বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
গল্প/কবিতা: ২টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৩৭

বিচারক স্কোরঃ ২.১৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.২ / ৩.০

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৩৭ নূপুর

জয়ন্ত মন্ডল
comment ৫  favorite ০  import_contacts ৩১১
কলেজের প্রথম দিন। সাইকেলে চেপে রওনা দিলাম আমি আর সবুজ। ও বলা হয়নি, সবুজ আমার ছোট বেলার বন্ধু। একই সাথে পড়ি সেই ওয়ান থেকে। তো কথা বলতে বলতে কলেজে এসে গেছি। আমাদের কলেজটা ছবির মত সুন্দর। পাঁচালিটা মাধবীলতা আর নীল অপরাজিতায় ঢাকা। বড় বড় দুটি কদম ফুল গাছ আর মাঠের চারিপাশ কৃষ্ণচূড়া গাছে ঢাকা। যদিও গাছে ফুল ফোটেনি, তবুও খুব সুন্দর দেখাচ্ছে। মাঠের পাস দিয়ে হেটে কলেজের মুল ভবনে যেতে হয়। সবুজ সাইকেল ঠেলছে আর আমি হাঁটছি। পূবালী বাতাসে মৃদু গন্ধ ভেসে আসছে। বকুল ফুলের গন্ধ। সবুজ কে বললাম-
-সবুজ চলনা ওই দিকে বকুল ফুলের সুগন্ধ পাচ্ছি, তুই তো জানিস আমার বকুল ফুল কত ভালবাসি।
-আরে ছাড়তো তুই পড়লি ফুল নিয়ে, আজ কলেজের প্রথম দিন। কোথায় দেখবি ডলী জলী, তানা পড়লি বকুল নিয়ে।
-আরে আয়না, না হয় ঐ পাস দিয়ে একটু ঘুরেই যাই।
এই বলে ওকে এক কথায় টানতে টানতে নিয়ে আসলাম। গাছের গোঁড়াটা বাধানো। অনেক গুলো ফুল পড়ে আছে। ভারি মিষ্টি একটা গন্ধ। সবুজকে বললাম, এসেই যখন পড়েছি আয় একটু বসেনি। বসতেই চোখে পড়লোসামনে একটা নূপুর পড়ে আছে।

আমি নূপুরটা সবুজকে দেখিয়ে বললাম-
–দেখ সবুজ কার একটা নূপুর পড়ে আছে।
-আরে ছাড়তও কার না কার, চল এবার যাই। দেখি যদি কোনওটিলা মিনা চোখে পড়ে।
আমি নূপুরটা কুড়িয়ে নিলাম, আর মনে মনে ভাবছি কার নূপুর, কি করে, কেমন দেখতে।আমরা আসার আগেই হয়তো ঐ মেয়েটা এই পথ দিয়ে গেছে। সামনে দেখলাম একজন মালী ফুর গাছে জল দিচ্ছে। কাছে এসে মালীকে জিজ্ঞাসা করলাম-
-মামা আমরা আসার আগে এখানে কোনও মেয়েকে দেখেছেন।
- আমার মেয়ে এসেছিল, কেনওবলুন তো।
-না কিছুনা, এমনি।
আর কিছু না বলে, নূপুরটা হাতের মুঠোয় রেখে আমি আর সবুজ হাটা সুরু করি, কেমন যেন একটা সংশয় মনের মধ্যে উকি মারলো। হালকা ঘুরে পিছনে তাকিয়ে দেখি, মালী আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি জিহ্বায় কামড় দিয়ে হাটতে থাকি। কথা বলতে বলতে ক্লাসে পৌঁছে যাই।

আমি আর সবুজ তৃতীয় বেঞ্চে বসলাম। প্রথমে সবুজ পরে আমি। নতুন কলেজ, নতুন সহপাঠী সবার সাথে কমবেশি কথা হচ্ছে। এমন সময় একটি মেয়ে ক্লাসে প্রবেশ করলো আর আমার পাসের সিটে এসে বসলো। আমি অতোটা খেয়াল করিনি। পাস থেকে সবুজ আমার হাতে চাপ দিয়ে ডাক দিল –দোস্ত;
-আহ্; আমি হাতে হালকা ব্যথাঅনুভব করলাম, তাকিয়ে দেখি আমি এখনো নূপুরটি ধরে আছি। তাড়া তাড়ি নূপুরটা ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে বললাম- কি হয়েছে? এমন করিস কেন?
ফিস ফিসিয়ে বলল
-পাসে তাকিয়ে দেখ; ডানা কাটা পরী, হরিণের মত চোখ, গোলাপের মত ঠোট, রেশমি কোমল চুল, আহ্ প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
-বাজে বকিস নাতো, থাম।
- তা তোর মতকি নূপুর ধরে বসে থাকবো, ক্লাস শেষে ওর সাথে কথা বলবো। আর সাহায্য করবি তুই।
বলতে বলতে স্যার ক্লাসে এলো। স্যার তার ক্লাস শুরু করলো –তোমাদের প্রথম ক্লাস, তাই পরিচয় দিয়ে শুরু করি। তবে একটু অন্য ভাবে। তোমরা কি তোমার পাসের বন্ধুটিকে সবাই চেনো? যদি না চেনো তবে একে অপরের কাছে জিজ্ঞাসা করো, তবে জোরে জোরে যেন আমি শুনতে পারি। আর আমি সুনীল, সুনীল রার। এবার তোমরা শুরু কর। প্রথম থেকে পরিচয় দান শুরু হয়ে আমাদের, মানে তৃতীয় সারিতে এলো। আমি চুপ করে বসে আছি, আর সবুজ আমার হাতে টোকা দিচ্ছে। তবুও আমি চুপ করে বসে আছি। পাস থেকে সেই মেয়েটি বলে উঠলো –হায় আমি অপরাজিতা, তুমি?
-আমি...আমি স্বপ্নীল।
-ভালো লাগলো তোমার সাথে পরিচিত হয়ে।
-হু।
সবাই কেমন করে যেন আমার দিকে তাকাল। আমি আমার মত একমনে বসেই থাকলাম। কখনযে ক্লাস শেষ হয়েছে বুঝতে পারিনি। প্রথম দিন একটাই ক্লাস হলো, বাকিটা সময় আড্ডা মেরে চলে গেল। বাড়ি ফেরার পথে সবুজ জিজ্ঞাসা করলো –কি হয়েছে তোর?
-কি হবে!
-কেমন যেন একটা ধ্যান ধরার মত হয়ে গেলি, নূপুর বাজছে নাকি মনে
- তুই কি যে বলিস।
-চল চল বাড়ি চল, কাল এসে খুঁজবো; কেহে কন্যা তুমি পরিরে এ নূপুর খানি।
-মুখে যা আসে তাই বলছিস, চল চল বাড়ি চল।

সন্ধ্যার পর বইয়ের ব্যাগ খুলতে চোখে পড়লো নূপুর। সবুজ তো ঠিক বলেছিল নূপুরটা আমার সাথে, মনের ভিতর বাজছে ঝুম ঝুম ঝুম, মনের রাজ্য কোন এক রাজ কুমারী হেটে যায় চপল পায়ে। আর আমি রাজ কুমারীর পিছু ছুটতে ছুটতে চলে আসি রাজপ্রাসাদের ধারে। তখনি বাগান থেকে মালী বেরিয়ে এসে বলে –দাড়াও কুমার।
আমি হুড়মুড় করে চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠি। রান্না ঘর থেকে মা ডেকে বলে -কি হয়েছে নীল?
-কিছুনা মা।
-আয় খেতে আয়।
পরদিন কলেজে যাওয়ার পথে সবুজ বলে –তোর বান্ধবী না খুব সুন্দর।
-কে?
- কেন কাল তোর পাসে বসেছিল, অপরাজিতা।
-ধুর কি যে বলিস।
-শোন আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আজ ক্লাসের পর কথা বলবো। তুই ডেকে আনবি।
-আমি কেনরে?
-কারণ ও তোর বন্ধু।
-চল, ভাট বকিসনা।

ক্লাস শেষে সবুজ আমাকে একপ্রকার জোর করে পাঠাল অপরাজিতার কাছে। আর বলল, শোন আমার কথা বলবি। আমার ওকে খুব খুব পছন্দ হয়েছে। আমি কি করবো বুঝতে পারছিনা, ধীরেধীরে এগুতে থাকি। সত্যি তো অপরাজিতা খুব সুন্দরী, নয়নযুগল কমলের মত, কেশপাশ দীর্ঘ, অঙ্গ মনোহরা, ওষ্ঠদ্বয় গোলাপের ন্যায়, বাক্য মধুর। আমি কাছে আসতেই ও কথা বলতে শুরু করল –কেমন আছো?
-ভালো, তুমি?
-আমি সব সময় ভাল থাকি। এই গাছপালা ফুল পাখি যেমন হেসে খেলে বেড়ায়, আমিও তেমনি। ফুলের বাগানে গাছের পাতায় বাতাস যেমন নূপুর বাজিয়ে ঘুরে বেড়ায় সারাদিন আমিও তেমনি.........
হঠাৎ আমার নূপুরের কথা মনে পড়ে গেল। ব্যাগে হাত দিয়ে দেখলাম নূপুরটা আছে। আমি ভাবতে থাকি কার এই নূপুর, নাজানি সে কত সুন্দরী, সে কি অপরাজিতার মত? নাকি অন্য রকম....
-কি হল স্বপ্নিল, কিছু বলছনা যে?
-না কিছুনা, আজ উঠি, কাল আবার কথা হবে।
-ঠিক আছে, ভাল থেকো।
-হু। আর কিছু না বলে আমি চলে এলাম। সবুজ সেই বেলী গাছের নিচে বসে ছিল, মালী সেই ফুল বাগানে কাজে ব্যস্ত। আমাকে দেখে একটু আড় চোখে তাকাল, আমি একটু মুক ঘুরিয়ে চলে এলাম। সবুজের কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করল –কি কথা হলো?
- হু
-আমার কথা কিছু বললি?
-না
-তোকে কি কারণে পাঠালাম, আর তুই....
-আজ বলিনিতো কি হয়েছে, কাল বলবো। চল বাড়ি যাই।

রাতে পড়ার টেবিলে বসে পড়ার ফাকে মনের কোনে উকি মারল অপরাজিতার কথা। কত সুন্দর কথা বলে মেয়েটা। অপরাজিতা যদি ঐ মেয়েটা হতো; যার নূপুর আমি বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। আচকা মায়ের ডক –নীল কি হলো রে তোর।
-কই কিছু নাতো।
-কেমন একটা ভাব করে বসে থাকিস, কিছুতে মন নেই।
-কিছু হয়নি মা। খুব খুদা লেগেছে।
- আয় ভাত দিচ্ছি।
মা রুম থেকে বেরিয়ে গেল, আমি নূপুরটা ব্যাগে রেখে দিলাম।

কয়েকটা দিন কেটে গেল। অপরাজিতার সাথে নিয়মিত কথা হতে থাকে। এখন শুধু মুগ্ধ হয়ে কেবল শুনিনা,অনেক কিছু বলিও। বলা হয়না যেটা বলতে যাই সেইটা। সম্পর্কটা গাড়ো থেকে গাড়ো হতে থাকে। কিন্তু সেই নূপুরের মালিককে আজও খুঁজে ফিরি। কেমন যেন একটা ঋণী ঋণী ভাব লাগে। যদি তাকে পেতাম দুনয়ন ভরে দেখতাম। আর নিজের হাতে পরিয়ে দিতাম তার রাঙা পায়ে। আবার অপরাজিতার হাসি ভালো লাগে, কথা ভালো লাগে। কোন এক দ্বিধার মাঝে পড়ে গেলাম আমি। দেখতে দেখতে ১৪ই ফেব্রুয়ারী চলে এলো। সে দিন কলেজে যেতেই সবুজ আমাকে একটা প্যাক করা উপহার ধরিয়ে দিল। আর বলল –তুই নেকামো করে অনেক সময় নষ্ট করেছিস আর না। এইটা ওর হাতে দিবি, ভিতরে সব লেখা আছে।
-তা তুই দিয়ে আয় আমায় লাগছে কেন।
-শুরু তোকে দিয়ে করিয়েছি, শেষও তুই করবি।
বলতে বলতে উপহারটা আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিল। আমি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে অপরাজিতাকে খুঁজতে শুরু করলাম।আজ একটা কিছু করতে হবে। সবুজের দিকটা তো দেখতে হবে, ওকে আর কত দিন ঘুরাবো। প্রথম দিন যদি বলে দিতাম আমি পারবোনা, তবে এক কথা ছিল। খুঁজতেখুঁজতেঅপরাজিতাকে দেখলাম এক কোনে বসে আছে। পরনে তার ঢাকাই শাড়ি, লাল পাড়, লাল টিপ, লাল ঠোট......যেন স্বর্গ থেকে নেমে আশা পরী। আজ অপরাজিতাকে কেন যেন মনে হচ্ছে; এ আমার সেই, যাকে আমি এতো দিন ধরে খুঁজছি, যার নূপুর বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি। না না এসব কি ভাবছি আমি। আমিতো সবুজের হয়ে একটা গিফট দিতে এসেছি। দেব আর চলে যাব। কাছে আসতেই অপরাজিতা বলল –কেমন আছো নীল?
-বেশি ভাল নেই অপু
-কেন কি হয়েছে?
-অনেক দিন ধরে একটা বিষয় আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে, সমাধান পাচ্ছিনা।
-আমারও অনেক কথা জমা হয়ে আছে, বলা হচ্ছেনা। তোমার কি সমস্যা শুনি।
-তার আগে তোমায় একটা গিফট দেয়ার আছে
বলতে বলতে আমি ব্যাগ খুলে উপহার বের করতে যেয়ে নূপুরটা মাটিতে পড়ে গেল। অপরাজিতা চমকে উঠে বলল –কোথায় পেলে এটা? আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।
আমিও বিচলিত হয়ে বললাম –এটা তোমার! আমি কতদিন ধরে ব্যাগে নিয়ে ঘুরছি। নাজানি কবে পাব তার দেখা, ফিরিয়ে দেব বলে। আর তুমি এতো কাছে রয়েছ, চিনতে পারিনি।
-দেখ আমি একপায়ে নূপুর পরে বসে আছি, তুমিকি আমাকে ওটা পরিয়ে দেবে!
আমি নিজের হাতে অপরাজিতার কোমল নরম গোলাপি পায়ে পরিয়ে দিলাম তার হারিয়ে যাওয়া নূপুর। আর আমি খুঁজে পেলাম আমার ভালবাসা। আমি উঠে দাড়িয়ে বললাম –তোমার কি যেন বলার ছিল?
-তারকি আর প্রয়োজন আছে? তুমি আমার জন্য কি যেন গিফট নিয়ে এসেছ, কই?
-ছাড়তো, হিসাব নিকাসের সমীকরণেগিফট এখন ফালতু। আমার চেয়ে বড় উপহার তোমার কাছে আর কি হতে পারে।
-তাই.. না...। চল যাওয়া যাক।
-চল যাই।
অপরাজিতা আর আমি হাত ধরে হাটতে থাকি। আজ মনে অনাবিল একটা সুখ, হয়তো অপুরও তাই। আজ ফুলের গন্ধে মিসে য়েতে ইচ্ছে করছে। নীল আকাশে উড়তে ইচ্ছে করছে। আর বাতাসের নূপুর পায়ে পাতায় পাতায় নাচতে ইচ্ছে করছে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন