বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১ জানুয়ারী ১৯৭০

অনেক কথা ১১


  • মতবাদ--

    তক্ষক নাকি পানির বদলে বাতাস খায়? তাই তক্ষকের মতো যদি বাতাস খেয়ে বাঁচা যেত, তা হলে বোধহয় আমাদের বাঁচার আনন্দটা আরও ব্যতিক্রম হত? একেত সুদীর্ঘ জিন্দেগি হত, দ্বিতীয়ত অশুদ্ধের মহামারি থেকে সরে এসে অনেকটা শুদ্ধের জিন্দেগি হত? কেননা আজকাল খাঁটি জিনিসের বড় অভাব! এমনকি বিশুদ্ধ পানি পাওয়াও বড় কঠিন! বাজারজুড়ে যেহারে ভেজালের ছড়াছড়ি চলছে, তাতে মাঁদারপাতাও ভেজাল ছাড়া পাওয়ার নয়! আগের সেই স্বাদ বর্তমানে কোন জিনিসে আছে বলে মনে হয় না! দিনদিন পৃথিবীর উন্নতি যত বাড়ছে মানুষের আয়ু ততবেশি হ্রাস পাচ্ছে! আগে বার টাকার ডালভাতে যেস্বাদ ছিল, আজকের বারশ টাকার উন্নতমানের খাবারে সেস্বাদ নেই! প্রযুক্তির বিশ্ব আজ যুক্তির ভিত্তিতে যতবেশি বিস্ময়কর, তারচেয়ে আরও বেশি অবাককর কৃত্রিমোপায়ের সৃষ্টি এবং মানুষের শৌখিন জীবনযাপনের দৌড়!

     

    বলা বাহুল্য, দেহে শক্তিসঞ্চারের জন্যে খাদ্যের সমস্ত উপকরণের যেমন প্রয়োজন পড়ে তদ্রূপ দীর্ঘায়ু জীবনের জন্যে প্রার্থনারও দরকার হয়। খাদ্য বিনা যেমন শরীরের পাঁচাঙ্গ সচল নয়, প্রার্থনা বিনাও তেমন সবকিছু অচল। দুয়েতে সমস্ত কিছুর মিলন এবং দুয়েতে সমস্ত কিছু প্রতিষ্ঠিত আর দুয়ের সংঘর্ষেই সমস্ত কিছু শেষ! আল্লাহ্‌‌ সুবাহানুতালা ‘কুন ফা-ইয়া-কুন’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করে এ বিশ্বজাহাঁ রচনা করেছেন। কিন্তু সকল সৃষ্টির মধ্যে মানুষের কার্যক্ষমতা ও ধীশক্তি সবার উপরে রেখেছেন! তবু আল্লাহ্‌ যেটা করতে পারে মানুষ সেটা করতে পারে না আর মানুষ যেটা করতে পারে কোন পশুপাখি-জীবজন্তু ও অন্যান্য সৃষ্টি সেটা করতে পারে না। আল্লাহ্‌‌ মানুষকে বাকশক্তি দিয়েছে বাক বিনিময়ের জন্যে এবং জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক ও মস্তিষ্ক দিয়েছে ভালমন্দ বিচার-বিবেচনার জন্যে। এখন যদি কেউ মধু বলে বিষ খায়, তা হলে সেটা তার বোকামি।

     

    বোকা হয়ে জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয় কিন্তু বোকার রাজ্যে বাস করা অস্বাভাবিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন আদিমজাতির সৃষ্টিমত বিভিন্নরূপে রূপায়িত হয়েছে ঠিক--সৃষ্টিকর্তা দেবদেবী হতে শুরু করে এমনকি পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে বটে! প্রত্যেক জাতি বা সম্প্রদায়ের স্বকীয়তা থাকা স্বাভাবিক। তাই বলে কতিপয় জাতি বা ধর্মের ভুলভ্রান্তি পর্যবেক্ষণে প্রত্যেক জাতের ধর্মই যে বেঠিক এমন চিন্তাধারা অস্বাভাবিক! পূর্বে বহু জাতিকে বলতে দেখা গেছে, পূর্বপুরুষেরা যেপথে হাঁটছে, বাপদাদারাও সেপথ ধরে চলে গেছে, আমরা কি বাপদাদাদের চলানো পথ ত্যাগ করব! বাপদাদাদের চলানো পথ ত্যাগ করতে কে বলে? তবে কথা আছে, বাপদাদারা যদি না জেনে অমৃত মনে করে বিষ খায়! আমি জেনেশোনে কি বিষ খাব? উক্ত যুক্তিহীন কথাগুলো এখনকার বিজ্ঞসমাজ মানবে ত দূরের কথা, মুখেও আনবে বলে মনে হয় না। কারণ মানুষ আজ জ্ঞানেগুণে-সভাসভ্যতায় অতুলনীয়। ভালমন্দ বেশ আর কম সকলে জানে এবং বুঝে। সৃষ্টিকর্তাকে যে যেনামেই ডাকুকনা কেন, প্রায় ধর্মের সারমর্ম কিন্তু ‘একেশ্বরবাদ’। আমরা বলছি না, সৃষ্টিকর্তাকে তুমি মানতেই হবে, নাহলে জগতে বেঁচে থাকা তোমার অন্যায়। ন্যায়ান্যায়ের বিচারক্ষমতা একমাত্র বিচারকেরই হাতে।

     

    গবেষণা করা ভাল তবে পথভ্রষ্ট হওয়া ভাল না। মহাবিস্ফোরণে হোক অথবা ‘টা’ নামক হাতুরির আঘাতেই হোক, স্রষ্টা যদি এ আশ্রয়স্থল থেকে ক্ষুণুমটা ভেঙে সৃষ্টিকার্য হাতে নেয় তা হলে ক্ষতি কি? প্রকৃতিই যদি কারও আদেশ মেনে চলে তবে দোষ কোথায়? কোন্‌‌ মতবাদ আজ পর্যন্ত সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে? একশ বছরের মধ্যে যে বৈজ্ঞানিকগণ এককথায় একস্থানে স্থির থাকতে পারে না, সেখানে ‘উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি’ আখ্যায়িত বড়ই দুঃখজনক! এমন কথা কি বলা যায়, আজকের বৈজ্ঞানিকসত্য কালকে যে মিথ্যা প্রমাণিত হবে না? কারণ, কোন বৈজ্ঞানিক ঈশ্বর নন আর ঈশ্বরের পরিবর্তে ইনসানের কোন ধারণা নির্ভুল বলে ধরে নেওয়া আরেকটা মারাত্মক ভুল। ‘ঈশ্বর বলে কোন অস্তিত্ব নেই’ তা হলে কোন্‌‌ বীজ থেকে গাছপালা-কীটপোকা-জীবজন্তু-পশুপাখি ও মানুষজন এতসব সুন্দর সুন্দর নিদর্শনাবলি সৃষ্ট হল? বিস্ফোরণের অঙ্গার থেকে এমন সতেজ প্রাণ হলইবা কেমন করে! ‘ঈশ্বরকণা’ বলে যদি কোনকিছু সৃষ্টির মূলকারণ হয়, হোকনা তবে তাতে দোষের কি? ঐশ্বরিক ব্যবস্থা যেকোনভাবেই ত হতে পারে। আজকাল চাতক যদি সাধারণ পানি পান করে আর মাঁদারগাছে যদি সুমিষ্ট ফল ধরে এবং ডুমুরগাছে যদি ফুল ফুটে তবে আশ্চর্যের কী আছে। সূর্য পশ্চিমদিকে আর চন্দ্র পূর্বদিকে যদি কোনদিন উদিত হয় তবেও অস্বাভাবিক কেন বলব। বিন্দু থেকে যেখানে সিন্ধু হওয়া সম্ভব, সেখানে মহাবিস্ফোরণে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। আল্লাহ্‌‌ চাইলে সবকিছুই সম্ভব কারণ তিনিই সর্বশক্তিমান।

     

    শুরু যেমন শেষও তেমন! যতবার শুরু ততবার শেষ! সৃষ্টির কোনকিছু স্থির নয়। জীবনমৃত্যুর এ লীলা আদি হতে অন্ত পর্যন্ত চলছে এবং চলবেই! এটাই স্বভাব, এটাই স্বভাবের নিয়ম। এ স্বভাব পরিবর্তন বা সম্প্রসারিত হতে যতবেশি সময় লাগছে, স্থগিত বা সঙ্কোচিত হতে ততবেশি সময় লাগবে না--এটা প্রকৃত সত্য। আর প্রাকৃতিক সত্য--বারান্দার কোণে রজনীগন্ধার গাছটিও আজ সঠিক গন্ধ ছড়াচ্ছে না! আমড়াকাঠে এখন ঢেঁকি বানানো সহজ! আকাশের তারা হতে পাতালের বালিকণা পর্যন্ত মানুষের হাতের গণনায় চলে আসছে! পৃথিবীকে আজ হাতের তালুতেই দেখা যাচ্ছে! বিজ্ঞানের গতি এভাবে সচল থাকলে মহাবিশ্বের মহারহস্য একদিন চোখের সামনে পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়! তবু এ বৈজ্ঞানিকসত্যের ভিতরে যে অসত্য লুকানো থাকবে না তাও নিশ্চিত বলা যাবে না! বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন কথা, বিভিন্ন জাতি বা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংস্কার-কু-সংস্কার এবং হাজার জনের হাজার ধারণা, হাজার মতবাদ সবগুলো বাদ দিলাম। কিন্তু! ইসলামের এক লক্ষ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজার পয়গম্বরের আগমন ও মোজেজা এবং কুরআন-হাদিস ও আসমানী কিতাবসমূহ এবং নূহ্‌‌ (আ)এর নৌপরিত্রাণ ও মহাপ্লাবন এবং ইব্রাহিম (আ)এর পাখির পুনর্জীবিত ঘটনা ও অগ্নিকুণ্ডের শীতলতা এবং জনৈক গাধারোহীর একশ বছর নিদ্রা ও পুনর্জীবন এবং মুসা (আ)এর নদী পার ও ফেরাউনের নিমজ্জন এবং ঈসা (আ)এর মাতৃক্রোড়ে সাক্ষ্যদান ও জীবিত আসমানে উত্থান এবং দাউদ (আ)এর জবুরপাঠ ও মাছেদের শ্রবণ আর পাখিদের ছায়াদান এবং লূত (আ)এর অবাধ্যজাতির বিনাশ ও অবিশ্বাসী স্ত্রীর পরিণতি এবং আইয়ুব (আ)এর অসহনীয় কষ্ট ও ধৈর্যের মহিমা এবং ইউচুফ (আ)এর সৌন্দর্য ও সততার দৃষ্টান্ত এবং ইউনুচ (আ)এর মৎস্যোদরস্থ ও অক্ষত মুক্তিলাভ এবং সোলায়মান (আ)এর হাওয়াই তখ্‌‌ত ও সৃষ্টিকুলের বাদশাহি এবং ইসমাইল (আ)এর উৎসর্গ ও পদাঘাতে জমজম এবং মুহাম্মদ (স)এর বারবার বক্ষছেদন ও অধ্যাত্ম মেরাজ এবং আসাব কাহাফির তিনশ বছরের ঘুম ইত্যাদি অলৌকিক ঘটনাবলি কি মিথ্যা বা বানোয়াট হয়ে যাবে? এগুলো ত চাক্ষুষ প্রমাণ। কুরআনে জ্ঞানীদের জন্যে অসংখ্য নিদর্শন ‘তারা কি লক্ষ করে না যে, তাদের পূর্বে কত সম্প্রদায় আমি ধ্বংস করেছি’ এখন কি তবে প্রমাণাদি বিশ্বাস করব নাকি মতবাদ? হায়! কোন বস্তুবাদী যদি বাস্তব সত্যের খবরাখবর জানতে পরত, তা হলে বোধহয় বস্তু থেকে সরে এসে আধ্যাত্মিক জীবনের সন্ধানে মত্ত হত। মানুষ সৃষ্টিকে নিয়ে আজ যতবেশি কৌতূহলে মাতছে স্রষ্টাকে নিয়ে তার সিকিপরিমাণও মনোযোগ দেখাচ্ছে না! ‘বিশ্ব উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি’ এটা বৈজ্ঞানিকের কী ধারণা বা কেমন যুক্তি বুঝি না তবে মানুষ সঠিকপথে এগোচ্ছে কিনা জানি না। কারণ, অনুমানে ঢিল ছুড়া সহজ কিন্তু লক্ষবস্তু ছোঁয়া কঠিন। আজ পর্যন্ত কেউ উদ্দেশ্যহীন যাত্রা করেছে? নাকি আগামীতে কেউ করবে? তবে? সামান্য জ্ঞানের মানুষ যেখানে উদ্দেশ্যহীন নয়, সেখানে এত বড় ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি উদ্দেশ্যহীন হতে পারে আমাদের বুঝার সাধ্যাতীত!

     

    বানরের লেজ খসতে যেখানে সাত কোটি বছর লাগে সেখানে মানুষ আজকের সুশ্রী আদলে আসতে সময় এত কম! বানর লেজ খসে মানুষে রূপান্তরিত হলেও লেজওয়ালা বানর কিন্তু এখনও বিরাজমান এবং বনমানুষও নিজের আকৃতিতে আজও বিদ্যমান! সাগরনদী পুকুরডোবায় নালানর্দমায় খালেবিলে সন্ধান করলে এখনও এককোষী জীবের দেখা যত্রতত্র মিলবে! আজ তক যোনাচারও স্বজাতিতে বিদ্যমান! তা হলে কালের বিবর্তনে মানুষের রূপান্তর হল কিভাবে? ক্ষুদ্র একটি বীজ থেকে যখন প্রকাণ্ড মহীরুহে পরিণত হয় তখন বীজের কি আর অস্তিত্ব বজায় থাকে? রূপের পর রূপান্তর যদি হতেই থাকে তবে পূর্ব বা আদিরূপ বিদ্যমান থাকল কেন? জীবাশ্ম ‘ফসিল’ যদিওবা হয় কোনকিছুর মৌলিক উপাদান তবে সেটাইবা এল কোত্থেকে? বাঁদর শিম্পাঞ্জি গরিলা বনমানুষ ও মানুষ যাবতীয় প্রাণপ্রাণীর রক্তকণিকা ও অন্যান্য আকৃতিপ্রকৃতি একই ধাঁচের হওয়া স্বাভাবিক তবে অস্বাভাবিক বাহ্যিক আবরণ? নালানর্দমা ও পচা-আবর্জনা থেকে কীটপোকা-মশামাছি জন্ম নিতে এখনও আমরা দেখি! সচরাচর আবার মরে যেতেও দেখি! হোক, এটা প্রকৃতিরই আদত। কিন্তু, এ আদতের পিছে যে কারও মত নেই সেটাইবা যুক্তি কি? এসব প্রশ্ন অযৌক্তিক। ‘প্রত্যেক জিনিসের একটা শক্তি ও গতি আছে’ এটা যেমন সত্য, সব গতি ও শক্তির মালিক একজন আছে এটাও মিথ্যা নয়। যুগেযুগে যুগ পরিবর্তন হবে, মানুষের ধারণা পাল্টে যাবে, মানুষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে করতে একসময় মোহগ্রস্ত হয়ে পড়বে এটাও স্বাভাবিক। ভূতত্ত্ব গণিততত্ত্ব বিজ্ঞানতত্ত্ব দর্শনতত্ত্ব যা আছে সব তত্ত্বই ঠিক তবে ‘ঈশ্বর নেই’ এ তত্ত্ব বোধহয় মোটেও ঠিক নয়। মানুষের অন্তরিন্দ্রিয়--হুঁশজ্ঞানে ও দয়ামায়ায় এবং প্রেমভালবাসায় অনুভূতভরপুর এত মনোজ্ঞ-শ্রীযুক্ত অবয়ব বা দেহাকৃতি কোন পশুপাখি-কীটপতঙ্গেরই রূপের পরিবর্তন! স্বাভাবিক মনে হয় না। দুইশ কোটি হোক কিবা দুই হাজার লক্ষ কোটি, বিবর্তনের সুবাধে হোক বা স্রষ্টার অনুগ্রহে, এককোষী হোক অথবা বহুকোষী মানবদেহের রূপগঠনে যে একজন সুদক্ষ কারিগরের পরিচয় মিলে সেটা কি অস্বীকার করা যায়? ‘কোন্‌‌ কোন্‌‌ অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে’ যে যা বলে বলুক, যে যা ভাবে ভাবুক, যে যা হয়ে যায় যাক ‘স্রষ্টা আছে’ এ আস্থার মধ্যে কমসে কম কেউ-না-কেউ আছে--থাকবেই।

     

    ‘পৃথিবী একদিন ধর্মহীন হয়ে পড়বে’ এটা যেমন অসত্য ভাবা যায় না, তেমনি বিজ্ঞানীদের নিত্যনূতন আবিষ্কার পৃথিবীকে কোন্‌ উচ্চতায় নিয়ে যাবে এটাও কল্পনা করা যায় না। মানুষ হয়ত একদিন এমন উচ্চতায় পৌঁছবে, যেখান থেকে মানুষকে স্পষ্ট দেখা ত যাবে তবে বুঝা সম্ভব হবে না! কারণ পলকে মানুষ নানা বর্ণ ধারণ করবে! কাজেই বৈজ্ঞানিকের মতবাদ যুক্তির ভিত্তিতে চলবে কিন্তু ঐশ্বরিক বাণী কোন যুক্তির মাধ্যমে চলবে না। সেদিন হয়ত পৃথিবীতে বিরাট বিপর্যয় নেমে আসবে! সুতরাং বিভিন্ন মতবাদ হাজার দৃষ্টান্ত বা যুক্তি আমিও আজ দাঁড় করে যেতে পারি--তবে লাভ? কে শোনবে কার কথা! কে মানবে কার যুক্তি! ‘প্রকৃতিই সৃষ্টির উৎস’ বিশ্বাস করা যায় তবে প্রকৃতিই সৃষ্টির মালিক বিশ্বাস করা যায় না। নিজের মনে মনে নিজেই যেটা ভাল অনুভব করতে পারবে সে-ই উত্তম পথ খুঁজে পাবে।

     

    আমি কোন ভাববাদী দ্রষ্টাদার্শনিক শিক্ষকশিক্ষিত মোল্লামৌলবি ফাদারপাদ্রি পণ্ডিতপুরোহিত এমন জ্ঞানীগুণী নই, না এসবে আমার কোন জ্ঞান বা গুণ আছে। তবে? যা মনে আসে বলি আর বলি। কেউ যদি ভাবে আমায় বিজ্ঞান-বিদ্বেষি বা বৈজ্ঞানিক-ঈর্ষী, তা হলে আমার কপালদোষ আর খণ্ডানো গেল না! বিজ্ঞান আমাদের অনেক কিছুই দিয়েছে, বিজ্ঞানীদের ধারণা যাই-ই হোক, অবদান প্রশংসনীয়। কর্মের মাঝেই একজন মানুষের জীবন এবং কর্মের মাঝেই একজন মানুষের ফলাফল; যে যাঁর কর্মমতেই সবকিছু ভোগ করবে। এখন যদি আমরা বলি, এটা সত্য ওটা মিথ্যা, তা হলে আমাদের কথায় বা বিশ্বাসে সত্যতা কী? ‘বিশ্বাসে বস্তু মিলে’ এমন বিশ্বাসেও আমরা রাজি নই, হোক সেটা ধর্মের দিক দিয়ে কিবা দর্শনের দিক দিয়ে অথবা বিজ্ঞানের দিক দিয়ে; এবলে কাকে অন্ধবিশ্বাসের দোহাই দিতেও পারব না। ‘আমি কোন ধর্মে বিশ্বাসী না’ তবে বলি, আপনার পরিচয়? মানুষ হলে কিন্তু একটা জন্মপরিচয় থাকে, যেটা হয় জাতীয় পরিচয় অথবা বংশীয় পরিচিতি, যার পরিচয়ে একজন মানুষ মৃত্যুর দুয়ার পর্যন্ত আসবে এবং যার যার ধর্মমতে শেষকৃত্য শেষে সমাহিত হবে চিতায় বা কবরে আর এ পরিচয় যদি না থাকে তবে সে মানুষ কেমন?

     

    জীবদ্দশায় পশুপাখিদের বাস পাহাড়পর্বতে বনেজঙ্গলে খেতকামাড়ে, মরার পর স্থান ভাগাড়ে। কারণ তাদের দেশ নেই, সমাজ নেই, পরিবার নেই, নীতি নেই, শিক্ষা নেই, দীক্ষা নেই তাদের আর ধর্ম ও সৎকারের কী প্রয়োজন। ধর্ম মানবজাতির কল্যাণের জন্যে এবং সৎকার মানবের পরিশুদ্ধির জন্যে। তাই প্রত্যেক মানুষের একটা ধর্ম থাকা উচিত। উল্লিখিত হয়েছে, কতিপয় ধর্মীয় আচার-আচরণে বা বিধি-বিধানে কিছু কিছু বিভ্রান্তি থাকতেই পারে তাই বলে ‘সকল ধর্ম বেঠিক’ তা ভাবা কি ঠিক? ধর্মতত্ত্ব দর্শনতত্ত্ব বিজ্ঞানতত্ত্ব যত তত্ত্বই বলিনা কেন, সত্যতত্ত্ব বুঝা প্রায় মানুষের পক্ষে মুশকিল। মানুষের কর্মকাণ্ডে ও নিয়মনীতিতে কিছু-না-কিছু খুঁত থাকবেই--এটা মানুষের স্বভাব। একেবারে নিখুঁত যদি হয় তা হবে একমাত্র স্রষ্টার ভাব ও সৃষ্টির ধারা। মানা যাবে, মানুষের ইন্দ্রিয়ের চেয়ে বড় কোন আশ্চর্যের জিনিস আছে? না আছে মানুষের দেহের চেয়ে বড় কোন সৌন্দর্য? মানুষের এক একটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দর্শনীয় নয় কি? বলা যাবে, মানুষের আশ্চর্যসকল সৃষ্টির মধ্যে কারও অদৃশ্য হাত নেই? খাঁটি আস্তিক কেউ কেউ নাইবা হলে তবে সম্পূর্ণ নাস্তিকের জিন্দেগি করা ভুল। মানতে হবে, এ বিশ্ব কোন নিয়ন্তার নিয়ন্ত্রণে চলছে। কোটি কোটি গ্রহ-তারকা-নক্ষত্র একই নিয়মে একই ধারাক্রমে বিচরণ করছে। কোথাও কোন বিশৃঙ্খলা নেই, সংঘর্ষ নেই, তাড়াহুড়ো নেই সকলে নিজ নিজ কক্ষপথে ঘুরছে। কার ইশারায়? নিশ্চয় কোন-না-কোন মহাশক্তি এর আড়ালে কাজ করছে! নিশ্চয় কেউ-না-কেউ এসবের মালিক। নিশ্চয় কারও-না-কারও হুকুমে চলতে সমস্ত কিছু বাধ্য। তাই সৃষ্টির কোনকিছু নিয়মনীতির বাইরে যেতে পারছে না! সুতরাং কোন মতবাদে অথবা আবিষ্কারে বিস্ময়বোধ না করে স্রষ্টার আস্থায় আস্থাবান থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।

    চলবে...