বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২৮ ডিসেম্বর ১৯৮১
গল্প/কবিতা: ৫টি

সমন্বিত স্কোর

৪.০২

বিচারক স্কোরঃ ২.৫২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ১.৫ / ৩.০

অপরা‎‎হ্ণ প্রসূন

প্রশ্ন ডিসেম্বর ২০১৭

কাঠের শহর

আঁধার অক্টোবর ২০১৭

প্রতীক্ষা

দিগন্ত মার্চ ২০১৫

শ্রম (মে ২০১৫)

মোট ভোট প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.০২ পানকৌড়ির পৃথিবী

মনজুরুল ইসলাম
comment ৭  favorite ২  import_contacts ৫১৪
০১
শিশির সিক্ত শুভ্র সকাল। শীতার্ত প্রকৃতি। কুয়াশার ঘোমটায় আবৃত সূর্য। মুক্তির অকৃত্রিম প্রয়াস। ঘুমের রাজ্যে নিমগ্ন ঘুমপুরীর প্রতিটি প্রাণ,সঙ্গে আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা ও জীর্ণ বস্তি। নগরীর সরু পথ,গলি পথ, প্রশ্বস্ত সড়ক জেগে উঠেছে মাত্র। ব্যস্ততা বরণে ব্যস্ত সবাই। তবে নীরবতার ছোঁয়া নেই কেবল ক্রিকেট মাঠে। নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত মাঠে তারুণ্যের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। নগরীর চতুর্দিক থেকে তরুণদের নিবিড় সমাগম। ব্যাটবলের লড়াইয়ে প্রাণিত ক্রিকেট মাঠ। শিশিরের সফেদ ফোটার স্পর্শে সজ্জিত সবুজ ঘাস তারুণ্যের জোয়ারে দলিত মথিত প্রায়। একেকজনের ঠিকানা,গন্তব্য একেক রকম। ক্রিকেটের অমোঘ আকর্ষণ একই বাঁধনে আবদ্ধ করেছে তাদের সবাইকে। বড্ড বেপরোয়া আজ বাবলুর ব্যাট। চার ছক্কার ফুলঝুরিতে বেহাল দশা বোলারদের। অপরপ্রান্তে যোগ্য সঙ্গ দিচ্ছে রাহী। প্রতিনিয়ত খেলার মাঠেই মুখোমুখি। মাঠ গড়িয়ে পরিচয়ের সূত্রপাত এখনও হয়ে উঠে নি।

দারুন খেলেছ,তোমার বাসা কোথায়? লজ্জার দেয়াল ভেদ করে রাহীর জিজ্ঞাসা।
ধন্যবাদ,না আমার কোন বাসা নেই। দোকানে থাকি।
দোকানে থাকো মানে! কী করো?
‘কাপড় বিক্রি করি’ বাবলুর সরল উত্তর।
অপ্রত্যাশিত উত্তরে অপ্রস্তুত রাহী। কোন স্কুলে পড় কি? মলিন মুখে পুন:জিজ্ঞাসা।
গ্রামের স্কুলে পড়তাম,অনেক ভালো লাগত। এখন পড়ি না। পড়ি না বলতে, কাজের চাপে সুযোগ পাইনা।
তুমি কোথায় থাক? কী কর?
সামনেই,সদর হাসপাতালের পাশেই আমার বাসা। এইবার ক্লাস এইটে উঠেছি।
আচ্ছা ঠিক আছে, আমার দোকান এইদিকে। আমাকে যেতে হবে।
কালকে আসছো তো খেলতে ?
অবশ্যই আসবো।
সাফল্যের সমান সম্ভাবনা। মাঝখানে প্রাচীর প্রকৃত বাস্তবতার। দু’জনার পৃথিবী দ’ুরকম। আকাশ পাতাল প্রভেদ অনুধাবনে অপরাগ তারা। বন্ধুত্বের গিট শক্ত করে গেঁথেছে মনের সুতোয়। হয়ত সময়ের জল গড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কের সমাধি ঘটবে। তবু নিস্পাপ মনের বাঁধন সকল বাঁধনের শ্রেষ্ঠ বাঁধন। এই শাশ্বত সত্যের চরম উপলব্ধি দু’জনের মধ্যে প্রবল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গাঢ়তর হতে থাকে সম্পর্ক। স্মৃতির এ্যালবামে যুক্ত হতে থাকে ভাল লাগার অসংখ্য মুহূর্ত।
০২
অতি অপ্রত্যাশিত বাস্তবতার অদৃশ্য শৃংখলে আবদ্ধ কিশোর বাবলুর বিনোদন বলতে ওই এক টুকরো সকাল। হৃদয় কন্দরে লালিত মৃত স্বপ্ন ও কষ্টের স্রোতে ভেসে বেড়ানো অবুঝ বাবলু প্রশান্তি খুঁজে বেড়ায় ওই ফুটফুটে সকালে। গত বছর বাবাকে হারিয়েছে। সেই সাথে হারিয়েছে চিরচেনা প্রকৃতি,লালিত স্বপ্ন,অপূর্ব পৃথিবী। শহরে এসে পরিচিত হয়েছে অপরিচিত বাস্তবতার সঙ্গে। সকাল থেকে রাত অবধি সীমাহীন শ্রমের ভারে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ে সে। মুক্তি পেতে চায়। বন্ধুত্ব গড়তে চায় প্রকৃতির সঙ্গে। দুধকুমরের ঢেউ,পালতোলা নৌকা, বিলের পানা ফুল,স্কুল মাঠ,প্রকান্ড বট গাছ হৃদয়তন্ত্রীতে বেদনার সুর তোলে বাবলুর। পানকৌড়ি ও বকের মত ডানা মেলে প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে যেতে চায় হারানো শৈশবে। সীমাবদ্ধতার সকল প্রাচীর ভেঙ্গে ছুটতে চায় ও। ছুটতে চায় গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ডালের বড়া,টাকি মাছের ভর্তা আর মায়ের আদর প্রচন্ড কাছে টানে বাবলুকে। কিন্তু বাস্তবতার নিকষ অন্ধকারে আবেগের পাপড়িগুলো প্রতিনিয়ত অসহায়। “বাবা,মন দিয়ে কাজ করবি”-মায়ের আকুতি বুলেটের মতো বিদ্ধ করে বাবলুকে। মুহূর্তেই মানসপটে চিত্রিত হয় পরিবারের ভঙ্গুর চিত্র। মুখ থুবুড়ে পড়ে তার সুবর্ণ অতীত। স্থির হয় ও। ধৈর্য্যরে প্রাচীর হয়ে হৃদয়ে সঞ্চিত কষ্টপুঞ্জ সঙ্গে নিয়ে ছুটে চলে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে। ২০০০ টাকার ৩০০ টাকা রেখে পুরোটাই পাঠায় মায়ের কাছে। স্বামীর অকস্মাৎ বিদায়ে বাচ্চাদের নিয়ে অথই সাগরে পড়েছে সুন্দরী বেগম। কঠোর পরিশ্রম ও বাবলুর রোজগারেও কষ্টের ক্ষত আজও দগদগে।
০৩
সূর্যের ঘুম ভাঙ্গার আগেই ঘুম ভেঙে গেছে বাবলুর। প্রচন্ড ব্যস্ত সে। বাইরে প্রতীক্ষমাণ রাহী। খেলতে যাবে স্টেডিয়ামে। খেলা হবে হাসপাতাল পাড়া বনাম কলেজ পাড়ার মধ্যে। নাছোড়বান্দা রাহীর অনুরোধে বাবলুর সম্মতি। হাসপাতাল পাড়ার পক্ষে মাঠে নামবে বাবলু। শর্ত-সকাল ৯.০০ টার মধ্যে খেলা শেষ করতে হবে। ঘড়ির কাঁটা সাতটার দিকে এগুচ্ছে। প্রস্তুত বোলার। আম্পায়ারের নির্দেশ। শুরু হলো ব্যাট বলের লড়াই। দর্শক শূন্য স্টেডিয়াম। বন্ধুত্বের আবেদন ও বাবলুর প্রত্যয়ী মনোভাব। দুইয়ে মিলে বাবলুর অসাধারণ ব্যাটিং। জয় তো বটেই সেরা খেলোয়াড় হিসেবে মনোনীত হয়েছে বাবলু। প্রচন্ড উল্লসিত রাহী। সঙ্গে পুরো দল। কিন্তু বাবলুর শরীরী ভাষায় জয়ের চিহ্ন অনুপস্থিত। বৃষ্টির কারণে এক ঘন্টার অপ্রত্যাশিত বিরতি। তাই প্রচন্ড উত্তেজনা তার। দ্রুত বিদায় নিতে প্রস্তুত বাবলু। “যাবি তো,কিন্তু পুরস্কারটা অন্তত নিয়ে যা।” কষ্ট ও উত্তেজনা মিশ্রিত কন্ঠে রাহীর সনির্বন্ধ অনুরোধ। “কাল মাঠে নিয়ে আসিস” -আলিঙ্গন সেরে দ্রুত বিদায় বাবলুর।
০৪
বাড়ীর দিকে ছুটলো রাহীও। দ্রুত পৌঁছে স্কুলের পথে এগুতে হবে। বাবলুর দ্রুত বিদায়ে আনন্দের অনুরণনে ফাটল ধরেছে। তবুও তৃপ্ত সে। কালকে তো আবার দেখা হচ্ছে। চাকুরীজীবী বাবামায়ের একমাত্র সন্তান রাহী। অর্থনৈতিক সংকট নেই। তবুও জীবনযাপনে স্বাভাবিকতা। জিলা স্কুলের সেকেন্ড বয়। কিন্তু অহংকারের লেশমাত্র নেই। বৃহস্পতির মতো আচরণের আলো ছড়িয়ে সবার প্রিয় সে। “মা,কাল সকালে টাকি মাছের ভর্তা আর ডালের বড়া কর তো,খুব খেতে ইচ্ছে করছে।” বাসায় এসেই মায়ের নিকট আকুতি। “শোন ,একটু বেশী করে করবে কিন্তু । আমার এক বন্ধুও খাবে।”
কোন বন্ধু আবার সাত সকালে খেতে আসবে? হাস্যোজ্জ্বল মুখে রাহীর মা ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে থাকে।
ঠিক বন্ধু না খেলার সাথী।
কোন স্কুলে পড়ে?
কোনো স্কুলে পড়ে না। দোকানে থাকে।
স্কুলে পড়ে না মানে, কি সব যাতা বকছিস।
স্কুলে পড়ত, এখন পড়ে না। বাকিটা পরে বলব। তুমি আগে বলো রান্না করবে কিনা?
আচ্ছা তা না হয় করলাম,কিন্তু তোর আবার হঠাৎ ডালের বড়া আর টাকি মাছের ভর্তা খাওয়ার ইচ্ছে হল কেন রে ?
এত কিছু জানি না,মা। তুমি করবে কিনা, আগে তাই বলো?
পাগল ছেলে আমার, করব না কেন। যা খেয়ে স্কুলের জন্য তৈরি হয়ে নে।
মায়ের আশ্বাসে প্রশান্তি ছুঁয়ে গেল রাহীকে। ঠোঁটের কোনায় ঈষৎ হাসির রেখা ফুটে উঠল। হৃদয় সরোবরে তৃপ্তির ঢেউ ছড়িয়ে রওয়ানা হলো স্কুলের দিকে।
০৫
দুরন্ত গতিতে ছুটছে বাবলু। পকেটমানি পেয়েছে। মোড়ে এসেই রিকসায় উঠে পড়লো। রিকসার গতি ও মনের গতির মধ্যে বিস্তর ফারাক। রিকসা থেকে নেমে দৌড়াতে উদ্যত হল। ইতোমধ্যে ১০টা পেরিয়ে গেছে। মহাজনের রুদ্রমূর্তির কথা ভেবে ক্রমেই অস্থির হয়ে উঠছে বাবলু। প্রকৃতির প্রতি প্রচন্ড রুষ্ট সে। চাকুরিটা কি চলে যাবে? নাকি বিপদের মাত্রাটা আরও ভয়ংকর হবে? হাজারো ভাবনার জাল ছড়িয়ে পড়ল মস্তিস্কের প্রতিটি কোণে। স্রষ্টাকে বারংবার স্মরণ। দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল। কিন্তু ভাবনার কোনো সমীকরণই বাস্তবে মিলল না। “যাক বাবা,এবারের মত রক্ষা হলো,আর কখনই এমন কাজ করা যাবে না” দোকানে কেনাবেচার মাঝেই বাবলুর নীরব ভাবনা। মনে মনে প্রচন্ড স্বস্তি অনুভব করলো সে।

পুনরায় কাজে মনোযোগী হয়ে উঠল বাবলু। রাত এগারটা পেরিয়ে গেছে। দোকান প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। তবু ক্রেতাদের উপচে পড়া ভীড়। এই মুহুর্তে বলিষ্ঠ কন্ঠে পুরাতন কর্মী আবদুল্লাহর নির্দেশ “বাবলু, দ্রুত তিন কাপ চা নিয়ে আয় তো।” চা আনার সুবাদে উদাত্ত পৃথিবীকে দেখার সুযোগ পেয়ে ছুটে গেল বাবলু। নিজে এক কাপ চা খেয়ে রওয়ানা হলো দোকানের দিকে। “ম্যানেজার স্যার তোকে ডাকছে বাবলু।”দোকান হতে ফিরে এসেই কর্মী আবদুল্লাহর বার্তা পেল বাবলু। অপ্রত্যাশিত আহবানে শংকিত উদ্দীপ্ত বাবলু। ৩৬ টি সিঁড়ি পেরিয়ে ম্যানেজারের দরজায় দাঁড়িয়ে বাবলু। সঙ্গে উত্তেজনার বারুদ। ম্যানেজারের হাতের ইশারায় গুটি গুটি পায়ে বাবলুর নি:শব্দ অনুপ্রবেশ।
স্যার,আমাকে ডেকেছেন? কাঁপা কন্ঠে বাবলুর অসহায় উচ্চারণ।
হ্যাঁ,বাবলু,মনোযোগ দিয়ে শোন- “তোমার সাতদিনের বেতন কাটা হয়েছে। কাল থেকে খেলা বন্ধ। ব্যত্যয় ঘটলে বিনা নোটিশে চাকুরি বাতিল। কথাটা মনে থাকে যেন।”





আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন
  • মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
    মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্ গল্পটা ভাল, উপস্থাপনাও চমৎকার ! তবে শাস্তিটা খুব কষ্টের হলেও বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক নয় । তাই সব মিলিয়ে সুন্দর !
    প্রত্যুত্তর . ১১ মে, ২০১৫
  • এমএআর শায়েল
    এমএআর শায়েল ছোট গল্প বলে এত ছোট। সবার কমেন্ট দেখলাম। সত্যি একটি উত্তেজনাকর গল্প। আশা করি আগামীতেও এরকম গল্প আরো পাবো। আমার পাতায় আপনাকে আমন্ত্রন জানাচ্ছি।
    প্রত্যুত্তর . ১৫ মে, ২০১৫
  • নাসরিন চৌধুরী
    নাসরিন চৌধুরী ভাল লিখেছেন কিন্তু প্রথম দিকটা বর্ননার আধিক্য ছিল। কিছু বানান ছুটেছে। সব মিলিয়ে ভাল। শুভকামনা জানবেন
    প্রত্যুত্তর . ২১ মে, ২০১৫