বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১ মার্চ ১৯৮৯
গল্প/কবিতা: ১৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৪১

বিচারক স্কোরঃ ২.৮৫ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫৬ / ৩.০

আঁধার রাতের কবি

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

আঁধারি জীবন

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

অসাম্প্রদায়িক

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - ঋণ (জুলাই ২০১৭)

মোট ভোট ৩৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৪১ স্বল্পদৈর্ঘ্য

ফেরদৌস আলম
comment ২৪  favorite ০  import_contacts ৪২৭
চুল দাঁড়ি পাকলেই যে বয়স হয়ে যায়, তা আজকালকার যুগে হর-হামেশায় মিথ্যে হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বছর চারেক বয়সের বালকের মাথায়ও যখন চুল পেকে যায়, আর নিজে বাহাত্তর বছরেএসে কোটরস্থ চোখের ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়ে তা দেখতে হয় - তখন সত্যিই মনে হয়- আসলে বয়স এবার পৃথিবীরও খানিকটা হয়েছে।তাইতো পৃথিবী বদলে গেছে কত ! তার স্বভাব বদলে গেছে, রুপ বদলে গেছে, হয়তো অন্তরও রুক্ষ হয়ে গেছে। কখনও কখনও এই নিরস পৃথিবীর জন্য আমি কী গভীরভাবে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি, পাগলের মত পথে পথে, পাহাড়ে-পর্বতে, সাগর-নদীতে তার অতীতের চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য্যের সন্ধান করেছি ! লাভ হয়নি কিছুই, আমার তৃষ্ণা মেটেনি, শুধুই মনে হয়েছে-আমি যাকে দেখেছিলাম আমার শৈশবে, যাকে আমি আলিঙ্গন করেছিলাম কৈশোরে, যার রুপে অন্ধ হয়ে বিদ্রোহী প্রেমিক হয়েছিলাম যৌবনে – সেই ‘প্রিয়তমা ‘পৃথিবী’কে আমি হারিয়ে ফেলেছি চিরকালের মত। আমার গা ঘেঁষে বড় ছেলে ফয়সাল বসে আছে, বয়স হয়নি খুব একটা, তবুও এখনই ওর মাথার চুলগুলোই কিছুটা কাঁচা-পাকা, মেহেদীর রঙে সেগুলো সোনালী হয়ে আছে। ওরও তো কত পরিবর্তন দেখলাম, কত বড় হয়ে গেছে এখন। বেশ বিষণ্ণ মুখে বসে আছে, গাল বেয়ে নেমে যাওয়া আঁকাবাকা পানির স্পষ্ট দাগ থুতনি পর্যন্ত নদীরেখার রুপ নিয়েছে। সে নদীর নাম হয়তো ‘মায়া-নদী’। তার অত্যন্ত প্রিয়, সাধাসিধে বাবাটার জন্য সে গভীর মায়া। যে বাবা জীবনে তার ছেলের গায়ে একবারের জন্যেও হাত তোলেনি শুধু এক সমুদ্র পরিমাণ সন্তান-স্নেহ মনে ধারণ করার কারণে। এই ছেলেকেই আমার এখন উল্টো অভিভাবক মনে হচ্ছে। বয়স হলে সন্তানকে অভিভাবকই মানতে হয়-যদি সে স্বেচ্ছায় সে অভিভাবকত্ব নিতে রাজি হয়।

বা পাশে একটু দূরত্ব বজায় রেখে আমার ছোট ছেলে বসে। গাড়ির জানালা দিয়ে দৃষ্টি প্রসারিত করে আছে ধূ ধূ প্রান্তরে। চোখের নিচে কালসিটে দাগ। কত রাত ঘুম হয়নি – কেউ না জানলেও আমি জানি। হাজার হলেও ওর বাবা তো ! ওর ফর্সা ত্বকে সে দাগটা স্বচ্ছ আকাশে লম্বাটে কালো মেঘের মত লেপ্টে আছে। বড় ভাইয়ের মত ও ওর জীবনে সফল সবখানেই।

আকস্মিক গ্রামে যাওয়া এবার, সেও আবার আমার কারণেই। কতদিন গ্রামে আমার যাওয়া হয়নি। এবার তাই যেতে হচ্ছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে। একটা দফা-রফার কাজ করতে। জানি ওদের ব্যবসার অনেক ক্ষতি হবে, অন্তত দু দিনে দু কোটি, তবুও কিছু করার নেই। কখন কখন জীবনে ‘কিছু করার নেই’ র মত অবস্থাকে ডিঙ্গিয়েও কিছু কিছু কাজ করতে হয়, হোক ইচ্ছায়, হোক অনিচ্ছায়। সেখানে ঘাড় ঘুরিয়ে, গালে হাত দিয়ে অদ্ভুত-সুন্দর ভঙ্গিতে বসে বসে ভাবনার কোন সুযোগ নেই। আমার স্ত্রী জানে, আমার জীবনে আমি এরকম অবস্থার শিকার কত সহস্রবার হয়েছি। আমাদের বিয়ে, সংসার গোছানো, টানা-পোড়েনের মধ্য দিয়ে, সখ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের বড় করে তোলা- প্রত্যেকটা মুহূর্ত গতানুগতিক মুহূর্তহুলোর চাইতে কী কঠিন আর নির্মম ছিল। মানুষের জীবনে গড়পড়তা উথান-পতন সবারই আছে, থাকবে, কিন্তু পতনের যদি কোন তল না থাকে, উথানের যদি কোন দেখা না মেলে-সেই সময়ে জীবনকে বয়ে বেড়ানো জীবনের জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

সে সময়ও পার করে একদিন আমাদের স্বচ্ছলতা আসলো, প্রয়োজনের চাইতে অঢেল হয়ে। তিন তিনটা শিল্প-কারখানার মালিক হলাম। ছেলেরা প্রাচুর্যতায় বড় হল, স্ত্রীও স্বামীর ধনাঢ্যতায় ধন্য হল সমাজে। একসময়ে মনে হল, আমার আর পাওয়ার কিছু বাকী নেই। যা পেয়েছি তার জন্য আমি আল্লাহর দরবারে অশেষ শোকর-গুজার। কিন্তু পাশ থেকে শুনলাম আমার ছেলেদের কণ্ঠ- ‘আমাদের তো পাওয়ার এখনও অনেক কিছু বাকী’। তখন আমার উপলব্ধি হল- মানুষ প্রজন্ম থেকে তার সকল কিছুরই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রেখে যায়। ঠিক আগের সাথে তাল মিলিয়ে। সেখানে চাহিদা বরাবরই প্রথম।

প্রায় ছ’ ঘণ্টার পথ শেষে বাড়ী পৌছলাম। পুর্ব-থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত আয়তক্ষেত্রের মত বাড়ীটা পাক্কা তিন বিঘা জায়গা দখল করে আছে। পাঁচ মিনিটের মত সামনে হাঁটলেই অপরুপা যমুনার মোহাবিষ্ট দর্শন মিলে। বাড়ীটা আমার দাদুর সম্পত্তি, ভীষণ শক্ত করে আগলে রাখা তারই হাতে, আমি চেষ্টা করেছিলাম যথাযথ তাই’ই রাখতে, আজ পর্যন্ত পেরেওছি। আজ তার দফারফা হবে হয়তো। আমি উঠানেই থাকলাম স্থির হয়ে, নিশ্চল আর বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে।

এই সে মাটি, যেটার অস্তিত্ব আমার শরীরের প্রতিটি লোমকূপ থেকে রক্ত পর্যন্ত মেশা। যার স্পর্শ শীতল, মায়াময়, স্নেহশীল, আর যার আহবান খুব হৃদয়স্পর্শী। আজ বা কয়েকদিনের মাথায় মুসলিম আইনে বিক্রি হবে এ সম্পদ, তিলে তিলে আমার স্বত্ত্বা ধারণ করা ভূখণ্ডটা, কিন্তু তারও আগে মুসলিম আইনে ভাগ-বাটোয়ারা হবে সেটা। আমার আদরের কোন সন্তানই সেটা আর রেখে দিতে চায় না। হয়তো পাঁচ শতকের মত অবশিষ্ট থাকবে, কিন্তু বাকী সবই বিক্রি হবে। সে টাকা শহরে ব্যবসায় খাটানো হবে, তা থেকে লাভ আসবে, সেখান থেকে আয়ের টাকায় আমার সন্তানেরা অনেক সুখ, আর আয়েশে থাকবে – এর চাইতে পরম তৃপ্তির কথা একজন বাবার কাছে আর কী থাকতে পারে। কিন্তু তবুও কাটার মত বিঁধে যে, জায়গাটুকু বিক্রি হবে-এ বাক্যটুকু শুনলেই। এ আমার হৃদপিণ্ডের মত, আমি শহরে ছিলাম বটে, কিন্তু যখন শহুরে জীবনের তাড়নায় হাঁপিয়ে উঠতাম, তখন এখানেই ছুটে আসতাম, প্রাণভরে শ্বাস নিতাম, সজীব হতাম, আবার নিজেকে নিজের জায়গায় দেখতে পেতাম ঠিকঠাক। সেসব অনেক পুরনো দিনের কথা। এখন মনে পড়লে বুকটা হু হু করে উঠে। চোখ ফেটে পানি আসে। কিন্তু তা দেখানোর মত লোকগুলো আজ অনুপস্থিত।

যখন বয়স আমার ছ’ কি সাত হবে, তখন এই উঠোনটায় প্রতিদিনএই বালকের জন্য কী চঞ্চলতা, উচ্ছ্বলতা, বেহিসেবী জীবনের উদ্দামতা আর রাজ্যের আনন্দ ভীড় করত প্রতিটা সন্ধ্যা-রাতে। যে ক্ষুদ্র বালকটি জীবনের শুরু থেকে তার বাবা-মা’র আদর থেকে বঞ্চিত। মমতাময়ী দাদীর আচলের ছায়ায় তার লুকোচুরি খেলার কী যে আনন্দ ! খেলা শেষ হলে চেয়ার পেতে দাদীর মুখোমুখি বসে কত রাজ্যের গল্প, কত-শত জিজ্ঞাসা, হাসির খোরাক জোগানো শিশু মনের কত নিখুঁত অভিনয় করতাম।দাদীকে প্রশ্ন করতাম, ও দাদী, চিন্তা কী গো? চিন্তা আসে কোত্থেকে? দাদী মুখ ভার করে আকাশের দিকে মুখ তুলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলত-চিন্তা যে কী জিনিস ভাই-সেটাই তো বুঝিনা, আর আসেও যে কোত্থেকে তাও তো বুঝিনা। শুধু বুঝি ভাই, চিন্তার অনেক জ্বালা, আর তার কোন শেষও নাই ! তুই ভাই বড় হলে বুঝবি, চিন্তা ক্যামন করে, কোত্থেকে আসে ! সেদিনের সেই চিন্তার গল্প শুনতে শুনতে কত গভীর সব চিন্তা করতে শিখে গেছি বড় হতে হতে – আজ তা ভাবতেই অবাক লাগে।

হঠাৎ কৌতূহল বেড়ে গেল ! কান পাতলাম ঘরের দিকে। কী ঘটছে বুঝে উঠার জন্য। ফিসফিসানির শব্দ বেড়েই চলছে। দেখি সবাই হাজির। আমার দুটো বোন, দুটো ভাই, তাদের সন্তান। সারি হয়ে বসা। চোখ-মুখ ভারী, সম্ভবত কোন গূঢ় রহস্যের কারণেই। আবার মনে হচ্ছে-তারা যেন সব ক্ষুধার্ত কাকের সারি। খাবারের অপেক্ষায়, একটা ছো মারার অপেক্ষায় অপেক্ষমাণ।যদিও এটা আমারই হীন চিন্তার ফসল। মানুষের সমাগমই বলছে, কী একটা আনুষ্ঠানিকতায় বাড়িতে একটা মাতম চলছে। চোখে আঁচল চেপে ফোঁপানে গলায় গুম আওয়াজে কিছু একটা ঘটছে। কিছু চাওয়া-পাওয়ার ব্যাপারে ভাগ-বাটোয়ারা চলছে হয়তো। আমার সেদিকে বিন্দুমাত্র লাভ নেই, লোভও নেই। পার্থিব সম্পত্তিতে হয়তো কিছুটা অর্থের মালিক হওয়া যায়, সে অর্থের ক্ষমতায় অহংকারী হওয়া যায়, কিন্তু দু দণ্ড সুখ পেয়ে সুখী হওয়া যায় না, পরমাত্মার সন্ধান পাওয়া যায় না।

আমি বরং চারপাশটা চোখ বুলিয়ে নিই, যেখানে যেমন ছিল প্রত্যেকটা উপকরণ – মাটি, গাছপালা, খড়ের গাদা, বাঁশঝাড়, তার পাশে ঘন সবুজে আচ্ছাদিত ফুরফুরে প্রশস্ত ধানখেত, তারও পাশে আকাশ ছোঁয়া শিমুল আর নারিকেল গাছ, তারই মাঝে মাঝে ঝুপড়ি পাতার আমগাছ, বেয়ারা বড়ইগাছটা, আস্কারা পাওয়া অজস্র বুনো গুল্ম-লতার ঝোপ-ঝাড় – এখনও অক্ষুণ্ন রয়ে গেছে কিছুটা আগের চেহারায়।

আবারো দাদীর ডাক কানে আসে, সেই অনেক আগের দিনের। বাউর হচ্ছে রে, তাড়াতাড়ি আমগাছের নিচে যা, মানুষে সব আম কুড়ায়ে নিয়ে গেল রে ! আমিও ভোঁ দৌড় দিয়ে হাঁক ছাড়তাম, কেডারে, ধর্‌ , ধর্‌ , ধর্‌ , ! বৃষ্টি-ঝড় গায়ে মেখে কাচা আম কুড়ায়ে নিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে উৎফুল্ল চোখ নিয়ে দাদীকে বলতাম, দেখ দাদী, কতগুলো আম ! দাদীরও চোখ জোড়া খুশিতে চকচক করে উঠত। বলত, যাক, এই বেমাক আম দিয়ে আচার বানামু ! আমার জিভে যেন তখনই জল এসে ভীড় করতে চাইত। কখনও কখনও নদী থেকে তৌড় জাল দিয়ে মাছ ধরে আনলেও দাদীর সে কী খুশি! এই তো সেই উঠান – যেখানে খেলার ছলে সে জাল ফেলা শিখেছি, চৈত্রের ভ্যাপসা গরমে পাকা ধান মাড়াই করেছি, বদম খেলেছি। ধান মাড়াইয়ের সময় মাথায় যে গামছা বাঁধা থাকত, তাতে গেঁথে গেঁথে থাকত সেই ধানগুলো। কত পরম মমতায় সেসব ধান খুটে খুটে আলাদা করত দাদী। সেই সন্ধ্যেবেলায় খেতে বসতাম দুপুরের খাবার খেতে। দাদী পাতে তুলে দিত টাকি মাছের ভর্তা, মসুরের ডাল। নিমিষেই সব নিঃশেষ করে দিতাম পেটের ভিতর। জীবনে কতবার কত জায়গায় দাদীর হাতের সেই স্বাদ খুঁজে ফিরেছি, কিন্তু শূন্য হাতেই আমি ফিরে এসেছি।

যৌবনের শুরুতে এই সেই উঠোনে যখন আমার বিয়ে, কত ধুমধাম, কত পাড়ার দাদীদের বিয়ের গীত, কত শাস্ত্র-বিধি মেনে বিয়ে করতে যাওয়া ! উঠানে চেয়ারে ঘোমটাটানা নতুন বউকে দেখে সবার সে কী আহ্লাদ ! দাদীকে বলতাম, বউ পছন্দ হয়েছে?
হু,
খালি হু, আর কিছু না?
আর কী কমু, তুর বউ তো আসলেই খুউব সুন্দর হইছে !
তাহলে মন খারাপ করছ কেন?
কোথায়?
কোথায় আবার, তোমার চোখে-মুখে তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। চেহারা তো কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে। কেন দাদী, বলত?
হাউমাউ করে কেঁদে দিল দাদী। কাঁদতে কাঁদতে বলল, যাই করিস, এই বুড়ি দাদীটাক ভুলে যাস্‌নে। শহরে সাবধানে থাকিস্‌। জীবিকার এই চাহিদা মাঝে মাঝে আমাদের এমন ঝাটকা টান মেরে প্রিয়জনদের থেকে আলাদা করে দেয়, নির্মম করে দেয়, তাতে কার চোখে জল এল, কার হৃদয় মুচড়ে গেল – সেসব বরাবরই থেকে যায় অবিবেচ্য। আমাদের এই নির্মম হওয়ার মধ্যে যে সান্ত্বনা আছে, তাতে মিথ্যে যে তৃপ্তি আছে, তা আমাদের জীবনের খাটি অনুভূতির থেকে, নিখাদ প্রশান্তি পাওয়া থেকে চিরদিনের জন্য যে বিচ্ছেদ করে দেয় – তা আমরা বুঝে উঠতে পারিনা আর কখনই।

আমার সেদিনের কথাও মনে পড়ছে, যেদিন কচি ও কোমল আঙ্গুলগুলো আমার অনামিকা আঙ্গুল ধরে এই উঠানে পা রেখেছিল । আমার এই শিশু ছেলেটা। আমার প্রথম সন্তান। বাবা হিসেবে প্রথম হৃদয় বিগলিত হওয়ার স্মৃতি, নিজের সন্তানকে প্রথম নিজের গায়ে মাখা মাটির সাথে পরিচয় করে দেয়ার সেই পরম অনুভূতি ! যখন আধো আধো বোল দিয়ে সে বলেছিল,
বাবা, এটা কোথায়?
এটা তোমার বাবার পুরনো বাড়ি, বাবা।
পুরনো বাড়ি কী, সেটা কেমন হয়, বাবা?
পুরনো বাড়ি হল যেখানে মানুষ ছোট বেলায় থাকে, অনেক গাছপালা, আলো-বাতাস আর অনেক আত্মীয়-স্বজন থাকে, বাবা।
আসলেই বাবা, পুরনো বাড়িই তো অনেক ভালো, বাবা। আমার জন্য কত বড় খেলার জায়গা, কত গাছ, আমি কত জোরে দৌড় দিতে পারি এ পাশ থেকে ও পাশ পর্যন্ত, বাবা। এই পুরনো বাড়িটাই তো অনেক অনেক মজার, বাবা। তাহলে আমরা শহরের বাড়িতে থাকি কেন, বাবা?
হ্যা বাবা, পুরনো বাড়ি সবসময়ই অনেক ভালো আর অনেক মজার ! কিন্তু টাকা পাওয়ার জন্য আমাদেরকে এই অনেক ভালো বাড়িটা ছেড়ে শহরে থাকতে হয়, বাবা।
আমাদের এতো টাকা কেন লাগে, বাবা?
সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। টাকা যত বেশি থাকে তত সবার জন্য অনেক খেলনা কেনা যায়, নতুন নতুন জামা-কাপড় কেনা যায় আর খুব খুব স্বাদের অনেক খাবার পাওয়াও যায়, বাবা। এগুলো সবাইকে যতবেশি দেয়া যায়, ততবেশি সবার মুখে হাসিও ফুটে, বাবা।
ঠিক আছে, বাবা। আমিও বড় হয়ে অনেকগুলো টাকা করব।
তাই? আচ্ছা বাবা, বড় হয়ে তোমারও অনেক অনেক টাকা হবে, হ্যা ! আমি তোমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করে দিচ্ছি।
আজ সত্যিই ওর অনেক টাকা, আমার যা ছিল তার চাইতেও আরো কয়েকগুণ বেশি, ওর ভাইটারও তাই।

চোখের সামনে এই উঠোন আগের মতই রয়ে গেল। দাদী চলে গেল, দাদাও চলে গেল। কোমল আঙ্গুলের শিশুটি আজ যৌবন ছেড়ে মধ্যবয়সের খাতায় নাম উঠাতে যাচ্ছে। আর তার বাবার অস্তিত্ব এখন পৃথিবীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ! হৃদয়ের ব্যথায় ব্যথায় যেন কুঁকড়ে যেতে লাগলাম আমি। স্মৃতিচারণ থেকে যেন গভীরতর বিস্মৃত স্বপ্নের তলানিতে গিয়ে পৌছলাম। সারাজীবনের দেখা যত পরিচিত মুখ, সবাই যেন উঠোনটায় জমা হয়ে গেছে, সবাই যেন বলছে, এই, তুমি তো এখানেই আছো, এখানেই থাকবে, আমাদের মাঝেই থাকব, আমরাও থাকব তোমার সাথেই। এই স্মৃতিকাতরতা আসলে কিছুই না – এ হল মায়া, এই চোখের সামনে ঘটে যাওয়া বিস্তর পথ যেন এক পলকের ক্ষণিক মুহুর্ত।

আমার মনে পড়ছে সেই দিনের প্রখর জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা। কী কাঁপুনি দিয়ে আসা জ্বর, আমার ঠোট কাপছে, শরীরের খিঁচুনি বাড়ছে, চামড়া যেন আগুনে ঝলছে যাচ্ছে আর আমি দাদীকে বলছি, দাদী, তোমার হাতটা শুধু কপালে রাখ, ঐ হাতের শীতল স্পর্শে একটু যদি ভালো লাগে ! দাদী, বালতি করে পানি নিয়ে আসে, পলিথিনের কাগজ নিয়ে আসে, তারপর পানি ঢালতে থাকে মাথায়। সাথে মাথায় এক পরম আদরে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে। পানি আর হাত – দুটোরই শীতল স্পর্শে আমি হারিয়ে যেতে থাকি ঘুমের দেশে। আমার শরীর হয়ে যেতে থাকে শীতল ও নিস্তেজ, চোখ বুজে ফেলি নিদারুণ স্নিগ্ধতায়।

আজও, এখন, এই সবাই যেন আমাকে আবার ঘুম পাড়িয়ে দেবার জন্য যেন কত শত আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত। কত কান্নাজড়িত প্রার্থনা দু ঠোটের পাতায় কাঁপছে। হঠাৎ কোত্থেকে কালো মেঘের এক বিশাল রাজ্য নেমে আসে উঠোন থেকে বাঁশঝাড়টার আকাশ পর্যন্ত ছেয়ে। কী কালো ! সবাই তখন ঘরে ফেরার জন্য আরও কী ব্যতিব্যস্ত ! কী তাড়া ! দেখতে দেখতেই সে মেঘের রাজ্য গলতে শুরু করে, ছন্দ নিয়ে, এক বিদায় ও এক নতুনের যুগপৎ মিলনের মূর্ছনা নিয়ে। কী অদ্ভুত, কী অপূর্ব, কী মোহময় এই ব্যঞ্জনা ! আমি বিস্মিত, অতঃপর শংকিত, এবং প্রবলভাবে আহত এই দেখে যে, এ আমার অতলে হারিয়ে যেতে থাকা স্বপ্ন নয়, বরং এ অতি কঠিন বাস্তবের মত অবিশ্বাস্য ! আমি এই তো, এখনও দেখছি যে, কী অঝোর ধূমায়িত ঝুম বৃষ্টি নেমেছে চারিদিকে। কবরের কাঁচা মাটি কাদা-স্রোত হয়ে আমাকে মাখিয়ে দিচ্ছে আপাদমস্তক, গায়ে জড়ানো শাদা কাপড়ের টুকরোগুলো কী রকম অবাক করে দিয়ে হয়ে যাচ্ছে মেটে রঙের। আমার সন্তানদ্বয়ের দ্রুতলয়ের দু জোড়া পা দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে নিমিষেই। সে চৌকাঠ থেকে আমার কবরের কিণার পর্যন্ত, বেশ ছোট্ট ও সরল একটা দৈর্ঘ্য, বহুদিনের একটা অতিচেনা মায়াজড়ানো খুব সামান্য এক পরিসর ! জানি, এই অতি সামান্য দূরত্বটুকুর রঙ, স্বাদ, আলো-বাতাস, রৌদ্র-বৃষ্টি, ভালোবাসা-স্বার্থপরতা কিংবা তার মাঝে বিদ্যমান হৃদয় জুড়ানো অপার সৌন্দর্য্যটুকু উপভোগের জন্যই সৃষ্টিকর্তার কাছে চিরঋণী থেকে যাচ্ছি!
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন