বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৩.৯৯

বিচারক স্কোরঃ ২.১৯ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৮ / ৩.০

আমি কোহেন বলছি..

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

একটি অমাবস্যার জন্য প্রতীক্ষা

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

যে আগুনে অন্তর জলে

কামনা আগস্ট ২০১৭

গল্প - আঁধার (অক্টোবর ২০১৭)

মোট ভোট ২১ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৩.৯৯ আলো আমার আলো

জসিম উদ্দিন আহমেদ
comment ১৩  favorite ০  import_contacts ১৮০

মিডিয়া ও প্রেসওয়ালাদের আনাগোনা এতটাই বেড়ে গেছে যে জালালের পরিবার হাঁপিয়ে উঠেছে। খাড়া বড়ি থোড় আর থোড় বড়ি খাড়া-ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সকলের একই প্রশ্ন।

আজ এসেছেন পুলিশের এক বড়কর্তা। জালালের ঘটনায় পুলিশকে জড়িয়ে মিডিয়াতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বড়কর্তা এসেছেন ঘটনার সাথে পুলিশ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখতে।

‘তাহলে আপনি বলছেন পুলিশ বাড়ী থেকে আপনার ছেলেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল?’ জালালের মা বৃদ্ধ সাহার বানুর কাছে জানতে চান বড়কর্তা।

‘জি¦ সাহেব, দুইজন লোক আইসে জালালরে কইল, থানার ওসি সাব তারে ডাকছে। জালাল তখন হাসপাতালে রওয়ানা করছিল। ঐ দিন হের একটা মাইয়্যা হইছে। মাইয়ারে দেখতে জালাল হাসপাতালে যাইতেয়াছিল।’ সাহার বানু জানান।

‘তারা কি পুলিশের পোশাক পরা ছিল।’

জি¦, না সাহেব। তাগোর গায় পুলিশের পুষাক ছিল না’।

বড়কর্তা সাহার বানুর প্রতিটি কথার নোট নিচ্ছিলেন। তিনি তার খাতায় লিখে নিলেন, দুইজন লোকের কথা সাক্ষী বললেও তারা পুলিশ ছিল কি না সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।

‘তাদের পুষাক না থাকলেও একজনের হাতে একটা যন্ত্র আছিল। থানার দারোগাগো হাতে যেইরহম থাহে। যন্ত্রটা আবার মাঝে মদ্যে কথা কইয়া উঠতেয়াছিল’ । পুলিশের ওয়ারলেস সেটের বর্ণনা এরচেয়ে ভাল দেয়া ষাটোর্ধ সাহার বানুর পক্ষে আর সম্ভব ছিল না।

বড়কর্তা লিখে নিলেন, আগত ব্যক্তিদ্বয়ের নিকট ‘ওয়্যারলেস সেট’ ছিল মর্মে সাক্ষী ইঙ্গিত করলেও সাক্ষীর বক্তব্যে তা প্রমান হয়না। পুলিশ ছাড়াও আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য সংস্থার লোকেরাও ওয়্যারলেস সেট ব্যবহার করেন। বর্তমানে অনেক দুষ্কৃতকারীও পুলিশের সাজ-সরঞ্জাম ব্যবহার করে। কাজেই পুলিশ পরিচয়ে জালালকে বাড়ী থেকে যারা ডেকে নিয়ে গিয়েছিল তারা পুলিশ ছিল কি না সে বিষয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বড়কর্তার অবস্থা হলো ইন্টারভিয়্যু বোর্ডের কর্তাদের মতো। কাকে নিয়োগ করা হবে তা আগে থেকে ঠিক থাকলেও লোক দেখানোর জন্য ইন্টারভিয়্যু চালিয়ের যাওয়ার মতো।

বড়কর্তা এবার প্রসঙ্গ পাল্টালেন। ‘আপনার ছেলে যে অপরাধ জগতের সাথে জড়িত সেবিষয়ে আপনি কতটুকু জানেন?’

সাহার বানু প্রথমে চুপ করে থাকেন। খানিক পরে দীর্ঘশ^াস ছেড়ে বলেন, ‘সাহেব মোরা গরীব মানুষ। প্যাটের তাগিদে জালাল ঐগুলান খারাপ কাম করত। কিন্তু পোলারে বিয়া করানোর পর থিইক্যা সব ছাড়ান দিছে। বউডা হেরে ভাল মানুষ বানাইয়্যা তুলছে। ব্যাটার বউডা আমার সাক্কাত লক্ষী।’

‘জালালের সাথে কারো শত্রুতা ছিল?’

জালাল যখন ফিন্সি হিরুইনের কারবার করত তহন অনেক লোকের সাথে রেষারিষি ছিল। কিন্তু তিন বছর হইল পোলাডা সবকিছু ছাইড়্যা কাইড়্যা দিছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কালাম করে। তাবলীগে যায়। হালালভাবে কামাই করে।’

বড়কর্তা জালালের গুনকীর্তন শুনতে আসেননি। তিনি এসেছেন সত্য উন্মোচন করতে। তাঁর কাছে আবেগের কোন স্থান নেই। তিনি কিছুটা অসহিঞ্চু হয়ে উঠেন। একপ্রকার খেঁকিয়ে উঠে বলেন, “ ওইসব বাজে কথা রাখেন। জালাল তো তার ধান্ধাপাতি ঠিক আগের মতই চালিয়ে যাচ্ছিল। ’

“একদম মিথ্যে কথা সাহেব” সাহার বানু প্রতিবাদ করেন। মোর পুলা ভালা অইয়্যা গেছিল। পুলিশের লোকে হেরে মাঝে মধ্যে আইস্যা ধান্ধা শুরু করণের লোভ দেহাইত। জালাল কারো কথা হুনে নাই। গর্ব কইর‌্যা কইত, যতদিন বাঁচমু হালাল পথে থাইক্যা বাঁচমু।”

বড়কর্তা টানা দুইসপ্তাহ অক্লান্ত পরিশ্রম করে জালালের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাঁর তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, জালাল ঘটনার দিন ছিনতাই করতে গিয়ে জনতার কাছে ধরা পড়ে। উত্তেজিত জনতা তাৎক্ষনিকভাবে ছুরি দিয়ে জালালের চোখ তুলে ফেলে। পরবর্তীতে পুলিশ গিয়ে জালালকে উদ্ধার করে। জালালকে পুলিশ বাসা হতে ধরে নিয়ে নির্যাতন করে চোখ উপড়ে ফেলেছে- মিডিয়া ও জালালের পরিবারের এই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট।

সত্য উন্মোচনে বড়কর্তা বরাবরই সিদ্ধহস্ত। কাজেই তার দেওয়া প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষ নির্দ্ধিধায় গ্রহণ করে। জালালের ‘চোখ রহস্যের’ যবনিকা ঘটে।



আলোর বয়স একমাস হয়েছে। আলো জালালের মেয়ে। তার নাম আলো রাখার দুটি কারণ। আলোর যেদিন জন্ম হয়েছে সেইদিন তার বাবা জালাল নিজের চোখের আলো হারিয়েছে চিরদিনের মতো। আরেকটি কারণ হলো জালালের মেয়েটি হয়েছে পুর্ণিমার চাঁদের মত। এসব কারণে হাসপাতালের একজন ডাক্তার আপা মেয়েটির নাম আলো রেখেছে। নিজের চোখ হারিয়েছে তাতে জালালের কোন দুঃখ নেই। তার দুঃখ হলো এতসাধের মেয়েটিকে সে দেখতে পাচ্ছে না। শুধু ছুঁয়ে দেখে তাকে সন্তুষ্ঠ থাকতে হচ্ছে। এই আক্ষেপ জালালের কিছুতেই যাচ্ছে না।

জালাল মেয়ের পাশ থেকে সারাদিন কোথাও নড়ে না। এমনিতে চোখ হারানোর পর থেকে তার চলাফেরায় যথেষ্ট ‘সেন্সরশিপ’ পড়েছে। মেয়ের প্রতি বাবার এই সীমাহীন আহ্লাদেপনা জালালের স্ত্রী সালেহা স্বামীকে মৃদু-মধুর ভর্ৎসনা করতে থাকে সবসময়।

আজকের তিরস্কারটা মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সালেহার কথা জালালের মনে গিয়ে আঘাত করে। ঘরের ভিতর কাজ করতে করতে সালেহা হঠাৎ করে বলে,‘তুমি যে মাইয়্যারে লইয়া এমুন কর, তুমি কি অরে দেখতে পাও? এইডারে বুঝি কয় অন্ধভালবাসা’

জালাল স্ত্রীর দিকে ফেরে। অন্ধ হওয়ার পর থেকে সে শব্দ শুনে সকলের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেয়। শব্দ বলে দিচ্ছে, সালেহা এখন রান্না করছে।

কথাটা বলে সালেহাও বুঝতে পারে এই কথাটা স্বামীর মনে লেগেছে। সে কাজ ফেলে জালালের পাশে গিয়ে বসে। তার একটা হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে চাপ দেয়। বুঝাতে চেষ্টা করে কথাটা তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে।

জালাল জানে সে আঘাত পাবে এমন কোন কাজ সালেহা কখনই করে না। বউয়ের প্রতি তার অগাধ ভালবাসা। তার যা কিছু অর্জন তা এই বউয়ের কল্যাণে। সেও স্ত্রীর হাতে মৃদু চাপ দেয়। স্ত্রীকে সে ক্ষমা করে দিয়েছে।

সালেহা বলে, “নিজেরে মোর বড় অপরাধী লাগে। ভাল অইতে অইবে, ভাল অইতে অইবে কইর‌্যা কইর‌্যা তোমার মাথাডা মুই খাইছি। মোর জন্যে তুমার আজ এই অবস্থা”।

“তুমি মিছামিছি নিজেরে দোষারোপ করতাছ। সবই কপালের দোষ। মুই এককালে চুরি ছিনতাই কইর‌্যা খাইছি। হেইকালে পুলিশ তো মোরে ধরেই নাই উল্টা খাতির করছে চুরি ছিনতাইয়ের ভাগ নেওয়ার জন্যে। যেই মুই ভাল অইয়া গেলাম ছিনতাইয়ের মিছা নাটক সাজাইয়া মোর চোখ দুইডা খাইয়া দিলে”।

“ যেই দারোগা মোর চোখ দুইড়া তুলছে মুই হের পা দুইখান ধইর‌্যা অনেক কান্নাকাটি করছিলাম। স্যার, মোর একটা মাইয়্যা অইছে আজ। হের মুখখান এহনো দেহি নাই। মোর বউ হাসপাতালে। মোরে ছাইড়া দেন। মুই বউ পুলাপান লইয়্যা অনেক দুরে চইল্ল্যা যামু”। জালালের দুচোখের ব্যান্ডেজ এখনো খুলা হয়নি। চোখের পানিতে ব্যান্ডেজ ভিজে গেছে সম্পূর্ণ।

সালেহা চুপ করে নিঃশব্দে কাঁদছে। কথা বলেন সাহার বানু। তিনিু অভিশাপ দেন, ‘যারা মোর পুলার দুনিয়াডা আন্ধার করছে, আল্লা তাদের বিচার করবে।’

জালাল হাতড়াতে হাতড়াতে সালেহার একটি হাত ধরে। সালেহা লজ্জা পায়। মনে মনে ভাবে, দিন দিন তার স্বামীর কি লজ্জা শরম কমে যাচ্ছে। পাশে মা রয়েছে। জালাল কি চোখের মাথা খেয়েছে?। পরক্ষণেই গভীর বিষাদে তার মনটা ভরে যায়। তার মনে পড়ে যায়, জালাল তো এখন আর চোখে দেখে না।

‘বউ তুমার মনে আছে, বিয়ের পর মোরে খারাপ কাজ ছাড়ার ওয়াদা করাইছিলা। মুই কী কইছিলাম তোমারে। মুই প্রয়োজনে ভিক্ষা কইর‌্যা খামু। তবুও পাপের পথে পা বাড়ামু না। মোর জীবনে ওই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে ফলছে। মুই সিদ্ধান্ত নিছি মুই অহন থিক্যা ভিক্ষা করমু। এই ছাড়া মোগো বাঁচার আর কোন রাস্তা নেই।

জালাল কথাগুলো বলে স্ত্রীর মতামতের প্রতীক্ষা করে। কিন্তু সালেহা কোন কথা বলে না। সে অনেক কষ্টে কান্না চেপে রেখেছে। কথা বলতে গেলে তা আর সম্ভব হবে না। কথা বলেন সাহার বানু, “তুই শ্যাষে ভিক্ষা করবা?”

‘হু, মা। মুই ভিক্ষা করুম। অন্ধ মানষেরে দেখলে লোকে দয়া কইরবো। মানুষের মনে এখন অনেক দয়া-মায়া।” জালাল উদাসভাবে বলে।

ছেলের কথা শুনে বৃদ্ধা সাহার বানু তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। জালালের সাথে যারা অন্যায় করেছে তাদের “আল্লাহ বিচার করবে” এবং “মানুষের মনে এখন অনেক দয়া-মায়া”-এই দুটি বিষয়ে আস্থা রাখা ছাড়া জালালের পরিবারের আর কোন উপায় নেই। কারণ তাদের সামনের পথ গভীর আধাঁরে ঢাকা। নিকষ কালো আধাঁর।
-০-
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন