বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৮ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ২২টি

দাহন

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

অামার উমেদ

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

অাজও নারীরা অসহায়

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

গল্প - প্রশ্ন (ডিসেম্বর ২০১৭)

শান্তা

রওনক নূর
comment ৬  favorite ০  import_contacts ৪১
একটুও কাঁদতে পারছেনা শান্তা। সারাটা জীবন তার সাথে এমনই হয়েছে। গত দুইটা দিন নিজের সাথে অনেক অভিনয় করেছে সে। তবুও সে স্বাভাবিক আছে। আসলে তার জন্মটাই হয়েছে দুঃখ পেতে। তাই সবকিছু প্রাপ্য ভেবে মেনে নিয়েছে সে। তবে এখনও সে তার স্বামীকে মিথ্যাবাদী ভাবতে নারাজ। শুধু বুঝে গেছে তার জীবনটাও মায়ের মত কষ্ট আর কান্নায় ভরা। মামুনকে কখনও শান্তার অবিশ্বাস হয়নি, তবুও কৌতুহল নিয়ে গিয়েছিলো মামুনের গ্রামের বাড়ী। সেখানে যেয়ে দেখলো মামুনের আগের স্ত্রী আর সন্তানকে। অথচ মামুন শান্তাকে বলেছিলো সে বিবাহিত কিন্তু তার সন্তানের মা মারা গেছে। মা মরা ছেলের কথা শুনে শান্তা মামুনের বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়। আর সন্তানের দায়িত্ব নিতে যখন মামুনের গ্রামের বাড়ীতে যায় তখন দেখে মামুনের স্ত্রী জীবিত। দুইটা রাত সেখানে কাটালেও কিছুই বুঝতে দেয়না মামুনের প্রথম স্ত্রীকে। নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়ে বুকের ভেতরে জমানো কষ্ট আর হাহাকারকে বুকে চেপে নিজের একলা পথের গন্তব্যে রওনা হয় শান্তা।

শান্তা তার দুঃখগুলোকে বুকে মেঘ করে জমাট বাধিয়ে রেখেছে সেই ছোট্টবেলা থেকে। শান্তার বাবা একজন সরকারী কর্মকর্তা। মেয়ের জন্মের আগেই তিনি দ্বীতিয় বিয়ে করেন। শান্তার মা সরল গ্রাম্য মহিলা। স্বামীর দ্বীতিয় বিয়ের কথা জেনেও তার সংসারে থেকে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু শান্তার বাবা তাকে পেটে সন্তান নিয়ে বাড়ী ছাড়তে বাধ্য করেছিলেন। অসহায় শান্তার মা বাপের বাড়ীতে ভাইদের সংসারে চলে যেতে বাধ্য হয়। সেখানে খেয়ে না খেয়ে ,ভাবীদের খোটা শুনে, সংসারের সব কাজ করে দিন কাটাচ্ছিলো সে। এরই মধ্যে জন্ম হয় অভাগিনী শান্তার।

শান্তা মায়ের বুকের ওমে খুব আদরে একটা বছর কাটালো। কিন্তু তারপর শান্তার বাবা সন্তানের অধিকার নিতে শান্তাকে মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে নিজের বাড়ীতে নিয়ে আসেন। আর সেখানে শান্তা মায়ের আদর ছাড়া দাদীর কাছে বড় হতে থাকে। পাঁচ সাত বছর বয়সে একটু বড় হতেই শান্তার সৎমা তাকে দিয়ে বাড়ীর অধিকাংশ কাজ করাতে থাকে। শান্তার সৎমায়ের অনেকগুলো ছাগল ছিলো। প্রতিদিন সকালে পানতা খেয়ে শান্তাকে বের হতে হতো ছাগল চরাতে। কিন্তু তরকারী ছাড়া শুধু পান্তা লবন দিয়ে খেতে খুব কষ্ট হতো শান্তার। তাই অধিকাংশ সময় না খেয়েই ছাগল চরাতে বের হতো। দুপুর আর রাতে তাকে আধাপেটা খাবার দেওয়া হতো। তাছাড়া কারনে অকারনে খুব মার ধোর করত শান্তার সৎমা।

শান্তার উপর এতসব অত্যাচারের কথা তার বাবা কিছুই জানতোনা। না খেতে পেয়ে শান্তা একদিন ছাগল চরানো মাঠে মাথা ঘুরে পড়ে যায়। সেখান থেকে ধরাধরি করে শান্তাকে বাড়ীতে নেওয়া হয়। শান্তার দাদী অনেক কাঁদতে থাকে শান্তার এ অবস্থা দেখে। তিনি শান্তার বাবাকে ডেকে সবকিছু খুলে বলেন। অসহায় মা ছাড়া বাচ্চাটা এত অত্যাচারিত হচ্ছে জেনে শান্তার বাবা তার স্ত্রীকে অনেত বকাবকি করেন। কিন্তু এতে শান্তার উপর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। দশ বছর বয়সে শান্তাকে তার বাবা শান্তার খালার বাসায় দিয়ে আসেন। ইচ্ছা থাকার স্বত্ত্বেও শান্তাকে তার মা নিজের কাছে রাখতে পারেনা। কারন সেই ভাইদের মুখাপেক্ষি হয়ে থাকে। তার উপর সন্তানের খাবার কেইবা দিবে।

খালার বাড়ীতে যেয়ে শান্তা পড়ে যায় নতুন সমস্যায়। খালার শাশুড়ি কিছুতেই শান্তাকে মেনে নিতে পারেনা। শান্তার নামে প্রতিদিন তার ছেলের কাছে নালিস দিতে থাকে। এমনকি শান্তাকে ঠিকমত খাবারও দিতে বাধা দেয়। শান্তার খালা তাকে খুব ভালোবাসতো। সে লুকিয়ে শান্তার খাবার স্টোর রুমে রেখে আসতো। মেয়েটি লুকিয়ে স্টোর রুম থেকে খাবার খেয়ে নিতো।

এভাবেই ক্ষুধার সাথে যুদ্ধ করে শান্তার জীবন চলতে থাকে। ষোলো বছর বয়সে শান্তা পেটের ধান্ধায় খালার বাড়ী ছেড়ে ঢাকায় যাত্রা করে। ঢাকাতে এসে দুরসম্পর্কের এক মামার দোকানে ফ্লেক্সিলোড এর কাজ নেয়। সেখানে শুরু হয় শান্তার নতুন যুদ্ধ। দোকানে কাজ করে শান্তা নিজের মেস ভাড়া আর খাবারের টাকা ঠিকমত জোগাড় করতে পারে। কিন্তু কিছু বাজে লোকের নজর পড়ে শান্তার উপর। প্রায় প্রতিদিন তারা খারাপ প্রস্তাব নিয়ে শান্তার কাছে আসে। কিন্তু যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা এ মেয়ে কারো কাছে আপোস করতে রাজী নয়। সে তাদের মুখের উপর তাদের কুপ্রস্তাব বারবার প্রত্যাক্ষান করে।

প্রায়ই মোবাইলে ফ্লেক্সিলোড করতে আসতো মামুন নামের একজন। অনেক্ষন দাড়িয়ে গল্প করতো শান্তার সাথে। শান্তাও তার একাকিত্ব জীবনে মামুনকে বন্ধুর মত মনে করতো। জীবন যুদ্ধের সব গল্পগুলো মামুনকে শুনায় বিশ্বাসের সাথে। মামুনও তার একাকিত্ব জীবনের গল্প বলে শান্তাকে। বিয়ের এক বছরের মাথায় সন্তান জন্ম দিতে যেয়ে মামুনের স্ত্রী মারা যায়। এখন মামুনের বাবা মায়ের সাথে গ্রামে থাকে তার ছেলেটি। আর জীবিকার সন্ধানে ঢাকা চলে আসতে হয় মামুনকে। জীবনে প্রথম কাউকে এতটা বিশ্বাস করেছে শান্তা। মামুনের ছেলেটার কথা ভেবে খুব কষ্ট হতো তার । বাচ্চাটাও তার মত দুঃখী।

মামুন আর শান্তার সম্পর্ক বন্ধুত্বের থেকে বেশি কিছু হয়ে গেলো। মামুন শান্তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। যদিও শান্তার কাছে তা স্বপ্নের মত ছিলো। একটা সংসারের স্বপ্ন শান্তা সব সময় দেখতো। আর মামুনের মাহারা ছেলেটাতে শান্তা নিজের সন্তান মনে করতে শুরু করেছিলো। এরমধ্যে যারা শান্তাকে কুপ্রস্তাব দিয়েছিলো তারা শান্তাকে হুমকি দিতে থাকে। শান্তা নিজের মাথার উপর কারো ছায়ার অভাব অনুভব করে। এক পর্যায়ে নিজের নিরাপত্তা আর মামুনের সন্তানের দায়িত্ব নিতে বিয়ের প্রস্তাবে রাজী হয়। শুরু হয় মামুন আর শান্তার নতুন জীবন।

বেশ ভালোই চলছিলো শান্তার ভালোবাসার সংসার। কিন্তু মামুন কোনভাবেই শান্তাকে তার গ্রামের বাড়ী নিয়ে যেতে চায়না। কিন্তু শান্তা মামুনের সন্তানকে দেখতে অস্থির হয়ে যায়। মামুনের সন্তানের দায়িত্ব নিতে ঠিকানা নিয়ে একাই চলে যায় মামুনের গ্রামের বাড়ী। সেখানে যেয়ে শান্তার পায়ের নিচে মাটি থাকেনা। মামুনের স্ত্রী জীবিত। মামুনের সন্তান মাতৃহারা নয়। দুইটা দিন বুকে পাথর চেপে মামুনের বউ আর সন্তানের সাথে কাটিয়ে দেয় শান্তা। নিজের জীবনের প্রতি বড্ড ঘেন্না হয় তার। না জেনেই সে একজন নারীর স্বামীর ভাগ নিয়েছে।

মামুনের গ্রামের বাড়ী থেকে বের হয়ে শান্তা ঢাকার গাড়ীতে উঠে। কিছুতেই মামুনকে মিথ্যাবাদী বলে মানতে পারছেনা শান্তা। সে জানেনা এখন সে কি করবে। মামুনের কাছে যাবে নাকি নিজের দুর্ভাগ্যকে মেনে নিয়ে আবার নতুন কোন যুদ্ধ শুরু করকে।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন