বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭
গল্প/কবিতা: ৩টি

সমন্বিত স্কোর

৫.৬৭

বিচারক স্কোরঃ ৩.২৭ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.৪ / ৩.০

গল্প - প্রেম (ফেব্রুয়ারী ২০১৭)

মোট ভোট ১২ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৫.৬৭ রাগে অনুরাগে

সুস্মিতা সরকার মৈত্র
comment ২০  favorite ২  import_contacts ৮০৬

আজ পার্থ আর জিনিয়ার বিয়ের দশ বছর পূর্ণ হল। রাত বারোটা। সাড়ে চার বছরের সোহম ঘুমিয়ে কাদা। একটু ঝুঁকে টেবিলের নিচ থেকে দশটা লাল আর একটা সাদা গোলাপ বের করে জিনিয়ার হাতে দিয়ে পার্থ জিজ্ঞেস করলো, “মনে পড়ে?” লাজুক হেসে আলতো করে ঠোঁট কামড়ে জিনিয়া শুধু ঘাড় নাড়ল। জিনিয়ার এই চোখ নিচু করে আলতো করে ঠোঁট কামড়ে ঘাড় নাড়ানোর মধ্যে যে কি আছে! পার্থর হৃৎপিণ্ড যেন হঠাৎ থেমে গিয়ে পড়িমরি করে চলতে শুরু করে। যতবার দেখে, পার্থ একটু থমকে যায়। আর তারপরই মনে হয় জিনিয়ার ওই ছোট্ট মুখটা দুহাতের পাতায় নিয়ে দুই চোখে চুমু খায়। আজও তার ব্যাতিক্রম হল না। সোহম তো ঘুমিয়ে পড়েছে, তাই মনে হতেই পার্থ দুহাত বাড়িয়ে দিল।


স্কুলের পাট শেষ করে পার্থ সুযোগ পেল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসে সব কিছুই ওর দারুন অবাক করা মনে হয়। ফর্সা মেয়েরা কেমন নির্লোম পা দেখিয়ে ছোট প্যান্ট পরে। সারাদিনের শেষেও কেমন ওদের গা দিয়ে মিষ্টি গন্ধ ছড়ায়। ছেলেরা কেমন কথায় কথায় মেয়ে বন্ধুদের খাওয়ায়। মেয়েরা কেমন নির্দ্বিধায় সিগারেট টানে। সবকিছুই নতুন। গ্রাম থেকে এসে, সেই জড়তা কাটিয়ে নতুন বন্ধু করাও যেন বিশাল একটা কাজ। ধীরে ধীরে নতুন ইউনিভার্সিটি চেনা হল। নতুন ছাত্রাবাসও নিজের হয়ে উঠল। আর আরও একটা নতুন জিনিস কখন যেন আপন হল। সেই নতুন জিনিসটি হল ভালোলাগা। একজনকে ভালোলাগা। একটি মেয়েকে ভালোলাগা। একটি দিদিকে ভালোলাগা।
সেদিন ক্লাসে পাশাপাশি বসে ফিসফিস করে গল্প হচ্ছিল। “কি সর্বনাশ! জিনিয়াদিকে ভালোলাগে তোর?” পার্থর নতুন প্রাণের বন্ধু সম্রাট ফিসফিস করে সাবধানবানী উচ্চারণ করল, “দিদিদের কাউকে ভালোলাগে বললে তোকে মেরেই ফেলবে কিন্তু দাদারা”। কথাটা ভুল বলে নি সম্রাট। ফার্স্ট ইয়ারের র্যা গিং এর মাত্রা কমেছে মাত্র, শেষ হয় নি এখনও। কাজেই কিছু বলা যাবে না কাউকেই। “তাহলে আমার এই ভালোলাগা না হয় শুধু আমারি থাক। কিন্তু...কিন্তু যদি দেরি হয়ে যায়?” “কিসের দেরি?” “আরে, তুই কি চোখে দেখিস না নাকি? সুব্রতদা কেমন প্রেম প্রেম চোখে তাকিয়ে থাকে জিনিয়াদির দিকে, দেখতে পাস না?” “কি জানি বাবা, আমি তো আর সারাদিন জিনিয়াদির দিকে তাকিয়ে বসে থাকি না!” সম্রাটের মিটিমিটি হাসি দেখে ওর গা জ্বলে যায়। “কেন, আমি কি সারাদিন জিনিয়াদির দিকে তাকিয়ে বসে থাকি?” “থাকিস না বুঝি?” সম্রাট আবার একটু হাসল শুধু।


সেই শুরু। থিওরি আর প্র্যাক্টিকাল ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে পার্থর সারাদিন কাটে ওর থেকে এক ক্লাস বড় জিনিয়া রাহার দিকেই তাকিয়ে। কেমন যেন নেশার মত। শুধু দেখেই যায়, জিনিয়ার সাথে কথা বলার কোন চেষ্টাই করে না পার্থ। দেখতে দেখতে বছর ঘুরল। এখন আর ফার্স্ট ইয়ার নয় পার্থ। একটু নিজেকে সিনিয়র সিনিয়র মনে হয় ওর এখনকার ফার্স্ট ইয়ারের ছেলেমেয়েগুলোকে দেখলে। তবু কি সাহস হল পার্থর জিনিয়ার সাথে কথা বলার? নাহ। জিনিয়ার মুখোমুখি হলে পার্থর কথা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এখন বরং কি করে যেন ওদের একটা শত্রুতা বা বলা ভাল বিরূপতা তৈরি হয়েছে।
পার্থ ইচ্ছে করে এই বিরূপতা তৈরি করে নি। দোষের মধ্যে দোষ, একদিন ক্যান্টিনে খেয়াল না করেই বলে ফেলেছে “সম্রাট, ওই মেয়েটাকে কি সেক্সি লাগছে দেখ। একদম মাখন।” বলেই খেয়াল হয়েছে আশেপাশে বড় দাদা দিদিরা কেউ থাকতে পারে। কপালটাই খারাপ। জিনিয়ার কানেই গেল কথাটা। ব্যাস, পার্থকে সেই থেকে মাঝে মাঝেই শুনতে হয়, “একদম মাখন।” শুধু কি তাই? পার্থর নামই হয়ে গিয়েছে মাখন। ডিপার্টমেন্টের সবাই ওকে এখন মাখন নামেই ডাকে। নামটা শুনলে রাগ হলেও পার্থ ভাবে জিনিয়া কি একটু হলেও ওকে গুরুত্ব দিয়েছে? নাহলে অন্য মেয়েকে দেখেছে বলে জিনিয়ার এত রাগ কেন হবে? অন্য মেয়ে দেখলে যদি খারাপ লাগে তাহলে জিনিয়ার নিশ্চয়ই ওকে একটু হলেও ভালো লাগে! নিজেকে এইসব যুক্তি দিয়ে পার্থ দেখেছে এখন কেউ মাখন বলে ডাকলে আর অত রাগ হয় না, বরং একটু যেন ভালোইলাগে।
পার্থর কপাল যে একদম খারাপ তা হয়ত নয়। নাহলে সুব্রতদা হঠাৎ পালটি খেল কি করে? এখন ডিপার্টমেন্টে বা ক্যান্টিনে সুব্রতদা আর প্রিয়াদি সবসময় একসাথে। ইউনিভার্সিটির মাঠে ওদের বেশ ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতেই দেখা যায়। কিম্বা লাইব্রেরীতে গেলেও দেখা যায় দুজনে একসাথে পাশাপাশি বসে। পাশে বইয়ের পাহাড় আর ওরা মশগুল হয়ে গল্প করছে। ওদের জোড়ায় দেখে পার্থর থেকে বেশি খুশি মনে হয় আর কেউ হয় না। যতবার দেখে ততবার মনে হয়, “ভাগ্যিস!” কিন্তু ওর নিজের কপালটা যে আরেকটু ভাল কি করে হবে সেটা বুঝতে পারছে না কিছুতেই। জিনিয়াদির সাথে এই বিরূপতার সম্পর্ক যে কবে ভাল হবে কি জানে।


পার্থর দিনগুলো এখন জিনিয়াময়। জিনিয়াদিকে রোজ এমন করে দেখে যে তাকানোর ভঙ্গি থেকে শুরু করে অনেক কিছুই মুখস্ত করে ফেলেছে। কেমন করে কপালের উপর এসে পরা অবাধ্য কোঁকড়া চুলের গুছি তর্জনী দিয়ে সরিয়ে দেয়। কেমন করে কথা বলার সময় হাত নাড়ায়। কেমন করে ওড়নাটা একটু সরে গেলে আবার গুছিয়ে কাঁধে তুলে দেয়। কেমন করে পিছন থেকে কেউ ডাকলে ঘুরে তাকায়। কথা বলার সময় ঐ চোখদুটো কেমন কৌতুকে ঝিকঝিক করে। কেমন করে কোন কিছুতে সম্মতি জানানোর সময় ঠোঁট কামড়ে মাথা হেলায়। কেমন করে মাঝে মাঝে মন কেমন করা ভঙ্গিতে চোখ নিচু করে কি যেন ভাবে। পার্থর শয়নে স্বপনে এখন জিনিয়া। জিনিয়াকে ওর দেখতে ভালোলাগে, কিন্তু ভাবতে ভালো লাগে আরও বেশি।
বছরগুলো নিজের গতিতে ঘুরে যায়। পার্থ এখন জিনিয়ার সাথে একটু আধটু কথা বললেও ওদের বন্ধুত্ব আর হল না। প্রতিবছর নবীনবরণের দিন জিনিয়াকে দেখে আরেকবার নতুন করে ভালোলাগে পার্থর। শাড়ি পরে, হালকা গয়না, একটা ছোট টিপ, আর হালকা লিপস্টিক। তাতেই পার্থ কাত। অবশ্য ভালোলাগা এখন আর শুধু ভালোলাগা নেই। কবে থেকে যে জিনিয়াকে ভালোবেসে ফেলেছে সেটা বুঝতে পারে না পার্থ। শুধু বোঝে ঐ মুখ না দেখলে ওর দিন কাটে না। তিন বছর পার হয়ে মাষ্টার ডিগ্রী শুরু হয়ে গেল। শেষ বছর নবীনবরণের দিন জিনিয়াকে দেখে পার্থ তো একেবারে হাঁ! আগুন রঙের মুর্শিদাবাদী সিল্ক, রক্ত লাল প্রবালের জাঙ্ক জুয়েলারি, আর খুনখারাবী লাল লিপস্টিক। সেদিন জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে পার্থর আশ যেন মিটছিল না। এত সুন্দর আগে কোনদিন লাগেনি জিনিয়াকে। সম্রাট অনেকবার ঠেলাঠেলি করল, কিন্তু দূর থেকে শুধু দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলো না ও।


পার্থর মাস্টার্সের শেষ বছর হঠাৎ একদিন শোনা গেল জিনিয়া চাকরি নিয়ে দিল্লি চলে গিয়েছে। যে মুখ না দেখলে দিন কাটত না, সেই মুখের বিহনে অনেক কষ্ট পেলেও পার্থ নিজেকে বোঝাল জিনিয়া হয়তো পার্থকে একটুও ভালোবাসে নি, নাহলে এরকম না বলে চলে গেল কি করে? মাষ্টার ডিগ্রী শেষ করে পার্থ আর সময় নষ্ট না করে ঢুকে পড়লো গবেষণায়।
প্রথমবছর তো কেটে গেল গবেষণা কি করে করতে হয় সেই গবেষণাতেই। আর কাহানি মে টুইস্ট তখনি। জিনিয়া ফিরে এলো আর জয়েন করল পার্থর সাথে একই ল্যাবে। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। পার্থর কদিন কেটে গেল হাওয়ায় ভেসে। কিন্তু, ওদের বন্ধুত্ব কি হল? নাহ, জিনিয়াকে পার্থ এখনও চক্ষে হারায়, আর জিনিয়া আজও মনে করে পার্থ সেই গ্রামের হ্যাংলা ছেলেটাই আছে, যে মাখনের মত ফর্সা, মসৃণ মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকে। জিনিয়ার একটু ছোঁয়ার জন্য পার্থ মরে যায়, কিন্তু সেটাই জিনিয়ার কাছে অপমান।

সম্রাটের গালাগালি খেয়েও পার্থ কিছুই বলতে পারে না জিনিয়াকে। “এবার গিফট হাতে বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে যাবি নাকি?” “মনে হচ্ছে তাই করতে হবে। বলতে আর পারছি কই? যতবার ভাবি বলব, ঢোঁক গিলে অন্য কথা বলি।” গবেষণার তিন তিনটে বছর এই রকমই টক ঝাল করে কেটে গেল। এই বছর দিল্লি যাওয়ার কথা কনফারেন্সে। কিন্তু তাতেই বা কি? ল্যাবের সবার সঙ্গে যাওয়া, সবার সঙ্গে সময় কাটানো, আর সবার সঙ্গেই ফেরা। সম্রাট হুমকি দিল, এবার না বলতে পারলে ওই ফাঁস করে দেবে সবকিছু।


এবার একসাথে ট্রেনে অনেকটা সময় পাবে ভেবে পার্থ খুব খুশি। ভাবল এবার একটা এস্পার নয় ওস্পার করে বলতেই হবে। কিন্তু যেমন হয়, ওর কপালটাই খারাপ। বিভিন্ন কারণে পার্থর যাওয়া একদিন পিছিয়ে গেল। যাহ্‌, একসাথে ট্রেন যাত্রাটাও মার গেল। মন খারাপ করে একা ল্যাবে বসে প্রেজেন্টেশন তৈরির দিকে মন দিল পার্থ। কাল সকালে লাইন দিয়ে পরের দিনের ট্রেনের টিকিটটা কাটতে হবে। হঠাৎ শুনল জিনিয়া পিছন থেকে বলছে “তোর সাথে আমার টিকিটটাও কাটিস, আমাকেও পরের দিন যেতে হবে।” জিনিয়া কারণটা বলছিল, কেন ওকে পরের দিন যেতে হবে, কিন্তু পার্থ আর কোন কথাই যেন শুনতে পাচ্ছিল না। ও ভাবছিল “শুধু আমি আর জিনিয়াদি, প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা একসাথে। নাহ, তাহলে কপালটা নেহাত খারাপ নয়।”
জিনিয়ার গলা কানে এল পার্থর, “স্যার একদম যাতা। পেপার রিভিউয়ারের কমেন্ট এল তো বলেন আগে পেপারের রেফারি কমেন্ট অ্যাড্রেস করে পাঠিয়ে পরের দিন কনফারেন্সে এস। কোন মানে হয়। ভাগ্যিস তুই ছিলিস, নাহলে একা এতটা রাস্তা যাওয়া কি বোরিং বলতো!” পার্থর মনে হল জিনিয়া যেন ওর কানে মধু ঢেলে দিল। একা যেতে বোর লাগবে কিন্তু পার্থ থাকলে লাগবে না! জিনিয়া আর কি কি সব বলে চলে, কিন্তু পার্থর কানে আর কিছু ঢোকে না। ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ে বেড়ায় ওর মন জুড়ে। চোখ কম্পিউটারে থাকলেও ওর হাত অবশ। কি বলতে আবার কি বলে ফেলবে এই ভয়ে টুক করে উঠে পড়ে। জিনিয়া বলে “আরে যাচ্ছিস কোথায়? টাকা পয়সা নিয়ে যা, কাল তৎকাল কাটতে হবে তো”। পার্থ শুধু কোনোরকমে বলতে পারলো যে ও চা খেতে যাচ্ছে। বেড়িয়ে গিয়েও আবার ফিরল পার্থ, “তুমি চা খেতে যাবে?” ওকে অবাক করে দিয়ে জিনিয়া একবাক্যে রাজি! পার্থর কি আজ কপাল খুলল?


নীচে ক্যান্টিনে গিয়ে জিনিয়া বসল ঠিক কৃষ্ণচূড়া গাছটার নীচে, বেদিতে। পার্থ জিজ্ঞেস করল, “চা ছাড়া আর কিছু?” জিনিয়া নির্দ্বিধায় বলে “চিকেন পকোড়া।” সেদিন ক্যান্টিন খালি ছিল। জিনিয়া আর পার্থ কোন চেনা মুখ দেখতে পেল না। চা আর চিকেন পকোড়া খেতে খেতে জিনিয়া হঠাৎ বলে উঠল, “আকাশটা কি সুন্দর লাগছে দেখ। কি ঝকঝকে”। কিন্তু পার্থ আকাশ নয়, আকাশের মত জিনিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিল। জিনিয়া খেয়াল না করে বলে চলে, “আরে ওদিক দিয়ে দেখলে অতটা বোঝা যাবে না। এদিক থেকে পাতার ফাঁক দিয়ে দেখ, পাতাগুলো যেমন ঝকঝকে, তেমন আকাশটাও”।
পার্থর বুকের মধ্যে তখন ঘোড়া ছুটছে। ওর কথার উত্তরে কি বলবে বুঝতে না পেরে বোকার মত দুম করে বলে উঠল “চিকেন পকোড়া ভালো লেগেছে?” যেন এই চিকেন পকোড়া ভাল হওয়ার উপর নির্ভর করছে আকাশ বা কৃষ্ণচূড়া পাতার সৌন্দর্য। জিনিয়ার মুড বদলে গেছিল নিমেষে। “কেন, তুই বানিয়েছিস নাকি! এত সুন্দর একটা দৃশ্য দেখাচ্ছি আর বলিস কিনা ‘চিকেন পকোড়া ভালো লেগেছে’?” ভেঙ্গিয়ে বলে উঠল জিনিয়া। “চাইলেই কি আর দেখানো যায়? দেখার চোখ থাকতে হবে তো!” রাগরাগ গলায় বলে ওঠে জিনিয়া। পার্থর তখন নিজের গালেই চড় মারতে ইচ্ছে করছিল।


যাওয়ার দিন ট্রেন ছাড়ার ঠিক আগে সম্রাট ফোন করল। “শোন, এবারও যদি না বলতে পারিস, তাহলে আমিই কিন্তু বলে দেব।” “এই রে, জিনিয়াদি তাতে আরও রেগে যাবে। তোকে বলতে হবে না, আমিই বলব।” সম্রাটকে এই কথা বলে ফোন তো রেখে দিল, কিন্তু জিনিয়ার দিকে তাকাতেও ভয় করছে পার্থর। ওর খালি মনে হচ্ছে “কি জানি, কি বলতে কি বলব, যদি আরও রেগে যায়? যদি রেগে গিয়ে আর কথাই না বলে?”
ট্রেন ছাড়ল। ধীরে ধীরে অন্য কথা শুরু হল। “অনেক দিন হল পড়াশোনা করছি, এবার চাকরি খুঁজতে হবে।” “হ্যাঁ, সত্যি তাই। পড়তে পড়তেই বুড়ো হয়ে গেলাম।” কথায় কথায় কখন যে নিজেদের কথা শুরু হল সেকথা কেউ জানে না। কখন যেন ওরা ওদের বাড়ির কথা, ওদের নিজস্ব স্বপ্নের কথা বলতে শুরু করল। বাড়ির সবার কত আশা পার্থর উপর সেকথা শুনে জিনিয়া পুট করে বলে উঠল “শুধু কি বাড়ির লোকের আশা তোর উপর, নাকি আর কেউ অপেক্ষা করে আছে তোর সাফল্য দেখার জন্য”?
ইশ, এই সময় কারোর জল তেষ্টা পায় নাকি? পার্থর পেল। ঢকঢক করে জল খেল আর মনে মনে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল কি বলবে। বেশ রোম্যান্টিক কিছু বলতে হবে, যাতে জিনিয়া রাগ না করে। জল খেয়ে বোতলটা পাশে রেখে তাকিয়ে দেখে জিনিয়াদি দূরে তাকিয়ে আছে। যতদূর চোখ যায় সবুজ খেত দ্রুত সরে সরে যাচ্ছে। দূরে সূর্য পাটে বসেছে। কনে দেখা আলোতে জিনিয়াকে অসম্ভব মায়াময় লাগছে। একটা হাত গালে আর একটা হাত কোলের উপর অলস ভাবে ফেলে রাখা।
মাথাটা ঠিক কাজ করছিল না। নাহলে এত সাহস তো ছিল না কোনদিন পার্থর। একটু ঝুঁকে বসল। তারপর ডান হাতের তর্জনীটা সবার চোখের আড়ালে জিনিয়ার কোলে রাখা হাতে ছোঁয়াল। ভুলেই গেল কি কি রোম্যান্টিক ডায়লগ ভেবেছিল। ফিসফিস করে বলে উঠল, “আর কে অপেক্ষা করছে তা তো জানি না, কিন্তু আমি যে সেই কবে থেকেই অপেক্ষা করছি জিনিয়াদি।”


সেবার ট্রেনের চব্বিশ ঘণ্টা যে কি করে কেটেছিল গেল সে এক ইতিহাস। ওদের পরস্পরের সাথে এত কথা বলার ছিল ওরা নিজেরাও জানত না। অবশেষে সন্ধ্যে বেলায় পার্থ বলল কথাটা। যে কথাটা শোনার জন্য জিনিয়া না জানি আজ কত দিন অপেক্ষা করে আছে। সারারাত কেউ ঘুমাল না। ধীরে ধীরে এক অন্য পার্থকে জানলো জিনিয়া। এই পার্থ কবিতা পড়ে। এই পার্থ গজল শুনতে পাগল। এই পার্থ সুন্দর করে জিনিয়াকে ছুঁতে জানে। আর এই পার্থ জানে কথা দিতে।
দিল্লিতে পার্থ আর জিনিয়া যখন ট্রেন থেকে নামলো তখন পৃথিবীটা অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠেছে ওদের কাছে। পার্থ আর জিনিয়ার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছে। স্টেশন থেকে বেড়িয়েই একটা ফুলের দোকান। পার্থ একটাই মাত্র সাদা গোলাপ কিনলো। আর ফিসফিস করে সবার কান বাঁচিয়ে জিনিয়াকে বলল “আমার সব থেকে পুরনো নতুন বন্ধুকে”। গোলাপটা নিয়ে জিনিয়াদি চোখ নিচু করে ঠোঁট কামড়ে হাসল, আর পার্থর মনে হল... কিন্তু সবাই দেখছে যে!

১০
জিনিয়াদি এরপর জিনিয়া হল। আর পার্থ তুই থেকে তুমি। পিএইচডি শেষ করে দুজনেই এখন কর্মরত। জিনিয়ার বাড়িতে একটা ছোটখাটো যুদ্ধ করতে হয়েছিল বাবা মাকে বিয়েতে রাজি করাতে। আর পার্থর বাড়িতে সবাই এমন দুহাত বাড়িয়ে জিনিয়াকে গ্রহণ করেছিল যে ওর মনেই হয় নি শ্বশুরবাড়ি এসেছে।
জিনিয়াকে পার্থ প্রতি বছর লাল গোলাপ দেয় বিয়ের বছর গুনে, কিন্তু সাদা গোলাপ একটাই। আর জিজ্ঞেস করে “মনে পড়ে?”
আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন