বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ১২ এপ্রিল ২০১৭

ষঢ়রিপু বনাম আত্মযুদ্ধ।

  • দিবানিশি যে ছয়জনা, দিচ্ছে কুমন্ত্রণা। তাদেরি কথা বলছি।
    অর্থাত মানুষের ভিতরে যে ছয়টি রিপু আছে। যে ছয়রিপু মানুষকে অহোরাত বিভিন্ন নিষিদ্ধ কাজে প্রলুব্ধ ক’রে ইবলিশকে জয়ী করে দেয়, সেই ছয়টি রিপুর কথাই বলছি। মনীষারা শব্দগুলিকে একটি বাক্যবন্ধে আবদ্ধ করেছেন এভাবে- (কামক্রোধলোভমোহমদমাৎসর্য্য) আরবীতে যাকে বলে “নফ্স।” অর্থাত আত্মার স্বারুপ।
     
    আরবীতে নফসে কে ৩ ভাগে রুপ দেয়া হয়েছে। ১। নফসে আম্মারা, ২। নফসে লাউয়ামাহ্, ৩। নফসে মুত্মাইন্না।
    ১। নফসে আম্মারা - কু-প্রবৃত্তিমূলক আত্মার প্রথম স্তর। শয়তানি বা অবাধ্যকারি আল্লাহ কর্তৃক অভিশপ্ত।
    ২। নফসে লাউয়ামাহ্- বিবেক তাড়িত বা তিরষ্কারকারি আত্মা। যাকে ইনসানিয়াত বা মানবিক আত্মা বলা হয়ে থাকে। ভালমন্দের পার্থক্যকারিও বটে!
    ৩। নফসে মুত্মাইন্না প্রশান্ত আত্মা বা প্রফুল−চিত্ত জান্নাতি আত্মাও বলা হয়ে থাকে।
     
    এই ছয়জনার রিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আল্লাহপাক মানুষের মধ্যে (বিধি ও নিষেধ) নামে একখানা জ্ঞানের সংবিধান দিয়েছে, আবার বিবেক নামের একখানি আয়নাও দিয়েছেন। যে আয়নাখানির একপিঠে আপনি আপনার ঐ সব রিপুর যে কোন একটি রিপু আক্রান্ত স্বরুপ দেখতে পাবেন, অন্যপিঠে কষ্টি পাথর সমতুল্য বিধি-নিষেধের সংবিধানে যাচাই করে আপনার রিপু-আক্রান্ত দুর্বুদ্ধীকে সংবিধিবদ্ধ সতর্ক করতে পারেন।
                
    এগুলি মানবজীবনেরি অনুসঙ্গ। স্রষ্টাই তার সৃষ্ট উচ্চমর্যাদাশীল মানুষকে দিয়েছে। যাতে আল্লাহপাক বলতে পারেন ফেরেশতাদেরকে যে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে মানুষই সেরাজীব।
    তবে, সেরা জীব বলে পদকটি পেতে হলে প্রতিজন মানুষকেই কথিত ছয়জন স্বশস্ত্র দুর্মদ সৈনিকের সাথে যুদ্ধ করতে হবে অহোরাত। যারা এই স্ব-শস্ত্র সৈনিকদেরকে পরাজিত করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ মানবরুপে প্রতিষ্ঠীত করতে পারবেন তারাই “আসহাব”।
     
    এই যুদ্ধই হবে শ্রেষ্ঠ জিহাদ।  অর্থাত শ্রেষ্ঠ ধর্ম যুদ্ধ। এটাই হোলো আসল গণতান্ত্রিক শান্তি ও শৃংখলার একমাত্র উত্তম পন্থা।
    কারণ - এই অনুশীলনের ব্যপ্তি অনিবার্য। মানুষ মূলতঃ সাংগঠনিক চরিত্রের হয়ে থাকে সৃষ্টির বৈশিষ্ট্যেই মিলিত হতে চায়, তৈরি করে নেয় মিলনায়তন। যেমন ব্যক্তি থেকে পরিবার। পরিবার থেকে সমাজ। সমাজ থেকে রাষ্ট্র।
     
    পৃথিবী সৃষ্টিলগ্ন থেকেই হক এবং বাতিল অর্থাত সত্য ও মিথ্যা বর্বরতা সভ্যতা এই দুটিতে চলছে যুদ্ধ তথা জয় পরাজয়ের খেলা। বর্বরতা যদি সংক্রামক হয় তবে সভ্যতা নিরাময়ক। এটিই স্বীকৃত সত্য এবং বর্বরতা কালে কালেই ধিকৃত, ইতিহাস তার সাক্ষী।
     
    যদি উলে−খিত বাক্যবন্ধের শব্দগুলিকে আলাদা করে সজ্ঞায়িত করা যায় তাহলে আমরা দেখতে বা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারি, উক্ত কোন শব্দটি তাড়িত হয়ে মানুষ কি অপকর্ম চরিতার্থ করতে প্রানান্ত হয়ে ওঠে। আমরা প্রতিদিনই যে ঘটনাগুলো খবরের পাতায় দুঃখজনক অক্ষমতায় প্রত্যক্ষ্য করছি, তার সবগুলিই দুষ্ট রিপু তাড়িত উম্মাদনা।
     
    আমরা এই দুর্মদ অনিরুদ্ধ শব্দগুলির অতি উম্মাদনার বিপরিতে যুদ্ধ করছিনা কেন? কেন আমাদের পবিত্র শক্তির আত্মা পরাজয় বরণ করছে? মানুষের মধ্যে, শতকরা ৮০ জন-ই মনে হয় (নফসে লাউয়ামাহ) র চরিত্রে অবস্থান করি। আমরা নিশ্চই বিবেক তাড়িত। আমরা সহজে কোন  অন্যায় করতে পারিনা। ভুলক্রমে কিছু করতে গেলেও আমাদের আত্মসমালোচক আত্মা তিরষ্কার করে ও মানবিক বোধটা জাগ্রত হয়ে, ভালমন্দের পার্থক্য-টা-বুঝিয়ে দেয়, আমরা সংযত হই। তাই নফসে লাইউয়ামাকে ইনসানিয়াত বা মানবিক আত্মা বলা হয়ে থাকে।
     
    এবার দেখা যাক, ১০ জন মানুষ যদি কু-প্রবৃত্তিমূলক আত্মার প্রথম স্তরে অবস্থান করে, অর্থাত- (নফসে আম্মারায়)। যারা কিনা শয়তানের বন্ধু অবাধ্যকারি, আল্লাহ কর্তৃক অভিশপ্ত।
     
    তবে তার বিপরিতে ১০ জন মানুষও অবস্থান করে নফসে মুতমাইন্নায়। যারা প্রশান্ত আত্মা বা প্রফুল− চিত্তের অধিকারি। সে সকল আত্মাকে জান্নাতি আত্মাও বলা হয়ে থাকে। মানুষ যদি শতকরা ৯০ জন ভাল চরিত্রের আধিকারি, তাহলে আর মাত্র ১০ জনের সাথে কেন যুদ্ধে হেরে যাবে?  ঐ প্রপঞ্চক, প্রতারক, লুটেরা, হন্তাকারি, বিকৃত যৌনতা চরিতার্থকারি, মানুষ নামক রিপুবন্দিদের বিপরিতে আত্মযুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে না! কিংবা পারবেনা? অবশ্যই পারবে। কারণ ঐ সব শব্দের শক্তির চেয়ে মানুষের পবিত্র ইচ্ছাই অনেক বেশি শক্তিশালি। তার সাথে আছে ধর্মের বিধি নিষেধের মতো একখানা সংবিধান ও বিবেক নামক তরবারি। যা ক্ষণে ক্ষণে মানুষের দুর্দমনীয়তাকে ছেঁটে কেটে (সাফাকাহ্) অর্থাত কেয়ারি করে রাখে।  এই আত্মযুদ্ধই আসল জিহাদ। অর্থাত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মিথ্যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বোপরি অংশীবাদের বিরুদ্ধে সার্বক্ষণিক যুদ্ধ।


     
    কথিত ঐ ১০ জনের উদ্দেশ্যে বলি, তাদের উম্মত্ততায় যাদের ক্ষতি হয়, তারা অবশেষে সুবিচার পাবে।  কবিতার ভাষায় যদি বলা যায়, মনে হয় এভাবে বলতে হয়-

    খেয়ালি গাফেল কান পেতে শোন হায়
    পচন বাতাসে তাদের প্রাণের
    রোনাজারি শোনা যায়।
    কারা বিচারক তারা কী বোঝে না
    তাদেরও হবে বিচার
    মহাকর্তা লিখছেন বসে, যাবতীয় সব ফিচার।

    রাসুলে পাক (সঃ) হাজারেরও বেশি শত্র“ বাহিনীর সথে ৩১৩ জন নওমুসলিম সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করে শত্র“পক্ষকে পরাজিত করেছিলেন। তা নিশ্চই আল্লাহপাকের দ্বীনের উপর দৃঢ় বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠীত করার ও তাঁহার উপর আল্লাহপাকের অর্পিত দায়িত্ব সম্পাদনের অটল সংকল্পের বলে বলিয়ান ছিলো বলে-ই।
     
    আমরা উম্মতে মোহাম্মদী, অর্থাত, রাসুল (সঃ) এর অনুসারীরাও কিন্তু সে দায় কাঁধে নিয়েই চলছি মহাকালের মানব মিছিলে শেষ দিনের পরিণতির দিকে।
    সুতরাং আমাদেরকে আত্মার সাথেই যুদ্ধ করতে হবে। রিপু সর্বস¦তা পরিহার করে মানবিক গুণাবলীতে সমৃদ্ধ হতে হবে। বিশ্বমানবতার মাঝে সর্বধর্মে সর্বকালেই মণীষ মহামণীষ জন্মগ্রহণ করেছেন। সবাই তাঁদের ধ্যানলব্ধ জ্ঞানলব্ধ কথা যুগের মানুষের জন্য মহাকালের বাহিত স্রোতে রেখে গেছেন, সেই সব কথাও আমাদেরকে ইন্দ্রীয় খেয়ালীপনা থেকে রক্ষা করবে। আমাদের শুধু চর্চা করতে হবে, রাখতে হবে প্রাতস¦রণে। হতে হবে ধ্যানমগ্ন।
     
    ভারত রাজ ইন্দিরাপুত্র রাজন্য রাজীব গান্ধি যখন ছোট ছিলেন, তখনকার কথা। তাঁর শৈশব বা তারুণ্যে যখন তিনি একটু চাঞ্চল্য প্রকাশ করতেন, ইন্দীরাগান্ধী তখন তাকে বলতেন, - ঝর্ণার পাশে চুপচাপ বসে থেকো। নিশ্চুপ থেকে ঝর্ণার চলার গতিকে অনুসরণ কোরো। তোমার মন শান্ত হবে। তুমি চিন্তা করতে শিখবে।  এ থেকে বোঝা যায়-
    আল্লাহপাক তাঁর সৃষ্ট নিঃস্বর্গের যেমন সৌন্দর্য দিয়েছেন, তেমনি দিয়েছেন একধরনের মৌন ভাষা। নিঃস্বর্গের মৌনমধুর সৌন্দর্য ও ভাষার সাথে মানুষের কথোপকথন হতে পারে। নেয়া যেতে পারে শান্তনার অমিয় পাঠ। আমরা অবদমিত হতে পারি।
     
    নবী রসুলগণ জীবনের বেশির ভাগ সময় গভীর মৌনধ্যানে থাকতেন। বিশেষ করে নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত। এভাবেই আল্লাহপাক তাঁদের তৈরি করতেন। সুতরাং চিত্ত যখন চঞ্চল হয় তখন মৌনতা অবলম্বন করলে স্রষ্টার প্রতি আনুগত্য দৃঢ় হয়। আত্মা তখন শুদ্ধতার প্রতীক হয়ে ওঠে। নষ্ট  চিন্তা দূরিভূত হয়ে যায়, অন্তরে স্রষ্টার প্রতি প্রেম সৃষ্টি হয়। মানুষ কল্যাণ চিন্তায় মনোনিবেশ করতে পারে। আমরা জিহাদের ভুল সংজ্ঞায় বিভ্রান্ত হচ্ছি। আমরা ভেবে দেখছিনা বা বুঝতেও চেষ্টা করছিনা জিহাদ আসলে কী? জিহাদ শব্দের অর্থ চেষ্টা ও সংগ্রাম করে যাওয়া। জিহাদ শব্দের উদ্ভব জাহাদা থেকে। আর পবিত্র যুদ্ধ নামে এর যদি আরবী করা যায়, তাহলে তা হয় “হারবেমোকাদ্দাসা।” তাহলে আমরা সাধারণভাবে বুঝতে পারি অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা ও ফিরে আসার নাম-ই  জিহাদ যা আমরা ২৪ ঘন্টাই অন্যায়ের বিরুদ্দে নিজের সাথে যুদ্ধ করতে পারি। এরিই নাম আত্মযুদ্ধ বা জিহাদ।