বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫

একদিন পাখি উড়ে (নভেলেট)

  • ২য় পর্ব

    ‘কী হলো, শুয়ে রইলে যে! বাজারে যাবে না? ফ্রিজটা খুলে দেখো একবার। কিচ্ছু নাই রান্না করার মতো। বাজারে না গেলে আজ খাবার জুটবে না বলে দিলাম।’

    ‘আরে কী শুরু করলে সাত সকালে! বাজারে যাবো না তা একবারও বলেছি নাকি?’

    ছুটির দিনে একটু আরাম করে ঘুমাবো তার উপায় নেই। স্ত্রী বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলো। কোনো নড়নচড়ন নাই। অগত্যা উঠে বসতে হলো।

    সকাল সাড়ে আটটা বাজে। সপ্তাহে এই দুইটাই তো দিন, যে দুইদিনে নাকে মুখে গুঁজে ছুটতে হয় না। সকালে কী নাস্তা করি ঠিকমতো বুঝতেও পারি না অনেক সময়। শুক্রবার দিনটা এলেই মনে হয় একটু শুয়ে বসে থাকি। সেটারও উপায় নেই। এখুনিই বাজারে ছুটো!

    বাজারের ব্যাগ আমার হাতে গছিয়ে দিয়ে স্ত্রী শায়লা আবার গিয়ে ঢুকে পরেছে রান্নাঘরে। রান্নাঘর থেকে বেশ চনমনে একটা সুবাস ভেসে আসছে। শায়লা ছুটির দিনগুলোতে পরোটা বানায়। পরোটা আর ঝরঝরে করে ভাজা আলু ভাজি। আমার বিশেষ পছন্দের খাবার। এই আলুভাজি টা সবাই করতে পারে না। শায়লা কোথায় থেকে যেন শিখেছে। টিভিতে রান্নার অনুষ্ঠান দেখালেই সে চোখ গোল গোল করে দেখে। বেচারীর রান্না শেখার খুব শখ। রান্না শেখার একটা কোর্স করতে চেয়েছিল অনেকদিন আগে। টাকার অংক শুনে রাজি হতে পারিনি। সে খুব মনোকষ্টে ভূগেছে কিছুদিন। এখন অবশ্য সেই শোক ভুলে গেছে। টিভি আর ইন্টারনেটে চাইলেই এখন যেকোনো রান্না শেখা যায়। ইউটিউবে সার্চ করলে তো সব রান্নারই ভিডিও পাওয়া যায়। হাতে হাতে মোবাইল সবার। তাতে মোবাইল ডাটাও ভরা থাকে। প্রতিদিন ফেসবুক ব্যাবহার করতে হয়। এটাও এখন যুক্ত হয়েছে নিত্য দিনের অপরিহার্য প্রয়োজনে। তাহলে শুধু শুধু আর পয়সা নষ্ট করে রান্না শিখতে যাওয়া কেন? আর তাছাড়া, মধ্যবিত্ত জীবনে এমন দু’দশটা শখ আহলাদের গলা টিপে ধরতে হয়। এটা এমন বেশি কিছু নয়।

    ছেলেমেয়েদুটো অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওদেরও আজ শান্তির দিন। সপ্তাহের বাকী পাঁচটা দিন যে হাড়ভাঙ্গা খাটাখাটুনি যায় তা কোনো অফিসে চাকরি করার চেয়ে কম কিছু নয়। কী বা এমন বয়স এদের! অথচ এই বয়সেই জগতের খুঁটিনাটি সবকিছু শিখে ফেলতে হচ্ছে।

    ওদের ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। ছেলেমেয়েদুটোর সাথে আমার ইদানীং দেখাই হয় না। সকালে আমি বেরুনোর আগেই ওরা স্কুলে চলে যায়। আমি ফেরার আগেই ওরা ঘুমিয়ে পড়ে। সারাদিন পড়াশুনা আর স্কুলের ধকলে ন’টা বাজতে না বাজতেই ঘুমিয়ে পড়ে। আমার অফিসের চাপও আজকাল খুব বেড়ে গেছে। যে শাখাতে এখন আছি, প্রচুর খাটতে হচ্ছে। বসকে বলে অন্য শাখায় যেতে হবে। এখানে শুধু শুধু বেগার খেটে কী এমন আহামরি হচ্ছে! উপরি বলে কোনোকিছুর তো আজ অব্দি দেখা পেলাম না।

    বাচ্চা দুটোর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে মনে হলো, আমার অবর্তমানেই বড় হয়ে যাচ্ছে ওরা। ওদের বেড়ে ওঠার পেছনে আমার প্রত্যক্ষ কোনো অবদানই নেই। এই বয়সে বাবা যে আদর্শ আর শিক্ষার বীজ আমার ভেতরে বুনে দিতে চেয়েছিলেন, আমি তার কিছুই এদের মধ্যে দিচ্ছি না। বড় হয়ে এরা যদি আমাকে প্রশ্ন করে...যদি বলে, ‘তুমি তো আমাদের কিছুই দাওনি, কিছুই শেখাওনি...’ তাহলে? মনের ভেতরটাতে কেমন একটা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল।

    ওদের দেখতে দেখতে আমার ছোটবেলার সেই বন্ধুটির ছেলেমেয়েদের কথা মনে পড়লো। বন্ধুটির সাথে প্রায় একবছর আগে একবার বাসে দেখা হয়েছিল। সে তার বউ-বাচ্চার গল্প বলেছিল। সুখি সুখি মুখে। একবার বাসায় বেড়াতে যেতে বলেছিল। আমিও বলেছিলাম আমার বাসায় বেড়াতে আসতে। দিন চলে গেছে। কেউ কারো বাসায় যেতে পারিনি। হয়তো সময় হয়নি, হয়তো তাগিদ অনুভব করিনি। হবে একটা কিছু।

    মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, ওর বাসায় একবার যাবো। ঠিকানা জোগাড় করা তেমন কঠিন কিছু হবে না। আরেকজন যে বন্ধু ওর অসুস্থতার খবর দিয়েছে তার কাছ থেকেই পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। বেশি দেরি করা যাবে না। এমনিতেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কে জানে কখন কী হয়! আমরা সবকিছুতেই কীভাবে কীভাবে যেন বড্ড দেরি করে ফেলি।

    বাজার থেকে এসে গোসলে ঢুকে বাইরের কাপড়চোপড় পরে ফেললাম। সিদ্ধান্ত যখন নিয়েছি আজকেই ঘুরি আসি। আমাকে ছুটির দিনে বাইরে যাবার প্রস্তুতি নিতে দেখে শায়লা প্রশ্নবোধক চোখে তাকালো।

    ‘এক বন্ধুকে দেখতে যাচ্ছি। আমার স্কুলজীবনের বন্ধু রাশেদ। তোমার কাছে কখনো ওর গল্প করা হয়নি। বন্ধুটি খুব অসুস্থ। ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ। আর বেশিদিন নেই।’

    শায়লা ব্যথিত মুখে চেয়ে থাকলো।

    ঠিকানা পেয়ে গেলাম সহজেই। আমার বাসার একদম কাছেই। বলতে গেলে প্রায় হাঁটার দূরত্ব। অথচ এতোদিনে একবারের জন্যও আমাদের দেখা করার সময় হয় নাই।

    লোহার গেট টা পেরিয়ে নোনা ধরা চারতলা বাসাটায় ঢুকতে যেতেই বুকের ভেতর কেমন কেন হাতুড়ির আওয়াজ টের পাচ্ছিলাম। সরকারি কোয়ার্টার। রাশেদ সরকারী রাজস্ব বিভাগে চাকরি করে। কর্মচারী পদে। সেদিন বাসে দাঁড়িয়ে নিজের অনেক গল্প করেছিলো রাশেদ। আমি আর রাশেদ একই গ্রামের ছেলে। একই গ্রামের আলো, হাওয়া, পানিতে বড় হয়েছি দুজন। বর্ষাকালে ভরা নদী সাঁতরে পার হয়েছি কতোদিন! কাদা জলে মাখামাখি হয়ে ফুটবল খেলেছি স্কুলের মাঠে। গ্রামের স্কুলে পড়তাম দুজন। স্কুল জীবনে পড়াশুনাতে খারাপ ছিল না রাশেদ। স্কুল শেষে কলেজ জীবনেও দুজন একসাথে পড়েছি। অনেক সম্ভাবনা ছিল রাশেদের মধ্যে। আমরা মনে করতাম, ও ভবিষ্যতে অনেক বড় চাকরি করবে। এসএসসি পরীক্ষাতেও দারুণ ভালো করেছিল। কিন্তু কলেজে এসেই কেমন আস্তে আস্তে পাল্টে যেতে থাকে রাশেদের জীবন। মন্দ কিছু সংসর্গে পড়ে ওর জীবনের গতিপথ কেমন যেন পাল্টে যেতে থাকে। প্রচণ্ড মাত্রায় সিগারেট আসক্তি দেখা দেয়। রাজনৈতিক ভাবেও একটু জড়িয়ে গিয়েছিল মনে হয়। পড়াশুনার ক্ষেত্র থেকে একেবারেই সরে এসেছিল। হয়তো ওর মাঝে একটা সম্ভাবনা ছিল দেখেই আরো বেশি করে নজরে পড়েছিল সবার। কলেজে একেবারেই সাধারণ গোছের একটা রেজাল্ট করে কোনোমতে উতরে যায়। কলেজ শেষে আর যোগাযোগ থাকেনি রাশেদের সাথে। আমি স্কুলের শেষ বেঞ্চের ছাত্র হয়েও রাশেদের চেয়ে ভালো রেজাল্ট করি। পরবর্তীতে অবশ্য জীবনের যোগবিয়োগে খুব বেশি হেরফের ঘটেনি। জীবন সেই একই উচ্চতায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের দুজনকে।

    রাশেদের বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। বাবা ছিলেন গ্রামের পোস্টমাস্টার। মা এখনো বেঁচে আছেন। গ্রামেই থাকেন। রাশেদ আনতে চেয়েছিল ঢাকায়। তিনি রাজি হননি। শেষজীবনে স্বামীর ভিটা আঁকড়েই বাঁচতে চেয়েছিলেন। এসব গল্প সেদিনই রাশেদের কাছে শুনেছি। রাশেদ ওর মা’র একমাত্র সন্তান। তিনি কীভাবে সহ্য করবেন পুত্র শোক? স্বামী হারিয়েও পুত্রের মুখ চেয়ে বেঁচে থাকতে পেরেছেন। পুত্রকে হারিয়ে কী নিয়ে বেঁচে থাকবেন? মানুষ যে এমনই...বেঁচে থাকার জন্য সব সময়ই একটা অবলম্বন খোঁজ করে। একটা কিছুকে আঁকড়ে ধরে পার করতে চায় জীবনের কঠিন পথ।

    দরজায় বেল টিপে দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। প্রায় পাঁচ ছয় মিনিট তো হবেই! আবার টিপতে যাবো এমন সময় দরজা খুলে গেল। পাল্লা ধরে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তাকে চিনতে কারো ভুল হবার কথা নয়। আলুথালু বেশবাস আর উদ্ভ্রান্ত চোখের দৃষ্টিই বলে দেয় কী বয়ে চলেছে তার উপর দিয়ে। কিছুক্ষণ কথা বলতে পারলাম না কোনো। সম্বিত ফিরে পেতেই সালাম দিয়ে বললাম,

    ‘ভাবী, আমি রাশেদের ছোটবেলার বন্ধু। আমার নাম জোনায়েদ। রাশেদ অসুস্থ খবর পেয়েছি...তাই...’

    ‘ও..., আসুন। আপনি মনে হয় অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন...’ খুব ক্লান্ত স্বরে কথা বলে উঠলেন রাশেদের স্ত্রী। ‘কিছু মনে করবেন না। এই ক’দিনে আমাদের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে।’

    ‘আমি বুঝতে পেরেছি ভাবী।’

    পাশের ঘর থেকে অল্প কিছুক্ষণের বিরতিতে কাশির আওয়াজ আসছে। ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্বরে একটা আওয়াজ শোনা গেল,

    ‘কার সাথে কথা বলছো মিনা? কে এসেছে?’

    মিনা, মানে রাশেদের স্ত্রী আমাকে লক্ষ্য করে বললেন,

    ‘ও এখন অল্পতেই খুব অস্থির হয়ে ওঠে। সব কিছু জিজ্ঞেস করে। অবিরাম প্রশ্নের পরে প্রশ্ন করতে থাকে। কিছুক্ষণ সাড়া না পেলেই হৈ চৈ শুরু করে দেয়। আপনি ঐ ঘরেই যান। ও তো বেশ কিছুদিন যাবত হাঁটাচলা করতে পারে না। সারাদিন বিছানাতেই শুয়ে থাকে।’

    আমার মাথাটা কি ঘুরছে অল্প অল্প? কেমন যেন শীত শীত লাগছে। এই বাসাটাতে ঢোকার পর থেকেই যেন মৃত্যুর সাথে দেখা হয়ে গেছে। কোথাও যেন কোনো প্রাণের ছোঁয়া নেই। পা টাকে একরকম টেনে নিয়ে চললাম পাশের ঘর। বুকের মধ্যে বেজে চলা হাতুড়ির আওয়াজ যেন আকাশ ছুঁয়েছে। দ্রাম দ্রাম শব্দে আমার অস্তিত্তকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে দিয়ে যাচ্ছে।

    দুতিনটা বালিশ বিছানার মাথায় সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাতে হেলান দিয়ে বসে আছে রাশেদ। আমার স্কুল কলেজ জীবনের মেধাবী সুদর্শন চেহারার রাশেদ। এখানে না আসলে কেউ আমাকে বার বার বললেও আমি বিশ্বাস করতাম না, এটিই আমার সেই একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহচর। চোখের নীচে বেশ পুরু করে কালি জমেছে। অস্থি চর্মসার দেহ। গলার কাছের হাড় পরিষ্কার হয়ে ফুটে উঠেছে। শরীরের এখানে ওখানে কালো কালো ছোপ ছোপ দাগ। মাথার চুল মনে হচ্ছে কেউ খাবলা মেরে উঠিয়ে দিয়েছে। মনে আছে যেদিন বাসে দেখা হয়েছিল, রাশেদ বার বার হাত দিয়ে নিজের অবাধ্য ঘণ চুলগুলোকে শাসন করছিল। বাতাসে সেগুলো বার বার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিলো। আমি একপর্যায়ে বলে ফেলেছিলাম,

    ‘রাশেদ, তোর চুলগুলো তো এখনো অনেক ঘন আছে। আমারটা দেখ! একেবারে ফাঁকা ময়দান! হাহ হা...’

    রাশেদ আমাকে দেখে হাসার চেষ্টা করলো। ঠোঁটদুটোকে একটু প্রসারিত করে হাসির মতো কেমন যেন একটা ভঙ্গি করলো। সেটাকে কান্নার মতো মনে হলো। আমি গিয়ে বসলাম রাশেদের বিছানার পাশে রাখা চেয়ারটাতে, খুব কাছাকাছি। আমার খুব খারাপ লাগছিলো ওর মুখের দিকে সোজাসোজি তাকাতে। তবু প্রাণপন চেষ্টা করে চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলাম,

    ‘কেমন আছিস রে রাশেদ?’

    ‘কেমন আর থাকবো! দেখতেই তো পাচ্ছিস...একেবারে টেশে গিয়েছি!’

    আবারও হাসার চেষ্টা করলো রাশেদ।

    রাশেদ ছোটবেলায় নিজেকে খুব সাহসী প্রমাণ করতে চাইতো। আমরা জানতাম ও ছিল আসলে একটা ভিতুর ডিম। কিন্তু সে সেটাকে মিথ্যে প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগে যেতো। আমাদের গ্রামে একটা পুরনো কালী মন্দির ছিল। সেটা ছিল পরিত্যক্ত। সেখানে অনেকদিন কেউ পুজো দিতে আসতো না। কালী মন্দিরটা জুড়ে ছিল একটা প্রকাণ্ড বট গাছ। সেটার বড় বড় ঝুরি উপর থেকে নেমে এসে একটা ভারী ভৌতিক আবহ তৈরি করেছিল। সেই গাছের নীচ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের প্রায় প্রত্যেকের বুকই ধুকপুক করে কাঁপতো। কিন্তু কেউ সেটা স্বীকার করতাম না। আমাদের মধ্যে একটা গল্প চালু ছিল, এই কালী মন্দিরে আগে নাকি নরবলি দেওয়া হতো। সেই নরবলি দেওয়া মানুষগুলোর ভূত মরার পরে সেই বটগাছেই থাকতো। সন্ধ্যের সময় তারা গাছ থেকে নেমে এসে মন্দিরের ভেতরে অপেক্ষা করতো। অন্ধকারে কেউ সে জায়গা দিয়ে পার হলে তাদের ধরে নিয়ে ঢুকিয়ে দিতো সেই মন্দিরের ভেতরে। তাদের হদিস আর কেউ কখনো পেতো না।

    রাশেদের সাহসিকতার ফাঁকা আওয়াজে অস্থির হয়ে ওকে আমরা একবার এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলাম। সন্ধ্যের সময় সেই বটগাছের নীচ দিয়ে পার হতে হবে। আমরা সবাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে লক্ষ্য রাখবো। রাশেদ বাহাদুরি করে আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। তারপর আমরা সবাই দূর থেকে দেখতে লাগলাম। সেই গাছের নীচ দিয়ে যাবার সময় একবার উপরে তাকিয়ে রাশেদ একেবারে সটান মাটিতে পড়ে গেল।

    আমরা অনেক সাহস সঞ্চয় করে রাশেদকে ধরাধরি করে সরিয়ে নিয়ে আসলাম। এরপরেও সে নানাভাবে এই ঘটনার ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিছুতেই তাকে স্বীকার করানো যায়নি যে সেদিন ভয়েই সে রাস্তায় সটান হয়ে গিয়েছিল। এক পর্যায়ে আমরাও ওকে ছেড়ে দিয়েছিলাম। মুখের বাহাদুরি দেখিয়ে যদি শান্তি পায় পাক না!

    আজ এই ভগ্নস্বাস্থ্য মৃত্যুপথযাত্রি রাশেদের জোর করে টেনে নিয়ে আসা হাসিমুখ দেখে আমার আবার সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল। আমি ওর হাতটা শক্ত করে ধরলাম। কিছু বললাম না। কখনো কখনো মৌনতা শব্দের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাশেদ ওর দূর্বল দু’হাতে আমার হাতটাকে আঁকড়ে ধরে কাশির দমক সামলাতে সামলাতে কাঁপা কাঁপা স্বরে বললো,

    ‘তোর মনে আছে জোনা...স্কুলে যাওয়ার পথে... বাঁশের সাঁকোটা পার হবার সময় রোজ তোর সাথে বাজি ধরতাম। দূর থেকে দৌড়ে এসে কে আগে পার হতে পারবে সাঁকোটা। একদিনও তোর সাথে জিততে পারতাম না। তুই রোজ দৌঁড়ে আমার পেছনে থাকলেও কীভাবে যেন আমাকে টপকে সাঁকোতে উঠে যেতি। আমি প্রতিদিন প্রতিজ্ঞা করতাম, আজকে আমি জিতবোই। কিছুতেই তোকে আজ জিততে দেবো না। দেখলি? বড় বাজিতে কিন্তু তুই আমাকে হারাতে পারলি না! আজ কেমন তোকে টপকে আমি আগে উঠে গেলাম ওপাড়ে যাওয়ার সাঁকোতে! এবার আমাকে হারাবি কীভাবে? হ্যাঁ?’

    আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি ঝরতে লাগলো। আমিও খুব প্রতিজ্ঞা করে এসেছিলাম, রাশেদের সামনে একেবারে কাঁদবো না।

    আমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারলাম না।

     (চলবে.........।)