বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মার্চ ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ১৭টি

ছলনা যখন নারীর মনে

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

বিষণ্ন আঁধারের অতিথি

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

নীরবে ভিজতে থাকা এক ইষ্টিশান

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

গল্প - বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী (নভেম্বর ২০১৭)

এখনও আমি সোহানাকে খুজি

মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
comment ৫  favorite ০  import_contacts ৬০
সোহানার মৃত্যুর ব্যাপারটা নিয়ে প্রায় সময় আমাকে মাথা ঘামাতে হত। আমাদের অনেকের মাঝে একটা ভাবদায়ক সৃষ্টি হত। কেউ বলে সেদিন সকালে দেখেছি কি ভালো মেয়ে রাস্তা দিয়ে হেটে যাচ্ছে, এই যে তার কিছুক্ষণ পর আমি তাকে স্কুলে দেখেছি, কি বলোস তুই- আমি তো শেষ বিষয়ের ক্লাসটা একসাথে করেছি। আমি তা মানিনা, আর তাদের বলাটা আমাকে আশ্চর্য করে ফেলে। আবার কেউ বলে এটা স্বাভাবিক। স্বাভাবিক বললেই তাকে ধাক্কা দিতে আমার মোটেও দ্বিধা করতো না। মাঝে মাঝে চোখের জলে নিজেই সাগর হয়ে যেতাম।
এই যে গত তিন বছর সোহানার সাথে আমার চাচাতো বোনের পরিচয়। এতদিন সম্পর্ক ছিল আপন বোনের মত। আমাদের বিষয়টা ছিল একটু আলাদা। মায়ের মুখ থেকে কখনও শুনিনি যে, সোহানা আমার চাচাতো বোন। বড় ভাই হিসেবে বোনের প্রতি যেমন একটা দায়িত্ব থাকে তা আমি সহজে পালন করেছি। কখনও মেরেছি কি না মনে হয় না। আমাকে প্রায় জ্বালাতন করতো। একদিন বাবাকে বলি কতদিন হয়েছে সমূদ্র- সৈকতে নিয়ে যাবে বলে একবারও তো নিচ্ছ না। এবার চল না বাবা দেখতে খুব ইচ্ছা জেগেছে।
বাবা বিভিন্ন তালবাহানা দেখিয়ে নিজে রাজি না হয়ে মামাকে রাজি করেছে, আমাদেরকে সমূদ্র সৈকতে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
পরের দিন সকালে মামা, আমি, সোহানা, মামাতো বোন জাবেদা, পাশের ঘরের প্রিয়াংকা, সবুজ, সিফাত সহ আমরা আট- নয়জন রওনা দিলাম। কয়েক ঘণ্টার ভিতরে আমরা পৌছে গেলাম।
সমূদ্রের কিনারে অনেক্ষণ ধরে সাতার কাটা, মজা করা সহ বেশ কিছু আনন্দ শেষ করে আমরা বাড়িতে ফিরলাম। সেদিন রাতে-ই সোহানার জ্বর উঠে গেল। আমাদের বাড়ির পাশে-ই ছিলেন এক ডাক্তার। তাকে দেখানো মাত্রই তিনি আবিজাবি ওষুধ কত গুলো দিয়ে দিলেন। সে ওষুধ খেয়ে সোহানার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল। সোহানাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার ডাক্তারেরা ওষুধ গুলোকে ভুল প্রমাণ করে এবং ওষুধ গুলোর ডেট ওভার হয়ে গেছে বলে জানালেন। শেষ পর্যন্ত সোহানার বাম চোখে সমস্যা দিল। এমন সমস্যা হয়ে গেল যে আমার দিকে তাকালে মনে হয় অন্য দিকে দেখে আছে। পরে চক্ষু হাসপাতাল নিয়ে গেলে তাতে সমাধান হয়নি, ডাক্তার তাকে চশমা ব্যবহারের আদেশ করলো। সেখান থেকে এ এলাকার অধিবাসীরা তাকে হাতুড়ে ডাক্তার নামে চিনে। আমরা তাকে আইনের লোকের কাছে সোপর্দ করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সমাজের মাথা উচু লোকের কারণে পারিনি। সমাজের মাথা উচু লোকের জন্য একটা সমাজ উপরের দিকে উঠতে পারে না, তৈরি হতে পারে না ন্যায়-সঙ্গত। ফলে একজন হাতুড়ে ডাক্তারের মত চিকিৎসক শত ভালো মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।
দিন যায় সে বড় হয়, আর মানুষের আচরণে কালো সাপ হয়ে দ্বাড়ায়। একটা ছেলের কোন সমস্যা হলে সমাজে যতটা না গড়ায়, একটা মেয়ের সমস্যা হলে তার চেয়ে চার গুন গড়ায়! মেয়ে জাতি যুগ যুগ ধরে সমাজের কাছে শুধু অপমানিত হয়নি, শত লাঞ্চনা তাকে সয়ে যেতে হয়েছে।
.
এর ভিতরে প্রায় কয়েক বছর কেটে গেল। এই তো কিছুদিন আগে আমার সাথে সোহানার সম্পর্ক চাচাতো ভাই- বোনের। যদিও ব্যাপারটা অন্য রকম বুঝায়, কিন্তু বিষয়টা এই যে- যখন সোহানার দু’বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যায়। বাবার মৃত্যুর শোক নিয়ে তার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েন। রোগ এমন এক পর্যায়ে পৌছে গেছে, তার মৃত্যু ছাড়া আর কোন কিছু করার ছিল না। শেষে আমার মা সোহানাকে নিজ মেয়ের মত বরণ করে লালন পালন করেছেন। দাদু আমাকে এমন-ই বলেছেন যে, সোহানাকে মানুষ করার জন্য তোমার মা দ্বিতীয় মেয়ের স্বপ্ন দেখেনি।
একদিন সোহানা কি যেন একটা ভুল করে ফেলেছে এ জন্য আমি খুব বকা দিছি। এইটুকু আবার ছোট চাচি শুনে আমাকে ইশারায় তার ঘরে ডেকে নিয়ে সব কথা বলে দিল। ভুল করলে আমি যেন তাকে রাগ না করি এ প্রথম চাচির মুখ থেকে শুনেছি। প্রথমত- মেয়েটির চোখে সমস্যা, দ্বিতীয়ত- পিতৃ ও মাতৃহীন; যদি সীমার বাহিরে রাগ চলে যায় তাহলে সমাজের কিছু মানুষের ঘৃণা ও প্রিয়জনের আচরণে হয় তো মেয়েটি খুব কষ্ট পাবে। যদিও তাকে কেউ বলেনি যে, কে তার আপন মা এবং কে তার সতাই মা, কিন্তু সমাজের কাছে গোপনীয় কথা লুকিয়ে থাকে না। বিষয়টা আমার কাছে খুব আশ্চর্য জনক লেগেছে। এ কথা গুলো সোহানা এক নিমিষে চাচির ঘরের পাশে কান পেতে শুনে গেছে। রাতে মা আমাকে ভাত খেতে দিয়েছে, অথচ সোহানাকে খেতে বললেই খাবে না বলে শুয়ে পড়েছে। তাকে ডাকতে গিয়ে দেখি দু’চোখের জলে বালিশ ভিজে গেছে। মায়ের কাছ থেকে শুনেছি- স্কুলে নাকি প্রতিদিন অনেকে টেরা (এ দিকে তাকালে যখন বুঝা যায় অন্যদিকে দেখে আছে তখন গ্রামের ভাষায় তাকে টেরা বলে) বলে তাকে নিয়ে উপহাস করে। বুঝতে আর বাকি রইল না- এই তো সে নারী, যার বুক ফাটলেও মুখ ফাটে না। হয় তো চোখের জলের ভিতরে সে সুখের স্বপ্ন দ্যাখে, নয় তো বুকের ভিতরে উনুন জ্বেলে রেখে সুদিনের প্রতিক্ষায় থাকে। অনেক তোষামদ করে সোহানাকে আমার সাথে খাবার শেষ করলাম। দিন যেতে থাকে আর তার জন্য আমার মায়া আরও বেড়ে যেতে থাকে।
.
একদিন রাতে পড়া- লেখা শেষ করতে রাত প্রায় গভীর হয়ে গেল। কিছু ভালো লাগে না, বাহিরে চাদনী ছিল তাই একটু গিয়ে বসলাম। হালকা বাতাসে মনটা বেশ চুপসে উঠেছে। হঠাৎ একটা ভাবনা চলে আসলো- সোহানাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার, কিন্তু কিভাবে সম্ভব? তাকে তো আমার আপন বোনের মত সব সময় দেখেছি, তার জন্য তো আমার ব্যাপারটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও মনটাকে অন্য রকম ভাবে বোঝাতে চেয়েছি যে- এক দিকে সে এতিম, অন্য দিকে তার চোখের অবস্থা ভালো নয়। যদি তাকে অন্যের সংসারে বিয়ে দেয়- তারা তো একদিন না একদিন তার এ সমস্যার জন্য তাকে নিয়ে সময়ে অসময়ে উপহাস করবে, খোট্টা দিবে। যদিও তাকে হাতে মারবে না কিংবা ভাতে কষ্ট দিবে না, কিন্তু আচরণে তাকে মোটেও সুখ দিবে না। দ্বিতীয়ত, তাকে যখন অন্যের সংসারে বিয়ে দিবে তখন তার জামাই বাড়ির লোকজন আত্মীয়তার সম্পর্কে আসা যাওয়া করতে চাইবে। একদিন, দুইদিন, তিনদিন কিংবা চারদিন কিন্তু সতাই মা যতই মেয়ের মত আপন ভেবে থাকুক না কেন সে কি সেই সব দায়িত্ব একদিন মেনে নিতে পারবে? হয় তো না, কিংবা কয়দিন অন্যের ভেজাল নিজ কাঁধে অর্পণ করবে...
:) নিরলসে ভাবনা গুলো ডিগভাজি খাচ্ছে। এই যে আমার হাতের উপরে বড় করা সোহানার এমন হতাশা দেখলে সে সময় আমার কি সহ্য হবে? মনে হয় না, কারণ আমি তো আপন বোনের মত সব সময় সোহানাকে দেখেছি, আদর করেছি, খাইয়ে দিয়েছি, পড়া লেখা শিখিয়েছি। অবশেষে চিন্তা করেছি যে, আমি সোহানাকে বিয়ে করবো। যা হোক, বিভিন্ন চিন্তা ভর করে একদিন সরাসরি সোহানাকে এমনটা প্রস্তাব দিয়েছি যে, আমার মা- বাবা যদি তোমার জন্য কোনো বিয়ের পাত্র খুজে তুমি রাজি হতে যেও না, কিন্তু কেন আমি তাকে বিয়ে করতে চাই তার সব প্রশ্ন ও উত্তর দু’টি-ই আমার কাছে।
.
অনেকদিন আগে থেকে একটি সরকারী ডিপার্টমেন্টে চাকরী করার আবেদন চলেছে। ইচ্ছা ছিল সেখানে যদি চাকরিটা হয়ে যায় তাহলে বেশিদিন অপেক্ষা করা যাবে না। সর্বোচ্চ বছর খানেক।
একদিন কার্তিক মাসের দ্বিপ্রহরে দীর্ঘ সময়ের ব্যস্ততা কাটিয়ে ক্লান্ত শরীরটাকে আঁধশোয়া অলস বিছানায় শুয়ে দিলাম। হঠাৎ সোহানার ফোন বেজে উঠলো। কল রিসিভ করতে বলে-
:) তুমি নাকি বাড়িতে আছো, একটু কলেজে আসতে পারবে?
=:) কেন, কি হয়েছে? কোন সমস্যা?
:) কিছু হয়নি, তুমি নিশ্চয়ই জানো সামনে আমার ফাইনাল এক্সাম। প্রাক্টিকেল বলতে কিছু জানি না। যদি তুমি আমার কলেজে আসতে, তাহলে ল্যাবে গিয়ে কিছু শিখাতে পারতে।
=:) ফোন দিয়েছ খুব খুশি হয়েছি, মুহূর্তের মাঝে আসছি।
অন্য কেউ হলে হয় তো বিছানা থেকে উঠাতে পারতো না, কারণ শরীরটা খুব ক্লান্ত। যখন তার ফোন মোবাইলে বেজে উঠলো, তখন-ই লাফ দিয়ে উঠে পড়েছি এবং কথা শেষ করে দ্রুত চলতে শুরু করেছি।
যেতে যেতে পথিমধ্যে দেখা সোহানার ক্লাস ফ্রেন্ড রানার সাথে।
:) ভাইয়া কোথায় যাচ্ছেন...?
এই তো তোমাদের কলেজে।
:) কেনো যাচ্ছেন? কোন কাজ আছে নাকি?
=:) একটু কাজ আছে, তবে আমার নয় সোহানার জন্য। কলেজে কি প্রাক্টিকেল শিখায় না?
আ রে না ভাইয়া, আপনি মনে হয় মোটেও জানেন না। এই যে নতুন রিয়াদ স্যার, সজিব স্যার, ফিরোজ স্যার এরা সবাই বিজ্ঞানের শিক্ষক, কিন্তু প্রাক্টিকেল বলতে কিছু জানে না।
চাকরি নেওয়ার সময় নাকি তাদের ইন্টারভিউও হয়নি, চেয়ারম্যানের সুপারিশে প্রিন্সিপাল কলেজে তাদেরকে জয়েন দিতে বলেছে।
কথা বলতে বলতে রানাকে নিয়ে গেলাম কলেজে। সোহানা যে কলেজের ছাত্রী আমিও এক সময় সে কলেজের ছাত্র ছিলাম। কলেজের প্রিন্সিপাল আমার খুব পরিচিত। প্রিন্সিপালের সাথে কথা শেষে সোহানার ক্লাসে চলে গেলাম। সোহানা আমাকে দেখে বেজায় খুশি হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের ভিতরে আমাকে সোহানা ও একজন স্যার ল্যাবে নিয়ে গেল এবং কোথায় কি আছে তা দেখিয়ে দিল।
সোহানা আমাকে রসায়নের একটি প্রাক্টিকেল করার জন্য বলল। প্রাক্টিকেলটা করার জন্য যা কিছু দরকার তার সব কিছু এখানে ছিল না বলে সোহানার এক বান্ধবি আর রানাকে ল্যাবে রেখে কলেজ থেকে একটু দুরে দোকানে আসলাম।
.
আমি দোকানে চলে আসলাম। দোকানের পাশে সাক্ষাত হল আমার পুরোনো বন্ধু রাহাতের সাথে। কথা বলতে বলতে প্রায় আঁধা ঘণ্টার মত। হঠাৎ রানা আমাকে ফোন দিয়ে বলল, তাড়াতাড়ি ল্যাবে আসুন খুব সমস্যা হয়ে গেছে।
কথাটা শুনা মাত্র এক দৌড়ে সোজা কলেজের ল্যাবে। রাহাত আমাকে ডাকতে ডাকতে আমার পিছনে পিছনে চলে আসলো।
ল্যাবে ঢুকে দেখি আমার প্রাণ প্রিয় সোহানা ফাঁকার উপরে শুয়ে আছে। নাকে হাত দিয়ে দেখি- কোনো নিশ্বাস বের হচ্ছে না। হাতের রগ চেপে ধরে রেখেছি, কিন্তু শরীরের কোনো অংশ নড়ছে না। আর কলেজের পাশে ছিল মেডিকেল। দ্রুত মেডিকেলে নিয়ে গেলে কিছুক্ষণ পর ডাক্তার রিপোর্ট দেয় সে আর বেঁচে নেই। এখানে তদন্ত করে কোন রিপোর্ট বের করার সময় না দিয়ে আমরা লাশ নিয়ে আসলাম, কারণ বেশিক্ষণ রাখলে এরা লাশের কাটা- ছেড়া করতে পারে। সেদিন থেকে দু’চোখের জলে নিজেই সাগর হয়ে গেছি। সপ্তাহ দু’য়েক আর ঘুম হল না। যাকে নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলাম মনের পিঞ্জরে সে আজ আর নেই...
.
এর ভিতরে রানা ভয়ে পালিয়ে গেছে তার নানা বাড়িতে। সোহানার বান্ধবি আর রানার নামে থানায় জিইডি করা হয়েছে, কিন্তু ঘটনার পূর্বেই কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সোহানার বান্ধবি কলেজ থেকে বের হয়ে গেছে তার প্রমাণ পাওয়া গেল দারোয়ান, সম ক্লাসের আরও কিছু ছাত্রী এবং তার মুখ থেকে।
আমাদের বাড়ি থেকে এক কিলোমিটার দুরে ছিল রানার নানা বাড়ি। রানাকে ধরার জন্য তার নানা বাড়িতে গেলাম এবং শার্টের কলার ধরে যখন নিয়ে আসবো তখন-ই রানার মা আমাকে ধাক্কা মেরেছে। আমি পাশে দেওয়ালের উপরে উপচে পড়েছি এবং আমার হাতে খুব আঘাত পেয়েছি। আঘাত নিয়ে তাকে সে অবস্থায় পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছি।
তবে এক সময় সোহানাকে না দেখেও মোটামোটি সময় কাটাতে পেরেছি, আজ কেন তা পারছি না! এই যে শত বন্ধু আজ চারদিকে কত মজা করে, নানা রকম খেলা করে, কত জাদু দেখায়, তাতে মোটেও কি তাকে ভুলে থাকা যায়?
আ রে না, ভুলতে-ই পারি না, বরং আরও মায়া বেড়ে উঠে।
.
এক সময় ভাবনা গুলো ছিল হাসির, মজার কিংবা দুশ্চিন্তাহীন, আর আজ সে ভাবনা গুলো খুজে পায় নীরব দু’চোখের জলে কিংবা নিকোটিনের প্রতিটি টানে। রহস্যজনক এ মৃত্যুটা আমাকে সীমাহীন ভাবায়।
এ দিকে রানার বাড়ি থেকে লোক আসে রানাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে। অন্যদিকে কলেজের প্রিন্সিপালকে অনুরোধ করা হয়েছে- যত দ্রুত সম্ভব সোহানার মৃত্যুর কারণ বের করা। সময় তার নিজস্ব গন্ডিতে চলেছে, কিন্তু কেউ তার প্রমাণ বের করতে পারছে না। এ দিকে পরশু দিন রানাকে জবান বন্দি দেওয়ার জন্য আদালতে সাব্যস্ত করা হবে। কি করবো বুঝতে পারছি না। যদি আবার লাশকে কবর থেকে উঠানো হয়, কিংবা মৃত্যুর দোষটা আমার উপওে চাপিয়ে পড়ে, তখন কি হবে?
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা চিন্তা চলে আসলো। আমি যখন কলেজে ছিলাম তখন সিসিটিভি ছিল না, এখন নাকি সিসিটিভি আছে। স্যারকে একবার ফোন দিয়ে জিঙ্গেস করি, এ তথ্য পাওয়া যায় কি না। এই সময়ে কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি ফোন দিলে যদি স্যারে সিসিটিভির ধারণকৃত ভিডিও টুকু গোপন চুক্তির মাধ্যমে কেটে দেয়, তখন কি হবে?
না আমি আগামীকাল সকালে-ই স্কুলে উপস্থিত হব। মা বাবা, দাদা দাদি সবাই আমাকে বার বার জিঙ্গেস করে, কি রে- কি করবি? কাউকে কিছু না বলে চুপ করে থাকলাম।
:) পরের দিন সকালে-ই কলেজে উপস্থিত হয়ে গেলাম। প্রিন্সিপাল থেকে সম্পূর্ণ অনুমতি নিয়ে সিসিটিভির মনিটরের কাছে চলে গেলাম। নির্দিষ্ট সে তারিখ অনুযায়ী সে দিনের সম্পূর্ণ ভিডিও আমি টেনে টেনে দেখেছি। হঠাৎ সে সময়ে পৌছে যাওয়া ভিডিও তে আমি দ্যাখতে পেরেছি যে-
আমি যাদেরকে সোহানার সাথে রেখে গেছি তাদের মধ্যে সোহানার বান্ধবির মুঠোফোনে একটি ফোন আসছে, কথা শেষ করে সে রুম থেকে বের হয়ে গেল। টেবিলের একপাশে বসে আছে রানা। দু’মিনিট পর রানাও সেখান থেকে বের হয়ে গেছে। একটু পর সোহানা ল্যাব ছেড়ে খাবার রুম থেকে খাবারের বাটিটা নিয়ে এসেছে এবং বাটিটার ভিতরে খাবার ছিল। এখানে সোহানা শুধু একা, পাশে আর কেউ নেই। সে খাবার গুলো খেতে শুরু করলো আর তার প্রাক্টিকেল বইয়ের দিকে নজর দিয়ে কি যেন চিন্তা করল। ল্যাবের ভিতরে একপাশে ছিল বিভিন্ন ধরনের সায়ানাইডের বোতল (যেমন- পটাশিয়াম সায়ানাইড, সোডিয়াম সায়ানাইড)। এখানে বিভিন্ন ধরনের সায়ানাইডের বোতল থাকার কারণ হচ্ছে এই ল্যাবটি শিক্ষকদের ট্রেনিং ও শিক্ষার্থীদের প্রাক্টিকেল এ দু’ভাবে ব্যবহৃত হয়। বোতলটির মুখ খুলতে ভিতরের সায়ানাইডের বিষক্রিয়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং খাবারের সাথে মিশে গেছে। সোহানা এত কিছু না ভেবে সায়ানাইডে মিশে যাওয়া খাবার খেতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর সে ফাঁকার উপরে পড়ে গেল এবং ঝাপটানি দিতে শুরু করলো, কিন্তু কেউ শুনতে পারছে না। কলেজের দক্ষিণ মাথায় ছিল ডাক্তারের রুম, যদি কেউ এসে তাকে সাথে সাথে নিয়ে যেত পারতো হয় তো সোহানাকে বাঁচানো সম্ভব হত। ধীরে ধীরে সোহানার হাত- মুখ কালো হয়ে যাচ্ছে। হয় তো সোহানা যে খাবারটি খেয়েছিল তার সাথে সায়ানাইডের বিষাক্ত বিক্রিয়া ঘটেছে, তবে সায়ানাইড এমনে বিষক্রিয়া। যার কারণে সোহানা সাথে সাথে পড়ে গেছে। বরাবর বিশ মিনিট পর রানা এসেছে। রানা এসে দেখে সোহানা ফাঁকাতে ঝাপটানি দিচ্ছে। স্যার ও অন্যান্য শিক্ষার্থীরা আসতে আসতে সোহানা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। বিজ্ঞানের এক শিক্ষক এক ছাত্রকে চোখ টিপের মাঝে ছাত্র মুখোশ পড়ে সায়ানাইডের বোতলটি কোথায় যেন নিয়ে গেল এবং অন্য এক ছাত্র এসে রুমটাকে সুগন্ধ ছড়ানোর জন্য স্প্রে করে দিল...
.
এদিকে রানা কোন দোষী নয়, আমি তাকে দোষী ভেবে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে দিয়েছি। পরের দিন আমি নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে সিসিটিভির ধারণকৃত ভিডিও ফুটেজ বিচারকের সামনে তুলে ধরলাম। বিচারক সবটুকু দেখে বাংলাদেশের আইন মোতাবেক রানাকে ছেড়ে দিল এবং সিসিটিভির মনিটরের সামনে সে সময় কেউ ছিল না বিদায় কলেজের পক্ষ থেকে বিশাল অংকের টাকা জরিমানা করা হল...
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন