বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ১০ জানুয়ারী ১৯৮৪
গল্প/কবিতা: ১৪টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৮৯

বিচারক স্কোরঃ ৩.৭৩ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১৬ / ৩.০

আমি কোহেন বলছি..

বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী নভেম্বর ২০১৭

আলো আমার আলো

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

একটি অমাবস্যার জন্য প্রতীক্ষা

ভৌতিক সেপ্টেম্বর ২০১৭

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট ১৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৮৯ অপার হয়ে বসে আছি....

জসিম উদ্দিন আহমেদ
comment ২০  favorite ০  import_contacts ৪৯৯
শান বাধান পুকুরঘাটে বসে জমিলা বানু অতীত ঘাটাঘাটি করছেন। হয়ত জীবনের পাওয়া না-পাওয়ার হিসেব কষছেন। আজ তাঁর সুখের দিন। ধন, মান কোন কিছুতেই কমতি নেই। মানুষ যখন সুখে থাকে তখন দুঃখের স্মৃতিচারণ করতে ভালবাসে। এ-টাও একরকম বিলাসিতা। এর নাম দুঃখ-বিলাস। জমিলা বানু ঘাটে বসে দুঃখ-বিলাস করছেন।
লতিফুদ্দির সাথে যখন তাঁর বিয়ে হয়-সে ত্রিশ বছর আগের কথা- তাঁর বয়স তখন অল্প। স্বামীর সংসারে নিদারুণ অভাব। দু’জনের ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করতেই লতিফুদ্দি গলদঘর্ম। তার উপর ফি-বছর একটা করে নতুন মুখ যোগ হয় সংসারে। একে একে সাতটি মেয়ে তাদের। আহা! একটা ছেলের বড্ড শখ ছিল লতিফুদ্দির। ছেলের আশায় সাত সাতটি মেয়ে জন্ম দিয়ে ফেলে। সাত নম্বর মেয়েটি জন্মাবার পর লতিফুদ্দি একদম নিশ্চিত হয় যে, তার বউয়ের ছেলে জন্ম দেয়ার ক্ষমতা নেই। লতিফুদ্দি সিদ্ধান্ত নেয় ছেলের খায়েশ পূরণের জন্য সে দ্বিতীয় বিয়ে করবে।

জমিলা বানু পড়া-লেখা বেশি জানেন না। তবে তাঁর বুদ্ধির তুলনা নেই। তাঁর টেলিপ্যাথি খুব ভাল। মানুষের চোখের ভাষা পড়ে তিনি মনের কথা বলে দিতে পারেন। আশেপাশের দশ-গ্রামের লোক জানে জমিলা বানু ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারিনী। তার ঘাড়ে যিনি থাকেন তাঁর বাস হচ্ছে জীনদের নগরী কোয়েকাফে। তিনি জমিলা বানুর একান্তই অনুগত। জমিলা বানু আগর বাতি জ্বেলে পূত পবিত্র হয়ে মেঝেতে আসন পেতে তাঁকে আহবান করলেই তিনি চলে আসেন। জমিলা বানু তখন আর লতিফুদ্দির কুলবধূ থাকেন না, হয়ে উঠেন মুসকিল আসানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ‘পীর-মা’।

প্রতিদিন অসংখ্য লোক ‘মায়ের’ কাছে আসে নিজ নিজ সমস্যা নিয়ে। মা ঐশ্বরিক শক্তির মহিমায় তাদের মুশকিল আসানের পথ বাতলে দেন। ভক্তবৃন্দ খুশি মনে ফিরে যায়। বাড়ী ফিরে গিয়ে তারা দশজনের কাছে মায়ের গুনগান করে। এভাবে জমিলা বানুর সুনাম আজ বহু দূরবধি ছড়িয়ে গেছে। মায়ের ভক্তকূলের সাথে পাল্লা দিয়ে সহায় সম্পদও বেড়ে চলেছে দিন দিন। লতিফুদ্দি আজ দশ-গ্রামের সবচেয়ে বিত্তবান ব্যক্তি। তার চতুর্দিকে শাণশওকত। তার সাতটি মেয়েরই বিয়ে হয়েছে বড় ঘরে। সকলেই জমিলা বানুর মুরিদ। তারা একরকম কাড়াকাড়ি করে ‘মায়ের’ মেয়েগুলোকে বউ করে নিয়ে গেছে। প্রার্থী ছিল অনেক। কিন্তু বৈষয়িক বুদ্ধিতে পাকা জমিলা বানু সবচেয়ে ধনী ও মর্যাদাবান পরিবারেই মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। জমিলা বানুর আর কোন মেয়ে নেই বলে ভক্তকুলের কেউ কেউ হাপিত্যেস করে ফিরেছে। আছে ছোট ছোট চারটি ছেলে। ভক্তকুলের এমনি আগ্রহ যে, তারা পারলে ‘মায়ের’ নাবালক ছেলেগুলির সাথে নসব করে ফেলে।


একের পর এক মেয়ে হওয়ার দরূন লতিফুদ্দির সংসারে জমিলা বানুর নির্যাতনের সীমা ছিল না। সপ্তম মেয়েটি জন্মাবার পর তা চরমে উঠে। লতিফুদ্দি কারণে অ-কারণে তাঁকে মারধর করে। অবস্থা এমন হয় যে, জমিলা বানু স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মাঝে মাঝে আত্মহত্যার কথাও চিন্তা করে। কিন্তু সে না থাকলে লতিফুদ্দির ভাল হয়। আরেকটা বিয়ে করা হতে কেউ তাকে আটকাতে পারবে না। আর তখন সৎমায়ের সংসারে মেয়ে গুলোর ঠাঁই হবে না। স্রোতে ভাসা কচুরি পানার মত তাদের জায়গা হবে আঘাটে। একারণে শত অত্যাচার সয়েও সে স্বামীর সংসার আকড়ে থাকতে চেষ্টা করে। তারপরেও লতিফুদ্দির নির্যাতন দিন দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কথায় কথায় গাঁয়ে হাত তোলে। গালাগালির কথা না হয় বাদই দেয়া গেল। একদিন তো তাকে মেরে গভীর রাতে রাস্তার নামিয়ে দেয়। সেই রাতের কথা জমিলা বানু কিছুতেই ভুলতে পারে না। গাঁ ছমছমে অন্ধকার চারিদিকে। লতিফুদ্দির দ্বিতীয় বিয়ের বাতিক ভীষন ভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আপদটাকে কোন মতে তাড়াতে পারলেই তার পথ পরিস্কার।! সে জমিলা বানুকে মেরে ঘর থেকে বের করে দেয়। রাত তখন গভীর। অন্ধকার রাতে অসুস্থ শরীর নিয়ে সে কোথায় যাবে! জমিলা বানু অন্ধকারে পথ হাতড়ে কোনমতে নদীর ধারে পৌঁছায়। ঘন কালো অন্ধকারে নদীর জল চিকচিক করছে। সে ভাবে একবার ঝাপ দিতে পারলেই জাগতিক সব সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। একজীবনে এত অত্যাচার সয়ে কেউ কি বাঁচতে পারে!


সময় কেটে যেতে থাকে। জমিলা বানু নদীর কুলে বসে তার আত্মহত্যার স্বপক্ষে মনে মনে বিভিন্ন যুক্তি দাঁড় করতে থাকে। এ-যেন নিজের মনকে প্রবোধ দেয়া। কিন্তু যুক্তির পাল্লা যতই ভারী হোক না কেন, কাজটি করতে তার মন কিছুতেই সায় দেয় না। যতবারই সে নদীতে ঝাপ দিতে গেছে ততবারই ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে। অন্ধকারে তার এই খেলা চলে অনেকক্ষণ। সে নদীর পাড় বেয়ে অন্ধকারে উদভ্রান্তের মত হাটতে থাকে। তার মনে হয় সাতজোড়া নিষ্পাপ চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কোন প্রাণে সে আত্মঘাতী হবে! নিজের সাথে যুদ্ধ করতে করতে জমিলা বানুর ভয়ানক সেই রাতটি কেটে যায় নদীর পাড়ে। ভোরের আলো ফুটতেই সে নিজেকে যেখানে আবিস্কার করে, ভয়ে তার গাঁ শিউরে উঠে। নদীর ধারের এই জায়গাটির নাম মুচিভিটা। মস্তবড় এক তুলো-মাদার গাছ আছে সেখানে। জনশ্র“তি আছে, এই তুলো-মাদার গাছে জীন-পরীরা বাস করে। নির্জন এই জায়গাটাতে মানুষ দিনের বেলাতে আসতেও ভয় পায়।


অমাবস্যার রাতে লতিফুদ্দি’র যুবতি বউয়ের ভয়ংকর মুচিভিটায় রাত কাটানোর কথা গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ে। সে সাথে লোকের মুখে মুখে যুক্ত হয় নানান মুখরোচক গল্প। সকলেই একবাক্যে মেনে নেয় যে, লতিফুদ্দি’র যুবতি বউডার উপর জিনের আছর হয়েছে। তা-না হলে কেউ কি এমন ভয়ংকর জায়গায় রাত কাটাতে পারে! দলে দলে লোকজন আসতে থাকে লতিফুদ্দি’র বাড়ীতে। তারা জমিলা বানুর মুখ থেকে ঘটনা শুনতে চায়। কি কারণে সে অমাবস্যার অন্ধকারে গভীর রাতে অমন ভয়ংকর জায়গায় গিয়েছিল?


জমিলা বানুর পক্ষে পরিস্থিতির ফায়দা নেওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। একেতো স্বামীর অভাবের সংসার। তার উপর বার বার কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় স্বামীর সংসার হতে বিতাড়িত হওয়ার জোগাড়। এমনই এক জটিল পরিস্থিতিতে সে উৎসুক জনতার মাঝে তার রহস্যে ঘেরা রাতের গোমর ফাঁস করে। সে যা বলে তার মমার্থ হলো এই যে, বার বার কন্যা সন্তান হওয়ায় তার মনে অনেক কষ্ট। সে গভীর রাতে উঠে আল্লার কাছে অনেক কান্নাকাটি করেছে। এমনি একরাতে ইবাদত বন্দেগি করে সে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই রাতে সে স্বপ্নে দেখে, নদীর ধারের বড় তুলো-মাদার গাছটাতে একহাজার বছর বয়সী একজন নেককার জীন থাকেন। তেনার নিবাস জীনদের নগরী কোয়েকাফে। জমিলা বানু যদি ঘোর-অমাবস্যায় গভীর রাতে সম্পূর্ণ একা একা সেখানে গিয়ে তেনাকে সালাম জানায় এবং মনের কথা ব্যক্ত করে তাহলে সে ঐশ্বরিক শক্তি লাভ করবে। আল্লাহর ইচ্ছায় ঐ নেককার জীন তার বশীভূত হবে। তখন তার মনের সকল ইচ্ছা পূরণ হবে!

সেই থেকে সূচনা। সেই রাতের পর থেকে লতিফুদ্দি’র সংসারে লক্ষীর ছোঁয়া লাগে। জমিলা বানুর ঐশ্বরিক ক্ষমতা লাভের কথা ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। সোনায় সোহাগা হিসেবে সেবার জমিলা বানু ছেলে সন্তান জন্ম দেয়। সাত সাতটি মেয়ের পর যখন ঐশ্বরিক শক্তির বলে তিনি ছেলের জন্ম দেন তখন তার ক্ষমতা প্রাপ্তিতে কারো কোন সন্দেহ থাকে না। এরপর একে একে তার আরো তিনটি ছেলে সন্তান হয়। এতে করে ভক্তকূলের বিশ্বাস আরো মজবুত হয়। ভাবখানা এমন যে, এরপর যত সন্তান হবে সবই ছেলে হবে। কাজেই এখন স্বেচ্ছায় ক্ষ্যামা দিলাম!

খাদেমের ডাকে জমিলা বানু সম্বিৎ ফিরে পান। ‘মা, আসনে বসার সময় গড়িয়ে যাচ্ছে। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসেছে। মা’র যে একবার দর্শণ দিতে হয়’

‘তুমি গিয়ে ব্যবস্থা কর, আমি আসতেছি’ খাদেমকে উদ্দেশ্য করে জমিলা বানু বলেন।



ইদানিং আসনে বসতে জমিলা বানুর একদম মন চায় না। হট্টগোল এড়িয়ে নির্জন এই পুকুরঘাটে এসে তিনি বসে থাকেন। নিতান্তই দরকার না হলে কেউ তাকে এখানে বিরক্ত করে না। তিনি প্রায়ই ভাবেন তার ভিতর বিরাজমান ঐশ্বরিক শক্তি তিনি কাকে দান করে যাবেন! তাঁর উত্তরাধিকারী কে হবে! কাউকে তিনি তার স্থলাভিষিক্ত করতে পারলে হাফ ছেড়ে বাঁচেন। তাঁর আর এগুলো ভাল লাগে না।

স্বামী লতিফুদ্দিকে দিয়ে এসব হবে না। তার মোটা বুদ্ধি। তাছাড়া লতিফুদ্দির চরিত্র ভাল না। নারী ভক্তকুলের প্রতি তার বিশেষ দূর্বলতা। জমিলা বানু সে সব জেনেও চুপ করে থাকেন।


মেয়েদের মধ্যে তেমন কাউকে তার মনে ধরে না। সকলেই যার যার ঘর সংসার নিয়ে ব্যস্ত। তাদের বিয়েও হয়েছে বড় বড় ঘরে। তাদের দ্বারা তাঁর ব্যবসা চালিয়ে নেয়া সম্ভব হবে না। তবে তাঁর মেঝ মেয়েটি যেমন বুদ্ধিমতি তেমন গুনবতী। মায়ের অনুপস্থিতিতে সে-ই সব কিছু ঠিকঠাক চালিয়ে নিতে পারেবে। মেঝ মেয়েটির নাম আমেনা। আমেনার বিয়ে হয়েছে কয়েক বছর। তবে আমেনার ঐশ্বরিক শক্তি প্রাপ্তির পথে একটা বড় বাঁধা আছে। আমেনার সন্তান হয় না। একজন বন্ধ্যা মেয়েলোক ঐশ্বরিক শক্তি লাভ করেছে একথা সমাজে কেউ মেনে নিবে না। কাজেই আগে আমেনার বন্ধ্যাত্ব কাটাতে হবে। তারপর জমিলা বানুর মেয়ে হিসেবে সে-ই সব চালিয়ে নিতে পারবে। কী করে আমেনার বন্ধ্যাত্ব কাটান যায় জমিলা বানু এখন তাই নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছেন। উপায় একটা বের করতেই হবে।




জমিলা বানু সকলের চোখের আড়ালে ঘরে দরজা দিয়ে আমেনার সাথে কথা বলছেন। আমেনা মায়ের এমন আচরণের কোন কারণ খুঁজে পাচ্ছে না। কী এমন গোপনীয় বিষয় থাকতে পারে যে মা তাকে এত সর্তকভাবে বলছে।

জমিলা বানুর কথা শুনে আমেনা কী জবাব দেবে তা ভেবে পায় না। কোন মা কি নিজের মেয়েকে এমন পরামর্শ দিতে পারে? লজ্জায় তার ঘর থেকে দৌড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে! আমেনা বলে, “ মা এইডা তুমি কী কও? এইডা কিভাবে সম্ভব?”

‘সম্ভব রে মা, সবই সম্ভব! আর এইডা তো আমার সিদ্ধান্ত না, ‘তেনার’ সিদ্ধান্ত। এতে কারো কোন হাত নেই।’ জমিলা বানু তার মেয়েকে বুঝাতে চেষ্টা করেন। ‘তেনার’ কথা বলতে তিনি তার ঘাড়ের এশ্বরিক শক্তিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর ধারণা আমেনার যে সন্তান হয় না তা তার স্বামীর কারণেই। আমেনার স্বামীর সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা নেই। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি হাড়েহাড়ে বুঝেছেন যে, সন্তান হওয়া না হওয়ার ব্যাপারে নারীকে দোষারোপ করা একদম বৃথা! দেখা গেছে মালী বদল হলে অনেক বন্ধ্যা গাছেও ফুল ফোটে! তাঁর নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে আমেনার পেটে সন্তান আসা চাই-ই। তা যেকোন মূল্যেই হোক না কেন।

জমিলা বানু শীতল গলায় বলেন.“ আমি যা বলতেছি তা তোর করাই লাগবে। এর কোন বেত্যয় যেন না ঘটে। আজ অমাবস্যার রাত। তোর দুলাভাই ও-ঘরে তোর জন্য অপেক্ষা করতেছে। তুই যা সেখানে! তারে বলছি এইডা ঐশ্বরিক আদেশ। এতে কোন পাপ নাই!”

মায়ের কথা শুনে আমেনার কান ঝা ঝা করে। সে নিশ্চুপ দাড়িয়ে থাকে।

জমিলা বানু ঝাজের সাথে বলেন, “একটা কথা কানখাড়া করে শুনে রাখ, তোদের জন্য অনেক করছি। এখন তোরা যদি আমার কথামত না চলিস, তাইলে আমার মরা মুখ দেখবি আমি কয়ে রাখলাম”

আমনে বলে, ‘কিন্তু মা, এইডা তো ভয়ানক পাপ। তাছাড়া আমি তোমাগের জামাইয়ের বিশ্বাস ভাঙ্গতে পারব না।’

জমিলা বানু মেয়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
‘মা-রে এই সংসারডা বিশ্বাস-অবিশ্বাসের চক্রে গাঁথা। এইখানে কারো বিশ্বাস ভাঙ্গতেছে আবার কারো বিশ্বাস জোড়া লাগতেছে! হাজার জনের বিশ্বাস অটুট রাখতে যদি একজনের বিশ্বাস ভাঙ্গতে হয় তবে ক্ষতি কী? তাছাড়া সারাজীবন কি তুই বন্ধ্যা হয়ে কাটাবি না-কি?’

আমেনা ভাবে, তার মা তো ঠিকই বলেছে। একজনের বিশ্বাস ভেঙ্গে যদি হাজার জনের বিশ্বাস টিকিয়ে রাখা যায় তাহলে মন্দ কি? তাছাড়া নারীর স্বার্থকতা তো ‘মা’ হওয়ার মাঝে। ‘মা’ ডাক শুনার জন্য তার মনটাও হাহাকার করে। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময়েই সে এতবড় পাপ কাজ করতে পারবে না। তার স্বামীর বিশ্বাসকে সে কিছুতেই হত্যা করতে পারবে না। আমেনা মায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে। সে দুলাভাইয়ের ঘরের দিকে না গিয়ে অন্ধকারে রাস্তার দিকে হাটা শুরু করে। জমিলা বানু দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। বাঁধা দেন না। থাক না মেয়েডা নিজের মত করে। না-ই বা পেল ঐশ্বরিক শক্তি, নাম-যশ, টাকা-পয়সা। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের খেলা খেলতে খেলতে তিনি নিজের জীবনটাকে শেষ করেছেন। তিনি ভাবেন, মেয়ের জীবনকে তিনি কোনভাবেই শেষ হতে দেবেন না। মেয়ের চরিত্রের দৃঢ়তা দেখে তিনি খুশি হন। হঠাৎ করে অন্যরকম ভাললাগায় তার মন ভরে উঠে। যে ভাললাগা ত্রিশ বছর আগে এমনই এক অমাবস্যার রাতে তিনি বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন।
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন