বিজ্ঞপ্তি

এই লেখাটি গল্পকবিতা কর্তৃপক্ষের কোন সম্পাদনা ছাড়াই প্রকাশিত এবং কর্তৃপক্ষ এই লেখার বিষয়বস্তু, মন্তব্য অথবা পরিণতির ব্যাপারে দায়ী নয়।
Photo
জন্মদিন: ২৩ নভেম্বর ১৯৭৫

একদিন পাখি উড়ে

  • ১ম পর্ব

    ‘জোনায়েদ ভাই, এই যে, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি? আরে কী ভাই...অফিসে বসে বসে ঝিমান। আসেন, একটু গপ সপ করি। ঝিমানি কেটে যাবে।’

    মনে মনে ব্যাপক বিরক্ত হলাম। কিন্তু মুখে তেল চকচকে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করলাম। কতোটা পারলাম জানি না। অফিসে এসেই আজ একটা দুঃসংবাদ পেয়েছি। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু দুরারোগ্য মরণ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মনটা তখন থেকেই অস্থির। আমার স্কুল কলেজ জীবনের অতি কাছের এক বন্ধু। সুখে দুঃখে অনেকটা সময় দুজন একসাথে পার করেছি। মধ্যবিত্ত জীবনের টানাপোড়েনে শিক্ষাজীবন শেষে আর তেমন একটা যোগাযোগ হতো না। দুজনেই ছোটখাট চাকরি করি। মাস শেষে নুন আনতে পানতা ফুরোনোর দশা। তাই কার খোঁজ কে রাখে! তবু হঠাৎ সঠাৎ মাঝে মধ্যে পথচলতি দেখা হয়ে যেতো।এক ঝটকা দমকা বাতাসের মত যৌবনের সেই দিনগুলো উঁকি দিয়ে যতো মনের ফাঁকে। আজ সকালে ফোনে কলেজের আরেক বন্ধু খবরটা দিলো। বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠলো। আহারে! কত বয়স হলো আমাদের? এখনই চলে যাওয়ার দিন এসে গেলো?

    কাজের মাঝখানেই ডেস্কে মাথাটা গুঁজে দিয়ে বসে ছিলাম। ভাল লাগছিলো না কিছুই। সকাল সকাল বেরুতে হয়। রাতে ঘুমাতে ঘুমাতে অনেক বেজে যায়। শরীর মনের ক্লান্তিতে হয়তো তন্দ্রা চলে এসেছিলো। জলিল সাহেবের গুঁতা খেয়ে সোজা হয়ে বসলাম।

    ‘কিছু বলছিলেন নাকি জলিল ভাই?’ যথাসম্ভব সহজ হওয়ার চেষ্টা করলাম। নিজের আবেগ অনুভূতি অন্য কারও সামনে প্রকাশ করতে আমার কখনোই ভাল লাগে না।

    ‘মিজান সাহেবের মিসেসের কেইসটা শুনেছেন কিছু? ঘটনা তো জমে একেবারে কুলফি। হে হে হে...’

    আমি যারপরনাই বিরক্ত হলাম। জলিল সাহেবকে অফিসে একটা বিশেষ নামে ডাকা হয়, ‘ড্রিলিং মেশিন’।  অফিসে যার যতরকম খুঁটিনাটি খুঁত আছে, সবকিছুই তার ড্রিলিং করে বের করে আনা চাই। যখন অফিসে খোঁড়ার মত কিছু পান না, তখন অফিসের বাইরে মনোনিবেশ করেন। সময়কে মোটেও হেলায় হারান না। এ কাজে তিনি বিশেষ দক্ষ। আমি বিরক্ত মুখেই বললাম,

    ‘কেন কী হয়েছে মিজান সাহেবের বউ এর?’

    ‘আরে ভাই, তার মিসেস তো পগার পার। ফুরুৎ। পাখি উড়াল দিয়েছে নীল আকাশে।’

    আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। রেগেমেগে বললাম,

    ‘ভাই, ভনিতা রেখে আসল কথা বলেন না!’

    ‘আরে, মিজান সাহেবের বউ তো তার প্রাক্তন প্রেমিকের ডাকে সাড়া দিতে বাড়ি ছেড়েছেন। দিন পনেরো হয়ে গেলো। মিজান সাহেব তো মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছেন। কিন্তু তাতে কী আর শেষ রক্ষা হয়! হে হে...’

    মনটা একটু খারাপ হলো। মিজান সাহেব আমাদের অফিসের একাউনট্যাণ্ট। একেবারেই কম বয়সী একটা ছেলে। আগের জন রিটায়েমেণ্টে যাওয়ার পর নতুন জয়েন করেছে। ছেলেটা কাজের। কথাবার্তাতেও চৌকষ। আমার কেমন জানি একটু মায়া লাগলো। যদিও জলিল সাহেবের কথাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কিছু নাই। তিনি খোঁড়াখুড়ি করে গল্প বের করতে ভালোবাসেন। নিজে থেকে বের না হয়ে আসলে গল্প বানিয়ে বের হওয়ার পথকে সুগম করে দেন। অফিসে তার গল্প শোনার লোকের কোন অভাব নাই। প্রায় সময়ই তাকে সঙ্গিসাথি পরিবেষ্টিত হয়ে আড্ডা মারতে দেখা যায়। সেই আড্ডাতে আমিও যে মাঝে সাঝে বসি না, এমন নয়। এসব গল্প গাঁথা কেমন যেনো চানাচুরের মতো। মুখে ঢুকিয়ে চিবুতে বেশ লাগে। মুঠোয় মুঠোয় সময় পার হয়ে যায়।

    কিন্তু আজ সত্যি ভালো লাগছে না। তাই একটু উষ্মাভরেই বললাম,

    ‘আরে কী জলিল ভাই, ছেড়ে দেন না! কী মজা পান মানুষের এসব নোংরা ঘেঁটে?’

    জলিল সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে বিশেষ ভ্রুভঙ্গি দিলেন। মশামাছি তাড়ানোর মতো করে বললেন,

    ‘তা জোনায়েদ সাহেবের বোধকরি আজ মুড নাই। কী ভাই, ভাবীর সাথে বনিবনা হচ্ছে তো ঠিকঠাক?’

    কথাটা বলে বেমক্কা একটা চোখ মেরে দিলেন আমাকে। অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে সামনে এগুলেন। তার উদ্দেশ্য বুঝতে আর বাকি রইলো না আমার। মিজান সাহেবের বউ ভেগে যাওয়ার খবরটা আর আধাঘণ্টার ভেতরেই অফিসের কাকপক্ষি কারও কাছেই পৌঁছতে বাকি থাকবে না। বেচারা মিজান সাহেবের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আমি মনে মনে একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলাম।

    আজ একেবারেই মন বসছে না কাজে। মাথাটা কেমন যেন চিনচিন করছে। তার মধ্যে জলিল সাহেবের বেহুদা কথা শুনে আরো বিরক্ত লাগছে। অফিসতো নয়, যেন একেবারে কুঞ্জবন! রঙের হাট বসে যায় প্রতিদিন। বুঝলাম, মারাত্মক চটে গেছি। আজ আর অফিসে বসে থেকে কাজ নেই। বলা তো যায় না, কারো সাথে উল্টাপাল্টা আচরণও করে বসতে পারি। সেটা কোনো কাজের কাজ হবে না মোটেও। ছুটি নিয়ে বাসায় চলে যাই বরং। যদিও একেবারে অপারগ না হলে সাধারণতঃ ছুটি নিই না আমি। তাই বেশ কিছু সিএল জমে গেছে। শুধু শুধু জমিয়ে রেখে তো কোনো লাভ নেই। বছর শেষে এই সিএল তো আর কোনো কাজে লাগবে না। তবু জানি না কেন জমাতে ভালো লাগে। সিএল জমা আছে ভাবলে একটা আলাদা শান্তি পাওয়া যায়। অনেকটা ব্যাংকে জমানো টাকার মতো, আলগা সুখ দেয়।

    সকালবেলা বন্ধুর খবরটা পাবার পর থেকেই নানান কিছু ভেবে চলেছি। ব্যাংকে টাকা পয়সা কিছু আছে কীনা সেটাও একফাঁকে ভেবে নিয়েছি। ছোট চাকরি করি। মাস শেষে তেমন কিছুই হাতে থাকে না। দুই ছেলে মেয়ের পড়াশুনা। তাদের স্কুল, কোচিং। এছাড়াও প্রতি মাসে কম করে হলেও দু’তিনটা দাওয়াত থাকে। বার্থডে, ম্যারিজ ডে, সিলভার জুবিলি, গোল্ডেন জুবিলি, গোল্ডেন এ প্লাস...কতো কী! মাঝে মাঝে ভাবি এই ডে গুলো কি মানুষের জীবনে আগে ছিল না, নাকি নতুন এসেছে? কই আগে তো এতো ঘটা করে বাসায় বাসায় এইসব ‘ডে’ উৎযাপন করতে দেখতাম না! এইগুলোর আবির্ভাব হলো কোথা থেকে?

    বেশির ভাগ উৎসবই লেগে থাকে শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজনের দিকে। অতএব, সেগুলোতে উপস্থিত না হলে বাসায় হাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর তাতেই প্রতি মাসে পকেট হয়ে যায় গড়ের মাঠ। সেটাতে বাকী ক’টা দিন ঘু ঘু চড়ে। সঞ্চয় বলতে গেলে কিছুই করা হয়নি।

    দেশের বাড়িতে বাবা-মা আছেন। ছোট ভাইটাও তাদের সাথেই আছে। সে লেখাপড়া তেমন কিছু করেনি। এইচ এস সি তে দু’বার ফেল করার পরে বাবাই একদিন ওকে বললেন,

    ‘আর পরীক্ষা দিয়ে কাজ নেই। সবাইকে দিয়ে সব হয় না। ব্যবসা পাতি কিছু করতে পারলে কর, নয়তো হাতে হাল তুলে নে।’

    বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। আদর্শের শিক্ষা দিয়ে মানুষ করতে চেয়েছেন সন্তানদের। এক সন্তান আদর্শকে শিকেয় তুলে কেরানীগিরি দিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছে। আরেক সন্তান শিক্ষার পাঠ সম্পূর্ণ না করতে পেরে ‘কিছু একটা’ করার চেষ্টায় জীবনপাত করছে। বাবা তার কষ্টের সবটুকু সম্বল ওর হাতে তুলে দিয়েছেন, যদি কিছু একটা ব্যবসা পাতি করে জীবনে মাথা তুলে বাঁচতে পারে। বড়ভাই হয়ে কিছু যদি দিতে হয় এই ভয়ে দূরে দূরেই থেকেছি। ছোট ভাই কী করছে, কীভাবে বাবা-মার দিন কাটছে কোনো খবরই রাখা হয়নি।

    সেই ছোটবেলায় বাবার সাথে মসজিদে যেতাম। প্রতি শুক্রবার জুম্মার দিনে ধবধবে সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পড়ে, কানে গলায় আতর মেখে সাজগোজ করে নামাজ পরতে যেতাম।

    ‘নামাজের সময় সুন্দর কাপড়-চোপড় পরতে হয়। আল্লাহ সুন্দর, তাই তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন।’ বাবার কাছেই শুনেছি।

    ধীরে ধীরে অন্য দিনগুলোতেও বাবা মসজিদে নিয়ে যেতে শুরু করলেন। মসজিদে হুজুরের কাছে অন্য বাচ্চাদের সাথে কুরআন তেলাওয়াতের তামিল নিতে শুরু করলাম। আস্তে আস্তে চমৎকার উচ্চারণে কুরআন পাঠ করতেও শিখে গেলাম। বাবা বলতেন,

    ‘আমার যতোটুকু সাধ্য, আমি করার চেষ্টা করলাম বাবা। বাকীটুকু তোমার দায়িত্ব এখন। জীবনে চলার পথে আমার দেওয়া এই শিক্ষাটুকুর সম্মান করো আর নিজের সঞ্চয় বাড়ানোর চেষ্টা করো।’

    জীবনের আটচল্লিশটা বছর পার করে ফেললাম। দীর্ঘ পথ। কতো শত অভিজ্ঞতার ভান্ডার পূর্ণ করে চলেছি অহরহ। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠি। খাবার খাই। শরীরের যাবতীয় চাহিদা পূরণ করি। বাথরুমে যাই। সবকিছুই করি নিয়ম মাফিক। সময়ের কোনো টানাটানি পরে যায় না কখনো। শুধু সৃষ্টিকর্তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসার সময়টুকু কিছুতেই করে উঠতে পারি না। আলমিরাতে যত্ন করে রাখা আছে জায়নামাজ। বাবা নিজের হাতে দুটো জায়নামাজ হাতে তুলে দিয়েছিলেন। ছোট শালা দু’বছর আগে হজ থেকে ফিরে আরো দুটো গিফট করেছে। স্ত্রী সুন্দর করে ভাঁজ করে সব তুলে রেখেছে। ভাঁজ খুলে দেখা হয়ে ওঠে না। সময় কই? সারাদিনের এতো ব্যস্ততা!

    বাসার কতো কাছে মসজিদ। দু’পা হাঁটলেই পাশের গলিতে। প্রায় প্রতিদিনই ফেরার পথে ঐ গলি থেকে এটা সেটা বাজার সদাই করে নিয়ে আসি। শুকনো বাজার...চা, চিনি, দুধ, চাল, ডাল। বাচ্চাদের স্কুলের খাতা, কলম। ঔষধপাতি, প্রতি মাসের প্রয়োজন। মসজিদটার দিকে চোখ পড়ে যায় কখনো সখনো। মুসল্লিদের ভীড়ে বাবার হাত ধরে মসজিদে আসা কোনো কচি মুখ দেখে হঠাৎ কিছু একটা মনে আসতে গিয়েও আসে না। চোখ চলে যায় অন্য কোনো প্রয়োজনের সন্ধানে। চারপাশে শুধু হাজার প্রয়োজন। খরচের তালিকা বাড়তে বাড়তে আকাশ ছুঁয়েছে। প্রতি মাসে যুক্ত হচ্ছে নতুন হিসাব। নগদের হিসাব ছেড়ে এখন বাকীর ঘরে সংখ্যা বসাতে শুরু করেছি।

    আসলেই তো, কোনো সঞ্চয়ই করা হয়ে ওঠেনি জীবনে আমার!

     (চলবে............)