বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মার্চ ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ১৭টি

মা (মে ২০১৭)

মায়ের চিঠি

মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
comment ২  favorite ০  import_contacts ১৫৮
রবিন আর তার বোন সাইমা যখন ছোট ছিল তখন তার বাবা মারা যান। মা অনেক কষ্ট করে দুই ভাই- বোনকে পড়ালেখা করাইছে। বোনটা বেশি পড়া- লেখা করতে পারলো না, কিন্তু ভাইটা উচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে নিজের এলাকায় চাকরি না পেয়ে শহরে গেছিলো চাকরির খোঁজে। সেখানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এর ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়েছে একটি অফিসে। বেতনও উচ্চ। বাড়িতে মোটামোটি দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত আসা যাওয়া ভালোই হয়। কিন্তু চতুর্থ বছরে রবিন একটি উচ্চ পরবারের মেয়েকে শহরে মায়ের অজান্তে বিবাহ করে এবং শহরে একটা ফ্ল্যাট বাসা কিনে সেখানে থাকে। কিন্তু বাড়িতে বিশাল এক ঘরে মা একাই থাকেন। মায়ের আশা ছিল, তার ছেলেকে গ্রামে বিয়ে করাবে ; যখন শুনছে রবিন শহরে বিয়ে করে ফেলছে তাতে নারাজ হয়নি, বরং খুশিতে গ্রহণ করছে। বিয়ের এক বছর পর রবিন বাড়িতে গেছে এরপর তিনটি বছর পেরিয়ে গেল রবিন বাড়িতে যাচ্ছে না এবং মায়ের খোঁজ খবর নিচ্ছে না। বছরের আগা- মাথায় তার মাকে চিঠি লেখে খোঁজ নেই, কিন্তু মাসে মাসে মায়ের খানা খরচ সহ যাবতীয় টাকা পাঠিয়ে দেয়। তাতে কি আর মায়ের দেখার ইচ্ছা মিটে? না, মোটেও মিটে না! তাই তিন বছর পর ছেলেকে না দেখায়-- পাগলের মত হয়ে রবিনের মা রবিনের কাছে চিঠি লিখল;
.
প্রিয় রবিন,
শুভেচ্ছা নিবি বাবা। কেমন আছিস রে বাবা তুই? কত দিন হয়েছে তোর সাথে কথা হয় না। মা তো ভালো নেই বাবা। সব ঠিক আছে শুধু আমার আদরের দুলালিটাকে এক নজর দেখার জন্য মনটা হাহাকার করছে। তোর শরীরটা ভালো আছে তো রে বাবা? তোরে তো মা কখনও কষ্ট দিতাম না। শত কাজের মাঝেও মা তোর শরীরের যত্ন নিতাম। ভুলে গেছিস সে যত্ন নেয়াটা? তুই নাকি আগের চেয়ে অনেক শুকিয়ে গেছিস? খাওয়া - দাওয়া ঠিক মত হয় বাবা? তুই কি মায়ের সাথে রাগ করছিস? মা তোরে ভালো-মন্দের কথা বলি, এতে কি তুই কষ্ট পেয়ে কথা না বলে থাকতে পারিস? তোর কি মনে আছে - যখন তোরে মায়ের বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতাম, তখন তুই প্রসাব করে দিছোস! মা তোরে শুকনো জায়গা শুয়ে তোর প্রসাবে ভেজা জায়গায় কত রজনী কেটে ফেলছি। কয় মা তো কখনও কষ্ট পাইনি, রাগ করে তোরে ছেড়ে দুরে যায়নি! তুই যখন পায়খানা করে দিতি,মা তোরে তো কখনও ঘৃণা করে কোথাও থাকতে পারিনি। মা তো কখনও তোরে কষ্ট দিই না, তবে তুই কেনো মায়ের কথাতে কষ্ট নিস?? তুই বল- পৃথিবীতে মা রা সন্তান জন্ম দেয়া কি ভুল? কোনো পাপ? কোনো অপরাধ? কিছুই নয়। শুধু একটুখানি মা বলে ডাক দিয়ে মায়ের মনটা শান্তি করার জন্য তোদের মত শত মা সন্তান জন্ম দেয়। আমরা দুঃখে থাকলেও, কষ্ট থাকলেও তোদের দুঃখি রাখি না, কষ্টে রাখি না। শুধু একটু খানি মা বলে ডাক দিয়ে মনটা শান্তি কর বাবা। বাবা মনে হয় মা বেশি দিন বাঁচবো না, কিন্তু তোরে দেখার মনের স্বাদ কিছুতে মুছতে পারছি না। তোর কি মনে আছে বাবা, ছোটো বেলা শুয়ে শুয়ে যে গল্প গুলো শুনাইতাম- বিশেষ করে তোর এক আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে যে রুমটাতে আমাদেরকে থাকতে দিল সে রুমটা ছিল ভাঙ্গা, তোদেরকে চুরে নিয়ে যাবে বলে মা শাড়ির আঁচলের দুই মাথা দিয়ে দুই ভাই-বোনকে বেধে রেখেছি, আমার সোনা যাদুরা যেন আমার কোল খালি করে কেউ নিয়ে না যায়। কয় মা কে তো কখনও এমন করে আটকিয়ে রাখলি না, বেধেও রাখলি না বরং দুরে গিয়ে মায়ের একটু খোঁজও নিস না। তোদের দুই ভাই-বোনকে কত কষ্ট করে পড়ালেখা শিখাইছি। ছোট বেলা তোর বাবা মারা গেছে, কয় তোদেরকে তো ছেড়ে চলে যায়নি। তোর বোনটা তো এমন নয়, তুই এমন হলে কেমন করে? তোর মনটা কি পাথরের তৈরী নাকি বিধাতা লোহা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তোর বোনটা মা কে দেখতে দেড়ি হয়ে গেলে, এসে বিলাপ শুরু করে দেই। তোরে মানুষ করতে গিয়ে মাথার ঘাম আমার পায়ে ফেলতে হয়েছে। দশ মাস দশ দিন বুকে নিয়ে করেছি কষ্ট, জন্ম দিতে গিয়ে সইছি দুঃখ, বড় করতে গিয়ে মেনে নিয়েছি কত জ্বালা,মানুষ করতে গিয়ে আপন করেছি কত আগুনের উত্তাপ, তোদের বড় করতে গিয়ে কত সুস্বাদু খাদ্য মা ত্যাগ করে ফেলছি,যদি আমার বাবার কিছু হয় এ জন্য। তবে কোনো দিন মায়ের কথা চিন্তা করে কখনও এক বেলা ভাত না খেয়ে ছিলি? একটা সুস্বাদু খাবার সামনে থেকে রেখে দিছিলি কোনো দিন?? বড় ডিগ্রী অর্জন করে শহরে গেলি, বড় বড় চাকরি করোস তাই বোঝি মা কে সময় দিতে পারিস না। শহরে বিয়ে করছোস তোর ইচ্ছায় কখনও রাগ করিনি। তবে আজ কেনো মায়ের মনে এত ক্ষোভ? মাসে মাসে টাকা দিস, সেটা দিয়ে খাবার কিনে খায়লে কি আর মনের ক্ষোভ দুর করা যায়। আমি তো তোর নিম্ন শিক্ষিত মা, তুই তো উচ্চ শিক্ষিত- তুই ভেবে দেখ তোর বিবেক কি বলে? তুই শুধু বলছোস একবার আমাকে শহরে যাওয়ার জন্য। আচ্ছা, তুই বল আমি তো গ্রামের নারী, চাল-চলন সব গ্রামের মত, তাহলে শহরে কি আমাকে টিকাবে? যদি তোর বউ কখনও আমাকে গ্রামের গাইয়া বলে, যদি অশিক্ষিত গেঁয়ো বলে তখন আমার বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া সমান কথা হবে! ঐ সময় ইচ্ছে করবে বিঁষ খেয়ে মরে যাওয়া। আবার তোর শ্বশুর- শ্বাশুরীর সাথে আমাকে মিলাবে না।যা হোক, আমাকে যেতে বলছিস আমি যায়নি, তাতে আমি মোটেও নারাজ নয়, বরং খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু দুঃখ কি জানিস? শুধু তোর মুখটা একটু দেখবো। ঐ সময় আমার বুকটা ফেটে যায়→ পহেলা বৈশাখ, রোজার ঈদ, কুরবানির ঈদ সহ আরও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তোরে না দেখলে। সবার ছেলে মা কে নিয়ে কত জায়গা বেড়াতে যায়, কিন্তু আমার সোনামনি কোথায়? আমারও তো বেড়াতে ইচ্ছে করছে! তোর কি মনে আছে সে ছোট বেলার কথা- তোরে মায়ের সাথে করে কত জায়গা বেড়াতে নিয়ে যেতাম, কখনও তোরে রাখি কোথাও গেছি এমন কথা বলতে পারবি? কোথাও যায়নি! এখন বাড়ির বাউন্ডারী ছাড়া তোর মা কোথাও যেতে পারে না। দু'চোখের অস্রুতে বুক ভাসে যখন তোর কথা মনে পড়ে। একবার ফিরে আয় না রে বাবা,শুধু একবার মায়ের বুকটা ঠান্ডা করে চলে যাস। আর কখনও তোরে অনুরোধ করবো না। কত মানুষ দিন রাত রাস্তা ঘাটে দিয়ে আসে যায়- কিন্তু আমার সোনা পাখিরে দেখি না.....
মনে হয় শত শত বছর পেরিয়ে গেছে তোরে দেখি না, তোর শরীরের যত্ন নিতে পারছি না, তোরে মা গোসল করাই দিতে পারছি না.......!
বাবা একবার ফিরে আয় না রে, আমার পুরো মনটা এখন তোরে দেখার জন্য আর কিছু না। তোরে দেখলে মায়ের মনটা শান্তি পাবে। তুই চিন্তা করিস না মা তোর জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামায পড়ে দোয়া করি। না আসলেও বদদোয়া দিব না মা।তোর বাবা থাকতে আমাকে যে চশমাটা নিয়ে দিছে সেটার কিছুদিন হয়েছে এক পা ভেঙ্গে গেছে, অন্য পা চোখে থাকছে না; তাই চশমা চোখে না দেয়ার কারনে বেশিক্ষণ লিখতে পারছি না। খুব মাথা ব্যাথা করে.....
.
আজ আর নয়। ভালো থাকিস, সুখে -শান্তিতে থাকিস আমার সোনা চাঁন পাখি। আর তুই দ্রুত মা কে দেখতে আসবি এ বলে শেষ করছি।
.
. . . ইতি,
তোর প্রিয় মা
.
পরের দিন ডাক যোগে রবিনের জন্য চিঠি জমা দিল। সে চিঠি শহরে পৌছতে সময় লাগলো আট দিন। রবিনের ঠিকানায় চিঠি পোছতে সময় লাগলো আরও দুই দিন। দশ দিনে চিঠি এসে পৌছলো রবিনের কাছে। রবিন চিঠি পড়ে দু'চোখের পানিতে বাহু ভিজাচ্ছে আর মন চাইছে উড়াল দিয়ে মায়ের হৃদপটে যাওয়া। কিন্তু সম্ভব নয়। ছুটির জন্য অফিসিয়াল নিয়ম-কানুন তাকে মেনে চলতে হবে।
পরের দিনই অফিসে ছুটির জন্য দরখাস্ত করল। সে ছুটি মঞ্জুর হয়েছে মায়ের চিঠি দেয়ার চৌদ্দ নং দিনে। এ দিন রবিন মায়ের জন্য চশমা সহ যাবতীয় জিনিস কিনে নিল।
পনর নং দিনে রবিন তার মাকে দেখার জন্য রওনা দিল। ষোল নং দিনে রবিন গ্রামের বাড়িতে পৌছলো। সে দিন রাত চারটার দিকে তার মা স্বামীর শোঁককাতর ও সন্তানকে না দেখার শোঁকে পৃথিবী নামক ক্ষণিক জিবন থেকে ইহত্যাগ করে পর ভূবনে চলে গেলেন......
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন