বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই অথবা উপেক্ষণীয় সম্পাদনা সহকারে প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।

লেখকের তথ্য

Photo
জন্মদিন: ২২ ডিসেম্বর ১৯৯০
গল্প/কবিতা: ৭টি

সমন্বিত স্কোর

৪.৩২

বিচারক স্কোরঃ ২.২২ / ৭.০
পাঠক স্কোরঃ ২.১ / ৩.০

অনুভূতির গভীরে

গভীরতা সেপ্টেম্বর ২০১৫

কাঁচের ব্যথা

ব্যথা জানুয়ারী ২০১৫

ভরকেন্দ্র

বিজয় ডিসেম্বর ২০১৪

গল্প - ভৌতিক (সেপ্টেম্বর ২০১৭)

মোট ভোট ২৮ প্রাপ্ত পয়েন্ট ৪.৩২ দ্বৈত স্পন্দন

সজল চৌধুরী
comment ৮  favorite ০  import_contacts ১৭৮
ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘশ্বাসের মতো শীতল বাতাস ছেড়ে কাজ করে যাচ্ছে ডাক্তার আজাদ ইশতিয়াকের চেম্বারের এসিটা। এক কোণে ভাঁজওয়ালা সবুজ পর্দায় ঘেরানো উঁচু বেড, তাতে মুক্তোর মতো ধবধবে সাদা চাদর বিছানো। বেডের ঠিক পায়ের দিকে একটা শোকেসে কোম্পানির দেওয়া উপটৌকন আর ডাক্তারী সাফল্যের ঝকঝকে ক্রিস্টালের পুরস্কারনামা। বেডের বাম পাশেই ডাক্তারের টেবিল। টেবিলের কাঁচের নিচে ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টিভদের অজস্র কার্ড। টেবিলের ডানদিক ঠেকে গেছে দেয়ালে। আরেকদিকে রোগীর জন্য কালো চামড়ার চেয়ার পাতা। আর দরজার দিকে রোগীর সাথে আসা লোকদের জন্য দুটো চেয়ার, টেবিলের অন্যপাশে ডাক্তারের আরাম কেদারা। পিঠ এলিয়ে দিলে ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ করে হেলে পড়ে পিছন দিকে।
বেডের ওপরেই বুক টান টান করে বসেছিল হালকা-পাতলা গড়নের রোগী। গালভাঙ্গা লম্বাটে মুখে কেমন বোকা বোকা ভাব। হাফ হাতা ময়লা সাদা নীল লম্বা স্ট্রাইপড শার্ট পরে আছে। হালকা নীল-গাঢ় নীল চেক লুঙ্গিটা ভাঁজে ভাঁজে কুঁচকে গেছে।
ডাক্তার গভীর মনোযোগের সাথে স্টেথোস্কোপের ডায়াফ্রাম বাম থেকে ডানে নিয়ে যাচ্ছেন। পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের ভাঁজ পড়া চিন্তিত কপাল যেন অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য বহন করছে। রোগীও গভীর প্রশ্বাস নিয়ে আর সুদীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ডাক্তারকে করছে সহায়তা। ডানদিকে ডায়াফ্রেমটা রইলো একটু বেশিক্ষণ। তারপর ভ্রু জোড়াকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে প্রচণ্ড অবিশ্বাস নিয়ে রোগীর দিকে তাকিয়ে দুপা পিছিয়ে এলেন ডাক্তার। রোগী এবার শ্বাস ছেড়ে থুতনির বেমানান ছাগল দাড়িটাকে নাড়িয়ে গ্রাম্য টানে জিহ্বা নাড়ালো,
“ডাক্তোর সাব, সমুস্যাটা কী? এমুন করতাছেন ক্যান?”
স্টেথোস্কোপের ডায়াফ্রাম ফসকে গেছে তখনই। গোলগাল মুখে আতঙ্ক নিয়ে পেছাতে পেছাতে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে ডাক্তারের। নিজের মাঝারি গড়নের দেহের বুকের বাম পাশে আলতো করে হাত দিলেন।
ঢিবঢিব।
ঢিবঢিব।
হৃৎস্পন্দন জানান দিচ্ছে হৃদপিণ্ডের কথা।
“কিন্তু লোকটার ডানপাশেও কী করে হৃৎস্পন্দন হচ্ছে?” মনে মনে বললেন ডাক্তার। এসির শীতল বাতাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কপাল বেয়ে সাপের মতো কিলবিল করে নেমে যাচ্ছে ঘাম।
ডাক্তার এবার আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলেন, “কী--মানে কে আপনি?”
হলুদ দাঁতের পাটি বের করে রোগী বলল, “ছার, আমি ছালেকুদ্দিন।”
“আপনার বুকের ভেতরে ডান পাশে ওটা কী?”
“ওহ! ওইটা? জানতে চান?” রহস্য কিলবিল করছে তার চোখেমুখে। যেন এর প্রতীক্ষাতেই ছিল সে এতক্ষণ।
“হ্যাঁ, বলেন...” আতঙ্কে ঢোক গিললেন তিনি।
“ওইটা আমার ইসতিরির (স্ত্রীর) রিদোয় (হৃদয়)।”
“মানে?”
“হেতি অন্য পুরুষের সাথে ইটিশপিটিশ করতো। তার রিদোয় অন্যজনরে দিতে চাইছিল। তাই হের রিদোয় আমি আমার কাছে রাইখ্যা দিছি।” সরল হাসি হেসে বলল ছালেকুদ্দিন।
“আপনার স্ত্রী এখন কোথায়? কীভাবে রাখলেন?” ডাক্তার যেন আশ্বস্ত হতে চাচ্ছেন।
“সে এখনও আমার সাথেই থাকে। কীভাবে রাখলাম, সেটা অনেক বড়ু কাহিনি। শুনবেন?”
ডাক্তার তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি সাবাড় করলেন। তারপর খানিকটা ধাতস্থ হয়ে বসলেন চেয়ারে। চেয়ারও একটা হালকা আর্তনাদ করে জানান দিল তার উপস্থিতি। দ্বিধান্বিত কণ্ঠে তিনি বললেন, “বলুন আপনার কাহিনি...”
ছালেকুদ্দিন বেড থেকে নেমে এসে ডাক্তারের সামনের চেয়ারে এসে বসলো। তারপর হারিয়ে গেল তার কাহিনিতে,
“বউটারে আমি অনেক ভালো বাসতাম। পরাণের পরাণ ছেলো। যখন দেখলাম সে আমারে ছাইড়া আরেকজনের লগে... নিজেকে আর সামলাইতে পারি নাই। ওর রিদোয় আমার, ওটা ক্যাবল আমার কাছেই থাকবে, ও সেটা আর কাউকে দিতে পারবে না।...”
ডাক্তার যখনই তার অপ্রাসঙ্গিক কথায় ক্রমেই বিরক্তভরা চোখে ঘড়ির দিকে তাকালেন তখনই সে মূল ঘটনায় চলে এলো।
“সেদিন ছেলো হাটবার। হাট শেষে বাড়িত ফিরতাছি। হাটের এক্কেরে এক কুনায় ওঝার বেশধারী এক লোককে দেখলাম। পায়ের সাথে পা গিট্টু বাইন্ধা, হাঁটুর ওপর দুই হাতের মুষ্ঠি রাইখা ঝিম মাইরা বইসা আছে। সামনে একখান টকটইকা লাল কাপড় বিছানো। কাপড়ের এক কুনায় আগুরবাতির ছাই পইরা আছে। আর পুরা কাপড়ে নানারকম ছাল-বাকল ছড়ানো।
ক্যান জানি খুব টান লাগলো দ্যাখতে। গিয়া শুধু খাড়াইছি, অমনি এক্কেরে কারেন্টের লাহান চোখ খুইলা উইঠা বইসা ধরলো আমার দুই হাতের কব্জি। তারপর বসায় দিয়া আগের মতো ঝিমাইতে লাগলো। ঝিমাইতে ঝিমাইতে কইলো, ‘বউকে অনেক পিরীত করিস, নারে?’
আমি কইলাম, ‘জি, বাবা। অনেক।’
‘যদি শোনোস তোর বউ অন্যের পুরুষের সাথে পিরীত করে, তাহলে কী করবি?’
‘কাইট্টা গাঙ্গে ভাসায় দিমু।’ রাগ্বত স্বরে বললাম।
‘তাহলে তুইও তো বাঁচতে পারবি না। জেলের ভাত খেতে খেতে ফাঁসিতে ঝুলবি।’
গাল চুলকাতে চুলকাতে বললাম, ‘হ, সেইটাও হাঁচা কতা। তয়, আমার বউ তো আমাকে অনেক পিরীত করে।’
‘যাহ, আগামী হাটবারে প্রমাণ পেয়ে আসিস। আমি থাকবো। এখন কিছু বললেও তুই বিশ্বাস করবি না। যাহ, তুই যাহ।’ বিদায়ের ভঙ্গিতে হাত নেড়ে আমাকে যেতে বললেন।
সেদিন চলে আইলাম অনেক চিন্তা লইয়া।”
“অনেক বলেছেন, এখন যান। অনেক রোগী অপেক্ষা করছে।” বেল বাজালে ভোজবাজীর মতো কম্পাউন্ডার দরজায় উঁকি দিলো। “ক’জন আছে বাহিরে?”
“কয়েকজন চলে গেছে স্যার। চার-পাঁচজন আছেন।”
‘চলে গেছে’--মানে? ঘড়ির দিকে তাকালেন। কী অদ্ভুত? বেশ সময় পেরিয়ে গেছে? “আচ্ছা, আরেকটু বসতে বলো বাকিদের।”
কম্পাউন্ডার মাথা চুলকে বলল, “জি, আচ্ছা।”
এবার ছালেকুদ্দিন তিন আঙুলে চিমটি দেখিয়ে বলল, “আর একটু কাহিনি আছে। শুনিয়াই চইলে যাব।”
নিতান্ত দায়সারাভাবে বললেন, “আচ্ছা, বলেন।”
“সেদিন থেকেই মনটা খচখচ করতেছিল। কোনো কাজে মন বসে না। বউয়ের হাসিটাও ক্যান জানি বিষের মতো লাগতে লাগলো।
হাটবারের আগের রাইতের কথা। গরমে ঘুম ভাঙ্গি গেলে দেখি বউ পাশে নাই। দরজার ছিটকিনি খোলা। কেমুন যেন একটা লাগলো। বাইরে এদিকওদিক তাকানির পর ফিসফিসানি শুনলাম। হাটের সেই ওঝার কথা মনে পইড়া গেল।
পা টিপে টিপে আওয়াজ ধইরা ধইরা পোয়ালের (খড়ের) গাদার কাছে গেলাম। আস্তে করে উঁকি দিয়া দেখি আমার বউ ওইপাড়ার কাশেমের সাতে বইস্যা হের গায়ে ঢইলা ঢইলা পইড়া রসের আলাপ পাড়তেছে।
আমার মাথা চক্কর দিয়া উঠলো। ঘরে আইসা কোনোমতে রাত পার কইরা হাটে গেলাম। কিন্তু সেই ওঝাবাবা তো নাই। সন্ধ্যা নামার পর পর দেখলাম সেইখানে বসা। কী তাজ্জব ব্যাপার। এতক্ষণ কই ছেলো?
তার সামনে দাঁড়াইতেই উনি মুচকি হেসে কইলো, ‘শোন, পাপের সাজা সবাইকেই ভোগ করতে হয়।’
দাঁতে দাঁত চেপে কইলাম, ‘হেরেও পাইতে হইবো। আপনি কিছু দেন বাবা।’
‘ধীরে। ধীরে। বস্‌। যা যা বলবো ঠিক তাই তাই করবি। একচুলও এদিকওদিক করবি না। তবেই ফল পাবি।’
‘বলেন বাবা, কী করতে হবে বলেন।’
‘জল শুকায় না এমন দীঘির জল নিবি এক ঘটি। সেই জলে সরিষার তেলে ভাজা শুকনা মরিচ চুবাবি। তাহলে ওই জল থেকে সব দেও-দানো চলে যাবে। তারপর ফুটাবি। তখন জলদেবী আর বায়ুদেব চলে যাবে। ঘটির জল হবে সব শুভ-অশুভ মুক্ত।
এরপর এই বোতল থেকে, তিনি একটা কালো তেলে আধভরা কাঁচের বোতল দেখাইলেন। এখান থেকে এক ফোঁটা তেল ওই জলে দিয়ে পূর্ণিমার রাতে ঘটিটা উঠানে রাখবি। তখন তিনি এই জলে স্থান করে নেবেন।’
‘তিনি কে বাবা?’
‘আহ! অত কিছু জানার দরকার নাই। তিনি শুভও না, অশুভও না। তিনি তিনিই। তিনি এলে জলের রং ঘোলা হয়ে যাবে। সেই জল তোর বউকে খাওয়াবি। তারপর বোতল থেকে আরো দুই ফোঁটা তেল মাখবি বৃদ্ধা, তর্জনী আর মধ্যমা আঙুলে। আঙুল তিনটা হাঁসের মুখের মতো করে তার বুকের দিকে তাক করবি। এরপর বাতাসে কোনোকিছুকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে আনার মতো করে নিজের বুকের দিকে টানবি। একটু পর টের পাবি তার হৃদপিণ্ড তোর বুকে।’
‘তাহলে তো বউ মরে যাইবো। সে মরলে আমি বাঁচমু কীভাবে?’
‘সে মরবে না। বেঁচে থাকবে, তোর গোলাম হয়ে। যতদিন তুই বাঁচবি, সেও বাঁচবে। তুই যা বলবি সে তাই করবে।’
তার হাত যুগল কপালে ঠেকিয়ে বললাম, ‘সবই আপনার কৃপা বাবা।’
বোতল নিয়ে চলে এলাম।” তারপর ছালেকুদ্দিন। একদম চুপ হয়ে গেল। যেন কী ভাবছে গভীরভাবে।
ডাক্তার অধৈর্য হয়ে বললেন, “শেষ করুন তাড়াতাড়ি।”
ইতোমধ্যে কম্পাউন্ডার বারতিনেক উঁকি দিয়ে গেছে।
“জি, আপনাকে দেখাইতেছি পরের কাহিনি।” তারপর দরজা খুলে মুখ বাহিরে বের করে হাঁক দিলো, “বউ, এদিক আইসো।”
বোরখা পরা একটা মেয়ে চেম্বারে ঢুকলো। চেহারা পুরোটাই ঢাকা, হাতে মোজা দেওয়া, তাই কিছুই দেখাই যাচ্ছে না। ডাক্তার কিছু বুঝে উঠতে পারলেন না।
ছালেকুদ্দিন তার বউকে বলল, “স্যারের পাশের চেয়ারে বসো।” তারপর ডাক্তারকে বলল, “স্যার দেখেন তো হের হের রিদোয় আছে কিনা?”
ডাক্তার অবিশ্বাসের সাথে ডায়াফ্রেমটা তার বউয়ের বুকে রাখলেন। আরেকবার রাখলেন। আবার রাখলেন।
অস্ফুট স্বরে বললেন, “কী আশ্চর্য! কোনো বিট নেই। রক্তপ্রবাহও নেই।”
হাতের পালস দেখলেন। শূন্য। শরীর উষ্ণ। কিন্তু কীভাবে? রক্তপ্রবাহ ছাড়া বেঁচে আছে কীভাবে?
তার ভাবনাকে ছিঁড়েফুঁড়ে দিলো ছালেকুদ্দিনের কণ্ঠস্বর।
আগের মতোই হলুদ দাঁতগুলো বের করে বলল, “এবার বিশ্বাস হইছে তো। নেন,” বলে পকেট থেকে একটা বোতল টেবিলের কাঁচের ওপর ঠক করে রেখে বলল, “রাখেন। আপনারও লাগবো।” বলেই ডাক্তারকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গটগট করে চেম্বার থেকে বের হয়ে গেল।
ডাক্তার আজাদ হা হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। পুরোই হতভম্ব অবস্থা। তার সামনে অলসভাবে পড়ে থাকা কালো তরলে ভরা শিশিটা যেন ব্যঙ্গ করছে তার পুরো ডাক্তার ক্যারিয়ারকে।
সেদিন আর চেম্বারে থাকলেন না। ফিরে এলেন ফ্ল্যাটে। পকেটে বোতলটা। মনে দ্বিধা। চোখে অস্থিরতা।
বেসিনের আয়নায় মুখ জলের ঝাঁপটা দিয়ে নিজের প্রতিবিম্বকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। মাথাভর্তি চুলের গোলগাল মুখে উজ্জ্বল আয়ত চোখ। খাড়া নাক, পুরু ভ্রু, হালকা কালো ঠোঁট। সবই ঠিক আছে। আবার কিছুই যেন ঠিক নেই।
সে রাতে তার ঘুম হলো না। এপাশ ওপাশ করে কাটিয়ে দিলেন। একবার পাশ ফিরে ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন। ফর্সা মুখে চোখ, নাক, মুখ সবই মানানসই। উজ্জ্বল প্রভা যেন ঠিকরে পড়ছে। বার বার ভাবছেন, এই উজ্জ্বলতার ভেতরে কী কোনো কদর্যতা আছে? নাকি এত দিনেও একটা সন্তান দিতে পেরে ব্যর্থতার গ্লানি লুকিয়ে আছে?
ভোরের দিকে গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন হবার পর উঠলেন বেশ বেলা করে। আজ হাসপাতালে তার একটা মেজর অপারেশন করাতে হবে। আজ বাড়িতে ফেরাও একরকম অনিশ্চিত। মিসেস আজাদ সেটা পরশুই জেনেছেন। তাই আজ সব ড্রেসিং টেবিলে আয়নার সামনে সাজিয়ে রেখে বেরিয়ে গেছে। বুয়া খাবার দিতে দিতে জানালো, পার্লার আর সুপার স্টোর ঘুরে আসতে আসতে বিকেল হয়ে যেতে পারে।
খেতে খেতেই ইন্টারকম বেজে উঠল। বুয়া রিসিভ করে আজাদসাহেবকে জানালেন, গ্রাম থেকে কোন এক লোক এসে দাড়োয়ানকে একটা ঘটি দিয়ে গেছে। কিছুক্ষণ বাদেই দারোয়ান ঘটিটা দিয়ে গেল। যাবার মনে করিয়ে দিয়ে গেল, আগামীকাল মিস্ত্রি এসে নষ্ট ডোর ভিউয়ারটা ঠিক করে দিয়ে যাবে।
কাঁসার ঘটি। মুখটা পলিথিনে শক্ত করে বাঁধা। তিনি বুঝলেন এটা কার কাজ। তার পক্ষে যে শর্ত মোতাবেক কখনও শুকায় না এমন দীঘির জল জোগাড় করা সহজ হবে না সেটা ছালেকুদ্দিন জানে। ঘটিটা হাতে নিয়ে বেডরুমে এসে বিছানায় বসলেন। সবকিছু কেমন যেন দুলছে। অবিশ্বাস ঘিরে ধরছে তাকে।
হাত বাড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলে ঘটিটা রেখে পোশাক পাল্টাতে শুরু করলেন। হাসপাতালে যেতেই হবে। টাই বাঁধার পর মনে হলো মনটা সুস্থির নেই। তাও বেরিয়ে পড়লেন। হাসপাতালে গিয়ে তার দায়িত্বটা অফিসিয়ালি অন্য আরেকজনকে দিয়ে বাড়িতে যখন রওনা দিলেন তখন সূর্যের আলো নিভে গেছে। ল্যামপোস্টের আলোকে ছাপিয়ে উঁকি দিচ্ছে পূর্ণ চন্দ্র।
জ্যাম পেরিয়ে দরজায় কলিংবেল চাপার অবস্থায় আসতে আসতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। বেল চাপার আগে আগে তার মনে কিছু একটা উঁকি দিল। বেল না চেপে কান পাতলেন। নাহ, কিছু শুনতে পেলেন না। নিজেকে বারকয়েক শুধালেন। তাকে কেউ সাইকোলজিক্যালি ট্রিক করছে, আর তিনি সেটাকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন।
এক নাগাড়ে কয়েকবার বেল চাপতেই খট করে লক খুলে দরজাটা একটু খুলতেই মিসেস আজাদকে দেখা গেল। খানিকটা বিস্ময় আর আঁটকে যাওয়া গলায় বললেন, “কী ব্যাপার? তোমার না আজ ওটি ছিল?”
আজাদসাহেব বাহিরে দাঁড়িয়ে বিস্তারিত বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না, তাই ঢুকতে গেলে, তার স্ত্রী হালকা বাধা দিতে চাইলো। একটু জোর খাটিয়ে ঢুকতেই বেডরুমটা চোখে পড়লো। দরজাটা খোলা। বিছানায় একজন শুয়ে আছে, সম্পূর্ণ খালি গায়ে।
তিনি এগিয়ে যেতেই ভিতরের লোকটা অবাক হয়ে উঠে দাঁড়ালো। সে যে সম্পূর্ণ নগ্ন সে খেয়ালই তার নেই। পিছনে মিসেস আজাদের কথাগুলো আজাদ সাহেবের কানেই ঢুকছিল না। তিনি একবার ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা ঘটিটা দেখলেন, আরেকবার ডাইনিং টেবিলে রাখা ফলের বাটিতে রাখা ছুরি।
মিসেস আজাদ বিছানার একপাশে মুখ চেপে চেপে কাঁদছেন। বিছানার মাঝখানে লোকটা পড়ে আছে, বুকে ছোরাটা আমূল বিদ্ধ। ড্রেসিং টেবিলে আজাদসাহেব বসে আছেন। নিজের হাতদুটো দেখছেন। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে তিনি নিজেকেই নিজে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
তিনি ভাবছেন, “ওকে নাহয় ডিভোর্স দিলে ল্যাটা চুকে যাবে, কিন্তু লাশটার কী হবে? ফাঁসিতে তো ঝুলতে হবে। কী করা যায়? একটাই পথ ওর মুখটাও বন্ধ করতে হবে।”
কিন্তু লাশটাকে দেখে একই কাজ পুনরায় করার মতো সাহসের উদ্রেগ আর ঘটলো না। ঠিক তখনই পাশে ঘটিটার দিকে নজর যেতেই উপায় পেয়ে গেলেন। ঘটিটা নিয়ে পলিথিন খুলে গ্লাসে পানিটা ঢাললেন। স্বচ্ছ পানি। একটু পরই পোড়া মরিচের গন্ধ নাকে এলো। পানিতে বোতল থেকে এক ফোঁটা তেল ঢেলে বোতলটা পকেটে পুরে গ্লাসটা বারান্দায় চাঁদের আলোতে রেখে দিলেন।
রুমে এসে লাশটার বন্দোবস্ত করা শুরু করলেন। পরিকল্পনাটা ছোট্ট। সবার চোখ লুকিয়ে মর্গে নিয়ে যেতে হবে, তারপর এসিডে চুবিয়ে দিলেই সবকিছুই গায়েব। হালকা পয়সা খসাতে হবে, কিন্তু জানটা বেঁচে যাবে। লাশ নেই তো, কোর্ট কাচারিও নেই।
লাশ পলিথিনে মুড়িয়ে প্রাইভেটকারের ব্যাঙ্কারে রাখতে রাখতে রাত দুটো। বাকি কাজ শেষ করে রুমে আসতে আসতে ভোর। বাসায় ঢুকেই বারান্দায় গিয়ে দেখেন গ্লাসের পানি কেমন ঘোলা ঘোলা। যেন সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে পানিতে। গ্লাসটা নিয়ে এসে বিছানায় বসা তার স্ত্রীর সামনে ধরলেন। জোর গলায় বললেন, “যা করেছ তার ফল তোমাকে ভোগ করতেই হবে।”
ভীত কন্ঠে মিসেস আজাদ বললেন, “তুমি কী আমাকে মেরে ফেলবা বিষ দিয়ে?”
“এটা বিষ নয়। তোমার মুক্তি। খাও...”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েক ঢোকে পানি শেষ করে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শান্তি পেয়েছ?”
গম্ভীর কণ্ঠে ডাক্তার আজাদ বললেন, “না।”
বলেই পকেট থেকে বের করলেন বোতলটা। কাঁপা কাঁপা হাতে তিন আঙুলে তেল মেখে ছালেকুদ্দিনের কথামতো ভঙ্গী করলেন। কিছুই ঘটলো না। তার স্ত্রী আগের মতোই বিছানায় বসে, স্থির দৃষ্টিতে।
হতাশায় বিছানায় বসে পড়লেন ডাক্তার আজাদ। ছালেকুদ্দিন এভাবে তার সাথে মজা নিলো? রাগে মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে গেলেন। বোতলটা তখনও বাহাতে ধরা। বোতলটা হাতবদল করে ডান হাতে নিয়ে মেঝেতে আছড়ে ফেললেন। কাঁচের বোতলটা সশব্দে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। অবশিষ্ট তেলটা মেঝেতে মানচিত্রের মতো পড়ল ছড়িয়ে। তারপর হঠাৎ উবে গেল।
সাথে সাথে বুকের ডানপাশে মোচড় দিয়ে উঠল কিছু একটা। ডাক্তার বুকের ডান পাশে হাত দিলেন।
ঢিবঢিব।
ঢিবঢিব।
স্পন্দিত হচ্ছে দুটি হৃদয় দ্বৈত স্পন্দনে।

সন্ধ্যাবেলা। ছালেকুদ্দিন বসে আছে ডাক্তারের বাসার ড্রয়িংরুমের সোফায়। মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। সেই সাথে মুখে একটা স্বস্তির ছাপ। পাশেই ডাক্তার বসা আয়েশি ভঙ্গীতে।
“ছার, অবশেষে আমারে বাঁচাইলেন।”
উড়িয়ে দেওয়ার ভঙ্গীতে ডাক্তার বললেন, “আরে ধুর, বাঁচালে তো তুমি।”
“না, ছার। আপনি আমাকে বাঁচাইলেন। ওই জিনিসটার হাত থাইকা।”
হেলান দেওয়া থেকে পিঠ টান টান করে ডাক্তার বললেন, “মানে?”
“ওই জিনিসটা ছার ভালো না। আবার মন্দও না। সে আমার বিবির শরীরে ভর কইরা তার সব কিছু চুইষা খাইছে। ছিল খালি তার চামড়া আর হাড্ডি। হেইল্লাইগা বাধ্য হইয়া বোরকা পিন্দাইয়া রাখতাম। সে ছিল জিন্দা লাশ। ওইটা একটা দেহ চায়।”
“এসব আমাকে আগে বলোনি কেন?”
“বললে কী আর দেহ দিতেন? আপনার ইসিতিরির দেহে আসতেই ওটা আমার বিবির দেহ ছেড়ে দিছে। তাকে গোর দিয়েই আপনার কাছে ছুইটা আইলাম সব জানাইতে। যেভাবে আমার কাছে আইছিল সেই ওঝাবাবা।”
“বুঝলাম না। ওঝা কেন এসেছিল? সেইই তো তোমাকে দিলো।”
“হেও আমার মতোই ছিল। আরেকজনকে খুইজা বাইর করতে সেই বেশ ধরছিল। আপনাকেও আরেকজনকে খুঁজে বাইর করতে হবে। নইলে সারাজীবন ওই জিন্দালাশের সাথে থাকতে হবে।”
“কী বলছো এসব?”
“ঠিকই বলতাছি।”
“ওকে যদি আমি এখন মেরে ফেলি?”
“ওনাকে এখন আর কিছুই করতে পারবেন না। আবার অনেক কিছুই করিয়ে নিতে পারবেন।”
“মানে?”
“এখন ওই জিনিসটাই তাকে সবকিছু থাইকা রক্ষা করবে। আবার আপনার ইসতিরির রিদয় আপনার কাছে আছে বলে আপনি ওরে দিয়ে যা খুশি তাই করাতে পারবেন। এখন...”
“এখন কী?”
“এখন বোতলটা ভালো করে রেখে আরেকজনকে খোঁজেন।”
“কিন্তু বোতলটা তো আমি ভেঙ্গে ফেলেছি।”
ছালেকুদ্দিন সোফা ছেড়ে লাফিয়ে উঠলো। “বলেন কী? করছেনটা কী? এখন আপনি মুক্তি পাইবেন কীভাবে?”
“আরেকটা বোতল পাওয়া যাবে না? যত টাকা লাগে দেবো।”
মাথা দুপাশে নাড়িয়ে বলল, “না ছার। সেইটার ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। আমি গেলাম।”

*

ছালেকুদ্দিন চলে গেছে। ডাক্তার আজাদ ইশতিয়াক বসে আছেন। তার বুকে স্পন্দিত হচ্ছে দ্বৈত স্পন্দন।
ঢিবঢিব।
ঢিবঢিব।
আজীবনের জন্য।

আপনার ভালো লাগা ও মন্দ লাগা জানিয়ে লেখককে অনুপ্রানিত করুন