বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১২ মার্চ ১৯৯৭
গল্প/কবিতা: ১৭টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৪২

বিচারক স্কোরঃ ১.৪ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.০২ / ৩.০

ছলনা যখন নারীর মনে

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

এখনও আমি সোহানাকে খুজি

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

বিষণ্ন আঁধারের অতিথি

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

গল্প - ভৌতিক (সেপ্টেম্বর ২০১৭)

মোট ভোট ৩৭ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৪২ ভৌতিক বাড়ি

মোঃ নুরেআলম সিদ্দিকী
comment ১৩  favorite ০  import_contacts ১৬৩
ঘরে যেতে ইচ্ছে করে না। বউটা শুধু প্যাচাল মারে। নিজের ইচ্ছাও প্যাচাল মারে। সারাদিন মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ায়, আর বন্ধুদের সাথে সারাক্ষণ আড্ডা মারে। এই- সেই- নানা প্যাচাল।
সেদিন রন্টুকে বললাম- সিমেন্ট আর বালু নিয়ে আসার জন্য; মুখে লেপে দিব, যাতে বকাবকি না করতে পারে।
মেয়েটাকে বললাম- আমি যদি চলে যায় তুই থাকতে পারবি আমাকে ছাড়া? মেয়েটা টেরা চোখের মত চেয়ে বলে আমি ও যাব।
কয় যাবি তুই?
তুমি যেখানে যাও... বাহ্ কি সুন্দর উত্তর!
বউটা কয় : যা যা- এখনই যা, দুরে গিয়া মর...
তাই সেদিন বের হয়ে গেছি, ইচ্ছা করছে আর বাড়িতে যাব না। এই বউকে আর দেখা দিব না, কিন্তু ছেলে- মেয়ের দিকে তাকালে মনে বিশাল মায়া সৃষ্টি হয়...
.
সেদিন খুব জ্বর উঠলো। ডাক্তারের কাছে গেলাম রোগ সারানোর জন্য, আর ডাক্তার আমারে আবি-জাবি বলে ওষুধ কতগুলা প্যাকেট করে দিল; কেমন লাগে? এমনে টাকা নাই আরও কত ওষুধ! চলে এসেছি এবং পাশের দোকান থেকে দুইটা প্যারাসিটামল নিয়ে গেলাম আর খেয়ে রোগ সারালাম।
কালকে ঘরে এসে বউকে বললাম;
খুব ক্ষুধা লাগছে রে, খাওয়ার কিছু থাকলে দাও না, খেয়ে পেটেরে একটু শান্তি দিই।
ঝাড়ু–টা উঠোনে মেলা মেরে রেখে আমারে বলল-
তোর লাহান আকাইম্মার কিসের ক্ষুধা; ঘরে কোনো খাবার নাই এখনই বের হয় ঘর থেকে। কেমন লাগে, কোথাও শান্তি নাই রে। বের হয়ে মার ঘরে গিয়া দেখি পটে কিছু মুড়ি, পাশে দেখি সরিষার তেলের ডিব্বা আর পেঁয়াজ। একটা বক্সে মুড়ি, পেঁয়াজ আর সামান্য তেল নিয়ে মেখে খেতে শুরু করে দিলাম। সামনে দেখি- মেয়েটা।
): কি রে খাইবি?
): দাদি দেখলে কিছু কইবো না? আ রে বোকা মেয়ে, আমি আছি না; কি কইবো?
ধর তুই কয়টা খেয়ে নে...
খাওয়া শেষে বাবার কাছে গেলাম, দেখি বাবা ক্ষেত নিড়াচ্ছেন। ভাবছি বাবাকে যদি একটু সাহায্য করি এক বেলার তরকারী হলেও তো বাবা আমার সংসারে দিবে। বাবাকে বললাম-
): বাবা তুমি একটু বিশ্রাম নাও, কোদালটা আমাকে দাও; আমি কতক্ষণ করে দিই। বাবা কলল- তুই নাকি সকাল পর্যন্ত কিছু খাসনি, কিছু খেয়ে আসতি। বাবা বুঝলো, কিন্তু বউটা বুঝলো না। খাইছি বাবা, দাও তুমি ঘরে যাও মা ডাকে। মিছা কথা, মা ডাকেনি। বিড়ির নেশা ধরে গেছে তাই একমুঠো লাল শাক আম্বিয়ার মাকে দিয়ে তিন টাকা নিয়ে বিড়ি কিনবো। :(
.
(১)
অনেকদিন হয়েছে বেচারাকে দেখি না। পুড়া কপালের (গ্রামের সবার ডাক নাম) ছেলেটা পৃথিবীতে জন্ম নেওয়াটাই অনর্থক হয়েছে। সিফাতের মায়ের সাথে ভূতের আঁচড় ছিলো। ছেলেটা জন্মের দুইমাস পর ওর মা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে। দাদি অনেক কষ্ট করে তার চাচিকে দিয়ে তাকে বড় করেছে। ওরা নাকি সাতজন, এক এক করে সাতজনকে নিবে। কি আশ্চর্য ব্যাপার, বোঝাটাই অন্য রকম। ছেলেটা বড় হয়েছে, কিন্তু তার মায়ের সাথে থাকা ভূত গুলো আজ কাল তাকে সুখ দিচ্ছে না। সময়ে অসময়ে তাকে জ্বালা-যন্ত্রণা করে। একদিন ছেলেটা আমার সাথে একই রুমে শুয়েছে ওদের ঘরে মেহমান ছিল বলে। তাড়াতাড়ি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, মধ্যরাতে বাতরুমের উদ্দ্যেশে বের হলাম। আমি বাতরুম করতে বসেছি, আর আমার সামনে দিয়ে কি যেন বসে হুবহু ওর চেহারা ধরে বসে আছে। ওরে ঘরে রেখে এসেছি, কিন্তু এখানে আসলো কোথা থেকে ভাবতেই অবাক লাগে। আর বাতরুম করলাম না, তাড়াতাড়ি ঘরে চলে গেলাম। রন্টুকে ডাকলাম হ্যারিকেনের জন্য। হ্যারিকেনের দরকার ছিল না, কারণ আকাশে চাঁদনির আলোতে ভরা। এতটা আলো ছিল যে, বসে বসে ডাইরিতে লেখা যাবে। কিন্তু কি করবো, মনের ভিতরে খুব ভয় আসলো; তবু ভয় নিচ্ছি না।
:) বাবা হ্যারিকেনের জন্য ডাকলে কেনো? বাহিরে তো কিরণে ভরে আছে।
কালভার্টের পাশে মাছের জন্য জাল দিয়েছি না, সেটা দেখতে চেয়েছি।
তুই একটু আমার সাথে আসবি বাপ?
চলো না বাবা। :(
রন্টুকে দাড়া করে বাতরুম সেড়ে আর বাহিরে থাকলাম না। দ্রুত ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। দরজা বন্ধ করতে গিয়ে খুব আওয়াজ হল। ঐ দিকে বউয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেল। আর প্যাচাল মারা শুরু করে দিলো-
:) রন্টু আমাদের ঘরে বড় বিড়াল ডুকছে নাকি? ঈদুরকে এমন করে দৌড়াচ্ছে ঘুম যাওয়া যাচ্ছে না।
রাত্রি বেলা আর কিছু বললাম না। কিছুক্ষণ পর বেড়ার পাশ থেকে কিসের যেন গুন গুন শব্দ শুনতে পেলাম। মনে হল এটা যেন “স্ট্যানলি” হোটেল। সে রাত্রে আর ঘুম হল না। (:)
.
(২)
খুব শীত পড়ছে। কুঁয়াশায় চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। বাবা চাদর গায়ে দিয়ে এই শীতের রাতে টঙে বসে বসে আকিজ বিড়ি টানে আর ফসল পাহাড়া দেয়, যাতে চুরে না নিয়ে যেতে পারে। কুমড়া গুলো খুব বড় হয়ে গেছে, আর মুলার ডাটা কচি কচি দেখাচ্ছে। ইতিমধ্যে লাল শাক বাজারে বেচার উপক্রম হয়েছে। বাবা সযতেœ ফসল চাষ করে, আর আমার মেয়েটা বাবাকে ফাঁকি দিয়ে মুলার ডাটা, কুমড়ার শাক, আলুর শাক, লাল শাক, কুমড়া নিয়ে আসে। মা জানতে পারে, কিন্তু বাবাকে বলে না। বাবা জানলেও আমাকে কিছু বলবে না, কারণ বাবা জানে আমার এখন কোনো ইনকাম নাই। এই কঁন-কঁনে শীতের রাতে বাবা বসে বসে ফসল পাহাড়া দিচ্ছে আমার খুব কষ্ট লাগলো।
:) সেদিন বাবাকে বললাম, বাবা আমি না হয় কয়দিন টঙে বসি তুমি না হয় কয়েকটা দিন শান্তিতে ঘুমাও।
বাবা বলে- সত্যি টঙে বসে ফসল পাহাড়া দিবি নাকি সাকিব, রাজিব, সজিব সবাই মিলে মানুষের খেজুর রস চুরি করবি?
কি যে বল বাবা, শয়তানির বয়স কি এখনও আছে? ছেলে- মেয়ে বড় হয়েছে না, এদের সামনে মানুষ এক কথা বললে ইজ্জত থাকবে... :(
এরপরের দিন চলে গেলাম টঙে। রাত বেশি নয়। পাশে নদী, আকাশে চাঁদনিরা দোলে, তারা গুলো মিটমিট করে আলো দিচ্ছে। হয় তো চাঁদের মা চাঁদকে নিয়ে খুব মজা করছে। নদীতে মনে হয় জোয়ার, তাই নৌকা গুলো মাছ ধরার উদ্দেশ্যে ঘাট ত্যাগ করছে। আজাদ মামার দোকান থেকে বিড়ি নিলাম এক প্যাকেট। বিড়ি টানছি আর এসব মজা দেখতে দেখতে সময় শেষ করছি। ধীরে ধীরে রাত নিঝুম হওয়া শুরু করলো, আর চারদিক থেকে ঝিঁঝিঁ পোঁকাড় ডাক। খুব ভালো লাগলো। বিশাল মাঠে শুধু দু’টো টঙ। এক পাশে রহিম চাচা’র, তার ওপর পাশে আমাদের। সংসার নিয়ে একটু চিন্তা বেড়ে গেলো। চাঁদরটাকে গায়ে দিয়ে খড়ের উপর মাথা রেখে ভাবছি- বসে বসে আর কত, ইনকামের দরকার। খড়ের উঞ্চতায় গরম অনুভব হলো আর ভাবতে ভাবতে চোখে ঘুম চলে আসলো।
:) হঠাৎ গরুর আওয়াজ। ঘুম ভেঙ্গে গেলো। মাথা উচু করে চারদিকে দেখেছি, কিন্তু কিছু নেই। প্রান্তর এখন নিস্তব্দ। চোখ দুটো বন্ধ করে চুপ করে থেকেছি, একটু পর ধপাস ধপাস শব্দ।
চোখ মেলতে দেখি- ক্ষেতের মাঝ বরাবর সাদা কাপড়ে পরিবেষ্টিত বিশাল লাম্বা একজন লোক এ দিকে আসছে। মনে ভয় ঢুকে গেলো, কিন্তু মা বলছে কখনও কোথাও যদি কোনো কিছু দেখি তাহলে মনে কোনো ভাবে ভয় নেওয়া যাবে না। ভয় নিলে এরা আঘাত করে বেশি। আর তাদেরকে দেখলে এমনেই ভয় ধরে যায়, তবু ধৈর্য ধরে ঘুমের ভাঁন করে চুপ করে শুয়ে আছি। এটা একেবারে কাছে চলে আসলো।
): করিম, এই করিম... ওই করিম, কি রে শুনতে পারছোস না...! (:
এটা আমার নাম জানে কিভাবে? প্রথমে যদিও চুপ করে ছিলাম, কিন্তু পরে আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। শুয়ে থাকা থেকে বসে গেছি, আর সালাম দিছি।
): হুজুর, আমাকে কেনো ডাকলেন? শরীরটা খুব কাঁপতে লাগলো; একে শীত আরও ভূত। আমাকে বলে-
ভয় করিস না তুই, আমি এই বাড়ির পাহাড়াদার। ঐ যে তুলা গাছ আর বটগাছ দ্যাখতে পারছোস? সেখানে আমার আড্ডা। ঐ দিন তুই বাহিরে বের হয়ে যা দেখলি, তা ছিলাম আমি। তুই সেদিন বেঁচে গেছিস, তবে একা কখনও নিশি রাতে বের হইবি না। যা ঘুমায় যা, ফজরের আগে কিছু খাবি না।
ভয়ে কেমনে যেন ঘুম চলে আসলো, হঠাৎ জেগে দেখি সব কিরণে ভরে আছে।
বাড়িতে এসে দেখি- ঘরে কেউ নাই। খেজুর গাছের ডাল দিয়ে দাত মাজতে মাজতে পুকুর পাড়ে দেখি বউ। শুরু করে দিছে- কত জমিদারের ছেলে; দিনের কতক্ষণ হয়েছে এখন এসেছে মুখ ধোয়ার জন্য।
কিছু বললাম না! মুখটা ধোয়ে ঘরে গিয়ে দেখি- মেয়েটা আলুর ভর্তা বানাচ্ছে। কি রে মা, বাবা রে কিছু দে- খুব ক্ষুধা পাইছি রে। মেয়ে পান্তা ভাত আর আলুর ভর্তা দিলো, তা খেয়ে পেটেরে শান্তি করলাম........
.
(৩)
রহিম চাচার সাথে কথা হয় না অনেকদিন হয়েছে। চাচার বাড়ির পাশে বিশাল বটগাছ। বটগাছের কেশ গুলো এমন করে ঝাকানো দিনের বেলাও মানুষ ভয়ে পেয়ে যায়। বাড়ির চারপাশে তাল গাছ আর তুলা গাছে ভরা।
এ বাড়িতে আমার বন্ধু রাতুলের ছোটো একটি খড়ের ঘর। তার বউ’রও একই অবস্থা; ভূতের আঁচড়। তার চার- চারটে সন্তান হয়েছে; সব গুলো মারা গেছে। তার জন্য খুব কষ্ট লাগে। বউ এর আদেশে আর একটি বিয়ে করলো- তাও একই অবস্থা। সেদিন তার বউ দুপুর বেলা বাগানে গেছে সুপারী’র পাতার জন্য- সেখান থেকে এসে আউল- বাউল করতে শুরু করে দিলো। এই বাড়ির ভূত গুলো যেন মানুষকে খেলনার পাত্র মনে করে, যখন যেমন ইচ্ছা তখন তেমন করে খেলনা করতে শুরু করে দেয়।
.
সেদিন রাতুলকে নিয়ে গেলাম আমার খালাতো ভাই আরিফের নৌকাতে মাছের জন্য। যেতে যেতে চার রাস্তার মোড় পড়ল। দুর থেকে দেখি চারটা কুকুর লাফালাফি করছে। আরও কাছে গিয়ে দেখি চারটা বিড়াল বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে। আরও কাছে যেতে দেখি বিশাল লাম্বা সাদা কাপড়ে পরিহিত, মাথা থেকে হাটু পর্যন্ত দাড়ি, পা গুলো বাঁকা করে দাড়িয়ে আছে। বুকটা থর থর করে কেঁপে উঠলো। সব গুলো লোম দাঁড়িয়ে গেলো, মন চাইলো দৌড় দিই, কিন্তু পাশ্ববর্তীতে কোনো বাড়ি নেই। তাদের ভিতরে এক জন ছিল নারী। সেটা তিনজনকে বলে- মেরে ফেলার জন্য, আর একজন বলে- না, ওদেরকে যেতে দাও; কারণ তাদের ভিতরে যে ছেড়ে দিতে বলছে সে রাতুলের বউ এর সাথে আঁচড় ছিল। মুহূর্তের মাঝে কোথায় যেন চলে গেলো। মনে এতটাই ভয় আসলো, ভেবেছি আর পৃথিবীর রূপ দেখবো না। রাতে আর কিছু খাইনি, দু’জনে আরিফের নৌকায় শুয়ে পড়েছি।
.
(৪)
বেশ কয়েকদিন রাত্রি বেলা আর কোথাও যাওয়া হল না।
:) একদিন মেয়েটা বলল- বাবা খালি লবন ভাত আর খাইতে ভালো লাগে না, দাদার খামারে জাল দিয়ে মাছ পাওয়া যায় কিনা দেখতে যদি?
আমাদের তো জাল ও নাই রে মা, মানুষ আর কত তাদের জাল দিবে মাছ ধরার জন্য।
তুমি হ্যারিকেনটা দাও আমি রহিম দাদার বাড়িতে যাব, তার জাল নিয়ে আসবো। এরপর আমি আর তুমি মাছ ধরবো।
তোর ভয় নাই, এত রাতে এত দুরে যাবি?
কি যে কও না বাবা, যারা ভয় করে তাদেরকে ভূতে বেশি ধরে। রন্টু তুই সেতারার সাথে যা তো, তোর রহিম দাদার কাছ থেকে জালটা নিয়ে আয়। দু’জনে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর এসে ছেলেটা এসে বলল-
দাদা তোমারে যাওয়ার জন্য বলছে। দাদা নাকি তোমারে নিয়ে এক সাথে মাছ ধরবে। যা হোক, ভালোই হল- যা তোরা যায় ঘুমায় যা।
চারদিকে হালকা বাতাস অনুভব হচ্ছে, আরও কঁন কঁনে শীত। আজ নাকি অমাবস্যা লাগছে, আর সে রাতে আমরা মাছ ধরতে যাচ্ছি; ভালো হবে কিনা... ): দুরো যা হবে হোক, মেয়েটার কথা তো রাখতে হবে। রহিম চাচা সহকারে আমাদের বাড়ির পূর্ব দিকে বিশাল ঝোপঝাড়, আর সেখানেই বিশাল খামার। দক্ষিণ কিনার থেকে জাল মারা শুরু করলাম, কিন্তু একটা মাছও জালে উঠলো না, কারণটা বড় অদ্ভুত। মাঝ বরাবর গিয়ে জাল মারতেই অনেক বড় বড় মাছ, যত বড় মাছ এ পুকুরে আর কখনও পাওয়া যায়নি।
চাচাকে বললাম- চাচা থলি তো ভরে গেছে, আর লাগবে না এবার চলো। চাচা বলল- আরও কিছু মাছ হলে ভালো হত, কালকে মেহমান আসবে। আবার মারতে শুরু করলাম।
:) হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন বলে উঠলো- মাছ দে, মাছ দে...ঐ করিম, মাছ দে
এমন স্বরে বলতে লাগলো- নিজেই চমকে উঠলাম। পিছনে ফিরে দেখি অনেক গুলো সাদা মানুষ, দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে কেউ আসছে আর কেউ যাচ্ছে। চাচাকে বললাম-
কি করবা চাচা? থাকবা নাকি যায়বা?
একটু পর দেখি সব গুলো লাশ। খামারের চারপাশ জুড়ে সব শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর দেখি- লাশের মাথা গুলো কাটা, শরীরের আর কোনো অংশ নেই। কাটা মাথা এ দিক- ঐ দিক খেলনা করছে। মনে হল এটা যেন- “প্যারিসের কাটাকম্ব”। যা হোক, চাচা আবার ভয় পাওয়ার মানুষ। মুখের দিকে চেয়ে দেখি-
চাচার মুখটা কালো হয়ে যাচ্ছে আর শরীরটা থরথর করে কাঁপছে। জালটা ফেলে দিলাম, আর মাছের থলিটা আমাদের থেকে প্রায় ত্রিশ হাত দুরে ছুঁড়ে মারলাম। নিজের গায়ের চাদরটা দিয়ে চাচাকে জড়িয়ে ধরে বসলাম। ছোটো বেলা মায়ের থেকে “আয়াতুল কুরসী” সুরাটা শিখলাম; সেটা জোরে জোরে পড়ছি, কিন্তু চাচার এমন দেখে মুখ থেকে কথা বের হচ্ছে না। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখলাম, এরপর চোখ খুলে চারদিক দেখি কিছু নেই। পাশে হ্যারিকেনটা জ্বলছে, আর একপাশে জালটা পড়ে আছে। মাছের থলিতে একটা মাছ ও নেই। চাচার বুকে হাত দিয়ে দেখি- তার হৃদপিন্ড খুব জোরে উঠা- নামা করছে। ধীর সহিত তাকে সজাগ করলাম এরপর আস্তে আস্তে বাড়ি ফিরলাম। নিজের ঘরে আর যাওয়া হল না সে রাতে, চাচার ঘরেই ঘুম দিলাম। সকালে কাউকে কিছু না বলে পুরোনো বাড়িতে ছোটো ভাই সিফাতকে নিয়ে গাছ কাটার জন্য চলে গেলাম।
.
(৫)
পোড়া কপালের ছেলেটাকে নিয়ে তার দাদা-দাদি একটু বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। দিন দিন চেহারা শুকিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে রাতুলের স্ত্রী দুইটারও একই অবস্থা। আম্বিয়ার মুখ উজ্জ্বল করে মিষ্টি একটি সন্তান আসলো তিন মাস হয়েছে। কত ফকির- কবিরাজ দেখালো কোনো কাজ হল না। বাচ্চাটি মারা গেছে।
রহিম চাচা, রাতুল, আম্বিয়ার বাবা সহ দশ-বার জন সেদিন উঠোনে বৈঠক করলেন যত দ্রুত সম্ভব এ এলাকার আষ্টে-পৃষ্ঠে থেকে ভূত- পেতনি সহ যাবতীয় জিন-পরী দৌড়াতে হবে। যাতে যুগ যুগ ধরে এরা এ এলাকাতে ঢুকতে না পারে। সেই রাতেই রাতুলের স্ত্রীকে উঠোনে মরা পাইছে। কি আশ্চর্য ঘটনা!
আমাদের বাড়ি থেকে অনেক দুরে থাকেন নাম করা একজন ফকির। তিনি নাকি জিন-ভূত- পেতনি এগুলো সহজে গ্রাম ছাড়া করতে পারেন। আমরা আট- দশজন তার দরবারে উদ্দেশ্যে যাচ্ছি। সেখানেই যেতে হলে বিশাল নির্জন একটি বাগান পড়ে, তার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। আমরা সে নির্জন বাগান দিয়ে যেতেই বাগানের মাঝে চোখ পড়ে গেলো-
:) পঞ্চাশ থেকে ষাট এর মত বিড়াল খেলা করছে। ভয় নিলাম না, কারণ আমরা আট- দশজন জন। সবাই সাহসী ছিলাম। একটু সামনে এগুতেই দেখি আমাদের চেয়ে অনেক দুরে রাতুলের স্ত্রী দাড়িয়ে আছে। যে কালকে মারা গেছে, আমরা সহকারে যাকে কবর দিয়ে আসলাম। আর একটু আগাতে দেখি সিফাতের মা। সিফাত জন্ম হওয়ার দুই মাস পরে সিফাতের মা মারা যায়। আর একটু আগাতে দেখি অনেক গুলো কালো রঙের কুকুর শুয়ে আছে। এতটাই কালো, দেখা মাত্রই শরীরের পশম শির শির করে দাড়িয়ে যাবে। এত জিনিস দেখার পরেও পিছন ফিরলাম না। বাগানের শেষ কিনারা যেতেই দেখি অনেক গুলো লাশ কাফনের কাপড় পড়ানো আমাদের পথ বন্ধ করে শুয়ে আছে। ভাবতে ছিলাম কি করবো? ছোটো বেলা দাদা ভাইয়ের কাছে শোনা গল্প অনুযায়ী- সবাই পড়নে লুঙ্গিটাকে ঘুরিয়ে উপরের মাথা নিচে আর নীচের মাথা উপরের দিকে দিয়ে পড়লাম। আর যে যেমন পারে সে অনুযায়ী দোয়া পড়লাম। এরপর চলতে লাগলাম। সামনে আর কিছুর দেখা পেলাম না।
.
ফকিরের সাথে সাক্ষাত। কতক্ষণ কথোপকথনের পর, আমাদের সাথে আসার জন্য অনুরোধ করলাম, নিয়ম না বুঝে আসার ফকির নয় তিনি। আগামীকাল ঠিক সন্ধ্যা উপস্থিত হবেন তিনি, তাই আমাদের চলে আসতে বললেন। আমরা যাওয়ার পথে যা দেখলাম, কিন্তু আসার পথে কিছু পেলাম না। এরপরের দিন ঠিক সময় ফকির বাড়িতে পৌছলো; কাজ চালাতে লাগলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এরপরে দিনের পর দিন কত ফকির- কবিরাজ সহ কত কেউ আসলো, কোনো কাজই হলো না। বরং তাদের কথা ঠিক রইল সাত জনকে নিবে। এক বছরের ভিতরে ঠিক সাত জন এ এলাকা থেকে তারা নিয়ে পুরো গ্রাম ত্যাগ করলো, আজ পর্যন্ত তাদের দেখা মিলল না।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন