ।
- আমরা কি আবার এক হতে পারি না ? রাব্বি সাহস করে কথাটা বলে ফেললো ।
সেটা কি সম্ভব ? গত দু বছরে তুমি কি একবারও আমার খোঁজ নিয়েছো ?
না , নিতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি । ভেতর থেকে একটা বাধা সামনে এসে দাঁড়াতো বারবার ।
তিথী এবার রাব্বির দিকে তাকিয়ে বলল ,
আমি স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছি । এখন আর স্বপ্ন দেখতে পারি না ।
কিন্তু আমিও তো তোমাকে একই প্রশ্ন করতে পারি । তুমি আমার কতটুকু খোঁজ নিয়েছে ?
বাদ দাও। তুমি কি এখনও সিগারেট খাও ? সরি , তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমার তো কথা বলবার অধিকার নেই ।
সেই কতদিন আগে রাগ করে একটা কথা বলেছিলাম । তুমি এখনও মনে রেখেছ?
কথাটা মনে রাখবার মত কথাই ছিল । তিথীর মুখটা একটু গম্ভীর হলো । সেই পুরনো রাগটা আবার ফিরে এসেছে বোধহয় ।
রাব্বি বলল,Ñ ইদানিং তোমার কথা খুব ভাবি । প্রায়ই সব সময় । জানি তোমার হাসি পাচ্ছে। তুমি বিশ্বাস কর বা না কর , আমাকে আজ কিছু কথা বলতেই হবে । দিন দিন নিজের কাছে খুব ছোট হয়ে যাচ্ছি । নিজের কাছে ছোট হয়ে থাকার মত কষ্টের ব্যাপার বোধহয় আর নেই । অনুতাপ মানুষকে শেষ করে দেয় । একটু একটু করে পুড়িয়ে ছাই করে দেয় ।
কতবার তোমার কাছে চিঠি লিখেছি , আবার ছিঁড়ে ফেলেছি । ওই যে বললাম না , ভেতর থেকে কে যেন বারবার বাধা দেয় । আমি বোধহয় খুব ভিতু । এ পর্যন্ত বলে ও হাফ ছাড়ে । আজ বড় শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ।
তিথী বলল,Ñ আমি কখনও তোমার ওপর রাগ করে থাকতে পারিনি । কেন জানি না ? তোমার ওপর রাগতে গেলেই নিজের চোখ ভিজে যায় ।
রাব্বি একটু সময় নিয়ে বলে ,
এখন মনে হয় , সব হারিয়ে ফেলেছি । থাকবার মতো কিছুই আমার নেই । তোমার কাছে কিছু চাইবো সেই অধিকারটুকুও বোধহয় আমার নেই ।
থাক না । আজ ওসব কথা থাক । কতদিন পর আজ মুখোমুখি বসে আছি আমরা। আমার এখনও মনে হচ্ছে , এটা স্বপ্ন । হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে দেখবো তুমি নেই । তোমাকে একটা অনুরোধ করতে পারি ?
হুম ,বলো ।
তোমার পড়াশুনাটা ঠিকঠাক করো । আমি কখনও তোমার হেরে যাওয়া মুখ দেখতে চাইনা । তোমাকে জিততে হবে ।
জিতে গেলেই কি সব হয়ে যায় ? সবাই কি জিততে পারে ।
আমি তো তোমার কাছে সামান্য কেউ । তবু আমার অনুরোধটা রাখবার চেষ্টা করো । হয়তো তোমার জীবনে অনেক ভাল কেউ আসবে দেখ ।
তুমি কিন্তু প্রথম থেকেই আমার কথা এড়িয়ে যাচ্ছো । আমি জানতে চাচ্ছি , তুমি কি এখনও আমাকে ভালোবাসো ? রাব্বি আবার জিগ্যেস করলো তিথীকে ।
কি মনে হয় তোমার ?
প্লিজ, আমাকে প্রশ্ন করো না । আমার প্রশ্নের উত্তর দাও । আমি একটুও ভালো নেই । তোমাকে ছাড়া খুব একা হয়ে গেছি ।
আমাকে নিয়েও কি কোনদিন একটুও ভালো ছিলে ?
তুমি যখন কাছে ছিলে তখন বুঝিনি । এখন বুঝি, তুমি আমার কতটা জুড়ে ছিলে।
থাক ওসব কথা , এখনও কবিতা লেখ ?
নাহ্ ।
কেন ?
এখন আর লিখতে পারি না । ইচ্ছেও হয় না ।
লেখাটা ছাড়লে কেন ? বেশ তো লিখতে ।
লিখে আর কি হবে বলো ? লিখতাম তো তোমাকে শোনাবার জন্য । এখন তুমি নেই -কবিতাও নেই ।
আমার থেকে ভালো একজন শ্রোতা খুঁজে নাও । তুমি লেখাটা ছেড়ে দিও না । জান, তোমার সেই কবিতাটা এখনও আমার মুখস্ত , ঐ যেটা আমার জম্মদিনে দিয়েছিল ।
রাব্বি তিথীর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকায় , ওর যেন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে । তারপর কিছুটা অভিমানি কন্ঠে বলে,
কবিতা মুখস্ত রেখেছো কিন্তু কবিকে মনে রাখোনি ।
খুব মন পড়তে শিখেছো তাই না ? শোন বলছি …..

ছেলেটি ঃ জান, ইদানিং প্রায়ই মনে হয়, বেঁচে থাকা অর্থহীন ।কয়েকবার সুইসাইড করার কথা মনে হয়েছে ।ভিতু বলে পারিনি ।
মেয়েটি ঃ ওমা, কেন ? সুইসাইড করা কি খুব বীরত্বের কাজ ?
ছেলেটি ঃ জানি না । আমার কিছু ভাল লাগে না । সব অর্থহীন মনে হয় ।
মেয়েটি ঃ তুমি নিজেকে ভালোবাসোনা । যারা নিজেকে ভালোবাসেনা তারা কি অন্যকে ভালোবাসতে পারে বল ?
ছেলেটি ঃ হয়তো ঠিক বলেছো । আসলেই আমি নিজেকে একটুও ভালোবাসিনা । তুমি শেখাবে ?
মেয়েটি ঃ কাঙালের কাছে ভিক্ষা চাইতে নেই । আমি আর এখন স্বপ্ন দেখতে পারি না ।
ক্ষমা করো । দূর থেকে তোমার ভালো চাইবো সারাজীবন । আমাদের দূরে থাকাই ভালো।
সবাই কাছে আসতে পারে না ।
ছেলেটি ঃ তুমি কিছুতেই আমার অপরাধটা ভুলতে পারবে না ?
মেয়েটি ঃ আমি ভালোবাসতে পারিনা । যদি পারতাম, তবে ভালোবেসে এত আঘাত কেন পেলাম ?
ছেলেটি ঃ অভিমানের কথা বলছ ?
মেয়েটি ঃ নাহ্ । সত্যি কথাটা বললাম । তুমি এখনও আগের মতো রাত জাগো ?
ছেলেটি ঃ হুম । আমার ঘুম আসেনা । মাঝেমাঝে মনে হয়, আমি বোধহয় পাগল হয়ে যাচ্ছি ।
মেয়েটি ঃ ওসব বাদ দাও । তুমি কিন্তু এখনো একবারও হাসোনি । কতদিন তোমার হাসি দেখি না । একটু হাস প্লিজ ।
ছেলেটির মুখে কষ্টজড়ানো একটু হাসি দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে গেল ।
ছেলেটি ঃ খুশী ?
মেয়েটি ঃ নাহ্ , তোমার হাসি দেখে আমার কান্না পাচ্ছে ।
ছেলেটি ঃ সত্যি করে বলো তো , আমরা কি আবার কাছে আসতে পারিনা ?
মেয়েটি ঃ নাহ্ , পারিনা । আমি এখন শুধুই আমি । একলা আমি , অন্য কারো হতে পারবো না ।
ছেলেটি ঃ আমি জানি , একজীবনে মানুষ তার সব ভুল শুধরে নিতে পারেনা । তোমার সাথে
যে অন্যায় আমি করেছি , তার ক্ষমা নেই ।
মেয়েটি ঃ তোমার কি খুব বেশী মন খারাপ ? যদি আমার জন্য মন খারাপ হয়ে থাকে তবে ক্ষমা করো ।
ছেলেটি ঃ ফরমালিটি করছো ?
মেয়েটি ঃ একটুও না । তোমার মন খারাপ কেন ?
ছেলেটি ঃ ও কিছু না । মানুষ হয়ে জন্মেছি মনতো একটু খারাপ হবেই ।
মেয়েটি ঃ চল, উঠি । অনেকক্ষণ সন্ধ্যা নেমেছে । একটু পরেই হিম পড়বে ।
ছেলেটি ঃ হ্যা, চল । আবার কবে দেখা হবে ?
মেয়েটি ঃ জানি না । হয়তো হবে, কিংবা না । চল উঠি ।
ওরা দুজন হাঁটতে শুরু করলো । এত কাছাকাছি তবু যেন আজ ওরা যোজন- যোজন দূরে।
এই দূরত্ব কমাবার শক্তি ওদের নেই ।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন