বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫
গল্প/কবিতা: ৪৮টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৫৫

বিচারক স্কোরঃ ৩.৬২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৯৩ / ৩.০

মনে কী দ্বিধা

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

নামছো কোথায়

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

আমার আপন আঁধার

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

গল্প - ঐশ্বরিক (মার্চ ২০১৭)

মোট ভোট ২৯ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৫৫ অতন্দ্রীয়

ফাহমিদা বারী
comment ৩০  favorite ১  import_contacts ৭১৯
অবিরাম কেঁদে চলেছে সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকটি। কেবিনে বসে থাকা প্রতিটি শোককাতর মানুষের মুখ কষ্ট আর উৎকণ্ঠায় বিবর্ণ। কেউ থামাতে পারছে না তাকে। জন্ম মুহুর্তেই তার সাথে ঘটে যাওয়া নির্মম দূর্ঘটনায় সে সর্বশক্তি জড়ো করে প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছে ঈশ্বরকে। শিশুটির বেদনায় সহমর্মিতা জানাতে কেবিনে ছুটে এসেছেন ডাক্তার, নার্স। প্রত্যেকেই প্রাণপন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, যদি কোনোভাবে তার কান্না থামানো যায়! কিন্তু সে যেন মহা পণ নিয়ে আবির্ভুত হয়েছে। কিছুতেই তার কান্না থামাবে না।
হঠাৎ কী মনে করে একজন নার্স ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে এসে শিশুটির দিকে ঝুঁকে থাকা মহিলা ডাক্তারের কানে কানে কিছু বলতেই তিনি বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন নার্সের মুখের দিকে। কী বলছে সে! এও কী সম্ভব!
চার ঘণ্টা আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া মায়ের কাছ থেকে শিশুটি কীভাবে তার জীবনের উষ্ণতা খুঁজে পাবে?

এক
সায়েমা যেন তার নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কী অবিশ্বাস্য ঘটনা! সে কি সত্যি দেখছে? চোখদুটো একবার ভালোমতো কচলে নেয় সায়েমা। হ্যাঁ, ঠিকই তো দেখছে। একদম পরিষ্কার গাঢ় দুটো লাল রেখা। ভুল হওয়ার কোনোই সুযোগ নেই। দিনের আলোর মতোই সত্যি।
সায়েমা’র কান্না পাচ্ছে। দু’চোখ ফেটে বেরিয়ে আসতে চাইছে জোয়ার। এতোদিনের জমে থাকা প্রচণ্ড আবেগ আজ কোনো বাধাই মানতে চাইছে না। ওর ইচ্ছে করছে চিৎকার করে সবাইকে জানাতে, ‘আমি মা হবো!...আমার নিজের একটি সন্তান আসবে এই পৃথিবীতে!...’ খুশিতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে দেয় সায়েমা। একবার ছুটে বারান্দায় চলে যায়। পরক্ষণেই দৌঁড়ে আসে টেলিফোনের কাছে। অসীমকে জানাতে হবে আগে। এই আনন্দের সমান ভাগীদার তো সেও। ফোন হাতে নিয়ে অসীমের নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়ে দেখে, নাম্বার ভুলে গেছে। হাত কাঁপছে। মোবাইলটাও খুঁজে পাচ্ছে না। কোথায় রেখেছে কে জানে!
অস্থির পদক্ষেপে মোবাইল খুঁজতে গিয়ে মনে হলো, এভাবে ছোটাছুটি করা তো তার ঠিক হচ্ছে না! এখন তো তার শুধু নিজের নয়, আরেকজনের কথাও ভাবতে হবে। একটা ছোট্ট প্রাণ! যে কী না একটু একটু করে বেড়ে উঠবে তারই ভেতর...তার শরীরের একান্ত নিজস্ব একটা অংশ হয়ে, সেই ছোট্ট প্রাণটির ভালোলাগা মন্দলাগা সবকিছু তো এখন থেকে তাকেই ভাবতে হবে! প্রবল মমতায় নিজের তলপেটে একবার হাত বোলায় সায়েমা। শরীরের সবগুলো রোমকূপ যেন দাঁড়িয়ে যায়। শিরশিরে একটা কাঁপুনি টের পায়। ওর হাতের স্পর্শে যেন আলোড়িত হয় আরেকটি প্রাণ। সায়েমার হাতের স্পর্শের সাথে সেও বুঝি তার প্রাণের স্পন্দন মিশিয়ে দেয়। অদেখা মা’র সাথে সে যেন তার কুশলটুকু বিনিময় করে নেয়। কী যে অভাবনীয় অভূতপূর্ব অনুভূতি!
মোবাইলটা খুঁজে পেয়েই দ্রুত হাতে অসীমের নাম্বারটা বের করে সায়েমা। রিং করার ঠিক আগমুহুর্তে মনে হয়, এভাবে ওকে এই খবরটা জানাবে সে! এমন একটা খবর টেলিফোনে দেওয়া কী ঠিক হবে?
নাঃ! টেলিফোনে এই খবর দেওয়া ঘোরতর অন্যায় হবে। সায়মা অপেক্ষা করবে অসীমের ফিরে আসার। অসীমকে জানানোর আগে এই খবর আর কাউকেই জানাবে না সে।
সারা দিনমান এঘর ওঘর করতে থাকে সায়েমা। অপেক্ষার কষ্টকর অস্থির প্রহর...একই সাথে তীব্র আনন্দের অভূতস্পর্শী অনুভূতি। মিশ্র এক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে ওর মনের ভেতর। সায়মার কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। সৃষ্টিকর্তা সত্যিই কী এ সৌভাগ্য রেখে দিয়েছেন ওর জন্য! নাকি পুরোটাই কোনো স্বপ্ন, অলীক কল্পনা? সত্য আর মিথ্যের মাঝে কেবল একটা নিদ্রাভঙ্গের ব্যবধান! কতোবার যে নিজের গায়ে চিমটি কেটে দাগ বসিয়ে দিলো সায়েমা! তবু বিশ্বাসের দোরে যেন কড়া নড়ে না।
আনন্দের আতিশয্যে ক্ষুধার অনুভূতিটুকুও হারিয়ে গেছে । তবু দুপুর হতে না হতেই লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেতে বসে যায় সায়েমা। অন্যদিন টুকটাক হাতের কাজ নিয়ে বসে, অথবা টিভিতে কোনো ভালো মুভি পেলে দেখে। যা করতে ভালো লাগে কিছু একটা করে। কিন্তু আজকে তো তার নিজের ভালোলাগা না লাগার উপর নির্ভর করে থাকা যাবে না। সময়মতো সব কিছু করতে হবে যেন তার অনাগত সন্তান ভালো থাকে। আজ খাওয়া শেষ করে একটু গড়িয়ে নিলো সায়েমা। শরীর আর মনকে প্রশান্ত রাখতে হবে। কোনোভাবেই যেন কোনোরকম চাপ না পড়ে। ওর নিজের এতটুকু গাফলতিও সে বরদাস্ত করতে পারবে না। কতো দীর্ঘ প্রতিক্ষার ফল সৃষ্টিকর্তা তাকে দিতে চলেছেন। তাকে সে কোনোভাবেই নষ্ট করতে পারবে না।
পনেরোটি বছর! দীর্ঘ পনেরোটি বছর কেটে গেছে তার বিবাহিত জীবনের। একটা একটা করে বছর গেছে আর আস্তে আস্তে চিড় ধরতে শুরু করেছে তার ধৈর্যের বাঁধে। প্রতিটি বছরের প্রতিটি মাস, প্রতিটি দিন সে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে গেছে শুধু। হয়তো এবার...এবার সে একটা শুভ ইঙ্গিত পাবে। একটা কোনো সম্ভাবনা, কোনো শুভ সংবাদ। কিন্তু সবকিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে বছরগুলো পার হয়ে গেছে একে একে। সে মা হতে পারেনি। তার মা হতে পারার কোনো সুদূর সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি। দেশের সবচেয়ে বড় ডাক্তার কোনো কার্যকর চিকিৎসা দিতে পারেননি। স্বামী তাকে নিয়ে গেছে দেশের বাইরে। প্রায় প্রত্যেকেই জানিয়েছেন চরম হতাশার কথা। সায়েমার মা হতে পারার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। তার শরীর মা হবার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে অপারগ। কেউ তাকে কোনোরকম আশার বাণী শোনায়নি।
তবু সায়েমা একেবারে পুরোপুরি আশাহত হয়নি। জগতে তো কতোরকম বিচিত্র ঘটনাই ঘটে! পাথরে ফুল ফোটে...শুকনো মরা গাছে নতুন পাতা গজায়। তাহলে তার জীবনে কেন কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটবে না? যতো ক্ষুদ্রই হোক, সেও তো এই বিপুল সৃষ্টিজগতেরই একটা অংশ! একই সৃষ্টিকর্তার মুখাপেক্ষী! তার করুণাকামী একজন। সৃষ্টির ক্ষুদ্রতম একটি অংশের বিশ্বাসের দীপ্যমান শিখার জ্বলে ওঠা বা নিভে যাওয়াতে সেই সৃষ্টিকর্তার কী কিছুই আসে যায় না!
সায়েমা পাহাড়ের মতো অটল মনে আস্থা রেখেছে সৃষ্টিকর্তার অলৌকিকতায়। তিনি যদি দিতে চান, কার সাধ্য আছে তাকে টলানোর?
সন্ধ্যার একটু আগে আগে বাসায় এসে অসীম দেখতে পায় পুরো ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ থাকলেও ওদের বাসায় বিদ্যুৎ নেই। সারা বাসাময় মোমবাতি জ্বালিয়ে সায়েমা সেজেগুজে বসে আছে।
ধবধবে সাদা রঙের শাড়ীতে কী অপূর্ব লাগছে সায়েমাকে! আজ কতোগুলো বছর পরে সায়েমা শাড়ী পরেছে! এতো সুন্দর করে সেজেছে! অসীম অবাক মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে সায়েমার দিকে।

দুই
গাইনোকলোজিস্ট নিলুফার বেগম খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছেন সায়েমার রিপোর্টগুলো। এই রিপোর্টগুলি তিনি নিজে আগ্রহ নিয়ে তার পেশেন্টকে নিয়ে আসতে বলেছেন। যা তিনি সচরাচর করেন না। রাতে একটা অপারেশন করার কথা ছিল তার। সেটা পেশেন্টের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে একদিন পিছিয়ে দিয়েছেন। তার হাতে আজকের রাতটুকুর অখন্ড অবসর। সময়টাকে তিনি পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন। কোনো ফোনকলও রিসিভ করছেন না। যাতে তার মনোযোগে বিঘ্ন না ঘটে।
যদিও কাজটি তিনি করছেন তার নিজের সার্থেই। ইনফার্টিলিটির একটা বিশেষ দিক নিয়ে তিনি আজ প্রায় সতেরো বছর যাবত গবেষণা করছেন। রোগীদের তথ্যাবলী তিনি তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি তার গবেষণার কাজেও লাগিয়ে থাকেন। এক ঢিলেই দুই পাখি মারার মতো ব্যাপার!
সায়েমা আজ প্রায় পাঁচ বছর যাবত তার পেশেন্ট। এর আগেও সে তার ইনফার্টিলিটির জন্য অন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়েছিল। সুফল না পাওয়ায় তার কাছে এসেছে। তিনি দেশের ব্যস্ততম গাইনোকলোজিস্ট। তার হাতে আল্লাহর অসীম রহমতে অনেক সফলতা এসেছে। অনেক মেয়ে তাদের মা হতে না পারার কষ্টকে ভুলতে পেরেছে তার কাছে এসে। দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তি ভুলে গিয়ে মেয়েগুলো যখন মাতৃত্বের সন্ধান পায়, তাদের বাঁধভাঙা আনন্দ কিছুটা হলেও তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কারণ তিনিও তো একজন মানুষ, একজন মা। আবার অনেক বেদনার রঙ যখন কিছুতেই খুশির রঙে রঙিন হতে পারে না, তখন সেই যন্ত্রণা তাকেও ছুঁয়ে যায়।
সায়েমার ব্যপারে তিনি একেবারেই আশাবাদী ছিলেন না। সায়েমার দুটি ফ্যালোপিয়ন টিউবই প্রায় অকেজো হয়ে পড়েছিল। এমন অবস্থায় কিছুতেই তার পক্ষে গর্ভধারণ করা সম্ভবপর ছিল না। এছাড়াও তার উচ্চ রক্তচাপের একটা সমস্যা আছে। তাই তার পক্ষে কোনোভাবে গর্ভধারণ করা সম্ভবপর হলেও এক্লাম্পসিয়াতে আক্রান্ত হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা। তিনি বিভিন্ন সময়ে তাকে সে কথা স্পষ্ট করে বলেছেনও। যাতে করে মেয়েটি কোনো মিথ্যে আশায় বসে না থাকে। কিন্তু তিনি সায়েমার মাঝে এক আশ্চর্য জিনিস লক্ষ্য করেছেন। আর তা হলো মেয়েটির মানসিক দৃঢ়তা। সৃষ্টিকর্তার প্রতি অদম্য বিশ্বাস। কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই জেনেও সে কখনোই পুরোপুরি হতাশ হয়নি। প্রতিবারে সে অজানা এক দুরুহ আশায় বুক বেঁধে থেকেছে। মাসের পরে মাস গেছে। মেয়েটি কিছুতেই হাল ছাড়েনি। তিনি নিজেও রুটিন মাফিক এটা সেটা চিকিৎসা চালু রেখেছেন। রোগি চিকিৎসা না ছাড়তে চাইলে কী করার আছে তার!
গতকাল বিকেলে সায়েমা তার এপোয়েণ্টমেন্ট নিয়ে যে অবিশ্বাস্য খবর তাকে শুনিয়ে গেছে, তিনি কিছুতেই তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। ডাক্তার তিনি, বিজ্ঞানের ছাত্রি ছিলেন। তার এতোদিনের কেরিয়ারে কিছু কিছু অতি দূরের সম্ভবনা সত্যি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এতোটা বহু দূরের সম্ভাবনা সত্যি হওয়া এবারই প্রথম। রোগির দেওয়া এই খবর তার নিজের কাছেও এক বিশাল অলৌকিক ব্যাপার। মেয়েটি এই অলৌকিকতার সম্ভাবনাকেই ধারণ করে বসে ছিল নিজের মাঝে। সে যেন তার বিশ্বাসেরই সুফল পেল আজ।
কিন্তু সত্যটাকে জানেন বলেই তিনি ভাবছেন এর পরবর্তী সময়টার কথা। এখনই এতো খুশি হওয়ার মতো কিছু হয়ে যায়নি। গর্ভধারণ অসম্ভব ছিল, কিন্তু এর পরের নয়টা মাস নিরাপদে পার করা আরো অনেক বেশি দূরের সম্ভাবনা।
রিপোর্টগুলো দেখছেন আর একটা একটা করে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে নিলুফার বেগমের কপালে। মেয়েটি এতোদিনে তার ধৈর্য আর বিশ্বাসের ফল পেয়েছে, সামনের অনির্বার্য পরিণতি সে কীভাবে সহ্য করবে!
অনেকগুলো বড় চ্যালেঞ্জ সামনে। আপাতত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, মেয়েটির এই প্রেগন্যান্সিটি স্বাভাবিক না হওয়া। ডাক্তারি পরিভাষায় এটি একটি ‘এক্টপিক প্রেগন্যান্সি’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। অবশ্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি করার আগে কিছু বলা সম্ভব নয়। কিন্তু সেটাই ঘটেছে এটা তিনি তার অভিজ্ঞতা দিয়েই বলে দিতে পারেন। আর তা যদি হয়, তাহলে অতি শীঘ্রই তার গর্ভপাত ঘটাতে হবে।
রিপোর্টগুলো সরিয়ে রেখে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন নিলুফার বেগম। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এই সায়েমা মেয়েটিকে দেখছেন । কখনো কখনো মাসে সাত আটবার তার কাছে এসেছে। নিলুফার বেগম যতোই তাকে সত্য কথা বলে শক্ত হতে অনুরোধ করেছেন, সে ততোই যেন বিশ্বাসের মনোবলে আরো অদম্য হয়ে উঠেছে। ব্যাকুল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতো মেয়েটা। সেই দৃষ্টির সামনে তার মতো পেশাদার মানুষও অসহায় বোধ করতো। তিনি সামান্য একজন চিকিৎসক মাত্র। অতি অতি নগন্য তার ক্ষমতা। অথবা অন্য ভাষায়, আসলে কোনো ক্ষমতাই তার হাতে নেই। মহাবিশ্বের অপার রহস্য যার একটুখানি ইশারায় এফোঁড় ওফোঁড় হয়, তিনি সেই রহস্যের কতোটুকুই বা জানতে দেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে!
তার ইশারা ছাড়া এতোটুকু সামান্য ঘটনা ঘটাও যে সম্ভব নয়! তাহলে কী অনির্বার্য দুঃখজনক এই সম্ভাবনাকে ঠেকানোর জন্য কোনো ইশারা তিনি দিতে চাইছেন? যদি তা নাই দিতে চাইতেন তাহলে এতো দীর্ঘ সময়ের অপ্রাপ্তি আর আশাভঙ্গের কষ্টের মাঝে এই আশার আলো কেন তিনি জ্বালিয়ে দিলেন?
সম্পূর্ণ অসম্ভবের কোনো ভাবনা আজ নিলুফার বেগমকে ভীষণভাবে ভাবিয়ে তুললো। তার খুব ইচ্ছে করছে, সায়েমা’র মতো বিশ্বাসের পাল্লাটাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকতে।
কেন যেন কিছুতেই তা ছাড়তে মন চাইছে না আজ!

তিন
আজ সায়েমার অপারেশন।
সকালের আলো ফোটার আগে থেকেই সবাই জেগে বসে আছে। দেশের বাড়ি থেকে অসীমের বাবা-মা এসেছেন। আজ প্রায় তিন মাস যাবত সায়েমার মা তার সাথে আছেন। সবার মধ্যেই চাপা উৎকণ্ঠা, উত্তেজনা। কিন্তু উপরে কেউ তা প্রকাশ করছেন না। ডাক্তারের কড়া নির্দেশ, কেউ যেন সায়েমার সামনে কোনোরকম আশংকা বা উত্তেজনার কোনোকিছু প্রকাশ না করে। প্রত্যেকের আচরণ হওয়া চাই সম্পূর্ণ স্বাভাবিক এবং স্বচ্ছন্দ।
তারা প্রাণপনে ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চলার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে চাইছেন। সায়েমার মা গতকাল শর্তা দিয়ে সুপারি কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছেন। অসীমের মা সকালে ভাত রান্না করতে গিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে প্রায় শাড়িতে আগুন ধরিয়ে ফেলেছিলেন। অসীম বার বার এটা ওটা হারিয়ে ফেলছে। কোথায় কী রাখছে কিছু মনে থাকছে না। কিন্তু এতোকিছু হয়ে চলেছে সবই সায়েমার অগোচরে। ওর সামনে সবাই একেবারে ফিটফাট, শান্ত। কারো মধ্যে কোনো অস্থিরতা বা কোনো কিছু নেই। অসীমের ছোট বোন ডাক্তারি পড়ছে। সেও গতকাল চলে এসেছে হোস্টেল থেকে। সায়েমাকে সে নানাভাবে আশ্বস্ত করে চলেছে আসার পরে থেকেই।
‘ভাবী, আজকাল সিজারিয়ান অপারেশন হচ্ছে ডাল-ভাত। কোনো বিষয়ই নয়। তুমি কিন্তু একদমই এটা নিয়ে ভাববে না।‘
সায়েমা প্রস্তুতি নিচ্ছে হাসপাতালে যাওয়ার। ওর মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা যাচ্ছে না। শান্ত মুখে সব টুকটাক কাজ করে চলেছে সে। সবাই খুব সাহায্য করছে যদিও, তবু নিজেরও তো কিছু কাজ থাকে। বাসাভর্তি লোকের মধ্যে অসীমকে একা পাচ্ছে না সায়েমা। অসীমকে কিছু কথা বলতে হবে। সায়েমার খুব অস্থিরতা বোধ হচ্ছে। মনটা কিছু একটা অজানা আশংকায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে সমস্ত শরীর যেন ঢলে পড়তে চাইছে। গত নয়টা মাসের শান্ত থাকার প্রাণান্তকর সংগ্রামে সে এখন একেবারে বিধ্বস্ত। শরীর মন আর নিতে পারছে না। সবকিছুকে ছাপিয়ে সবাই যেন বিশ্রাম নিতে চাইছে।
কম তো গেল না এই নয়টা মাসে!
সব দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ সবকিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়ে সায়েমা স্বাভাবিক গর্ভধারণে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু বলতে গেলে চব্বিশ ঘণ্টার মাঝে আঠারো ঘণ্টাই ওকে ডাক্তারের নজরদারিতে থাকতে হয়েছে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওর একটা কিছু করারও অনুমতি ছিল না। পদে পদে সাবধানতা মেনে পা ফেলতে হয়েছে। গাইনোকলজিস্ট নিলুফার বেগম তার পাঁচজন রোগীর মনোযোগ ও সময় সায়েমাকে দিয়েছেন। এতো কিছু সত্ত্বেও বেশ কয়েকবার ওর ব্লাডপ্রেশার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। দু’বার কয়েকদিন করে হাসপাতালেও থাকতে হয়েছে সায়েমাকে। ব্লাড প্রেসার নরমাল হবার পরে আবার ফিরে এসেছে। যদিও ওর ডাক্তারের ইচ্ছে ছিল ওকে পুরো সময়টা হাসপাতালে রাখার। কিন্তু সায়েমা কিছুতেই থাকতে চায়নি। ওর এক কথা, একটানা হাসপাতালে থাকতে হলেই সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। শেষমেষ ডাক্তারও আর জোর করতে পারেননি।
আজ দুপুর দু’টায় অপারেশন করার কথা। ওরা এগারোটার মধ্যেই হাসপাতালে পৌঁছে গেল। আনুষাঙ্গিক কাজ শেষ হবার পরে সায়েমাকে ইন্টেনসিভ কেয়ারে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। নিলুফার বেগম কড়া নির্দেশ জারি করে দিলেন, অপারেশনের আগে এবং পুরো চব্বিশ ঘণ্টা পর্যন্ত রোগীকে কারো সাথে দেখা করতে দেওয়া হবে না। সায়েমা সকলের সাথে কথা শেষ করে অসীমকে কিছুক্ষণ একা ওর পাশে বসে থাকতে বললো। অসীমের হাতদুটো ধরে সায়েমা চুপ করে থাকলো অনেকক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে বললো,
‘জানো, একটা কথা তোমাকে বলা হয় নাই। এই এতোগুলো দিনে আমি সবসময় আমাদের বাবুর সাথে কথা বলতাম। আমি আমার পেটে হাত দিলেই ও কেমন নড়েচড়ে উঠতো। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতো। ওর নিজের ভাষায়। কিন্তু আমি ঠিকই ওর কথা বুঝে নিতাম। আমি ওকে মজার মজার গল্প করতাম। ও হেসে কুটিকুটি হতো। আমার পেটের মধ্যে সমানে মোচড় দিতো। আমার দুশ্চিন্তা হলে আমি চুপ করে বসে থাকতাম। ও সেটা বুঝতে পেরে সমানে পেটে গুঁতো দিতো। আমাকে হাসতে বলতো। আমি সবকিছু বুঝতে পারতাম, জানো?’
অসীম শক্ত করে সায়েমার হাত চেপে ধরে। নরম স্বরে বলে,
‘সব মায়ের সাথেই জন্মের অনেক আগে থেকেই তার সন্তানের একটা বন্ধন তৈরি হয়। এটা তো ভুল নয়। একটা শিশু পৃথিবীতে আসার পরে কেউ বাবা হয়, কেউ চাচা, মামা, দাদা, দাদী, নানা, নানী...আরো কতো কী! কিন্তু একটি মেয়ে সেদিন থেকেই মা হয়, যেদিন থেকে সে একটি শিশুকে গর্ভে ধারণ করে। সৃষ্টিকর্তা এতোটা দূর্লভ সৌভাগ্যের ভাগীদার কেবলমাত্র একজন মাকেই করেন।‘
সায়েমা কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
‘আমার কেমন যেন ভয় করছে জানো? বেশ কিছুদিন ধরে আমার মনে হচ্ছে ও ভালো নেই। ও খুব চিন্তায় আছে। ও যেন সবসময় আমাকে চোখে চোখে রাখতে চাইছে। আমাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাইছে সবসময়। আমি রাতে সেদিন স্বপ্নেও দেখলাম...’
অসীম থামিয়ে দেয় সায়েমাকে।
‘বাচ্চা পৃথিবীতে আসার আগে আগে সব মেয়েরই এসব দুশ্চিন্তা হয়। তুমি সবসময় এই বিষয় নিয়েই ভেবেছো। কারণ আমরা এতোদিন বাবা-মা হইনি। তাই তোমার এমন মনে হচ্ছে। কিচ্ছু হবে না, দেখো। সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রাখো, যা তুমি সবসময় রেখে এসেছো। সব ঠিক হয়ে যাবে।‘
অসীম আরো কিছু কথা বলে সায়েমার কাছ থেকে বিদায় নেয়। সায়েমা চোখ বুজে শুয়ে থাকে।
সময় হয়ে যাচ্ছে...ওর এতোদিনের অপেক্ষা আর কৌতুহলের আজ অবসান হবে। ওর সন্তানের সাথে আজ ওর দেখা হবে।
কিন্তু এতো অস্থির লাগছে কেন?
ওর বাচ্চাটা এতো দুশ্চিন্তা করছে কেন?

চার
নিলুফার বেগম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অপারেশন টেবিলের পাশে।
নিজের চোখকে তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সবকিছু সুন্দর স্বাভাবিক ভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। অপারেশনের আগেও তিনি সবকিছু টেস্ট করে এতোটা নিশ্চিত ছিলেন না। মনে আশংকা ছিল মা অথবা শিশুর মাঝে হয়তো একজনের প্রাণ আশংকা ঘটতে পারে। কিন্তু আশংকা মিথ্যে হয়। দুজনকেই বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হন তারা। আর তারপর...সবকিছু নির্বিঘ্নে হয়ে যাওয়ার পর পরই অঘটন শুরু হয়ে যায়। কিছুতেই সায়েমার ব্লিডিং বন্ধ হয় না। তিনি আর তার পুরো টিম দু’ঘণ্টা ধরে পরিশ্রম করেও কিছুই করতে পারেন না। সফল একটা অপারেশন শেষে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই অপারেশনের দু’ঘন্টা পরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সায়েমার মৃত্যু হয়।
উপস্থিত ডাক্তার নার্স সবাই যেন পাথর হয়ে যায়। ধীরে ধীরে একসময় সম্বিত ফিরে আসে সকলের। বের হতে হবে অপারেশন থিয়েটার থেকে। রোগীর আত্মীয় পরিজনকে খবরটা জানাতে হবে।
এদিকে দীর্ঘসময় চলে যাওয়ার পরেও যখন অপারেশন থিয়েটারের লালবাতি নেভে না, উত্তেজনা ভর করতে থাকে সায়েমার পরিবার পরিজনের মাঝে। ধীরে ধীরে তা উদ্বেগে রূপ নেয়। কী ব্যাপার? এতোটা দেরি তো হওয়ার কথা নয়!
যদিও তারা অনেক আগেই শিশুর কান্না শুনতে পেয়েছেন। সেটা শুনে তারা আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু বাচ্চা কেঁদেই চলেছে। প্রায় দু’ঘণ্টা হতে চললো। এখনো কেন দরজা খুলছে না অপারেশন থিয়েটারের?
অপেক্ষার পালা শেষে একসময় খুলে গেল দরজা। পাথরের মতো মুখ নিয়ে বেরিয়ে এলেন নিলুফার বেগম। তার পাশে দাঁড়ানো সহকারী ডাক্তারের হাতে ধরা একটা কাপড়ের পুটুলি। তার ভেতর থেকে শোনা যাচ্ছে তীব্র চিৎকার...চরমতম প্রতিবাদের।

নিলুফার বেগম নার্সের কথায় চমকে উঠেন।
‘এসব কী বলছো তুমি? মাথা ঠিক আছে তোমার?’
চার ঘন্টা পেরিয়ে গেছে সায়েমার মৃত্যুর। এখনো থামানো যাচ্ছে না শিশুটাকে। অশ্রুসজল চোখে ভাঙা বুক নিয়ে সায়েমার পরিবারের সবাই প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ওকে থামানোর। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। সব চেষ্টাকে নিষ্ফল করে দিয়ে সে যেন প্রতি বারে তার চিৎকারের মাত্রা বাড়িয়েই চলেছে। অবস্থা একপর্যায়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে। অন্য ওয়ার্ডের ডাক্তার নার্স সবাই ছুটে আসেন বাচ্চার চিৎকারে।
সায়েমার লাশ এখনো পরে আছে অপারেশন থিয়েটারে। বাচ্চাকে নিয়ে ব্যস্ত সকলে এখনো লাশ সরানোর ব্যবস্থা করে উঠতে পারেননি। এর মাঝে অনেক সাহস নিয়ে একজন নার্স, ডাক্তার নিলুফার বেগমকে চুপিচুপি বলে ওঠে,
‘ম্যাডাম, বাচ্চাটাকে একবার ওর মা’র কাছে নিয়ে যাই। যদি মাকে দেখে বাচ্চাটা শান্ত হয়?‘
নিলুফার বেগম নার্সের কথায় প্রথমে চমকে উঠেন ঠিকই। কিন্তু শেষমেষ দ্বিধা দন্দকে জয় করে নার্সকে অনুমতি দেন শিশুটিকে তার মা’র লাশের কাছে নিয়ে যাবার। দেখাই যাক কিছু লাভ হয় কী না তাতে! কিছু তো হারানোর নেই আর!
পেছনে পেছনে অনেকেই আসে। লাশের মুখ খুলে শিশুটিকে শুইয়ে দেওয়া হয় তার পাশে। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়েন সায়েমার মা। অসীম পাথর হয়ে নির্বাক তাকিয়ে থাকে সায়েমা আর ওদের সন্তানের দিকে।
শিশুটি দু’হাতে যেন আঁকড়ে ধরতে চায় সায়েমার নিস্পন্দ মুখ। সেই মুখের সাথে ছোট্ট শরীরের সমস্ত জোর একত্র করে সে তার মুখটাকে ঘঁষতে থাকে। আর অবিরাম চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।
প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট পেরিয়ে যায় এভাবে। তারপরে একসময় সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করে লাশের চোখের পাতা যেন নড়ে উঠছে। আরো কিছুক্ষণ পরে...যেন বজ্রাঘাতে আহত নিশ্চল ঘরের প্রতিটি মানুষের চোখের সামনে...এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। সায়েমা আস্তে আস্তে সম্পূর্ণ চোখ মেলে অপলকে তার সন্তানের দিকে তাকায়। চোখের পলক ফেলতে ভুলে যাওয়া বিস্ময়াভিভূত প্রতিটি মানুষ অবাক হয়ে লক্ষ্য করে, সায়েমার চোখেও টলমল করছে অশ্রু।
ইতিমধ্যে থেমে গিয়েছে শিশুটির কান্না।
কান্না থামিয়ে, সেও যেন সকৌতুকে তাকিয়ে আছে সদ্য দেখা হওয়া মায়ের দিকে।
(হংকং এর কুইনস এলিজাবেথ হাসপাতালে গত বছর এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে। সন্তান জন্মগ্রহণের অল্প কিছু সময় পরেই প্রসবকালীন শক ও যন্ত্রণায় জুলিয়া মার্থারের মৃত্যু ঘটে। কিন্তু তার মস্তিষ্কের মৃত্যু তখনো ঘটেনি। শিশুটির অবিরাম কান্না থামাতে ব্যর্থ হয়ে উপস্থিত একজন নার্স তাকে তার মায়ের মৃতদেহের পাশে নিয়ে যায়। তারপরই ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা। শিশুর কান্নার শব্দ প্রবেশ করে মায়ের মস্তিষ্কে। শিশুটি যেন তার হাতের স্পর্শ আর মায়ের সাথে জুড়ে থাকা আত্মিক বন্ধনের জাদুমন্ত্রে মৃত্যুর চার ঘণ্টা পরে তার মাকে ফিরিয়ে আনে জীবনের স্পন্দনে। গল্পটি সেই সত্য ঘটনাটিরই ছায়া অবলম্বনে লেখা।)
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন